বাকের ভাইয়ের ফাঁসি আজ!

কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ভয়ার্ত চেহারার বদিকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘বাকের কি খুন করেছে?’

বদির দু’চোখে পানি টলটল করছে। বদি উকিলের কথায় মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেয়। উকিল আরো উচ্চস্বরে বলে, ‘মাথা না নাড়িয়ে মুখে শব্দ করে সবাইকে শুনিয়ে বলুন।’

বদি সেদিন মিথ্যা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে বলেছিলো, ‘জ্বিহহ!’

সেদিন ছিলো ৩১ আগস্ট, ১৯৯৩ সাল। মঙ্গলবারের একটি বিষাদময় সন্ধ্যা। বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক দিন। সেদিনের কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অভিনেতা আবদুল কাদের (বদি) বলেন, ‘সেদিন নাটকের সেটে আমি সত্যিহ কান্না করছিলাম। এর জন্য আমার আলাদা কোনো মেকাপ এর দরকার হয়নি। হুমায়ূন ভাই নাটকের দৃশ্যপট এমনভাবে তৈরী করেছিলেন যে আমার চোখে তখন আপনাআপনি পানি এসে যায়।’

এরপর শুরু হয় এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। একটি নাটকের কাল্পনিক চরিত্রের জন্য সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ঢাকা শহর সহ সারা বাংলাদেশের রাজপথে সাধারণ মানুষ মিছিলে স্লোগান ধরে, ‘বাকের ভাই এর কিছু হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’ … ‘বাকের ভাই এর ফাঁসি কেন, জবাব চাই জবাব চাই!’

‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিকের শুটিংয়ে

সন্ধ্যা হলেই শহরের মানুষ বিভিন্ন জায়গা থেকে শাহবাগে জড়ো হয়ে যেতো। সেখান থেকে মিছিল টি.এস.সি, নিউমার্কেট, সাইন্সল্যাব হয়ে ঘেরাও করা হতো রমনা থানা। একটি কাল্পনিক নাটকের জন্য বাস্তব জীবনে মানুষ থানা ঘেরাও করছে এসব ভাবাও যেন অকল্পনীয়!

যাইহোক, তখনকার দিনে এখনকার মত একবারে অনেকগুলো নাটক পর্ব শুটিং করে টিভিতে রেকর্ড সম্প্রচার করা হতো না। প্রতি পর্ব প্রচারিত হওয়ার পর পরবর্তী পর্বের শুটিং করা হতো। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এসব বিষয়ে আরো সচেতন। কারণ তিনি একটি পর্ব প্রচার করার পর পরবর্তী পর্ব নিজের মত করে আরো সুনিপণ দক্ষতায় তৈরী করতেন।

শেষ পর্বের আগে আরেকটি পর্ব প্রচারিত হয় সেপ্টেম্বরের সাত তারিখ। সেই পর্বে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যায় বাকের ভাই এর ফাঁসি হতে যাচ্ছে। মানুষের মাঝে এ নিয়ে আর সংশয় ছিলো না।

এরপর ঢাকা শহরে রাজপথে শুরু হয় আরো তুমুল আন্দোলন। সাধারণ জনগণ কিছুতেই বাকের ভাইয়ের ফাঁসি মেনে নিবে না। তাদের এই আন্দোলন, মিছিল ঠেকাতে রীতিমত পুলিশের ব্যবহার করা হয়। তবু উত্তেজিত জনতাকে কিছুতেই যেন থামানো যাচ্ছিলো না। উল্টো তারা স্লোগান ধরে, ‘বদি তোমার চামড়া, তুলে নিবো আমরা।’

নাটকের শেষ পর্ব প্রচারিত হওয়ার কথা ছিলো সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখ। কিন্তু সেদিন আর নাটকটি সম্প্রচারিত হয়নি। কারণ নাটকের শুটিংই করা হয়ে উঠেনি। সাধারণ মানুষের তোপের মুখে হুমায়ূন আহমেদ তখন বাসা থেকে বের হতে পারতেন না। অনেকটা বাসায় নির্বাসিত জীবন শুরু করে দিয়েছিলেন।

