জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত আনন্দে ভাসানো একজন জনি ডেপ

‘ভাইয়া, বাবা মা কি আবার ঝগড়া করছে?’

সংসারের সবচেয়ে ছোট্ট ছেলের এই অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে তাঁর বড় ভাই বিরক্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। পাশের রুমে জোরে জোরে বাবা মায়ের চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে যেটা এখন আর নতুন কিছু না, দীর্ঘদিন এই জিনিস শোনার পরেও যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে সেটা ঝগড়া কিনা- তাহলে তার দিকে একটা বিরক্তের দৃষ্টি দেয়াই যায়। সেই দৃষ্টি দেখে ছোট ভাই কিছুটা ভয়ে কুঁকড়ে গেলেও, প্রশ্ন করা ভুলে গেল না।

ছোট ভাইয়ের পরের প্রশ্ন ছিল তার বড় বোনের কাছে , ‘আপু, বাবা মা আলাদা মানে ডিভোর্স হয়ে গেলে আমরা কে কার সাথে থাকব? আমি কি আব্বুর সাথে থাকব না আম্মুর সাথে?’

বড় বোন এবার পুরো অবাক! এতটুকু পিচ্চি ছেলে এখনই ‘ডিভোর্স’ বুঝে গেছে? আবার আগেই জিজ্ঞাসা করছে যে সে কার সাথে থাকবে? বোন ধমকে বললো, ‘জনি, বাইরে খেলতে যাও! বেশি পকপক করছ ইদানিং!’

ছোট সেই ছেলের পকপক শোনার ধৈর্য ছিল একমাত্র তাঁর দাদার। সেই দাদাও মারা গেলেন যখন ছোট ছেলের বয়স মাত্র সাত। সাত সমুদ্র তের নদী তখনও পার না দিলেও, অলরেডি ২০ টা শহরে ঘোরা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। না, শখের বসে না, অর্থের অভাবে কয়েকদিন পর পর বাবা মা বাসা বদল করতেন।

শহর ছোটবেলায় ঘোরা হয়ে গিয়েছিল ২০ টার মতো, আর বাসা পাল্টানো হয়েছিল ৩০ থেকে ৪০ টার মতো। যদিও সবগুলোকে ‘বাসা’ বলা যায় কিনা, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায় – একদিন মোটেলে পুরো ফ্যামিলি তো আরেকদিন সস্তা এক অ্যাপার্টমেন্টে।

অ্যাপার্টমেন্ট সস্তা হলেও, ছোট ছেলের দুঃখগুলো দামি ছিল, গভীর ছিল। ছোট ছেলে ততদিনে আর ছোট নেই। বয়স প্রায় ১২র কাছাকাছি। প্রায়দিন বাবা মায়ের ঝগড়া অসহ্য ঠেকত তার কাছে। এই যন্ত্রণা ভুলে থাকতে নিজের শরীরে ছুরি দিয়ে কাটাকাটি করতেন তিনি, শরীরে সেই দাগগুলো এখনও আছে। এই ঘটনা সম্পর্কে পরে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের শরীর আসলে এক ধরনের ডায়রির মতো, ডায়রির পাতায় যেমন আমরা প্রতিদিনের কথা লিখে রাখি, প্রতিদিনের হিসেব নিকেশ লিখে রাখি, আমার শরীরেও আমি তাই বিভিন্ন যন্ত্রণার কথা ছুরি দিয়ে লিখে রাখতাম।’

যন্ত্রণার পরিমাণ আরও বাড়ছিল। ১২ বছর বয়সে সিগারেট ধরলেন, ১৩ বছর বয়সে নিজের ভার্জিনিটি হারালেন, ১৪ বছর বয়সে ড্রাগ ধরলেন। দুই একটা ড্রাগ না, প্রায় সব ধরনের ড্রাগ। ১৪ বছর বয়সে যতদূর ড্রাগ নেয়া সম্ভব একজন মানব সন্তানের পক্ষে- সেই পরিমাণ ড্রাগ। ড্রাগ নেয়ার কারণ সম্পর্কে পড়ে বলেছেন- খেতে ভালো লাগতো, খেলে অন্য জগতে হারিয়ে যাব – এই কারণে ড্রাগ নিতাম না। ড্রাগ দেয়ার একটাই কারণ ছিল- কৌতূহল, প্রচণ্ড কৌতূহল। জিনিসটা কি আসলে? খেতে কেমন? খেলে কেমন লাগে?

