কে ঠেকাবে কোহলিকে!

তাঁর নিজের পছন্দ ভিভ রিচার্ডসনের আগ্রাসী স্টাইল। মাইকেল ভনের মতে তিনি বর্তমান ক্রিকেটের তুরুপের তাস। খোদ শেন ওয়ার্ন মনে করেন, তাঁর বিরুদ্ধে বল করতে হবে সামলে, ডিফেন্সিভ লাইনেই; যিনি কিনা নিজের সময়ে সবচেয়ে আগ্রাসী স্পিনার ছিলেন, হোক সেটা খেলার মাঠে কিংবা মাঠের বাইরে। তিনি যখন একজন ব্যাটসম্যানকে এই কথা বলেন, তিনি নিশ্চয়ই সাধারণের চেয়ে আলাদাই হবেন।

৮০’র দশকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট যখন স্বর্ণযুগ পার করছিল, তখন দলটি ছিল সবদিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ , কি ছিল না তাঁদের!  ব্যাটসম্যানদের হাটুকাপানো বোলিং লাইনআপ, বোলারদের ভীতি সৃষ্টিকারী ওপেনিং জুটি, আর মিডল অর্ডারে ছিলেন একজন ত্রাস! সেই আতঙ্কের নাম ছিল ভিভ রিচার্ডস।

তিনি ব্যাটিংয়ে নামলেই বোলার-অধিনায়কের মনের মধ্যে চাপা উদ্বেগ কাজ করত, কিংবা ভারতের সেরা ব্যাটিং শিল্পী শচীন টেন্ডুলকার ব্যাটিং নামলে যেমন দর্শক থেকে শুরু করে ধারাভাষ্যকার সবাই মাঠ থেকে পলক সরাতে ভুলে যেত, বা স্যার ডন, গ্যারি বা সোবারসের মত কালজয়ী কিংবদন্তীদের মাঠের রাজত্ব, অথবা বলা যায় ক্রিজে সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া দলের কান্ডারী পন্টিং, গিলক্রিষ্ট , বা ভারতের বিখ্যাত পঞ্চপাণ্ডবের উপস্থিতি  বোলিং অধিনায়ককে দুশ্চিন্তায় রাখত নিশ্চিত।

হালের রান-মেশিনখ্যাত হাশিম আমলা কিংবা ভারতের মেধাবী খুনে ওপেনার রোহিত শর্মাও সেট হয়ে গেলে প্রতিপক্ষের গেমপ্ল্যানের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারেন।  কিন্তু বিরাট কোহলির রানের ট্রেন যেভাবে ছুটছে, তা দেখে মনে হচ্ছে, তিনি বোধহয় ছাড়িয়ে যাবেন সবাইকেই।

এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো ভবিষ্যতের অধিনায়কদের তাঁকে সেঞ্চুরির আগে ফেরাতে পারলেই তৃপ্ত হতে হবে। এই অতিমানবীয় শক্তিধর ট্রেনের লাগাম টেনে ধরার সাধ্যিই যে হবেনা কারো।

লিটল মাস্টার শচীনের ৪৯ ওয়ানডে সেঞ্চুরি যেখানে অজেয় মনে হচ্ছিল,  সেখানে তিনি ৪১ সেঞ্চুরি করে বসে আছেন মাত্র ২২৫ ওয়ানডেতেই, যেখানে শচীনের এই সেঞ্চুরি এসেছে  ৪৬৩ ম্যাচ খেলে।

শচীন যেখানে ১৮৪২৬ রান করেছেন ৪৫২ ইনিংসে, কোহলি প্রায় এর অর্ধেক খেলে করেছেন ১০৮১৬ রান। তাঁর ক্যারিয়ারের ব্যাটিং গড় বাড়তে বাড়তে দাঁড়িয়েছে এখন চলে এসেছে ৬০-এ, এটা কোথায় গিয়ে থামবে কে জানে!

