একজন বিজয়ী জয়া

সত্তরের দশকের প্রথিতযশা নায়িকা নব্বইয়ের শেষে এসে হয়ে উঠলেন মমতাময়ী মা। ‘হাজার চৌরাশি কা মা’ তে মৃত সন্তানের লাশের জন্য আকুতি, ‘ফিজা’তে বিপথে যাওয়া এক সন্তানের মা,যে চেয়ে থাকে একদিন তাঁর সন্তান ফিরে আসবে, ‘কিংবা কাভি খুশি কাভি গাম’-এ সন্তানের প্রতি আবেগময় ভালোবাসা, ‘কাল হো না হো’র সিঙ্গেল মাদার, ‘লাগা চুনরি মে দাগ’-এক মায়ের অসহায়ত্ব – অসাধারণ সব মায়ের চরিত্র করে গেছেন তিনি। তিনি বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী জয়া বচ্চন।

জয়া বচ্চন সব সময়ই সিরিয়াস। যখন যেটা করেন, সেটাতেই থাকে তাঁর পুরো মনোযোগ। তিনি পুনের বিখ্যাত ফিল্ম ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী। সেখানে পেয়েছেন স্বর্ণপদক। ‘শোলে’ সিনেমাটি যখন করেন তখন তিনি প্রথমবারের মত সন্তানসম্ভবা। ওই সিনেমার শ্যুটিং যখন চলছে, তখনই বড় মেয়ে শ্বেতা নন্দার জন্ম হয়। অভিনয় জগৎকে তখন ‘টাটা বাই বাই’ বলে দিলেন ১৪ বছরের জন্য। ১৯৯৫ সালে যখন ফিরলেন, তখনও যা করেছেন তাতেও তিনি নাম্বার ওয়ানই হয়েছেন।

একালে এসে হয়েছেন সংসদ সদস্য। ২০০৪ সালে প্রথম রাজ্য সভার সদস্য হন। সেখানেও তিনি সেরা। সংসদে সর্বোচ্চ উপস্থিতির জন্য ২০১৭ সালে তিনি পেয়েছেন সেরা সাংসদের সম্মান। টানা চারবার তিনি একই পদে জিতে এসেছেন।

বাবা তরুণ কুমার ভাদুড়ি ছিলেন সাংবাদিক ও কবি। পৈত্রিক সূত্রে তিনি বাংলাদেশের মেয়ে। শুরুটা ১৯৬৩ সালে, সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ ছবি দিয়ে। জয়ার বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর।  সেই অর্থে তাঁকে সত্যজিৎ রায়েরই আবিষ্কার বলা যায়। এরপর বাংলা ছবিতে ‘ধন্যি মেয়ে’ ও হয়েছিলেন, সেখানে তিনি ছিলেন মহানায়ক খ্যাত উত্তম কুমারের শালিকা।

হিন্দি ছবিতে যাত্রা ১৯৭১ সালে, হৃষিকেশ মুখার্জীর ‘ঘুড্ডি’ ছবি দিয়ে। প্রথম ছবিতেই পাশে ছিলেন স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন, সেটা অবশ্য ছোট্ট একটা চরিত্রে। জয়াও নজর কেড়েছিলেন। একই পরিচালকেরই ‘অভিমান’ ছবিটি ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক।

ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন বলিউডের শাহেনশাহ খ্যাত কিংবদন্তি অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনকে। দু’জনের বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালের তিন জুন। তখন থেকে জয়া ভাদুড়ি হলেন জয়া বচ্চন। মজার ব্যাপার হল তিনি না থাকলে হয়তো অমিতাভ বচ্চন এই ‘শাহেনশাহ’ খেতাবটাই পান না। কারণ, ১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শাহেনশাহ’  ছবিটির স্ক্রিপ্ট খোদ জয়া বচ্চনই লিখেছেন।

