ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের প্রথম আত্মহত্যা

আজকাল গণমাধ্যমের খুব ‘জনপ্রিয়’ বিষয় রুপালি জগতের তারকাদের অবসাদ, হতাশা এবং পরিণতি আত্মহনন। এই বিষয়ে বহু আলোচনা শুছি। বহু তথ্য বহুল জ্ঞান গর্ভ লেখা পড়লাম। কিন্তু, কাউকেই এই বিষয়ে একটি শব্দ ও উল্লেখ করতে দেখলাম না যে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের প্রথম সফল অভিনেতা জ্যোতি প্রকাশের আত্মহত্যা নিয়ে।

এই প্রসঙ্গে আলোচনা হলো গুরু দত্ত, ‘বালিকা বধূ’ খ্যাত প্রত্যূসা ব্যানার্জি, জিয়া খান ইত্যাদি, ফিল্ম এবং টেলিভিশন জগতের বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীকে নিয়ে। সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে সুশান্ত সিং রাজপুতকে (আত্মহত্যা না হত্যা?) নিয়ে, বিষয়টি এখন মহামান্য আদালতের বিচারাধীন এবং কোনও মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত কাম্য নয়।

অথচ, ভারত বর্ষের প্রথম সুপার স্টার কানন দেবী তাঁর আত্ম জীবনী ‘সবারে আমি নমি’ বইটিতে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে আলোচনা করেছেন নায়ক জ্যোতিপ্রকাশের কথা। এক অনাবিষ্কৃত ইতিহাসের অধ্যায় জানবো চলুন।

মেধাবী এই মানুষটির জন্ম অবিভক্ত বাংলার যশোরে ১৯১৬ সালে। পড়াশোনা কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং শান্তি নিকেতন। কমার্শিয়াল পাইলটের প্রশিক্ষণ নিয়ে ছিলেন কিন্তু চাকরি করেননি। সিনেমার প্রতি আকর্ষণে পরিচালক দেবকী কুমার বসুর সহকারী হিসাবে যোগদান, তৎকালীন সিনেমার পীঠ স্থান নিউ থিয়েটার প্রতিষ্ঠানে।

তখন দ্বিভাষিক এবং ত্রি ভাষিক ছবি তৈরি হতো শ্রী বীরেন্দ্র নাথ সরকারের নেতৃত্বে। ভারতীয় সিনেমার সব দিকপালরা ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের কর্মী। হিন্দি সিনেমার দিকপাল অভিনেতা রাজ কাপুরের পিতা পৃথ্বীরাজ কাপুর ছিলেন জ্যোতি প্রকাশের সহকর্মী।

অভিনেত্রী শীলা হালদারের ছবি। সৌজন্যে: শ্রী ইন্দ্রজিৎ হালদার

হিন্দি এবং বাংলায় তৈরি সিনেমা গুলি ছিল অবিভক্ত ভারত তথা বাংলার প্রধান জনপ্রিয় বিনোদন। তখন বোম্বাই সিনেমা জগৎ সবে মাত্র শিশু। হাঁটি হাঁটি পায়ে যাত্রা শুরু হয়েছে। অত্যন্ত সুদর্শন, রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান জ্যোতি প্রকাশ ভট্টাচার্য, অচিরেই অভিষেক হলো অভিনয় জগতে। ছবি গুলি’র নাম পরাজয় (১৯৪০), ডাক্তার (১৯৪০) , দ্য কোর্ট ড্যান্সার-রাজ নর্তকী (১৯৪১), মীনাক্ষী (১৯৪২), পাপের পথে (১৯৪১) ও চৌরঙ্গী ইত্যাদি।

দ্বিভাষিক এই ডাক্তার ছবিটি পরবর্তী কালে আবার তৈরি হয়, হিন্দি এবং বাংলাতে। নাম, আনন্দ আশ্রম। জ্যোতি প্রকাশ অভিনীত চরিত্র ‘সোমনাথ’-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা রাকেশ রোশন।

অভিনয় করতে করতে এই নায়ক প্রেমে পড়েন সহশিল্পী শিক্ষিত, অভিজাত নায়িকা শীলা হালদারের। শীলা হালদারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি, নর নারায়ণ (১৯৩৯), কর্নাজুন (১৯৪০) , গরমিল (১৯৪১) ইত্যাদি। তখনকার আমলে নারীদের সিনেমাতে অভিনয় খুব নীচু চোখে দেখা হতো। শীলা হালদার ছিলেন গ্রাজুয়েট, তখন কার দিনে যা ছিল অভাবনীয়। এই অভিনেত্রী ছিলেন ভারত বর্ষের প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী র নাতনি, তাঁর মেয়ের মেয়ে।

বিবাহিত জ্যোতি প্রকাশ সুন্দরী শীলা হালদার কে বিবাহ করবার জন্য ধর্মান্তরিত হন। দুজনের বিয়ে হয় ১৯৪১ সালে। কিন্তু, সুখের সংসার, ভালোবাসার সংসার, নিয়তির পরিহাসের শিকার। সন্তান জন্মের সময় মারা গেলেন শীলা হালদার, ১৯৪২ সালের নভেম্বরে।

পত্নী বিরহে অবসাদের শিকার জ্যোতি প্রকাশ। অনিয়মিত জীবন। একটি ছবির শুটিং চলছিল নায়িকা কানন দেবীর সঙ্গে (ছবি টির নাম ‘যোগাযোগ’)। চূড়ান্ত অবসাদের শিকার , নায়ক জ্যোতি প্রকাশ আত্মহত্যা করলেন ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরের ২৬ তারিখে। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে, স্ত্রী শীলা হালদারের মৃত্যুর একমাসের মধ্যে। অকালে শেষ হয়ে গেল এক প্রতিভাবান শিল্পীর।

https://www.mega888cuci.com