হুমকির মুখে থাকা শচীনের ৪৯ সেঞ্চুরি ছাড়িয়ে কোহলি কোন উচ্চতায় পৌছান সেটাই এখন দেখার বিষয়।

  • বিরাট কোহলি একটি মিথ

জীবনের প্রথম বিশ্বকাপটা জিতে গেলেও , গত বিশ্বকাপে হয়েছে স্বপ্নভঙ্গ। তাই বিশ্বকাপের পর রানের ক্ষুধায় পাগল হয়ে উঠেছেন যেন। কিছু দারুণ পরিসংখ্যানেই বোঝা যাবে, তাঁর দৌরাত্মের মাহাত্ম্য।

কোহলি গত ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে চার বছরে ৬৭ টি ইনিংসে করেছেন ৪২৭৯ রান, এত কম ইনিংসে এত রান আর কোন ব্যাটসম্যান পান নি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সতীর্থ রোহিত শর্মা দুই ইনিংস বেশি খেলেও তাঁর থেকে ৬৪০রানে পিছিয়ে (৬৯ ইনিংসে ৩৬৩৯ রান)।  তৃতীয় স্থানে থাকা জো রুট দুই ইনিংস বেশি খেলেও প্রায় ১০০০ রানে পিছিয়ে রয়েছেন (৬৯ ম্যাচে ৩২৮৮ রান)।

সেঞ্চুরি তো মামুলি ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছেন সেই কবেই, কিন্তু একজন ব্যাটসম্যান কিভাবে নিজেই প্রতিপক্ষ হয়ে এগারোজনকে টেক্কা দিয়ে দিতে পারেন এ ব্যাপারটি লক্ষ করা যায় একটি পরিসংখ্যানে। ২০১৭ সালের পর থেকে,  শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে সবমিলিয়ে এসেছে সেঞ্চুরি ১০টি, ক্যারিবিয়ানরা করেছে ১২ টি সেঞ্চুরি, বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে এসেছে ১৩ টি সেঞ্চুরি, পাকিস্তানিরা করেছে ১৪ টি সেঞ্চুরি, প্রোটিয়ারা পেয়েছে ১৫ টি সেঞ্চুরি।

আর একই সময়ে বিরাট কোহলি একাই করেছেন ১৫টি সেঞ্চুরি! চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের পেলেই তিনি যেমন জ্বলে উঠেন, পরিসংখ্যানও তেমনি তাঁকে অভিবাদন জানাতে ভুলছে না কোনদিকেই, পাকিস্তানিরা ২০১৫ এর পর থেকে আন্তর্জাতিক ময়দানে সেঞ্চুরি পেয়েছে ২৪ টি, সেখানে বিরাটের একার সেঞ্চুরি ২৫ টি!

আর এই দুই মৌসুমে অবিশ্বাস্য কোহলির গড় ছিল সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে – ৮০.৭৩!  এটা নিকটতম রস টেলরের থেকে প্রায় ১২ রান বেশি -৬৮.৮৫! ৯৮.৩৫ স্ট্রাইক  রেটে কোহলি যদিও ডেভিড ওয়ার্নার এবং এবি ডি ভিলিয়ার্সের পেছনে পড়ে গেছেন, তাঁদের গড় অবশ্য ৫০-এর বেশি।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণ বলছে , ২০১৫ আসলে ঠিক কোহল ‘র বছর ছিল না। ওয়ানডে অভিষেকের পর থেকে তাঁর স্ট্রাইক রেট এতটা নিচে নামেনি যতটা ২০১৫ সালে নেমেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের পর থেকে তাঁর অতিমানবীয় ফর্ম ৩২৪৬ রান এবং ১৫ টি সেঞ্চুরি এনে দিয়েছে যা বাকি গোটা দল মিলেও করতে পারেনি।