বাবা একসময় ছেড়ে চলে গেলেন। মাকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করতে লাগলেন, তবে ভেঙে পড়েননি। ভেঙে না পড়ার দিনগুলোতে হুট করে একদিন অদ্ভুত এক যন্ত্রকে দেখলেন, যার নাম ছিল গিটার। মা ছোট ছেলের আগ্রহ টের পেলেন, ২৫ ডলারে ছেলেকে তাঁর জীবনের প্রথম গিটার গিফট করলেন। সেই গিটার নিয়ে ছেলে প্রায় এক বছর দরজা আটকে বসে ছিল, গিটার শিখবে এই কারণে। গায়ক হওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছে তৈরি হল তার মাঝে। গানের মাঝে সে খুঁজে পেল নতুন জগত।

নতুন যখন কোন জগত তৈরি করার চেষ্টা আপনি করবেন, তখন সেখানে কেউ না কেউ বা কোন ধরনের অবস্থা বাধা দিতে আসবেই। ছোট ছেলের জীবনেও একটা ভিলেন আসলো- এই ভিলেনের নাম ‘হাই স্কুল’। অনেক কষ্টে তিন বছর চালানোর পরে হাইস্কুল ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিল সে।ততদিনে তার নামে বিস্তর অভিযোগ – মানুষকে বিরক্ত করা, ঢিল মেরে স্কুলের জানলার কাঁচ ভেঙে ফেলা ও আরও নানান কিছু।

খুবই অদ্ভুত ব্যাপার হল, হাইস্কুল ত্যাগ করার এক সপ্তাহ পরে সে আবার হাইস্কুলে ফিরে এল, পড়াশোনা করবে বলে। এর চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার হল, সেই হাইস্কুলের প্রিন্সিপাল তাকে বললেন, ‘তুমি মিউজিকই করো। ট্রাষ্ট মি, ওটাই তোমার প্যাশন। তোমার এখানে থাকা মানে টাইম নষ্ট। এটাই ঠিকমতো করো, ভালো করবে তুমি।’

নতুন এক প্রেরণা পেল সেই ছেলে। বন্ধুদের দিয়ে ব্যান্ড গঠন করে ফেলল। চলতে থাকলো গানের জগতে বিচরণ। কিন্তু আত্মার ক্ষুধা নিবারণ হলেও, পেট চলছিল না সেভাবে।বাধ্য হয়ে গানের পাশাপাশি বলপয়েন্ট বিক্রি করতে লাগলেন। গানের সাথে প্রেমটা তখন আরেক ধাপ উপরে উঠেছে।

এবার এক নারীর প্রেমেও পড়লেন তিনি। প্রেমের পরে বিয়েও হল ঠিকঠাক, ছেলের বয়স তখন মাত্র ২০। কিন্তু শুধু গান করে বা কলম বিক্রি করে চলছিল না আর। তখনই তার স্ত্রী তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন বিখ্যাত অভিনেতা নিকোলাস কেজের সাথে। কেজ তাকে অভিনয়ের পরামর্শ দিলেন। ছেলে শুরুতে খুব একটা আগ্রহী ছিল না এই কাজে, কিন্তু পয়সা কিছু রোজগার হবে, এই চিন্তা করে রাজি হয়ে যায় সে।

‘আ নাইটমেয়ার অন এলম স্ট্রিট’ নামে ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া ক্লাসিক হরর সিনেমা দিয়ে সিনেমার দুনিয়াতে যাত্রা শুরু হল তার। তবে ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া টিভি সিরিজ ‘২১ জাম্প স্ট্রিট’-এ অভিনয় করে রাতারাতি স্টার হয়ে গেল সে। তরুণদের মাঝে তখন সে খুবই জনপ্রিয়!

