আগ্রাসী কোহলি ও বিসিসিআইয়ের সংকট

২০১৬ সালের মার্চে যখন আমি বিরাট কোহলিকে দারুণ দুটো করভার ড্রাইভ খেলতে দেখলাম, তাও অস্ট্রেলিয়ার মত দলের বিপক্ষে তখন একটা টুইট করেছিলাম। তা কিছুটা এমন ছিলো, ‘মাত্র আমার সর্বকালের সেরা ভারতীয় একাদশ থেকে গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ বাদ পড়লেন।’

বাউন্ডারিদুটো এসেছিলো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের মত মঞ্চে যা একটি ম্যাচ জেতানো ৮২ রানের ইনিংসের অংশ ছিলো, শুধু তাই নয়, সেগুলো দিয়ে আমার দৃষ্টিতে ক্রিকেটের গ্রেট খেলোয়াড়দের একজন হয়ে গিয়েছিলো কোহলি।

২০১২ সালে ব্যাঙ্গালুরু টেস্টে দুর্দান্ত কিউই বোলিংয়ের সামনে যখন টেন্ডুলকারকেও সাধারণ লাগছিলো, সেখানে সে দাঁড়িয়ে সেঞ্চুরি করে ফেললো! কে বলবে তার ঠিক আগের বছরই শচীনকে কাঁধে নিয়ে ল্যাপ অফ অনারের নেতৃত্ব দিয়েছিলো সে! সে ইনিংসটা দেখেই তার উপর আমার চোখ আটকে গিয়েছিলো। এর দুই বছর পর অ্যাডিলেডে দুর্দান্ত একটা ১৪১ রানের ইনিংস খেলেছিল সে, যার প্রতিটা বল আমি টেলিভিশনের সামনে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখেছিলাম। সেটা ছিলো তার নেতৃত্বের প্রথম ম্যাচ, যা আরেকটু হলে জিতেই গেছিলাম আমরা।

তার প্রতি আমার প্রশংসা ধীরে ধীরে বাড়ছিলোই কেবল। ন্যাথান কোল্টার নাইল এবং এবং জেমস ফকনারকে কভারের উপর দিয়ে সীমানাছাড়া করার দৃশ্যটা সে বাঁধ ভেঙে দিয়েছিলো কেবল। বাল্যকালের আবেগ সেদিনতার দারুণ ক্রীড়াদক্ষতার কাছে হার মেনেছিলো।

আমার ফ্যান্টাসি একাদশে ইনিংসের গোড়াপত্তন করতেন বীরেন্দ্র শেবাগ, সাথে আসতেন সুনীগ গাভাস্কার। এরপরে যথাক্রমে পিচে আসতেন রাহুল দ্রাবিড় আর শচীন। কিন্তু পাঁচে কোহলীকে ছাড়া আমি কাউকে ভাবতেই পারছিলাম না।

সেটা ছিলো আজ থেকে দু’বছর আগের ঘটনা। কিন্তু এখন, বিগত দুই বছরে তার ব্যাট থেকে আরো কিছু ম্যাচ জেতানো ইনিংস দেখার পরে আমি আরেক কাঠি সরেস হতেই পারি। বলতেই পারি, যে কোনো ফরম্যাট কিংবা অবস্থা বিবেচনায় কোহলিই ভারতের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান।

দ্রাবিড় এবং গাভাস্কার টেস্টে যে অর্থোডক্স এবং ক্লাসিক খেলাটা খেলতেন যা তাদেরকে আমার কল্পনার একাদশে তুলে এনেছিলো, সেটাই তাদেরকে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছিলো। শেবাগের টেস্ট রেকর্ড ছিলো দারুণ। কিন্তু সে তুলনায় তার ওয়ানডে রেকর্ড আহামরি কিছু ছিলো না।