রাজপথের পরিস্থিতি সত্যিহ অনেক খারাপ হতে থাকে। সেইসময় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণলয়ের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিজে। তিনি তার প্রেস সচিবকে দিয়ে নাটকের পরিচালক বরকত উল্লাহ সাহেবকে অনুরোধ করেন বাকের ভাইকে যেন ফাঁসি না দেওয়া হয় কিংবা শেষ পর্ব যেন প্রচার করা না হয়।

পরিচালক বরকত উল্লাহ সাহেব বিষয়টি নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাথে আলোচনা করে। এছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের অনেক ঘনিষ্ঠজন হুমায়ূন আহমেদকে একই বিষয়ে অনুরোধ করেন।

কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তার সিদ্ধান্তে ছিলো অটল। তিনি সাফ সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি আমার জন্য নাটক বানাই। দর্শক শুধু সেটা উপভোগ করে মাত্র। আমি যদি দর্শকের কথা ভেবে নাটক বানাতাম তাহলে এই নাটক আরো পাঁচ বছর কন্টিনিউ করতে পারতাম। কিন্তু তাহলে কি আজকে বাকেরের জন্য দর্শকের যে ভালবাসা জন্ম নিয়েছে, সেই ভালবাসাটা থাকতো? আমি আমার জন্য নাটক সৃষ্টি করি বলেই সেটা দর্শক সেটা কাছে টেনে নিতে পারে। নাটকের শেষ পরিণতি যা আছে সেটাই শুটিং হবে এবং সম্প্রচারিত হবে।’

অবশেষে হুমায়ূন আহমেদ গোপনে নাটকের শুটিং সম্পন্ন করেন। টিভিতে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো ২১ সেপ্টেম্বর ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের শেষ পর্ব প্রচারিত হবে। হুমায়ূন আহমেদ সেদিন কাদেরকে (বদি) নিয়ে সেদিন বাসা থেকে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিলেন। কারণ তার বাসা সাধারণ জনগণ ঘিরে ফেলেছিলো। বাসায় রীতিমত ইট-পাটকেল দিয়ে ঢিলও ছোড়া শুরু করে।

সন্ধ্যা নামার পর পুরো ঢাকা শহর জুড়ে পিনপন নীরবতা। রাজপথে কোনো মানুষ নেই। এ যেন অলিখিত এক কারফিউ। সবাই টিভি সেটের সামনে গম্ভীর মুখে অপেক্ষার প্রহর গুণছে।

নাটকে শেষবারের মত বাকের ভাই মুনার হাত ধরে দু’জনে অঝোরে কাঁদতে লাগলো। মুনা সারারাত জেগে বাকের ভাই এর লাশের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণতে লাগলো। সবশেষে বাকের ভাইয়ের লাশ জেল ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসে!

সেদিন টিভি সেটের সামনে থাকা কোনো মানুষ নিজের চোখের পানি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। কেউ মনে মনে কাঁঁদছিলো, কারো চোখের কোণায় পানি, কেউ অঝোরে কাঁদছিলো, কেউ হাউমাউ করেই কান্না শুরু করেছিলো সেদিন। মনে হচ্ছিলো দেশের মানুষ এক বাস্তব জীবনের হিরোকে হারিয়ে ফেলেছে।

‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের ২৬ পেরিয়ে গেছে। তবুও বাকের ভাই, মুনা, বদি প্রত্যেকে যেন জলজ্যান্ত এক চিরসবুজ চরিত্র। বাংলাদেশের মানুষ এখনো স্মৃতিচারণ করে সেইসব দিনের কথা। নাটকের প্রতিটি পর্বের কথা।

আজকে খুব করে মনে পড়ছে জাদুকর হুমায়ূন আহমেদকে। আহা! কি জাদুকরী ছিলো তার প্রত্যেকটা সৃষ্টি। বাঙলায় একজন হুমায়ূন আহমেদের জন্ম হয়ছিলো বলেই হয়তো আমরা পেয়েছি অনন্য সব সৃষ্টি। আপনাকে নিয়ে আমি বেশী কিছু লিখতে পারি না। লিখতে গেলেই চোখের কোণায় জল এসে হাতটা জড়োসড়ো হয়ে আসে। আপনি ভালো থাকবেন জাদুকর।

https://www.mega888cuci.com