জনপ্রিয়তায় থেকে একটু ধাতস্ত হয়ে ১৯৯০ সালে পরিচালক টিম বার্টনের সাথে মিলে তিনি করলেন এডওয়ার্ড সিজরহ্যান্ডস, যেখানে এমন এক গেটাপে আসলেন তিনি যে তাকে চেনাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল সেই তরুণদের কাছে! টিম যখন তাকে স্ক্রিপ্ট শুনাতে এসেছিলেন, মাত্র ১০ মিনিট শুনেই তিনি বললেন, ‘আমি সিনেমাটা করব। শুটিং শুরু হোক।’

এই সিনেমা প্রচুর সাফল্য পেল। এই সাফল্য দেখে তিনি ঠিক করলেন – জীবনে কখনও নিজেকে রিপিট করবেন না, প্রতিবার নিজেকে নতুনভাবে দর্শকদের সামনে হাজির করবেন। নিজেকে প্রতিবার ভেঙেচুরে এক নতুন লুক দিবেন।

এরপরে সিনেমা করলেন আরেক অসাধারণ অভিনেতা লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিওর সাথে, সিনেমার নাম ‘হোয়াটস ইটিং গিলবার্ট গ্রেপ’। এই সিনেমাতে ভালো কাজ করলেও, নজর কেড়ে নিয়েছিলেন ডি ক্যাপ্রিও। সেটা হয়ত তার কাছে একটু অন্যরকম ঠেকেছিল। এই কারণেই পরের বছর আবার পুরনো বন্ধু টিমের সাথে কাজ করলেন, সিনেমার নাম ‘এড উড’। আমরা সমস্ত সফল পরিচালকের কথা জানি, শুনতে চাই, আরও জানতে চাই। কিন্তু এড উড ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম একজন ব্যর্থ সিনেমা পরিচালক। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েও সিনেমার প্রতি তার যে প্যাশন ছিল, সেটা অনেক সফল ব্যক্তির মাঝেও থাকে না। সেই জিনিসটাই তিনি পর্দায় ফুটিয়ে তুললেন, আবারো নতুন এক লুক। আর এবারও বাজিমাত!

প্রফেশনাল লাইফ যতটা বাজিমাত যাচ্ছিল, পার্সোনাল লাইফের অবস্থা ছিল ততটাই শোচনীয় যাচ্ছিল। যে স্ত্রী তাকে নিকোলাস কেজের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, তার সাথে ডিভোর্স হয়ে গেল বিয়ের দুই বছরের মাথায়। এরপরে আরও অনেকের সাথে প্রেম চলছিল আর ভাঙছিল। এঙ্গেজমেন্ট রিং পরানো আর খোলা অনেকটা জামা পরিবর্তন করার মতো হয়ে গিয়েছিল তার কাছে। আজকে একজনের সাথে তো কালকে আরেকজনের সাথে। আজকে প্রেমিকার নামে শরীরে ট্যাটু করাচ্ছেন তো কালকে সেই ট্যাটু এডিট করছেন! সাথে যুক্ত হয়েছিল সাংবাদিকদের সাথে দুর্ব্যবহার, মাদক রাখার দায়ে পুলিশের সাথে সাক্ষাত এরকম আরও অনেক কিছু।

এরই মাঝে তার জীবনে নতুন এক গেট খুলে গেল ‘দ্য নাইন্থ গেট’ সিনেমাটি করার সময়। এই সিনেমার শুটিং এর সময় তার সাথে পরিচয় হল ভ্যানেসা প্যারাডাইস’ নামের নারীর।এই নারীকে দেখেই তার মনে হল – তার জীবনে নতুন একটা পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এই নারীর প্রেমে তিনি এতটাই মজে গেলেন যে তার বাবা মায়ের সাথে কথা বলার জন্য তিনি ফ্রেঞ্চ ভাষা শিখলেন! অবশেষে একদিন শুভকাজে দেরি না করে এঙ্গেজমেন্ট রিং পরিয়ে ফেললেন। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো বাবা হলেন তিনি, কন্যা সন্তানের।