টেন্ডুলকার অসাধারণ ছিলেন, ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করার সময়ে তাকে প্রায়ই সর্বশ্রেষ্ঠ মনে হত। কিন্তুচতুর্থ ইনিংসে পুরোপুরি নির্ভরতার ছায়া তিনি দিতে পারেননি দলকে, এমনকি ওয়ানডে ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসেও। শচীন যখন অধিনায়কত্ব পেয়েছিলেন, তারপর নেতৃত্বের চাপ তার ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসেছিলো, যার ছাপ পড়ছিলো তার ব্যাটিংয়েও। নার্ভাসনেস এবং মানসিক অনিরাপত্তায় ভোগার কারণে স্ট্রোকসমৃদ্ধ ব্যাটিংটাও করতে পারেননি তখন। অন্যদিকে কোহলিকে দেখুন, অধিনায়কত্ব তার ভেতরের আত্মবিশ্বাসটাকে বেরই করে এনেছে কেবল, আর অবশ্যই, রান তাড়া করার সময়ে সে দারুণ!

কোহলীর সাথে কেবল একবারই দেখা হয়েছিল আমার, আর কখনো দেখা হয় কিনা জানি না। কিন্তু আমাদের একবারের আলাপ এবং এর আগে যেমন দেখেছি তা থেকে বলতে পারি যে, ভারতের অতীত-বর্তমানে গ্রেট খেলোয়াড়দের মধ্যেই সেই বেশি ক্যারিজম্যাটিক। স্পষ্ট বুদ্ধিমত্তা এবং দারুণ আত্মবিশ্বাসী মানুষসে। গাভাস্কার আর দ্রাবিড় এই কোহলির মতোই স্পষ্টবাদী ছিলেন কিন্তু তার ক্যারিশমাটা তাদের মাঝে ছিলো না। কপিল দেব আর ধোনিদের মজবুত ব্যক্তিত্ব ছিলো বটেকিন্তু কোহলির মতো ‘কমান্ড অফ ওয়ার্ডস’ তাদের ছিলো না।

বিসিসিআইয়ের কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর (সিএও) হিসেবে চার মাস কাটানোর সময়ে আমি কোহলির ডমিনেটিং সত্বাটার দৌড়টাদেখেছিলাম। নরেন্দ মোদিকে তার ক্যাবিনেট সদস্যরা যেভাবে পূজা করে তার চেয়েও বেশি বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা কোহলিকে পূজতো। এফটিপি হোক কিংবা জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির ম্যানেজমেন্ট, কোহলির জানার বাইরে ঘটতো না কিছুই!

ভারতের যে কোনো পর্যায়ে, হোক সেটা রাজনীতি কিংবা ব্যবসায় অথবা খেলাধুলা, যখন চারিত্রিক দৃঢ়তা সঙ্গে অর্জনের বুনিয়াদ যুক্ত হয় তখন সেটা প্রতিষ্ঠানের উপরে ব্যক্তির প্রাধান্য বিস্তারের জন্য যথেষ্ট হয়। এবং এখানে ফ্যাক্টটা হচ্ছে, মাঠে হোক কিংবা মাঠের বাইরে, কোহলি সত্যিই বেশ চিত্তাকর্ষক। আমাদের দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ব্যক্তিগত ক্যারিজমা, ক্রিকেটীয় গ্রেটনেস আর নিজের এবং দলের জয়ের জন্য অসাধারণ স্পৃহার মেলবন্ধন ছিলো না আর কারো মাঝেই। কাছাকাছি এসেছিলেন একজন। অনিল কুম্বলে।

কুম্বলে ছিলেন ভারতের সর্বকালের সেরা কিছু বোলারের মধ্যে অন্যতম, তার ক্রিকেটীয় চিন্তা ছিলো দারুণ। সবকিছুর আগে, তিনি ছিলেন সুশিক্ষিত এবং সমাজ-রাজনীতি বিষয়ে ছিলেন দারুণ আগ্রহী। নিজের গুরুত্বের ব্যাপারেও ছিলেন বেশ সচেতন। তিনি নিজের আত্মবিশ্বাসকে কান্নাড়া ধাঁচে দলে ছড়িয়ে দিতেন, পাঞ্জাবি ধাঁচে নয়।

হতে পারে কুম্বলেই একা কোহলির লিগে আসেন। তবে এটাই হয়তো তাদের ব্যক্তিত্বের সংঘাতের কারণ এবং এ কারণেই হয়তো কুম্বলেকে যেতে হয়েছে। কিন্তু কেন এমন একজনকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হলো যে কিনাক্রিকেটীয় অর্জন এবং ব্যক্তিত্বের দিক থেকে অধিনায়কের চেয়ে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে? তার উপর এমন একজনকে যার কিনা কোনো কোচিং অভিজ্ঞতাই নেই!

