কাদের খান: ফ্রম রেডলাইট টু লাইমলাইট

‘আনন্দে আটখানা’ বলে একটা শব্দ প্রচলিত আছে। সর্বোচ্চ পর্যায়ের আনন্দ বোঝাতে সাধারণত এই শব্দ দুটো পাশাপাশি বসে।তবে খান দম্পতি অর্থাৎ আব্দুর রহমান খান আর তাঁর স্ত্রী ইকবাল বেগম এই ‘আট’ শব্দটা শুনলেই সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন। সেই ভয় পাওয়ার ‘যৌক্তিক’ কারণ ছিল।

আফগানিস্তানের কাবুলে বসবাস করা এই দুটি নিরীহ প্রাণী তাদের প্রথম তিন ছেলেকে নিজেদের ছোট্ট সংসারে খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, তাদের পরপর তিনটি ছেলে জন্মের আট বছরের মাথায় মারা যায়! অভাবী বাবা মায়ের কিছু করার ছিল না, নিজের চোখের সামনে নিজের সন্তানদের ‘অদ্ভুত’ মৃত্যু দেখা ছাড়া!

পরপর তিনটি অদ্ভুত মৃত্যু অবলোকন করা দুটি প্রাণীর উপরে সৃষ্টিকর্তা যে তখনও নিজের রহমত বর্ষণ বন্ধ করে দেননি, তার প্রমাণ হিসেবেই তাদের ঘরে চতুর্থ সন্তানের আগমন ঘটে। তবে এবার আর ‘মৃত্যু চেয়ে চেয়ে দেখা’র দলে থাকতে চাইল না মায়ের অস্থির মন। ‘আমার মনে হয় কী জানেন? এখানকার পরিবেশেই কোন সমস্যা আছে! এই এলাকার বাতাস ভালো না! আমি আমার বাচ্চাকে নিয়ে এখানে থাকব না! এখানে আমার চার নম্বর বাচ্চার আট বছর বয়সে মৃত্যু আমার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব না। চলেন, আমরা এখান থেকে চলে যাই!’

চলে যাওয়ার কথা শুনে আব্দুর রহমান খানের মাথায় হাত! খাবার আর পানির জোগাড় যেখানে ঠিকঠাক হয় না, সেখানে খারাপ ‘বাতাস’ নিয়ে চিন্তা করার সময় কই? কিন্তু নাছোড়বান্দা ‘মায়ের মনের’ সাথে ছাপোষা ‘বাবার মনটা’ পেরে উঠল না! নাকি বাবার মনেও একটা সুপ্ত আর তীব্র ইচ্ছা ছিল নিজের চতুর্থ সন্তানকে বাঁচানোর যা তিনি সেভাবে প্রকাশ করতে পারছিলেন না? বাবারা সারাজীবন কেমন যেন অপ্রকাশ্যই থেকে যান! শুরু হল এক নিরুদ্দেশ যাত্রা!

নিজেদের এক বছরের সন্তানকে নিয়ে খান দম্পতি যে জায়গায় এসে থিতু হলেন, সেই জায়গাটাও ছিল ‘এক নম্বর’।তাদের এই চতুর্থ সন্তান যে একদিন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এক নম্বর লেখক হবেন, সেই ব্যাপারটা তারা তখন দুঃস্বপ্নেও না ভাবলেও, যে জায়গায় এসে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন সেই জায়গাটা কেন ‘এক নম্বর’ তার প্রমাণ তারা চোখের সামনেই দেখতে পারছিলেন আর সেটা কোন দুঃস্বপ্নের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। কাবুল থেকে তারা চলে এসেছিলেন মুম্বাইয়ের কামাঠিপুরাতে। কামাথিপুরা শুধু মুম্বাইয়ের নয়, শুধু ইন্ডিয়ার নয়, পুরো বিশ্বের এক নম্বর রেডলাইট এরিয়া। মোটা দাগে বললে- বেশ্যালয়।

দুনিয়ার এক নম্বর বেশ্যালয়ের আশেপাশে যারা থাকেন, তাদেরকে প্রতিদিন নিজের চোখে যা যা দেখতে হয়, সেসবের সব কিছুই খান দম্পতি আর তাদের ছোট ছেলে দেখে যাচ্ছিলেন। বাসার সামনে ডান দিকে মেয়েদের কেনাবেচা হচ্ছে, বাঁ-দিকেও একই অবস্থা। বাসা থেকে একটু সামনেই দেখা যাচ্ছে মদের কারখানা যেখানে রাতদিন মদ তৈরি আর মাতালদের উল্লাস, মদ খেয়ে হড়হড় করে বমি করা, নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়া। আর বাসার পেছনে মাঝরাতে মাতাল কোন এক স্বামী এসে তার স্ত্রীকে ইচ্ছেমত নির্যাতন তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