বাবা হওয়ার অনুভূতির সাথে অন্যকিছুর তুলনা হয়না, এমনটাই তিনি বলেছিলেন তার এক সাক্ষাৎকারে, ‘নিজের মেয়েটাকে যেদিন আমি প্রথম কোলে নিলাম, আমার মনে হল এতদিন শুধু আমি এক্সিস্ট করতাম জাস্ট, কিন্তু আমার মেয়ে আমাকে বুঝাল যে আমারও একটা অস্তিত্ব আছে, একটা আলাদা সত্তা আছে। প্রতিদিন সকালে উঠে তার মুখ দেখলে অদ্ভুত রকমের এক শান্তি অনুভূত হত আমার!’

 

বাবা হওয়ার ঠিক এক বছর পরে তাঁর আর একটি সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘আপনার মেয়ের বয়স এখন এক বছর। এক বছরের বাচ্চারা কেমন হয়?’

তিনি বললেন, ‘তারা মাতালদের মতো হয়, তারা হেলেদুলে হাঁটে, তারা বেশি খেলে বমি করে, মাঝে মাঝে আগে থেকে সতর্ক না করেই টয়লেট করে ফেলে, তারা হুট করে হাসে, হুট করে কাঁদে। এরপরেও তাদের হাত ধরে রাখতে হয় যেন বেলাইনে না যায় – একদম মাতালদের মতো! হা…হা…’

ততদিনে আল পাচিনোর মতো অভিনেতাদের সাথে কাজ করে ফেলেছেন তিনি ‘ডনি ব্রাসকো’র মতো সিনেমাতে। এছাড়া সেই পুরনো বন্ধু টিমের সাথে যুক্ত হলেন আরেকবার ‘স্লিপি হলো’ নামের সিনেমাতে। এই সিনেমাতে যে ঘোড়াটা অভিনয় করেছিল, সিনেমা শেষে তিনি জানতে পারলেন ঘোড়াটার নাকি যাওয়ার কোন জায়গা নেই, চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেয়া হবে। এটা শুনে তিনি নিজেই ঘোড়াটাকে নিজের কাছে রেখে দিলেন আর দেখভাল করতে লাগলেন। কারো কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকলে তার কষ্টের পরিমাণটা কেমন, সেটা তিনি জানতেন বলেই হয়ত এই কাজটা করেছিলেন।

২০০২ সালে তিনি আবার বাবা হলেন, এবার পুত্রসন্তানের। আনন্দের আর সীমা রইল না। অধিক আনন্দে থাকলে মানুষ মাঝেমধ্যে ভুলভাল কিছু বকে ফেলে, তেমনটা ঘটলো তার সাথে। ২০০৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমেরিকা সম্পর্কে কটূক্তি করলেন। তার মতে,  ‘আমেরিকা একটি নির্বোধ কুকুরছানা। এটা যাকে ইচ্ছে তাকে কামড়ে দিতে পারে আর ক্ষতি করতে পারে’।

এই এক বক্তব্যে তাকে নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হল। যদিও তিনি বললেন যে তার দেয়া সাক্ষাৎকারকে মিসকোট করা হয়েছে আর আউট অফ কনটেক্সট এ ব্যবহার করা হয়েছে। আমেরিকার প্রতি তার পূর্ণ সম্মান আছে কারণ তিনি এই দেশের নাগরিক। এরপরেও কিছু মানুষের কাছে তিনি ভিলেন চিহ্নিত হয়ে রইলেন। ক্যারিয়ারের এত বছরেও এখনও অস্কার না পাওয়ার পেছনে অনেকে তার এই সাক্ষাৎকারকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