একমাত্র কারণটা হচ্ছে, বিসিসিআইয়ের মত সুপ্রীম কোর্ট নিযুক্ত কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটরও কোহলির ব্যক্তিত্বের সামনে নিজেদের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। একই কাজটা করেছিলো তথাকথিক ক্রিকেট নির্বাচন কমিটিও। টম মুডিকে না এনে কোচ করা হলো রবি শাস্ত্রীকে কেননা বিনোদ রাই, টেন্ডুলকার, সৌরভ গাঙ্গুলি এবং ভিভিএস লক্ষ্মণরাও কোহলিকে সমঝে চলতেন যা প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যক্তির শাসনাধীন করে ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিলো। সে অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্তটা ঘরের মাঠে ছোট দলের বিপক্ষে চোখে না পড়লেও খুব বেশিদিন আড়ালে থাকবে বলে মনে হয় না।

বিসিসিআই যদি খেলাটাকে বানিজ্যের চেয়ে বেশি খেলা বলেই দেখতেন তবে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ ছাড়াই মাঠে নামতাম না। নির্বাচকরা যদি আরেকটু বিচক্ষণতা এবং সাহসিকতার পরিচয় দিতেন তবে ভারত এখন ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকতো না।

কিছু কিছু কোহলিভক্ত হয়তো এই লেখার টাইমিং নিয়ে আপত্তি জানাবেন, এটা লেখা হয়েছে এমন এক সময়ে যার কিছু আগেই কোহলি খেলেছেন দুর্দান্ত এক ইনিংস, কিন্তু আমি মনে করি, ব্যক্তিগত গ্রেটনেস প্রতিষ্ঠানের বিশালতাকে যেন গ্রাস না করে ফেলে সে ব্যাপারে নিজেদেরকে মনে করিয়ে দেয়ার এটাই উপযুক্ত সময়।

কোহলি ভারতকে ম্যাচে রাখার জন্য দারুণ চেষ্টা করেছে কিন্তু ব্যক্তির দৌড় দিনশেষে এতটুকুই। আজিঙ্কা রাহানে যদি দুটো ম্যাচেই খেলতো, কিংবা ভুবনেশ্বর এই টেস্টে, অথবা ভারত ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে গলি ক্রিকেট খেলা বাদ দিয়ে যদি দক্ষিণ আফ্রিকায় আরও দুটো সপ্তাহ আগে যেত তবে ফলাফলটা বেশ ভিন্নই হতো বলে বোধ করি।

সত্তর বছরের চেষ্টায় অস্ট্রেলিয়ায় মাত্র একটা সিরিজ জিতেছে। সে অস্ট্রেলিয়া যার জনসংখ্যা কিনা বৃহত্তর মুম্বাইয়ের সমান! এতেই বুঝা যায় দেশের ক্রিকেট কেমন অব্যবস্থাপনার শিকার!

দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির বেড়াজালে আগ থেকেই বন্দী ভারতীয় ক্রিকেটে হালে একটা নতুন রোগ যুক্ত হয়েছে। সুপারস্টার সিন্ড্রোম। কোহলি একজন গ্রেট খেলোয়াড়, একজন দারুণ অধিনায়ক কিন্তু ভারতীয় বোর্ডে প্রাতিষ্ঠানিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স অনুপস্থিত থাকার কারণে এখানে দলীয় গ্রেটনেসটা হয়তো নাও অর্জন করতে পারে তার দল যে দলীয় গ্রেটনেস কিনা তার এবং তাঁর ভক্তদের বহুল আকাঙ্খিত এক অর্জন!