এরকম (অ)ঘটনার মাঝে যারা থাকেন, তারা যে মানসিকভাবে খুব বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারবেন, সেটা আশা করা জগজিৎ সিংয়ের ‘বেশি কিছু আশা করা ভুল’ গানের মতই সত্য। উপরন্তু যদি সংসারের মাথা যদি সেভাবে উপার্জন করতে না পারেন, তাহলে রান্নাঘরে নিজের জীবন যৌবনের অধিকাংশ সময় দিয়ে দেয়া নারীর মাথা গরম হওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক না। ফলে যা হওয়ার তাই হল। সেই ছোট ছেলে চোখের সামনে নিজের বাবা মায়ের বিচ্ছেদ দেখলেন সেই ছোট বয়সে। অবশ্য রাতদিন পতিতালয়, মাতাল, নির্যাতন দেখে চোখ সয়ে যাওয়া বাচ্চার চোখে এই বিচ্ছেদ তখন খুব বড় কষ্টের ব্যাপার ছিল কিনা, সেটাও প্রশ্নের ব্যাপার।

তারপরেও বিচ্ছেদ তো বিচ্ছেদই! সম্পর্কের বিচ্ছেদ হলে বা বিপদে পড়লে দুই ধরনের মানুষদের আশেপাশে দেখা যায়। একদল আসেন সান্ত্বনা, সহানুভূতি দিতে আর রাস্তা দেখাতে আর আরেকদল আসেন কাটা ঘায়ে আয়োডিনযুক্ত লবনের ছিটে দিতে! ইকবাল বেগম ভাগ্যবতী ছিলেন, তারা বাবা আর ভাই তাকে লবণের ছিটে দিতে আসেননি।

লবণের ছিটে দিতে না এলেও, নিজের মেয়ে আর নাতিকে এই পরিবেশে এই অবস্থায় দেখে উপদেশ দিতে ভুল করলেন না বৃদ্ধ নানা। নিজের মেয়েকে বোঝালেন – ‘আমাদের সমাজের কাঠামোটা এমন আর যে জঘন্য পরিবেশে তুমি এই মুহূর্তে আছ, সেখানে আর যাই করা সম্ভব হোক না কেন, একা বাস করা সম্ভব না! বিশেষ করে একজন নারীর পক্ষে। আগের সংসার ভেঙ্গে গেছে তাতে আমার কোন সমস্যা নেই তবে বাবা হিসেবে আমার অনুরোধ, আরেকবার বিয়ে কর। আমাদের জন্য না, নিজের জন্য না, অন্তত নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে হলেও আমার এই কথাটা রাখো।’

তিন সন্তানের মৃত্যুর পর যে ছেলেকে মা পেয়েছেন, তার কথা শুনে তিনি আর না করতে পারলেন না। আবারও বিয়ে করলেন। নতুন এই বাবা পেশায় কার্পেন্টার।

বাবা ‘নতুন’ হলেও, জীবনযাপনের অবস্থা ছিল সেই পুরনো! যেদিন বাবা কাজে যেতেন, সেদিন চুলাটা ঠিকঠাক জ্বলত। কিন্তু যেদিন কাজে যেতেন না, সেদিনের অবস্থা থাকতো ভয়ংকর। কেন কাজে যাবেন না? প্রশ্ন করা হলে নতুন বাবা বলতেন- ভাল্লাগতেসে না আজকে। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করে!

‘নতুন বাবার’ শরীর ম্যাজম্যাজের কথা শুনে ‘পুরনো মায়ের’ গলাটা অগ্নিবাক্যে ‘ক্যাঁচক্যাঁচ’ করে উঠত। এই গলা সাময়িকভাবে বন্ধ করতেই নতুন বাবা তার ছোট ছেলেকে বলতেন- যা, তোর প্রথম বাপের কাছ থেকে কিছু পয়সা নিয়ে আয়! নাইলে তোর মায়ের এই ক্যাঁচক্যাঁচ থামবে না!

থামত না সেই পাঁচ বছরের ছোট ছেলেও। নতুন বাবার নির্দেশ পালনের জন্য পুরনো বাবার কাছে হেঁটে যেতো। পুরনো বাবা নিজের সন্তানকে ফেরাতে পারতেন না, পুরনো আর অকৃত্তিম সম্পর্কের টান বলে কথা! বেশি হলে মাত্র দুই টাকা দিতে পারতেন ছেলেকে। পুরনো বাবা থাকতেন ডোঙরি নামক একটি জায়গায় কামাঠিপুরা থেকে যার দূরত্ব ছিল ১৩ কিলোমিটার। আর এই ১৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে দুটাকা আনার জন্য পাঁচ বছরের এই ছেলের একমাত্র সম্বল ছিল- তার দুটো পা!

টাকার জন্য দুই পায়ের উপরে অবলম্বন করলেও, মানসিক পদোন্নতির জন্য যে শিক্ষার বিকল্প নেই, সেই ব্যাপারটা পাঁচ বছরের ছেলের মা অনেক আগেই বুঝেছিলেন। ছেলের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি শত কষ্টের মাঝেও। কিন্তু ছেলের মন থেকে একটা সময় পড়াশোনার প্রতি সম্পুর্ন অনুভূতিটাই কর্পূরের মতো উবে যায়! দু’টাকার জন্য যেখানে একটা ছোট্ট ছেলেকে মাঝেই মাঝেই যেখানে ১৩ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়, বেঁচে থাকাই যেখানে দায়, অলস বাবাকে শতবার বললেও যিনি নিজের মর্জি না হলে কাজে যান না, সেখানে পড়াশোনা বাড়তি বোঝা ছাড়া আর কীইবা যোগ করবে জীবনে?

