‘অস্পৃশ্য’ ও অভিজাত বিদেশিনীর কালজয়ী প্রেম

যখন আমরা গভীর কোনো ভালবাসার গল্প শুনি, তখন যেন মনের অজান্তেই বলে উঠি, ‘এটা তো কেবল সিনেমাতেই সম্ভব।’ সুন্দর ও মহান ভালবাসার একেকটি গল্প তো আর রোজ রোজ জন্ম নেয় না, তাই গল্পগুলো তো একটু সিনেম্যাটিক হবেই। এখন তেমনই একটা গল্প বলতে চলেছি আমরা।

  • গল্পের শুরু

গল্পটা প্রদীউমনা কুমার মহানান্দিয়া ও শার্লট  ভন শেডভিন বেগানের। তাদের প্রথম দেখা ভারতেই। এখানেই জন্ম প্রদীউমনার। জন্মের সময় এক জোতির্বিদ বলেছিলেন, প্রদীউমনার বিয়ে হবে ভিনদেশের এক অভিজাত পরিবারে। পাত্রী হবে বৃষরাশির জাতিকা, তিনি বাঁশি বাজাতে জানবেন ও তার বনাঞ্চলে অনেক জমিজমা থাকবে।

  • প্রথম দেখা

সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রদীউমনা ছিলেন নিচু জাতের মানুষ। ভারতী সমাজে তাঁদের অস্পৃশ্য বলে মনে করা হত। প্রদীউমনা স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘আমাদের সাথে কুকুর ও গৃহস্থালীর পশুর চেয়েও বাজে ব্যবহার কর হত। মন্দীরের পাশ দিয়ে গেলে লোকেরা আমায় পাথর ছুড়ে মারতো।’

যুবক বয়সে, প্রদীউমনা দিল্লীর রাস্তায় মানুষের ছবি এঁকে বেড়াতেন। সেখানেই তাঁর প্রথম দেখা হয় সুইডিশ টুরিস্ট শার্লটের সাথে। সেদিনই প্রদীউমনা বুঝে ফেলেছিলেন, কিছু একটা হতে চলেছে। কারণ, ও জোতির্বিদের ভবিষ্যৎবানী একদম মিলে যাচ্ছিল। দেখা গেল, শার্লট বৃষরাশির জাতিকা, তিনি বাঁশি ও পিয়ানো বাজাতে জানেন। এটাও শার্লট জানিয়ে দেন যে বনাঞ্চলে তাঁর পরিবারের জমিজমা আছে। সেদিন প্রদীউমনা মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন, ‘বাহ দারুণ! তুমি তো আমার স্ত্রী হতে চলেছো।‘

এর কিছুদিন বাদেই তাঁদের মধ্যে রোমান্টিক একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে, প্রদীউমনার গ্রামে স্থানীয় রীতি মেনে তাঁদের বিয়েও হয়ে যায়!

না, এতটুকুতে ভালবাসা অমর হয় না! গল্পটা কেবল শুরু হল এখানে।

  • বিচ্ছেদ

এই গল্পটা কতটা সুন্দর সেট আসলে দু’জনের মাঝে বিচ্ছেদ না আসলে বোঝারই উপায় ছিল না। শার্লট সুইডেনে চলে গেলেন। প্রদীউমনা কথা দিলেন, কিছু দিনের মাঝে তিনিও চলে আসবেন সুইডেনে।

১৬ মাস তারা আলাদা থাকলেন। এই সময়ের মধ্যে দু’জনের মধ্যে অবশ্য চিঠি চালাচালি ছিল। প্রদীউমনা বুঝে ফেললেন প্রাণপ্রিয় স্ত্রীকে ছাড়া তিনি বেশিদিন একা থাকতে পারবেন না। সব জমিজমা বেঁচে দিয়ে তিনি অন্তত টিকেটটা কেনারও পুরো অর্থ জমলো না। বাধ্য হয়ে ৬০ রুপি দিয়ে একটা সাইকেল কিনে ফেললেন। পকেটে ২০০ রুপি নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করলেন সুইডেনের পথে।

  • অনন্ত যাত্রা

১৯৭৭ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি রওনা দেন। তখনও প্রদীউমনার জানা ছিল না যে, সফরটা পাঁচ মাস লম্বা হবে। প্রতিদিন ৪৫ মাইল করে এগিয়েছেন। যখন তিনি সুইডেন পৌঁছান তার ছয় হাজার মাইল পাড়ি দেওয়া হয়ে গেছে তাঁর।