উল্লেখ করার মতো বহু কাজ এতদিনে তিনি করে ফেলেছিলেন। তবে ২০০৩ সালে তিনি এমন একটি সিনেমাতে এমন একটি চরিত্র করলেন যা তাকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। মজার ব্যাপার হল এই সিনেমাতে প্রথম তার কাজ করার কথাই ছিল না, জিম ক্যারি করতে না পারার কারণে তাকে বিবেচনা করা হয় এই রোলের জন্য, এরপরেও প্রোডাকশন কোম্পানি বেশ সন্দেহে ছিল যে তিনি আসলেই এই চরিত্র করতে পারবেন কিনা তাকে যখন জাস্ট বলা হল – ‘আমরা জলদস্যুদের নিয়ে একটি সিনেমা করব আর আপনি হবেন ক্যাপ্টেন’ – এটা শুনেই তিনি সিনেমা করতে রাজি হয়ে গেলেন! পরিচালক কে, স্ক্রিপ্ট এ কি আছে, সিনেমার নাম কি- কিচ্ছু জানতে চাইলেন না তিনি!

‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’ – সিরিজের প্রথম সিনেমাটি মুক্তির পরে ইতিহাস তৈরি করল। আর ইতিহাস তৈরি করা এই সিনেমার আইকনিক চরিত্র ‘জ্যাক স্প্যারো’ করা মানুষটির নাম হচ্ছে জনি ডেপ। ১ বিলিয়নের উপরে আয় করল এই সিনেমাটি, শুধু তাই না, জনি এই সিনেমার জন্য প্রথমবার অস্কারের নমিনেশন পেলেন। এই সিরিজের এখন পর্যন্ত পাঁচটি সিনেমা রিলিজ পেয়েছে। এই সিনেমার ভিডিও গেমও বের হয়েছে যাতে জনি নিজের কণ্ঠ দিয়েছেন- জনপ্রিয়তার পরিমাণটা বুঝতে আশা করি কষ্ট হবেনা!

এর চেয়েও কম কষ্ট হবে জনি ডেপের অভিনয় প্রতিভা বুঝতে। মার্লান ব্রান্ডোর মতো অভিনেতা জনিকে তাঁর প্রজন্মের অন্যতম সেরা আর ভার্সাটাইল অভিনেতা বলেছেন। আল পাচিনো ও তাকে প্রচণ্ড পছন্দ করেন। জনি এদেরকে প্রচণ্ড সম্মান করেন। হলিউডের ওয়ান অফ দ্যা হাইয়েস্ট পেইড এই অভিনেতা চলেন নিজের খেয়াল খুশিমতো, কাজও করেন নিজের ইচ্ছামত। টাকা যেরকম কামাই করেন, খরচ করেন সম্ভবত তার চেয়েও বেশি।

২০০৭ সালে নিজের একমাত্র মেয়ে যখন অসুস্থ হয়ে পড়ল, তখন যেন তার পুরো দুনিয়া কেঁপে উঠলো! হাসপাতালের ডাক্তার;রে নিবিড় তত্ত্বাবধানের তার মেয়ে সেবারের মতো সুস্থ হয়ে ফিরে আসলো। প্রতিদানে এই হাসপাতালে ২ মিলিয়ন ডলার দিলেন তিনি। এছাড়াও একদিন চার ঘণ্টার জন্য ক্যাপ্টেন জ্যাকের গেটাপে গিয়ে সেই হাসপাতালের সমস্ত বাচ্চাদের আনন্দ দিয়ে আসলেন তিনি।

নিজের অনেক বড় জিনিসের দিকে কম খেয়াল রাখা এই মানুষটি অন্যদের ছোট জিনিসগুলোও খুব ভালো করে খেয়াল রাখেন। হিথ লেজার মারা যাওয়ার পর তার মেয়ে অর্থকষ্টে পড়লে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন জনি ডেপ। নিজের মেন্টর নিকোলাস কেজ যখন ২০০৭ এর দিকে বেশ অর্থকষ্টে ছিলেন, তখন তাকেও সাহায্য করতে আসেন এই জনি ডেপ।

তার টাকার পরিমাণ বুঝাতে আর একটা জিনিস বলা এনাফ। নিজের কেনা বেশ কয়েকটি প্রাইভেট আইল্যান্ড বা দ্বীপ আছে তার। এর মাঝে একটি দ্বীপের বিশেষ একটি জায়গার নামকরণ তিনি করেছেন হিথ লেজারের নামে।