সত্তরের দশকের গোড়ায় যখন ভারত প্রথমবারের মত উইন্ডিজ এবং ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতলো, বিজয় মার্চেন্ট তখন এখানকার নির্বাচকদের চেয়ারম্যান ছিলেন। এর অনেক পরে যখন ভারত ঘরের মাটিতে নিয়মিত সিরিজ জিততে শুরু করলো, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ এবং দিলিপ ভেংসরকাররা ছিলেন এই পদে। তাদের ক্রিকেটীয় অর্জনগুলো ছিলো তৎকালীন খেলোয়াড়দের অর্জনগুলোর মতোই শাশ্বত।

দল নির্বাচনের ব্যাপারে অধিনায়কের সাথে কথা বলার মানসিকতাটা তাদের ছিলো কিন্তু প্রয়োজনে তাদের নিজেদের মতকে অধিনায়কের মতের উপরে প্রাধ্যান্য দেয়ার সাহসটাও তাদের ছিলো। অন্যদিকে বর্তমান নির্বাচকদের প্রত্যেকেই বেশ কিছু টেস্ট খেলেছেন। কোচ শাস্ত্রী খেলেছেন সবচেয়ে বেশি, কিন্তু তিনি কখনোই গ্রেট ছিলেন না, তাই অধিনায়কের সাথে যে কোনো ব্যাপারেই তার পার্থক্যটা চোখে পড়ার মত।

বর্তমান ভারতীয় ক্রিকেটে নির্বাচক, কোচিং স্টাফ, কর্তাব্যক্তিদের সবাই কোহলির পূজায় ব্যস্ত। এটা বদলানো দরকার। নির্বাচকদের সবাই অর্জনের ঝুলি ভরা সব সাবেক ক্রিকেটার হওয়া উচিত। যদি নিজেরা গ্রেট ক্রিকেটার না হন তবে অন্তত প্রয়োজনের সময় অধিনায়কের মতের বিরুদ্ধে কথা বলার সৎ সাহসটা পোষণ করা উচিত। যেমন নিজের মতকে অধিনায়কের জেদের উপরে প্রাধান্য দেয়ার জন্য কোচের দারুণ প্রজ্ঞা এবং সাহস থাকা উচিত যেমনটা কুম্বলের ছিলো। তিনি সিরিজ নির্ধারণী এক টেস্টে কুলদীপ যাদবকে দলে এনেছিলেন যার ফলে ভারত ম্যাচ এবং সিরিজটাও জিতেছিলো। এবং পরিশেষে, কর্তাব্যক্তিদের উচিত ক্যালেন্ডারটা এমনভাবে যা ভারতকে বাইরের বিরুদ্ধ কন্ডিশনেও ভাল করতে সাহায্য করে।

যখনই ভারত নিয়মিত দক্ষিণ আফ্রিকায় সিরিজ জিততে থাকবে এবং একই কাজ তাসমান সাগরপাড়েও করে দেখাতে পারবে, তখনই কেবল তারা নিজেদেরকে খেলাটার চ্যাম্পিয়ন দাবি করতে পারবে। তা করার জন্য উপযুক্ত খেলোয়াড় এবং অধিনায়ক আছে ভারতের। কোহলির অথরিটি আর জেদ তার ব্যক্তিগত সাফল্যের খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু দলীয় গ্রেটনেস অর্জন করতে হলে সে জেদে কিছুটা লাগাম পড়াতেই হবে তার। এবং সে কাজটা করতে হবে বোর্ডকেই।

কোহলির বয়স সবে ২৯। অদূর ভবিষ্যতে সে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতকে আরও অনেক সিরিজে নেতৃত্ব দেবে এবং তাঁর সামনে একাধিক অস্ট্রেলিয়া সিরিজও রয়েছে। দুই বছর আগে সে আমার সর্বকালের সেরা ভারতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছে। আমার আশা আকাঙ্খা এবং তীব্র ইচ্ছা এই যে, ক্যারিয়ারের শেষে অধিনায়কের জায়গাটাও তারই দখলে থাকবে।

_______________

Kohli’s arrogance helps his game but not the team শিরোনামে ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে লেখাটি লিখেছেন ভারতীয় ক্রিকেট প্রশাসক ও ইতিহাসবিদ রামাচন্দ্র গুহ।

https://www.mega888cuci.com