কোকেনের চেয়ে ভালবাসা বড়: সঞ্জয় দত্ত

‘বাড়িতে থাকতে পারাটা একটা স্বর্গীয় অনুভূতি। চিমটি দিয়ে পরখ করি, স্বপ্ন দেখছি না তো। মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে যখন দেখি আমি বাড়িতে আছি, তখন নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।’ – খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন সঞ্জয় দত্তর দিনরাত কাটতো পুনের জেলে। কিন্তু এখন তিনি মুক্ত, স্বাধীন। ফিল্মি ক্যারিয়ারেও নিজের ‘সেকেন্ড ইনিংস’ শুরু করেছেন। এই সময়ে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি মুখোমুখি হলেন টাইমস অব ইন্ডিয়া’র।

‘টাডা কি, আমি জানতামই না’

২৪ বছর আগের কথা। আমি তখন মরিশাসে শ্যুটিং করছিলাম। আমার বোন ফোন দিয়ে বললো, রাইফেল রাখার কারণে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমি বললাম, তাই নাকি! এরপর বাবা (সুনিল দত্ত) ফোন দিয়ে বললো ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে। গেলাম, ওনারা বললেন, ‘কোনো সমস্যা না! শ্যুটিং শেষ করে চলো আসো!’ আমি দুশ্চিন্তায় আর অপেক্ষা করতে পারলাম না। বাড়ির জন্য মন উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। আমি যখন বোম্বের পুরনো বিমানবন্দরে পৌঁছলাম, তখন দেখলাম ৫০ হাজার পুলিশ গান পয়েন্টে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। নিজেকে তখন ওসামা বিন লাদেন মনে হচ্ছিল।

ভারতের প্রত্যেক ব্যক্তির আইন জানা দরকার। হোক সেটা এন্টারটেইনমেন্ট বা ইনকাম ট্যাক্স। আমি আইন না জেনে ভুল করেছিলাম। আমি সেই কথাটাই বলতে এসেছিলাম। যা ভুল করেছিলাম তার জন্য শাস্তি বুঝে পেতে আমি প্রস্তুত ছিলাম। ভেবেছিলাম, পুলিশ আমাকে ছেড়ে দেবে, কারণ আমি প্রথমবারের মত এই ভুল করেছি।

কিন্তু এ কি! আমাকে ক্রাইম ব্রাঞ্চে নিয়ে গিয়ে টাডা (টেরোরিস্ট অ্যান্ড ডিসরাপটিভ অ্যাক্টিভিটিস অ্যাক্ট) লাগিয়ে দেওয়া হল। আমি জানতামও না টাডা কি জিনিস। যখন এমএন সিং (তৎকালীন মুম্বাই পুলিশের ক্রাইম বিভাগের জয়েন্ট কমিশনার) এসে বললেন যে আমাকে মুম্বাই ব্লাস্ট কেসে গ্রেফতার করা হয়েছে, তখন আমি ভেঙে পড়লাম। আমি চিৎকার করে বললাম, ‘আমি কেন নিজের শহরে বোম ব্লাস্ট করতে যাবো? কেন দেশের বিরুদ্ধে যাবো? উনি জবাবে শুধু বললেন, ‘দু:খিত, আপনাকে আমরা গ্রেফতার করছি।’

‘জেলে ডাল থেকে মাছি সরিয়ে খেয়ে ফেলতাম’

যখন প্রথম জেলে যাই, তখন বাবার জন্য খুব কঠিন সময় ছিল। রাখির দিনে প্রিয়া (প্রিয়া দত্ত, সঞ্জয়ের বোন) আমার সাথে দেখা করতে আসতো। আমি জেলে জমিয়ে রাখা কুপনগুলো ওকে দিতাম। আর পুনের জেলে অনেক মাছি। চুলে, কাপড়ে, এমনকি খাবারেও মাছি এসে পড়তো। আমি মাছি সরিয়ে ডাল খেয়ে ফেলতাম। আমার সাথে যে থাকতো, ও সেই ডাল খেতো না। আমি ওকে বলতাম, ‘আরে, কতক্ষণ না খেয়ে থাকবে!’ ও বলতো, ‘তুমি কিভাবে মাছি পড়া ডাল খেয়ে ফেলো?’ আমি ওকে বললাম, ‘এখানে তো ডাল বাদে আর কোনো প্রোটিন পাওয়ার উপায় নেই!’

