লাইফ উইল নেভার বি দ্য সেম!

গত সপ্তাহ খানেক ধরে অস্ট্রেলিয়ান পত্র-পত্রিকা গুলো নিয়ম করে পড়ছি।

বাংলাদেশের পত্রিকা গুলোর বাইরে সাধারণত ইংল্যান্ড কিংবা আমেরিকা ভিত্তিক পত্রিকা গুলোই পড়া হয়। তবে সপ্তাহ খানেক ধরে অস্ট্রেলিয়ান পত্রিকা গুলোও আমি বেশ আগ্রহ নিয়েই পড়ছি।

আগ্রহ নিয়ে পড়ার অবশ্য একটা কারন আছে। বল বিকৃতি’র মতো অবৈধ কাজ করার পর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক স্টিভ স্মিথের ভাগ্যে কি হতে যাচ্ছে এবং সেই দেশের মানুষ তার এই কাজ’কে কিভাবে মূল্যায়ন করছে; আমার ব্যাপারটা ভালো ভাবে জানার ইচ্ছে ছিল।

যখন স্টিভ স্মিথ অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকদের সামনে সম্মেলন করে কথা বলতে গিয়ে বার বার কেঁদে ফেলছিলেন, সত্যি বলতে কি, সেই দৃশ্য দেখে আমার চোখেও পানি চলে এসেছে।

যেই মানুষটা পুরো ক্রিকেট বিশ্বে দুই দিন আগেও ছিলো এক নাম্বার ব্যাটসম্যান, যাকে বলা হচ্ছিলো স্যার ডোলান্ড ব্রডম্যানের পরে আধুনিক ক্রিকেটে সব চাইতে সফল এবং ক্লাসিক ব্যাটম্যান; যার নাম নিলেই লোকজন কেবল ক্রিকেট আর ব্যাটিং নিয়ে কথা বলত; তার নাম এখন উচ্চারিত হচ্ছে পুরো পৃথিবীতে প্রতারক হিসেবে!

বল বিকৃতি এবং স্টিভ স্মিথের ভাগ্যে যা ঘটছে, সেটার সঙ্গে আমি নানান বিষয় মেলানর চেষ্টা করছিলাম। সমীকরণ গুলো কোন ভাবেই মিলছে না!

ভারতের সর্ব কালের সেরা ব্যাটসম্যান শচীন কিন্তু একবার এই বল বিকৃতির জন্য ধরা পড়েছিলেন। তাকেও বোধকরি আইসিসি শাস্তি দিয়েছিলো। যেই শাস্তি কিন্তু স্টিভ স্মিথকেও দেয়া হয়েছে। স্টিভ স্মিথকে আইসিসি কেবল এক ম্যাচের জন্য বোধকরি সাসপেন্ড করেছে।

কিন্তু তার দেশের ক্রিকেট বোর্ড এবং মানুষ এতো কম শাস্তি মেনে নেয়নি। আমি তাদের প্রতিটা পত্রিকার খবরের নিচে মানুষজনের কমেন্ট গুলো পড়ছিলাম। প্রায় সবারই একমত।

প্রত্যেকেই স্টিভ স্মিথের ক্রিকেট প্রতিভা নিয়ে কথা বলছে, তার অর্জন গুলোকে স্মরণ করছে; এবং এটাও বলছে- ওর জন্য খারাপ লাগছে; সেই সঙ্গে প্রায় সকল মানুষজনই বলছে- এরপরও তার কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। যাতে ব্যাপারটা দৃষ্টান্ত মুলক হয়।

আপনাদের জানিয়ে রাখি, অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট আমাদের চাইতেও জনপ্রিয় খেলা। সেই দেশে প্রধানমন্ত্রী কিংবা কোন সিনেমার নায়ক-নায়িকার চাইতে বড় সেলিব্রেটি হচ্ছে দেশটির ক্রিকেটার’রা। তাই তারা মনে করছে-স্টিভ স্মিথের বড় রকম শাস্তিই হওয়া উচিত।

এবং হয়েছেও তাই! তাকে এক বছরের জন্য সব রকম ক্রিকেট থেকে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড সাসপেন্ড করেছে।

আমি ভাবছিলাম ভারতের কথা কিংবা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার কথা। আমাদের এইসব দেশেও ক্রিকেট অনেক জনপ্রিয় খেলা। বিশেষ করে ভারতে তো ক্রিকেটার’রা দেবতা তুল্য! তো তাদের অতি জনপ্রিয় ক্রিকেটার শচীন যখন এই একই বল বিকৃতির জন্য জন্য অভিযুক্ত হয়েছিল; তখন কিন্তু ভারতীয় দর্শক’রা উল্টো শচীনের সাপোর্ট করেছে। ভারতীয় দর্শকরা ওই সময়টায় পারলে শচীন’কে মাথায় তুলে রাখে!