তবে জীবনে একা চলা যায় না, বন্ধু লাগে। ছোট্ট এই ছেলের বন্ধু জোটাতে সময় লাগেনি। বন্ধুরাই বুদ্ধি দিল- আমরা ষ্টীলের ফ্যাক্টরিতে কাজ করি, দিনে চার থেকে পাঁচ টাকা পাই। আমাদের সাথে কাজ কর, প্রতিদিন এমন পরিমাণ টাকা কামাতে পারবি।

টাকা কামানো তখন ছোট্ট ছেলের একমাত্র লক্ষ্য, অভাবের সংসার আর সহ্য হয় না তার। টাকা কামানোর ইচ্ছায় স্কুলের সমস্ত বইখাতাকে গুছিয়ে একপাশে রেখে বাসা থেকে বের হচ্ছিলেন। সিঁড়িতে যেই না পা রাখলেন, পেছন থেকে তার কাঁধে নরম কিন্তু দৃঢ় এক হাতের ছোঁয়া পেলেন। পেছনে তাকিয়ে দেখলেন, মমতাময়ী মা দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে তার স্মিত হাসি।

এই হাসি নিয়েই মা বললেন – তো পড়াশোনা বাদ দিয়েই দিচ্ছিস? একদম শেষ করে দিচ্ছিস একবারে?

ছেলে একদম অবাক! দিনের বেশিরভাগ সময় বাসায় থাকা নারীটা আসলে গোয়েন্দা? কাজে যাওয়ার খবর তিনি জানলেন কী করে?!

মা বলে চললেন- দারিদ্র্য দূর করতে চাস, অভাব আর দেখতে ইচ্ছে করে না বলে তুই পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছিস। কাজে যেতে চাচ্ছিস। কিন্তু তুই কি আসলেই দারিদ্র্য দূর করতে চাস নিজের জীবন থেকে?

এ আবার কেমন প্রশ্ন? করতে চাই বলেই তো বইখাতা গুছিয়ে ফেলে আসলাম! – মনে মনে বলল ছেলে!

এরপরে মা বললেন সেই বাণীটি যা এই ছোট্ট ছেলের পুরো জীবনটাই বদলে দিয়েছিল- তুই যদি আসলেই নিজের জীবন থেকে গরিবি দূর করে চাস, তাহলে তুই পড়! পড়ে শেষ করে ফেল সব! যত বই পড়বি, দারিদ্র্য তত তোকে ভয় পাবে। তুই শুধু পড়!

মায়ের মুখে এই ‘পড়’ শব্দটা সেই ছোট ছেলেকে কুরআন শরীফের নাজিল হওয়া প্রথম আয়াতের কথা স্মরন করিয়ে দিল’ ‘ইকরা’। মায়ের বলার ভঙ্গিটাই এমন ছিল যে ছোট্ট ছেলে ভুলেই গেল পৃথিবীতে স্টিল ফ্যাক্টরি বলে আর কিছুর অস্তিত্ব আছে। ফেলে রাখা বইখাতা নিয়ে সেই মুহূর্তেই ছোট্ট এই ছেলে রওনা দিল স্কুলের দিকে।

মায়ের কথা শুনে স্কুলের দিকে রওনা দেয়া এই ছেলেটি বড় হয়ে দিকে দিকে নিজের সুনাম ছড়িয়ে দিয়েছিল নিজের পড়াশোনা, লেখার হাত, দুর্দান্ত অভিনয়, কমিক টাইমিং আর পরিচালনার গুণে। একের ভেতর অনেক গুণের অধিকারী এই মানুষটির নাম- কাদের খান।

স্কুলের দিকে শুধু রওনা দিয়ে বসে থাকলেন না কাদের খান, পড়াশোনায় ছিল তার বেশ মনোযোগ। সাহিত্যে ছিল তার ব্যাপক আগ্রহ। আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপারে আগ্রহ ছিল তার। মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া ‘শব্দ’! ঠিক তাই। নারীরা সাজগোজের সময় আয়নার দিকে যেভাবে মনোযোগের সাথে তাকিয়ে থাকে, কাউকে সুন্দর করে কথা বলতে দেখলে ঠিক সেভাবে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকতেন কাদের খান, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন তাদের।

শুধু তাই না, স্কুল শেষ সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর বাড়ির পাশের ইজরাইলি কবরস্থানে গিয়ে সেইসব মানুষদের বলা সুন্দর কথাগুলো নিজের মুখে আওড়াতেন, জোরে জোরে বলতেন। এতে করে লাভ যেটা হল- কাদের খানের কথা বলার তরিকা হয়ে গেল চমৎকার! এমন সব শব্দ নিজের কোথায় তিনি নিয়ে আসতেন, যা ঐ বয়সী ছেলের মুখে যে কেউ শুনলে অবাক হয়ে যাবে। কবরস্থানের মৃতদের মাঝে আর কেইবা শুনবে বা ডিস্টার্ব করবে তাকে?- এই ভেবেই কবরস্থানকে নিজের প্র্যাকটিস গ্রাউন্ড বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।

কিন্তু মৃতদের মাঝে ছিলেন একজন জীবিত মানুষ- না, কোন হলিউড সিনেমার জম্বির কথা বলছি না। এক জীবিত মানুষ একদিন কাদের খানকে কবরস্থানে প্র্যাকটিস করতে দেখে ফেলেন। এই মানুষটি ছিলেন তখনকার সময়ে বিখ্যাত অভিনেতা- আশরাফ খান। ঐ সময়ে নিজের একটি নাটকের জন্য একজন চাইল্ড আর্টিস্টের খোঁজে ছিলেন তিনি। খুঁজলে নাকি ঈশ্বরকেও পাওয়া যায়!