‘জেলে কোনো কিছুরই আশা করতাম না’

জেলের সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, ওখানে কোনো কিছুর আশা করতে নেই। এটাই সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার। একবার এটা করে ফেলতে পারলেই জীবন সহজ আর সুন্দর হয়ে উঠবে। জেলে কোনো কিছুরই আশা করতাম না, কোনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতাম না, জেল যাত্রা তাই সহজ হয়ে গিয়েছিল। সময়ও দ্রুত কাটছিল।

আমি শিখেছিলাম, কাজ করো, কিন্তু কোনো প্রাপ্তির আশা করো না। আমি গোটা দেশে ঘুরে ঘুরে আমার এই শিক্ষাটা, আমার জীবনের অভিজ্ঞতাটা ছড়িয়ে দিতে চাই। তবে, আমার জন্য জীবনটা সুন্দর ছিল না। এটা অনেকটা হিমালয়ে উঠে পড়ে যাওয়ার মত ব্যাপার। তবে, প্রত্যেকবারই আমি আবারো চূড়ায় উঠেছি। আর এই ওঠার পথে একবারও হোঁচট খাইনি। আমি জেলে সব ধরণের ধর্মগ্রন্থ পড়েছি। আমি যেকোনে ধর্মের গুরুর সাথে বসে আলাপ করতে পারবো। জেলে বসেই আমি উপাসনালয়ের গন্ধ পেতাম, যদিও আমার ঘরের সামনেই ছিল বাথরুম। কারণ, সৃষ্টিকর্তা আমার হৃদয়ে আছেন।

‘বাচ্চাদের বলেছিলাম পাহাড়ে শ্যুটিং করতে যাচ্ছি’

যখন জেলে ছিলাম, তখন তিন বছর বাচ্চাদের না দেখে থাকাটা খুব কষ্টসাধ্য ছিল। কিছু কিছু সময়ে আমি ওদের খুব দেখতে চাইতাম। আমার স্ত্রী (মান্যতা দত্ত) বলতে, ‘ওদের নিয়ে আসি!’ আমি রাজি হতাম না। বলতাম, ‘কখনোই না। আমি ওদের এখানে দেখতে চাই না।’ আমি চাইতাম না যে ওরা আমাকে জেলের পোশাকে দেখুক। চাইতাম না যে ওরা এই বাস্তবতাটা বুঝুক। কিন্তু, এখন তো বাচ্চারা অনেক স্মার্ট। ওরা নাকি বলতো, বাবাকে ছবিওয়ালা (ভিডিও কল) ফোন করো। ওদের সাথে আমি মাসে দু’বার কথা বলতাম। ওদের বলতাম, আমি পাহাড়ে শ্যুটিংয়ে আছি। এখানে ফোনের কানেকশন ভাল না। ওরা তাই আজো সত্যিটা জানে না।

‘কারাবাস আমার অহংকার গুড়িয়ে দিয়েছে’

কারাগারের জীবন রোলার কোস্টার রাইডের চেয়ে কিছু কম নয়। এটাকে ইতিবাচকভাবেই দেখি আমি। এখান  থেকে আমি অনেক শিখেছি।  আমি আরও ভাল মানুষ হতে পেরেছি। পরিবার আর প্রিয় মানুষদের থেকে দূরে থাকা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। জেলে প্রতি ছয় মাসে সাস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত কয়েদিদের সংলাপ বলা, গান, নাচ শিখিয়েছি। কঠিন সময়ে তারাই পরিবার হয়ে ওঠে আমি। আমি হাল ছেড়ে দিতাম, তখন ওরাই আমার পাশে এসে দাঁড়াতো। কারাবাস আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে, অনেক উপলব্ধি এসেছে। এটা দরকার ছিল। কারাগার আমার অহংকার গুড়িয়ে দিয়েছে।

‘এতটাই ড্রিঙ্ক করতাম যে জেলে আসার আগে আমার ওজন ছিল ১১০ কেজি’

কে বলেছে জেলে শরীর ধরে রাখা যায় না। জেলে আসার আগে আমি কুকুরের মত এতটাই ড্রিঙ্ক করতাম যে ওজন হয়ে গিয়েছিল ১১০ কেজি। একদিন গোসল করার সময় লক্ষ্য করলাম, পেট একটু বেশিই বড় হয়ে গেছে। মনে মনে নিজেকে বললাম, ‘এবার তো তোমার লজ্জা হওয়ার উচিৎ সঞ্জয়!’

