ক্ষুদে ক্রিকেট বিস্ময় ও আমাদের ‘বিখ্যাত হতেই হবে’ মানসিকতা

ফেসবুকে দেশের ক্রিকেট সমর্থকদের গ্রুপ ক্রিকপ্লাটুনে কয়েকটা পোস্ট দেখলাম। এর বাইরেও বিভিন্ন পেজেও কিছু ভিডিও দেখলাম। সবার আবেগ আর ভালবাসার প্রতি সম্মান জানিয়েই এই লেখা লিখছি।

গত কিছুদিনে ‘ক্ষুদে ক্রিকেট বিস্ময়’ খুঁজে বের করার একটা ধুম লেগেছে। পিচ্চি পিচ্চি মানুষজন শচীন টেন্ডুলকার এর মত করে ড্রাইভ করছে কিংবা ম্যাক্সোয়েলের মত করে বিগ হিট খেলছে, পায়ে প্যাড, মাথায় হেলমেট পরে। দেখতে অবশ্যই দারুণ লাগে।

ব্যাপারটা অনেকটাই ছোট বাচ্চাদের বড়দের পোশাক(স্যুট/শাড়ি) পরানোর মত। দেখতে কিন্তু দারুণ লাগে। একই সাথে এটাও ঠিক, এই ছোট্ট বাচ্চাদেরই বড়দের মত পোষাক পরিয়ে যদি বড়দের মতই কাজ (১০টা-৫টা অফিস বা অন্যান্য) করতে বলা হয় সেটা কিন্তু তাদের সাথে সুবিচার হবে না। পুলিশের পোষাক পরা বাচ্চাকে আপনি অবশ্যই চোর-ডাকাত ধরার কাজে নিয়োগ করতে চাইবেন না।

ছোট বাচ্চাদের খেলা-ধুলার ব্যাপারটাও আমার কাছে তেমন মনে হয়। আপনি শখ করে তাকে হেলমেট+প্যাড পরে মাঠে নামাতেই পারেন। কিন্তু সেই সাথে ‘ক্রিকেটার বানাতেই হবে’ হবে টাইপ জিদ নিয়ে ‘বাচ্চা শচীন টেন্ডুলকার’ বানানোর লক্ষ্য নিয়ে দয়া করে কারো শৈশব নষ্ট করবেন না।

একটা সময় পর্যন্ত বাচ্চাদের মনের আনন্দেই খেলতে দিন না। স্কিল ডেভেলপমেন্ট নামক ফিউচার প্ল্যানিং করতে গিয়ে তাদের বর্তমান সময়ের নির্মল আনন্দ যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। আমি বলছি না যে তাদেরকে কিছুই শেখানো উচিত হবে না। আমি শুধু বলতে চাইছি, এই শেখানোর প্রক্রিয়াটা যেন তাদের উপর জোর করে চাপিয়ে না দেয়া হয়। এতো অল্প বয়সে বাচ্চারা যদি ভুল ফুটওয়ার্কে মনের আনন্দে ক্রিকেট বলকে পেটাতে শেখে তাতে কি আদৌ কোন ক্ষতি হবে?

শ্রীলঙ্কা থেকে মুত্তিয়া মুরলিধরন, অজন্থা মেন্ডিস টাইপের অপ্রথাগত ক্রিকেটার কখনই বের হয়ে আসতো না, যদি ছোটবেলা থেকেই তাদেরকে প্রপার ক্রিকেট শেখানোর চেষ্টা করা হতো।

যেই পিচ্চিটাকে বাচ্চা বয়সেই স্কিলফুল ব্যাটসম্যান হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, তার মধ্যে হয়তো সহজাত অন্য কোন প্রতিভা আছে। সেটা ক্রিকেটেও হতে পারে, নাও পারে। দয়া করে ‘ক্রিকেটারই হতে হবে’ নামক কোন শৃংখলে তাদেরকে বন্দী করে রাখবেন না।

সবাই কিন্তু শচীন হয় না। কেউ কেউ শেবাগও হয়। আমাদের সাকিবও কিন্তু সব শট ক্রিকেটের কপিবুক মেনে খেলেন না।

আর, ব্যাপারটা ‘স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ পর্যায়ে থাকলেও ততটা ক্ষতিকর নয়, যতটা ভয়ংকর এই বয়সেই তাঁদেরকে ‘বিরল প্রতিভা’ হিসেবে ‘ভাইরাল’ করার ঝোঁক। বিখ্যাত বানানোর মনোবাসনা যেন তাদের শৈশবকে নিরানন্দ করে না ফেলে। ‘বিখ্যাত হতেই হবে’ নামক চাপ যেন তাদের মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্থ করে না ফেলে।

পড়ালেখা নামক ব্যাপারটা আমাদের দেশে অনেক আগেই ‘যেকোন উপায়ে অন্যকে পেছনে ফেলার চেষ্টা’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়ে গেছে। নার্সারিতে ভর্তির আগেই একটা শিশু জেনে যায় যে তার বয়সী বাকি সবাই আসলে তার ‘প্রতিযোগী’ কিংবা ‘শত্রু’! খেলাধুলা নামক ব্যাপারটাকেও যেন আমরা আমাদের শিশুদের জন্য তেমন কিছু বানিয়ে না ফেলি।

একজন ফিউচার সাকিব আল হাসান তৈরি করার বাসনায় আমরা যেন হাজার হাজার ক্ষুদে সাকিবের আনন্দময় শৈশবকে নষ্ট না করে ফেলি। শিশুরাও যদি শৈশব থেকেই বুড়ো হয়ে যাওয়া শুরু করে তবে কেমন জানি হয়ে যায় না ব্যাপারটা?

‘নির্দোষ ভুল’ করার বয়সে সবকিছু ঠিকঠাক শেখানোর চেষ্টাটাও কিন্তু তারচেয়ে ‘বড় ভুল’ হয়ে যেতে পারে!

https://www.mega888cuci.com