তবে ঈশ্বরের কাছে যাওয়ার রাস্তা যেখান থেকে শুরু হয়, সেই কবরস্থানে এসে যে তিনি এমন এক ছেলেকে পেয়ে যাবেন, সেটা ভুলেও ভাবেননি। কাদেরকে অনেকটা জোর করেই নিজের নাটকে অডিশন দিতে বলেন তিনি আর সেই অডিশন এতই ভাল হয় যে কাদের খান ফাইনালি সিলেক্টেড হন সেই রোলের জন্য। আর অভিনয়? সেটা নাহয় সরাসরি নাইবা বলি! নাটক শেষে আশরাফ খান কাদের খানের হাতে ১০০ টাকার একটি নোট দিয়ে বলেছিলেন- শুধু একটা কথা মনে রাখবি, একদিন অনেক উপরে যাবি তুই। তোর ভেতরে আগুন আছে। আর আজকে যে ১০০ টাকা আমি তোকে দিলাম, সেই ১০০ টাকা একদিন লাখ টাকায় পরিণত হবে, দেখে নিস।

১০০ টাকা লাখ টাকায় পরিণত হবে কিনা সেটা সেই মুহুর্তে নিজের দিব্যদৃষ্টিতে না দেখলেও, যে জিনিসটি কাদের খান দেখে ফেলেছিলেন সেটি হচ্ছে, নাটক তাকে টানছে – অভিনয়ে যে এক ধরনের আনন্দ আছে, সেটা আবিষ্কার করে ফেলেছিলে তিনি। সেই আবিষ্কারকে আরও বড় রূপ দিতে কলেজে পড়ার সময় একটি নাটকের জন্য অডিশন দিলেন। অডিশনের সময় নাটকের ডিরেক্টর তাকে বললেন – স্ক্রিপ্টের একপাতা পড়। কাদের একপাতা পড়ে পরের পাতায় চলে গেলেন। এরপরে একের পর এক পাতা উল্টতেই থাকলেন।

এভাবে এক জায়গায় বসে পুরো স্ক্রিপ্ট পড়ে শেষ করে ফেললেন। কেউ তাকে থামাচ্ছে না, থামানর কোন কারণ নেই! ছোটবেলায় কবরস্থানে প্র্যাকটিস করা একের পর এক লাইন তার উচ্চারণ আর প্রকাশভঙ্গীকে এতটাই অসাধারণ করে তুলেছে যে, সেটা একবার শুনলে শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে। নাটকে রোল কনফার্ম হয়ে গেল তার নিমিষেই।

তবে কনফার্ম করতে পারছিলেন না নিজেকে, কনফিডেন্স দিতে পারছিলেন না। কারণটা হচ্ছিল স্ক্রিপ্ট। বারবার তার মনে হচ্ছিল, এই স্ক্রিপ্টে বেশ দুর্বলতা আছে, লেখাটা ঠিকঠাকমতো হয়নি। কিছুটা ভয় আর লজ্জার সাথেই জানালেন ডিরেক্টরকে সেই কথাটা। রেগে না গিয়ে সুবোধ শিশুর মতো ব্যাপারটা স্বীকার করলেন পরিচালক, ‘আমিও জানি এটা, পড়ার পর আমারও মনে হয়েছে। কিন্তু এখন তো সময় আর নেই সেভাবে! কী আর করব?’ – ‘আপনি অনুমতি দিলে আমি চেষ্টা করতে পারি!’ কিছুটা শঙ্কার সাথেই বললেন কাদের। ‘আরে বাবা! লেখালেখিও কর নাকি তুমি? ঠিক আছে, দেখি কি করতে পারো!’

দেখানোর জন্যই হোক, বা নিজের বিবেকের তাগিদেই হোক- তিনটা ঘণ্টা লাইব্রেরীতে বসে একদম দুনিয়া থেকে যেন বিচ্ছিন হয়ে গেলেন কাদের।একদম নিজের সবকিছু উজাড় করে লিখলেন। তিন ঘণ্টা পর যে জিনিসটি তৈরি হল, সেটা পড়ে ডিরেক্টর বললেন- এই নাটকটা আর আমার নেই, কারো নেই। এই নাটকটা তোমার হয়ে গেছে। আজ থেকে এই নাটকটা আমি তোমাকেই দিয়ে দিলাম। তোমার উপরে এখন এটার সম্পূর্ণ অধিকার। তুমি যা ইচ্ছে করতে পারো এটাকে নিয়ে।

বিখ্যাত সেই নাটকের নাম ছিল- তাস কি পাত্তে। কতবার যে এই নাটক কাদের খান পরবর্তীতে মঞ্চায়ন করেছিলেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। মুম্বাই আর সারা ইন্ডিয়াতে এই নাটকের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল, সাথে লেখক হিসেবে একটা মোটামুটি পরিচয় এসেছিল কাদের খানের। নিজের ড্রামার একটা ছোটখাটো দলও করে ফেলেছেন যেখানে কিছু সহকারী লেখকও তার সাথে কাজ করতেন। আর এই নাটকই কীভাবে তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে কাজ করেছিল, সেটা পরে জানা যাবে।