  • শতক উৎসব

কোহলি প্রতি ৫.৯ ইনিংস পরপর ওয়ানডে সেঞ্চুরি পেয়েছেন (২১৭ ইনিংসে ৪১), এতটা কাছে ওয়ানডে ইতিহাসে আর কেউ কখনো আসেনি।  দ্বিতীয় স্থানে থাকা হাশিম আমলা তাঁর প্রতিটি শতক পেতে কমপক্ষে ৬.৩৩ ইনিংস খেলেছেন (১৭১ ইনিংসে ২৭)।

এর একটি বড় কারণ , কোহলির মধ্যে থাকা বড় ইনিংস খেলার সহজাত ক্ষমতা, যা তাঁকে ফিফটিগুলিকে সহজেই সেঞ্চুরিতে পরিণত করতে অনুপ্রাণিত করে। ওয়ানডেতে তিনি ৯০ বার পঞ্চাশ রান ছুঁয়েছেন, এর মধ্যে শতকরা ৪৫.৫৬ ভাগকেই তিনি তিন-অঙ্কে রূপান্তর করেছেন।

কোহলিই একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি তিন বর্ষে পাঁচটি কিংবা তার বেশি সেঞ্চুরি পেয়েছেন, ২০১৭ সালে ছয়টি, ২০১৮ সালে ছয়টি এবং ২০১২ সালে পাঁচটি। তাঁর বিরুদ্ধে কিছু নিন্দুক বিতর্ক করার চেষ্টা করেন, তাঁর সেঞ্চুরি দলের কাজে লাগে কিনা।

সেই বিতর্ক অবশ্য পরিসংখ্যান কোন পাত্তাই দেয়নি, ৪১ টি সেঞ্চুরির মধ্যে ৩৩ টিই ভারতকে জিতিয়েছে, একটি হয়েছিল টাই।  ২৫ টি সেঞ্চুরি এসেছে চেজিংয়ে, ভারত এর মধ্যে ২১ টিই জিতেছে।

  • কোহলি বনাম আমলা, রানযুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই!

কোহলিকে শুরু থেকেই ধাওয়া করছেন আরেক রানমেশিন হাশিম আমলা। কোহলি দ্রুততম রানের মাইলফলক পেরোনো মাত্রই তা ভাঙা যেন আমলার নেশা হয়ে উঠছিল। ১০০০, ২০০০, ৩০০০, ৫০০০ রানের মাইলফলক সবচেয়ে কম ইনিংস খেলে পেরোনোর রেকর্ড এখন আমলার, যার প্রতিটিতেই তিনি কোহলিকেই পেছনে ফেলেছেন।

২২ ইনিংসেই ৬০০০ রান করে কোহলির পাশে নিজের নাম লিখালেও এরপরের চিত্রনাট্য লিখে গেছেন কোহলি।  তবে, গত কয়েক বছরে ফর্মের তারতম্য কোহলি আর আমলার মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। তিনি ৭০০০ এর পর এর পর প্রতিটি হাজারের জন্য মাত্র ১৪, 1৯ এবং ১১ ইনিংস খেলেছেন,

কোহলির মত ছুটন্ত ঘোড়ার পেছনে আমলাকে এখন কিছুটা ক্লান্তই দেখাচ্ছে, তাই এই যুদ্ধ বর্তমানে একপেশে হয়ে পড়েছে।

  • অধিনায়ক কোহলির রাজত্ব

অধিনায়ক কোহলির ব্যাটিং যেন আরো খোলসভাঙা, আত্মবিশ্বাসী।

৬৬ ওয়ানডেতে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ৮৩ এর বেশি গড়ে রান করেছেন ৪০৯৬। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর ১৯ সেঞ্চুরি এখন শুধু রিকি পন্টিংয়ের পেছনে, যিনি ২২ টি সেঞ্চুরি করেছেন ২৩০ ম্যাচে।

বোঝাই যাচ্ছে, এই রেকর্ডটিও আর বেশীদিন নিরাপদ নয়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।