জনি ডেপ নামটা মানেই ভিন্নরকম কিছু, আলাদা কিছু- সবসময় এই ধারা তিনি বজায় রেখেছেন। তবে তারমানে এই না যে তিনি কখনও ভুল করেননি। পাল্প ফিকশন থেকে শুরু করে দ্য ম্যাট্রিক্স, স্পিড, ফেরিস বুয়েলার’স ডে অফ, ইন্টারভিউ উইদ দ্য ভ্যাম্পায়ার, মিস্টার অ্যান্ট মিসেস স্মিথ, থেলমা অ্যান্ড লুইস-এর মত সিনেমা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন।

তার ভক্তদের অনেক ইচ্ছা যে তাকে একটি সুপার হিরোর রোলে দেখার, সেই ইচ্ছাটাও প্রায় পূরণ হয়ে গিয়েছিল ২০০৩ সালে। ২০০৩ সালের ‘হাল্ক’ সিনেমাতে তার অভিনয়ের কথা ছিল। এমনকি কিছুদিন আগে রিলিজ পাওয়া ডক্টর স্ট্রেঞ্জ সিনেমাতে শুরুতে নাকি তিনি অভিনয় করবেন- এমন গুজব শোনা গিয়েছিল।

গুজবে কান না দেয়া এই মানুষটি সবসময় নিজের মনের কথা শুনেন, সম্ভবত এই কারণেই আজকে তিনি এই অবস্থানে। এতদূর যে তিনি আসবেন, সেটা হয়ত অনেকেই কল্পনা করেনি, বিশেষ করে তার ছোটবেলার শিক্ষকেরা। তাকে ছোটবেলায় পড়িয়েছেন, এমন এক শিক্ষক একদিন তার অটোগ্রাফ নিতে এসেছিলেন। জনি তাঁকে নিরাশ করেননি, তবে খুব অবাক হয়েছিলেন। কারণ এই শিক্ষকই ছোটবেলায় তাঁকে প্রচুর অপমান করেছিলেন।

একবার তাঁর দিকে তাকিয়ে এত জোরে চিৎকার করেছিলেন যে, পুরো ক্লাস জনির দিকে তাকিয়ে ছিল। সেদিন অনেক কষ্টে এতগুলো চোখের অপমান সহ্য করে নিয়েছিলেন জনি বা বলা চলে সহ্য করতে হয়েছিল। সেই কারণেই হয়ত ক্যারেক্টারের জন্য যেকোনো ধরনের ত্যাগ তিতিক্ষা অতি সহজের সহ্য করে ফেলেন তিনি।

তবে সহ্য করতে পারেন না, তার অটোগ্রাফ নিতে এসে বা তার সাথে ছবি তুলতে এসে কেউ তাঁর বাচ্চাদের ছবি তুলে ফেললে। এই জিনিসটা করতে সবাইকে মানা করেন তিনি। এছাড়া আর কাউকে নিরাশ করেন না। একবার এক ছিনতাইকারী তাকে প্রায় লুট করে ফেলেছিল, তখনই তাকে চিনতে পেরে সেই ছিনতাইকারী বলে, ‘শিট! আমি তো ক্যাপ্টেন জ্যাকস স্প্যারোর কাছ থেকে টাকা নিতে পারিনা! জনি মুচকি হেসেছিলেন শুধু। আর হ্যাঁ, কিছু টাকা দিয়ে দিয়েছিলেন সেই ছিনতাইকারীকে!

অন্যকে নিরাশ না করা বা নিরাশ হতে না দেয়া তার এই বৈশিষ্ট্যকে অনেকেই সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলেন, বিশেষ করে তরুণেরা। জনির কাছে অনেক চিঠি আসে যার ৯০ ভাগই তরুণ। এরা সবাই যার যার সমস্যা লিখে জনিকে চিঠি পাঠায় এবং তাদের ধারণা জনির যেকোনো একটি কথা বা যেকোনো একটি দেখানো রাস্তা তাদের জীবনকে নতুন একটি পথের সন্ধান দিবে। জনি এই জিনিসটাতে যতটা না খুশি হন, তার চেয়ে বেশি ভয় পান।