তাস কে পাত্তের এত সফলতার পর শুধু নাটক মঞ্চায়ন করে সংসার চালানোর কথা তখন চিন্তাও করা যেতো না। একটি নাটক পরিচালনা করলে ২০০ টাকা পেতেন ‘ডিরেক্টর’ কাদের খান। পাশাপাশি এক ব্যবসায়ীর সাথে কাজে যোগ দিলেন। কিন্তু বিধি বাম! এক মাস পরেই তার চাকরি চলে গেল! নাহ, কাদের খানের কোন দোষ ছিল না। ব্যবসায়ীর কাছেই কোন কাজ আসছিল না। ব্যবসায়ী নিজে থেকেই বললেন, আমার যে অবস্থা, তোমাকে তো বেতন দিতে পারব না। কাজ না থাকলে বেতন আসবে কই থেকে? তার চেয়ে ভালো হয় অন্য কোথাও কিছু দেখ তুমি।

হাতেগোনা কিছু পরিচিত জায়গা ছাড়া ‘অন্য’ কোথাও কিছু দেখা তখন খুব একটা সহজ ছিল না কাদের খানের পক্ষে। নিজের পরিচিত জায়গা, নিজের কলেজের সিঁড়িকোঠায় এসে মন্মরা হয়ে বসে রইলেন তিনি। কলেজের প্রিন্সিপাল তাকে এই অবস্থায় দেখে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন, এরপরে সব শুনে বললেন

– খেয়েছিস?

– জি,স্যার!

– যাহ, মিথ্যুক! এই ওরা চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, খাস নি। আমি খাবার আনতে পিওনকে পাঠাচ্ছি। আর চেহারা এমন মলিন করে রাখিস না। লাইফে হয় এমন। কোন ব্যাপার না। শোন, জীবনে ভয় পাবি না কখনও। তোর জন্য একটা কাজের অফার আছে আমার কাছে। কলেজের জিওমেট্রিক্যাল মেশিন ড্রইং আর আপ্লাইড মেকানিক্স পড়ানো টিচার দুই মাসের জন্য ছুটিতে গেছে, তুই পড়াতে পারবি? ২০০ করে পাবি টাকা।

‘হ্যাঁ’ – বলে দিলেন কাদের খান। নাটকের শো করার মতো টাকা নেই, ব্যবসায়ীও ফিরিয়ে দিয়েছেন। প্রিন্সিপাল স্যার কে আর ফেরালেন না কাদের, সেই ক্ষমতা তার ছিল না। হ্যাঁ বলার সময় ওঠা শুনে পাঠক নিশ্চয় খুশি হচ্ছেন? তবে ধাক্কা খাবেন আসল ঘটনা শুনলে। এই দুটো সাবজেক্টে খুবই কাঁচা ছিলেন। শুধু তাই না, এই দুই সাবজেক্টে ফেলও করেছিলেন তিনি। কিন্তু পড়াতে তো এখন হবেই!

আর নামটা যেহেতু কাদের খান, কোন কাজ প্র্যাকটিস না করে তিনি করতেন না। নিজে আগে ভালো করে পড়া আর বোঝা শুরু করলেন, এরপরেও পড়ানো শুরু করলেন। বর্ণনার ভঙ্গি তো আগেই থেকেই চমৎকার ছিল তার, এবার সাথে যোগ হল বাড়তি চেষ্টা। ফলাফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা প্রচণ্ড পছন্দ করতো তার ক্লাস। শিক্ষক হিসেবে এতটাই সুনাম ছড়িয়ে গেল তার, মহারাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে পেলেন ‘বেস্ট টিচার’ এর পুরস্কার!

সুনাম আরও অনেক জায়গায় ছড়িয়েছিল তার। ক্লাস চলাকালে একদিন পিওন এসে বললেন- আপনার জন্য ফোন এসেছে। অফিস রুমে গিয়ে দেখেন সেখানকার সবাই তার দিকে এক বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিছুটা ভয়ই পেয়ে গেলেন তিনি। ফোনের রিসিভারতা নিয়ে বললেন – হ্যালো!

– হ্যালো, কাদের খান বলছেন?

– জি বলছি! আপনি?

– জি, আমি ইউসুফ খান।

– কোন ইউসুফ খান? এই নামে কাউকে চিনি বলে তো মনে পড়ছে না!

– জি এটা আমার আসল নাম। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি আমাকে দিলিপ কুমার নামে চিনে।

আরেকটু হলে কাদের খানের হাত থেকে ফোনটা পড়েই যাচ্ছিল! দিলিপ কুমার তাকে ফোন করেছেন!? সত্যি তো!? অনেক কষ্টে জিজ্ঞাসা করলেন – আমার কাছে আপনার কি দরকার আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।

– আমি আপনার তাস কি পাত্তে নাটকের অনেক প্রশংসা শুনেছি। আমি সেটা দেখতে চাই।

– বলেন কি! এ তো আমার পরম সৌভাগ্য! তবে জনাব দিলিপ, অধমের দুটো শর্ত আছে এই নাটকের ব্যাপারে।

– জি বলুন, কি শর্ত?