সেই সাইকেল

তিনি বলেন, ‘আমি প্রচণ্ড টায়ার্ড ছিলাম। আমার পা গুলো আর চলছিল না, কিন্তু স্রেফ শার্লটের কথা ভেবে আমি অনুপ্রানিত হই। আমার শিল্প আমাকে বাঁচিয়েছে। আমি রাস্তায় চলতে চলতে ছবি এঁকেছি। মানুষের কাছে বিক্রি করেছি। তাঁদের অর্থে আমার থাকা ও খাওয়ার সংস্থান হয়ে যায়।’

ওই সময় দেশগুলোতে যেতে কোনো ভিসা বা আলাদা কোনো অনুমতি লাগতো না। সফরটা তাই অনেক সহজ ছিল। যদিও সুইডেনে গিয়ে প্রদীউমনাকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা ঠাঁই দিতে চাইছিলেন না। কর্তৃপক্স কোনো ভাবেই তাঁর গল্পটা বিশ্বাস করছিলেন না। তবে, শার্লটকে ফোন দিয়ে নিয়ে আসার পর তাঁরা বুঝতে পারেন ও প্রদীউমনাকে ঢুকতে দেন।

প্রদীউমনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এত গরীব হয়ে এই সময়ে বসে কি এমন একটা কঠিন সফর করা সম্ভব? তিনি অনেকটা সিনেম্যাটিক ভঙ্গিতেই জবাব দেন। বলেন, ‘আপনি যদি সত্যিই কোনো কিছু চান, তাহলে সবই সম্বব। হ্যা, অবশ্যই ওরকম সফর এখন খুব কঠিন, তবে এখনো সেটা সম্ভব। সন্দেহ আর ভয়ই এখনকার দিনের মূল শত্রু। এটা যাদের মধ্যে আছে তাদের জীবন কঠিন হয়ে যেতে বাধ্য।’

  • পুনর্মিলন

সুইডেনের বোরাসে প্রদীউমনা পৌঁছাস ১৯৭৭ সালের ২৮ মে। প্রায় দু’বছরের বিচ্ছেদের পর হয় মধুর মিলন। ‘আমরা তখন কোনো কথা বলতে পারছিলাম না, কেবল দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম।’, বলেন প্রদীউমান।

শার্লটের খুশির কথা ভেবে তাঁর পরিবার সামাজিক সব রীতিনীতি ভুলে যায়। বর্ণবাদের অন্ধকার রীতি ভুলে কালো একটা ছেলের হাতে মেয়েকে তুলে দিয়েছিলেন স্বানন্দ্যেই। সুইডেনের আইন অনুযায়ী ১৯৭৯ সালে তাঁদের আবার বিয়ে হয়।

  • ৪০ বছরের যাত্রা

পুনর্মিলনের পর থেকে প্রায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে। এতটা সময় কাটিয়ে দেওয়ার পর মাঝে মধ্যে প্রদীউমনার বিশ্বাসই হয় না যে, তিনি এতটা আনন্দে আছে। মাঝে মধ্যে ভাবেন, যদি এখন এই ইন্টারনেটের যুগে শার্লটের সাথে তাঁর পরিচয় হত, তাহলে কি এভাবে তিনি আদৌ এভাবে মন জয় করতে পারতেন কি না! তবে, একটা ব্যাপারে প্রদীউমনার কোনো সন্দেহ নেই, ‘ভাগ্য হচ্ছে এমন একটা ব্যাপার যেটা আপনি নিজ হাতে নির্মান করেন।’

মাঝে মধ্যেই প্রশ্নের মুখে পড়েন এই দম্পতি, তোমাদের প্রেমের রহস্যটা কি? তাঁরা জবাবে, আন্তরিকতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধাবোধের কথা বলেন।  এই গল্পটা জানলেই বোঝা যায়, দু’টো মানুষের পক্ষে সত্যিকারের ভালবাসা থাকলে আসলে সব কিছুই সম্ভব। ভালবাসার জোরে কোনো বাঁধাই আসলে পাত্তা পায় না! অর্থ সংকট, দূরত্ব, সামাজিক রীতি এসব কোনো বাঁধাই নয়!

– ব্রাইট সাইট অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com