এরপর থেকে আমি জেলের আঙিনাতেই এক বালতি পানি নিয়ে দৌঁড়ানো শুরু করলাম। রুমে ফিরে দেওয়ালে বক্সিং করতাম। ততক্ষণ ঘুষি মেরে যেতাম, যতক্ষণ না আমার হাত ফেঁটে রক্ত বের হয়ে আসতো। আমি এটা রোজ করতাম। আমি ব্যাথাকে জয় করতে চাইতাম।

‘বন্ধুদের কাছে আমি কোনো দাবী করি না’

আগে আমার মন যা বলতো, তাই করতাম। কিন্তু, এখন আমি বদলে গেছি। আমার কাছে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা অন্যরকম। বন্ধুদের কাছে আমি কোনো দাবী করি না। ওরা আমার খারাপ সময়ে থাকুক আর নাই থাকুক, নিজের খারাপ সময়ে আমাকে পাশে পাবে। ভাল সময়ে সব সময় পাবে কি না বলতে পারি না। তাই বন্ধুদের কোনো আচরণ আমাকে কষ্ট দেয় না।

যখন আমি জেলে ছিলাম, তখন কারো প্রতিই আমাকে দেখতে আসার জন্য দাবী করতাম না। না আসলে তাই কষ্ট পেতাম না। তবে, এখন যখন ওরা আমার সাথে দেখা করতে আসে, তখন আমি উপভোগ করি।

‘ডাক্তার বলেছিল, তোমার তো এতদিনে মরে যাওয়ার কথা!

আমার মায়ের মৃত্যুর জন্য আমি মাদকাসক্ত হই, এই ধারণাটা ভুল। আমার কুকুর মরেছে, আমি মদ খাবো, আমার গাধা মরেছে আমি মদ খাবো। এগুলো স্রেফ অজুহাত। কেউ নিজে থেকে না চাইলে তাঁকে জোর করে মাদকাসক্ত করা যায় না। তবে, একবার আসক্ত হয়ে গেলে সেখান থেকে বের হয়ে আসা কঠিন। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে আজে ব্যাপার। আমার মাদকাসক্তির যাত্রাটা ১২ বছর লম্বা। পৃথিবীতে এমন কোনো মাদক নেই যার সংস্পর্শে আমি আসিনি।

বাবা যখন পুনর্বাসনের জন্য আমেরিকা নিয়ে গেলেন তখন ডাক্তার আমাকে একটা ড্রাগের লিস্ট দিয়ে টিক দিতে বললেন।  আমি সবগুলোতেই টিক দিলাম, কারণ আমি ওর সবগুলোই নিয়েছি। ডাক্তার অবাক। বললেন, ‘ভারতে তোমরা কেমন খাবার খাও। যেসব ড্রাগ তুমি নিয়েছো, তোমার তো এতদিনে মরে যাওয়ার কথা!’

আমি আমার পরিবারের জন্য মাদক ছাড়িনি। আমি ছেড়েছি, কারণ আমিই চেয়েছিলাম বের হয়ে আসতে। ওই জীবনটা আমি চাইতাম না। যখন পুনর্বাসন শুরু হল, তখন শরীরে অনেক সমস্যা হত। শরীর ভেঙে পড়েছিল, সব সময় খুব শীত লাগতো। সবচেয়ে কষ্ট ছিল নিজের মনতে বোঝানো। মাঝে মাঝে ভাবতাম, এখন তো ঠিক হয়ে গেছি, এখন একবার ড্রাগ নিলে কিই বা হবে! এটা এমন একটা সময় যখন নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। আমি তরুণদের বলবো, জীবনেটা উপভোগ করো, নিজের কাজকে ভালবাসো, নিজের পরিবারকে ভালবাসো। কোকেনের চেয়ে ভালবাসা বড়।

https://www.mega888cuci.com