– আপনি নাটক মঞ্চায়নের দিন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই আসবেন, পরে না। একবার নাটক শুরু হয়ে গেলে এর মাঝে হুট করে প্রবেশ করলে দর্শকরা বিরক্ত হন।

– আরেকটা শর্ত?

– নাটক আপনাকে পুরোটা দেখতে হবে, অর্ধেক দেখে চলে যেতে পারবেন না। হ্যাঁ, খারাপ লাগলে অবশ্যই চলে যেতে পারবেন।

– আপনার দুটো শর্ত আমি মানতে রাজি। আপনি কাজে লেগে যান আর আমাকে জানান কবে আসতে হবে।

অবশেষে এলো সেই দিন। দিলিপ কুমার সময়ের আগেই উপস্থিত। কাদের খান নিজের সেরাটা তৈরি করে রেখেছেন। নাটক শুরু হল। যথাসময়ে শেষও হল। কিন্তু একজনের লাল চোখ বেয়ে নেমে আসা চোখের পানি শেষ হচ্ছে না। সেই মানুষটা দিলিপ কুমার। এই নাটক দেখে তিনি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন, কাদের খানের কাজ এতই পছন্দ হল তার, যে নিজের পরের সিনেমাতে কাদের খানকে রোল অফারের পাশাপাশি বেনামে সিনেমার জন্য ডায়লগ লিখতে দিলেন। শুরু হল কাদের খানের যাত্রা। আস্তে আস্তে অনেকেই চিনতে লাগলো কাদের খানকে। জাওয়ানি দিওয়ানি নামের একটি সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে ১৫০০ টাকা পেলেন তিনি।

তবে কাদের খানকে মূল ব্রেকটা দিয়েছিলেন মূলত আরেকজন, তিনি হলেন পরিচালক মনমোহন দেশাই। এই পরিচালক তখন রাজেশ খান্নাকে নিয়ে রোটি সিনেমার কাজ করছিলেন। তার কানে খবর এসেছিল, ইন্ডাস্ট্রিতে এক নতুন রাইটার এসেছে যে লেখার পাশাপাশি অভিনয়ও করে। নতুন লেখককে শুরুতেই বেশকিছু কড়া কথা শুনিয়ে দিলেন পরিচালক, বেশ কিছু ইন্সট্রাকশন দিয়ে দিলেন, ‘আমি জানি আপনি অনেক সাহিত্য পড়েছেন, আমার এত সাহিত্য লাগবে না আমার সিনেমাতে। স্ক্রিপ্টে দয়া করে সাহিত্য ঢেলে দিয়েন না। গালি লিখতে পারেন আপনি? তাইলে গালিই জায়গামত লিখবেন স্ক্রিপ্টে! স্ক্রিপ্ট ভালো না লাগলে কিন্তু আপনার চোখের সামনে আমি আপনার সাধের স্ক্রিপ্ট ছিঁড়ে ফেলব!’

মনমোহন দেশাইয়ের এমন চাঁছাছোলা কথা শুনে কাদের খান জিজ্ঞাসা করলেন – আর যদি স্ক্রিপ্ট ভালো লাগে?

নতুন লেখকের সাহস দেখে কিছুটা অবাক হয়ে এরপরে হাসির ছলে পরিচালক বললেন – মাথায় নিয়ে নাচব আমি আপনাকে!

কাদের খান সেদিনের মতো বাড়ি চলে গেলেন, সারারাত ঘুমালেন না। এক জায়গায় বসে একরাতে সিনেমার স্ক্রিপ্ট শেষ করলেন। পরেরদিন সকালে স্ক্রিপ্ট নিয়ে দেখা করতে গেলেন মনমোহনের সাথে। মনমোহনের ক্রিকেট খেলার খুব নেশা ছিল, পাড়ার ছেলেদের সাথে প্রায়ই ক্রিকেট খেলায় নেমে যেতেন। সেদিনও তাই করছিলেন। দূর থেকে কাদের আসতে দেখেই কিছুটা রাগ আর হতাশা নিয়ে বিড়বিড় করে বললেন – চুতিয়াটা কিচ্ছু বুঝে নাই, একদিনের মাঝে আবার চলে আসছে জিজ্ঞাসা করতে!

কাদের খান তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রথমেই বললেন – স্যার, আমাকে গালি দিলেন কেন?

মনমোহন দেশাই কিছুটা হকচকিয়ে গেলেন। ‘কই? গালি কই দিলাম! দেই নাই তো!’

কাদের খান বললেন – স্যার, আমি ছোটবেলা থেকে মানুষের কথা বলাটা মনোযোগ দিয়ে দেখি। আমি মানুষের লিপ্স রিডিং করতে পারি। আমি দূর থেকেই আপনার লিপ্স রিডিং করে বুঝেছি- আপনি আমাকে চুতিয়া বলেছেন। যা আমি একেবারেই না।

– আচ্ছা হইসে হইসে! একটা স্ক্রিপ্ট লিখতে দিসি, একদিনেই চলে আসছেন। কি যে লিখসেন বুঝতে পারসি। আপনি মনে হয় বুঝেনই নাই আমার কথা! চলেন আবার বুঝাই আপনাকে যে আমি কী চাই!

– স্যার, আমি বুঝতে আসি নাই। স্ক্রিপ্ট দেখাতে আসছি। আমার লেখা শেষ!