‘আমি কি আসলেই এমন স্পেশাল কেউ? আমি কি আসলেও পরামর্শ দেয়ার মতো কেউ? আমি নিজেই তো যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে চলেছি। তাহলে ভালো একজন সাইকাইট্রিস্টের কাছে না গিয়ে এই তরুণেরা আমাকে কেন চিঠি পাঠায়?’ – এরপরেও তিনি চেষ্টা করে প্রতিটি চিঠির উত্তর দিতে। একবার এক ছোট্ট ছেলে জনির একটি হ্যাট পছন্দ করে। জনি ঠিকই তাকে চিঠি লিখে পাঠান আর সেই হ্যাটটি তাকে দিয়ে দেন। সাথে সঙ্গী হয় অনেক অনেক চকলেট।

সিনেমাতে অভিনয় করা এই মানুষটি কিন্তু সিনেমার পোকা এক অর্থে। বাসটার কিটনের অনেক বড় ফ্যান তিনি। পুরনো যেকোনো হলিউড সিনেমার যেকোনো তথ্য একদম তার ঠোঁটের আগায় থাকে সবসময়। অথচ এই মানুষটি তার নিজের সিনেমা দেখেন না, একটাও না। নিজের প্রথম সিনেমার প্রিমিয়ার শো দেখার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এরপর থেকে আর দেখেন না।

না দেখার আর একটি কারণ সম্ভবত তার বাঁ চোখ। সোজা বাংলায় বলতে গেলে এই চোখে তিনি একদম অন্ধ। কিছুই দেখেন না বলতে গেলে আর তার ভাষ্যমতে এটা কোন অপারেশন করে ঠিক করা সম্ভব না। এরপরেও মানুষকে এক চোখ দিয়ে আনন্দ দেয়াকে অনেক বেশি সম্ভব করে চলেছেন তিনি। বেজবল খেলতে খুব পছন্দ করেন তিনি। বেজবল ব্যাট আর গ্লাভস তার সাথেই থাকে সবসময়। আর একটা জিনিস সবসময় সাথে রাখেন তিনি – ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারোর পোশাক।

নতুন যেকোনো ধরনের ক্যারেক্টার, যেকোনো ধরনের চ্যালেঞ্জকে ভয় না পাওয়া মানুষটি ক্লাউন বা সঙ, মাকড়সা আর ভূতকে ভয় পান। বলতে গেলে ফোবিয়া আছে তার এই তিন জিনিসে।

নিজের শরীরে কাটাকুটির কথা বলেছিলাম তার, লেখার শুরুতে, সেটা এখনও জারি আছে তবে অন্যভাবে। নিজের শরীরে ট্যাটু করাতে পছন্দ করেন তিনি। ১৩ টির মতো ট্যাটু আছে তার শরীরে যার একটিতে আছে নিজের মায়ের নাম, আরেকটিতে আছে নিজের মেয়ের নাম আর আরেকটিতে আছে নিজের ছেলের নাম।

‘আপনি যেকোনো চরিত্রই করেন না কেন, সেখানে আপনার নিজের কিছু একটা ব্যাপার থাকতে হবে, থাকবেই হবে। নইলে সেটা অভিনয় হবে না, সেটা পুরোটাই হয়ে যাবে মিথ্যে।’- অভিনয় সম্পর্কে এমনটাই বক্তব্য তার। যদিও বেশ কয়েকবছর ধরে বক্স অফিসে তার খরা চলছে এক অর্থে। এরপরেও কাজ করে চলেছেন তিনি।

মুখে এখনও হাসি লেগে থাকে তার যেখানে দুটি সিলভারের দাঁত একটু লক্ষ করলেই দেখা যায়। হাত সবসময় দুইটি কঙ্কালের মাথাওয়ালা একটি আংটি পরেন তিনি, ‘এই আংটিটা আমাকে প্রতিবার মনে করিয়ে দেয় – আমাদের জীবন খুব ছোট। এর প্রতিটি মুহূর্তকে একদম পুরোপুরিভাবে বাঁচা উচিত।’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।