একই অপরাধে যেখানে অস্ট্রেলিয়ানরা মনে করছে এটা একটা বড় অপরাধ এবং তার দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি হওয়া উচিত; সেখানে ভারতীয়রা শচীনের অপরাধকে কিছুই মনে করেনি।

দক্ষিণ এশিয়ার মতো দেশ গুলোতে কেন এতো ক্রাইম কিংবা অন্যায় হয় কিংবা কেন আমরা এতো পিছিয়ে; তার একটা ব্যাখ্যা অবশ্য এর মাঝে থেকে দেয়াই যায়। উন্নত দেশ গুলো দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি দিতে জানে। যেই শাস্তি দেখে অন্যরা খুব একটা ক্রাইম করতে সাহস পায় না। আর আমরা অন্যায়কে পারলে উল্টো প্রশ্রয় দিয়ে বেড়াই!

এইতো বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন সরকারি বড় অফিসার ইতালিতে সরকারি কাজে গিয়ে এক সুপার মল থেকে জিনিস পত্র নিজেদের ব্যাগে ঢুকিয়ে টাকা পে না করেই বের হয়ে যাচ্ছিলো। তারা মনে করছিলো- কেউ বুঝতে পারবে না। কিন্তু এইসব দেশে যে স্ক্যানার গুলো খুব সহজেই এই ধরনের চুরি ধরে ফেলে, সেটা তারা বুঝতে পারেনি।

তো ইতালির কতৃপক্ষ কিন্তু তাদের জরিমানা করেছিল। তবে আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশ হলে এই বড় কর্তা’রা নিজদের পদবলে উল্টো তাদেরকে যারা জরিমানা করে বসেছে, তাদেরই বকা শুরু করতেন!

এর চাইতেও বড় ব্যাপার হচ্ছে এরা যখন দেশে ফেরত আসলো, এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি তো দেয়া যেত। কারন এরা বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে বিদেশে গিয়ে চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়েছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে এরা পুরো বাংলাদেশের মর্যাদাতেই আঘাত করেছে! অথচ দেশে ফেরত গিয়ে তাদের কোন শাস্তি হয়েছে বলে অন্তত আমার জানা নেই! যেখানে দেয়া দরকার ছিল দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি, সেখানে তারা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এবং ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে আবারও এমন বে-আইনি কাজ করে বেড়াবে!

এইসব কারনেই আমরা এতো পিছিয়ে আর ওরা এতো উন্নত!

তবে বলতেই হচ্ছে- আমার স্টিভ স্মিথের জন্য খারাপ লাগছে। আজ সাংবাদিকদের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে ছিল  – ‘মাই লাইফ উইল নেভার বি দ্য সেইম!’

অর্থাৎ তাঁর জীবন আর কখনো’ই আগের মতো হবে না! এটাই মানব জীবন! যাপিত জীবনে চলতি পথে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনাই জীবন থেকে মুছে ফেলা যায় না। জীবন তো আর লেখার কোন খাতা নয়; যে ইচ্ছে হলো ইরেজার দিয়ে মুছে নতুন কিছু লিখে ফেললাম আর পুরনোটা মুছে দিলাম!

সর্ব কালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন এই বল বিকৃতিটা তো আর নিজের জন্য করছিল না। সেত পৃথিবীর এক নাম্বার ব্যাটসম্যান এমনিতেই! সে করছিল তার দেশের জন্য’ই! হয়ত ওই খেলাটায় তার দেশ জিতবে, সেটা সে ভাবছিল! আবার তার দেশ যখন তাকে এক বছরের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেটাও দিয়েছে দেশের জন্য’ই। নইলে তাদের দেশের ভাবমূর্তি খারাপ হয়ে যেতে পারে, কম বয়েসি ছেলেপেলেরা এমন কাজ করে বেড়াতে পারে! তাই এই শাস্তিও তার প্রাপ্যই ছিল।

জগতের সকল কিছু থেকেই শিক্ষা নেবার আছে। ক্রিকেট খেলা, অতি সামান্য বল বিকৃতি এবং এর পরের ঘটনা গুলো থেকেও বোধকরি অনেক কিছু শেখার আছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- শিক্ষা যে দুই ভাবেই নেয়া যায়-ভালো কিংবা খারাপ! সমীকরণ’টা আসলে এখানেই! কে কিভাবে মেলাবে, সেটা নির্ভর করছে যার যার উপর!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।