দুই ছেলের সাথে কাদের খান

আকাশ থেকে পড়লেন মনমোহন দেশাই! অন্য লেখকরা যেখানে এক থেকে দেড় মাসের মতো নেয় লিখতে, সেখানে এই লোক এক রাতে স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলসে! কাদের খানকে বাসায় নিয়ে স্ক্রিপ্ট পড়া শুরু করলেন তিনি। আনন্দের চোটে বাচ্চাদের মতো লাফাতে থাকলেন তিনি। একবার সোফায় বসেন, তো একবার লাফ দিয়ে বিছানায় বসেন তো আরেকবার আনন্দে লাফাতে থাকেন! এমন লেখাই তো তিনি চাইছিলেন!এত কম সময়ে এমন লেখা ভাবাই যায় না! ‘কত নিবে স্ক্রিপ্টের জন্য? আমি কিন্তু খুব বেশি দিতে পারব না!’

কাদের খান বললেন- ২৫ হাজার দিয়েন।

মনমোহন- ধ্যাত! এইটা একটা নম্বর বললে? এই স্ক্রিপ্টের জন্য তুমি পাবা এক লাখ ২১ হাজার টাকা!

স্ক্রিপ্টটি সিনেমার হিরো রাজেশ খান্নারও এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে, তিনি লেখকের সম্মানি আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিতে বলেন। ফাইনালি এই সিনেমার স্ক্রিপ্টের জন্য কাদের খান পান- এক লাখ ২৫ হাজার টাকা।

কাদের খানকে পাওয়ার পর দেশাই ফোন করে তখনকার আরেক ডিরেক্টর প্রোডিউসার প্রকাশ মেহরাকে বললেন- সিনেমা বানানো বাদ দিয়া দাও তুমি আজকে থেকে। আমি এমন এক রাইটার পাইসি, তোমার সিনেমা আর চলবে না। অন্য কোন ব্যবসায় কিছু করতে পারো কিনা দেখ।

মাঝেমাঝে নাটক দেখার অভ্যাস থাকার কারণে প্রকাশ মেহরা খুব সহজেই বুঝে গিয়েছিলেন, এই নতুন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের জিনের মতো লেখকটি হচ্ছেন কাদের খান। সেদিন রাতেই তিনি কাদের খানের বাসায় গিয়ে তাকে নিজের সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করেন। এত সহজে শত্রুকে জিততে দিবেন সিনেমার ময়দানে? নেভার!

সেসময়ে বলিউডে দুটো রাইভাল গ্যাং ছিল, একটি ছিল মনমোহন দেশাই এর দল, আরেকটি ছিল প্রকাশ মেহরার দল। যারা দেশাই আর সাথে কাজ করতেন, তারা মেহরার সাথে কাজ করতে পারবেন না। আবার যারা মেহরার সাথে কাজ করতেন, তারা দেশাইয়ের সাথে কাজ করতে পারতেন না- এমন একটা অলিখিত সংবিধান প্রচলিত ছিল। শুধু দুইজন মানুষের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য ছিল না। এক- অমিতাভ বচ্চন আর দুই- কাদের খান! অমিতাভ বচ্চনের উন্নতির শিখরে যাওয়ার অন্যতম অবদান হচ্ছে কাদের খানের। চমৎকার সব স্ক্রিপ্ট আর ডায়লগ লিখেছেন কাদের খান অমিতাভের জন্য।

লাওয়ারিশ, অমর আকবর এন্থনি, মুকাদ্দার কা সিকান্দার, খুন পাসিনা, শারাবি এমনই কিছু সিনেমা। দুইজনের দারুণ একটা টিউনিং ছিল। শুধু অমিতাভের ক্যারেক্টার না, সিনেমাতে ভিলেন ক্যারেক্টারকেও কাদের খান এত ভালোভাবে লিখতেন যে একটা সময় পরিচালকরা অনেকটা জোর করেই কাদের খানকে সেই ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করতে বলতেন কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন, এই চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা ছাড়া এই ভিলেন ক্যারেক্টারকে আর কেউ ভালো করে ফুটিয়ে তুলতে পারবে না।

ততদিনে কাদের খান নিজেকে অন্য লেভেলে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর তার চেয়েও বড় জায়গায় চলে গিয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন। রাজনীতিতে যোগদান করলেন, সংসদ সদস্য হলেন। জনপ্রিয়তা আরও বাড়ল। সাথে বাড়ল অহংকার। রাজনীতি থেকে আবারও যখন সিনেমাতে ফিরে আসলেন তিনি, একদিন কাদের খান তার সিনেমার সেটে আসলেন। প্রোডিউসার কাদের খানকে জিজ্ঞাসা করলেন- স্যারের সাথে দেখা হইসে আপনার?

কাদের খান অবাক হয়ে বললেন – স্যার আবার কে?

– আরে অমিতাভ বচ্চন!

– অমিত? মানে আমাদের অমিত?! আরে সে তো আমার বন্ধু! স্যার কেন ডাকব!

– আরে না না! কী বলেন! স্যার না ডাকলে মাইন্ড করেন তিনি অনেক।

সেই মাইন্ডটাই করে বসলেন ‘বিগ বি’। মাইন্ড করার অধিকার শুধু যে অমিতাভ একা নিয়ে বসে থাকেননি, সেটাও বুঝিয়ে দিলেন কাদের খান। এই ঘটনার পর থেকেই দুইজনের রাস্তাটা আলাদা হয়ে গেল। এরপরেও একসাথে কাজ করেছেন তারা, কিন্তু আগের সেই টিউনিংটা আর পাওয়া যায়নি।

তবে কাদের খান বসে থাকেননি, প্রতিভা যার ভেতরে পূর্ণস্তরে আছে, নিজের নতুন পরিচয় করতে খুব বেশি সম্মান লাগে না তার। হিম্মতওয়ালা নামের একটি সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখলেন তিনি। এই স্ক্রিপ্টের মুনিম ক্যারেক্টারটি সম্পর্কে পড়ে ডিরেক্টর বলেন- এই ক্যারেক্টার প্লে করার মতো অভিনেতা এই মুহূর্তে আর কেউ আছে বলে আমার জানা নাই, আপনাকেই এই কাজটা করতে হবে।

টানা ভিলেন রোল করা কাদের খান এই মুনিম নামের কমেডি ক্যারেক্টারে এতটাই ভালো করলেন, এরপর থেকে তার কাছে সমানে শুধু কমেডি সিনেমার অফার আসতে থাকলো। সেখানেই তিনি নতুন এক জুটি গড়ে তুললেন ডেভিড ধাওয়ান আর গোবিন্দের সাথে। পর্দায় গোবিন্দ আর কাদের খান একসাথে আশা মানেই সিনেমা সুপার সাকসেসফুল।

তবে কাদের খানের শেষ জীবনটা তার সিনেমার মতো সাকসেসফুল যায়নি। বিরল এক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। এরপরেও সিনেমাতে কাজের চেষ্টা করেছেন, মুঝসে শাদি কারোগি সিনেমাতে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ছিলেন। শরীরে তেমন জোর ছিল না, তবে মনের জোরটা ছিল। সেটা দিয়েই হয়ত ২০১৪ সালে হজ্বও করেন তিনি। আজ থেকে এক বছর আগের আজকের দিনের ঠিক এই সময়ে যখন সবাই ২০১৯ কে বরণ করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কানাডায় মৃত্যুবরণ করেন কাদের খান। তারিখ – ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮!

গণমানুষের প্রচণ্ড ভালোবাসা পেলেও, ইন্ডাস্ট্রির অনেকের কাছ থেকে সেভাবে কিছুই পাননি কাদের খান। যে গোবিন্দের সাথে তার এত সফল সিনেমা, সেই গোবিন্দ তার লাশটাও দেখতে আসেননি। আর শুধু ‘স্যার’ ডাকটা না ডাকার কারণে ইন্ডাস্ট্রি থেকে কাজ পাওয়াই অনেকটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তার, সেটার ব্যাপারে আর কীইবা বলার আছে!

তবে কাদের খান আছেন, ছিলেন, থাকবেন – তার কাজের মাধ্যমে। ১০০ এর উপরে সিনেমা লিখেছেন তিনি, আর ৩০০ এর বেশি সিনেমাতে অভিনয় করেছেন তিনি, সংখ্যাটা মোটেও কম নয়, বরং এত কাজ করেও একটা লেভেলের কোয়ালিটি মেইন্টেন করে রাখাটাও ছিল একটা বিস্ময়ের ব্যাপার। লেখালেখি সম্পর্কে একটা কথা প্রায়ই বলতেন- ভালো লেখক হতে চাইলে যতই কম্পিউটার বা পিসিতে লেখ না কেন, লাভ নেই। হাতে কলম বা পেন্সিলের স্পর্শ না আসা পর্যন্ত তুমি ভালো লেখক হতেই পারবে না।

নিজের জায়গায় তিনি হয়েছিলেন অনেক কিছুই। পাঁচ বছরে ২ টাকার জন্য ১৩ কিলোমিটার হেঁটেছেন, ৯ বছরে ৪ টাকা ইনকামের জন্য কারখানায় যোগদানের কথা ভেবেছেন, ২০০ টাকায় নাটক পরিচালনা করেছেন, ১৫০০ টাকায় সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে দিয়েছেন আর সেখান থেকে এক লাফে ১ লাখ ২৫ হাকার টাকা পেয়েছেন এক সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেই। এই সত্য গল্পটাই কোন সিনেমার চেয়ে কম কিছু মনে হয়না!

মৃত্যু অবধারিত, সেটা আসবেই, তবে কাদের খানের মতো একজন লেখক আর অভিনেতার অভাব সবসময় অনুভুত হবে। মুকাদ্দার যা সিকান্দার সিনেমাতে মৃত্যু নিয়ে তার লেখা একটি লাইন দিয়েই শেষ করছি লেখাটি –

জিন্দা হ্যাঁয় লোগ জো মউত সে টাকরাতে হ্যাঁয়

মুর্দে সে ভাত্তার হ্যাঁয় লোগ জো মউত সে ঘাবড়াতে হ্যাঁয়!

অনুবাদ – মৃত্যুকে যারা আলিঙ্গন করে, তারাই বেঁচে আছে। আর যারা সারাক্ষণ মৃত্যুকে ভয় পায়, মুর্দার চেয়েও বাজে অবস্থা তাঁদের!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।