অমিতাভের সাথে জুটি বেঁধে প্রথম যে কাজটা করেন সেটা হল ‘বানসি বিরজু’। মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে। ইতিহাস সৃষ্টিকারী ছবি ‘শোলে’র অন্যতম নায়িকাও তিনি। ১৯৭২ সালে জয়ার দু’টি ছবি মুক্তি পায় – ‘কোশিশ’ ও ‘পরিচয়’। দু’টিতেই ছিলেন সঞ্জীব কুমার। তবে, মজার ব্যাপার হল কোশিশে জয়া ছিলেন সঞ্জীবের স্ত্রী, আর পরিচয়ে ছিলেন মেয়ে। কী পরিমান সব্যসাচী একজন অভিনেত্রী তিনি সেটা এ থেকেই বোঝা যায়!

সমসাময়িক নায়িকারা যখন অভিনয়ের পাশাপাশি গ্ল্যামারাস দিয়ে দর্শক আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি শুধু একেবারে সাধারণ ভাবেই পর্দায় আসতেন, ঠিক যেন পাশের বাড়ির মায়াময় মেয়েটি। একে একে অভিনয় করেন জাঞ্জির, কোড়া কাগজ, মিলি, চুপকে চুপকে, নওকার, উপহারের মত চলচ্চিত্র।সংসারে মনোযোগী হতে সিনেমা থেকে বিরতি নেওয়ার আগে সর্বশেষ মুক্তি পাওয়া ‘সিলসিলা’ ছবিটিও বিখ্যাত।

লম্বা সময় বিরতি দিয়ে ১৯৯৫ সালে করলেন মারাঠি ছবি ‘আক্কা’। এর তিন বছর বাদে বলিউডে প্রত্যাবর্তন হয় তার। ছবি- ‘হাজার চুরাশি কি মা’। মহাশ্বেতা দেবীর বাংলা উপন্যাস ‘হাজার চুরাশির মা’ অবলম্বনে নকশাল বিপ্লবের ওপর নির্মিত হয় এই ছবিটি।

এরপর ফিজা, কাভি খুশি কাভি গাম, কাল হো না হো ছবিতেও অভিনয় করেন। মায়ের চরিত্রে হয়ে ওঠেন অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী। বাংলাদেশে এসেও ‘মেহেরজান’ নামের একটি ছবি করেন, যদিও ছবির গল্পটা অনেক বিতর্কের জন্ম দেয়।

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে পদ্মশ্রী পেয়েছেন ১৯৯২ সালে। তবে দুর্দান্ত অভিনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় পুরস্কার আজো মেলেনি। তবে ফিল্মফেয়ারে একাধিক বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছেন মোট নয়বার। আইফা পুরস্কার জিতেছেন তিনবার। বিখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমী চলচ্চিত্রে এসেছেন তাঁর অভিনয় থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই।

পুত্র অভিষেক বচ্চন ও পুত্রবধূ সাবেক বিশ্ব সুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই বলিউডের স্বনামখ্যাত অভিনয়শিল্পী। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে অমিতাভ-জয়া এখন বলিউডে সুখী দম্পতি হিসেবে সুপরিচিত। যদিও, তাঁদের চলার পথটা এতটা সহজ ছিল না।

আশির দশকে অমিতাভ ও অভিনেত্রী রেখার প্রেম ছিল বলিউডের ‘টক অব দ্য টাউন’। তবে সব কিছু পাল্টে দেয় মনমোহন দেসাইয়ের‘কুলি’ ছবিটি। দিনটা ছিল ১৯৮২ সালের ২৬ জুলাই। ব্যাঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সহ-অভিনেতা পুনিত ইসারের সাথে একটা মারামারি দৃশ্য করতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে আহত হয়েছিলেন তিনি।

চোট এতটাই তীব্র ছিল যে তখনই তাকে জরুরী ভিত্তিতে মুম্বাই হসপিটালে নিয়ে আসা হয়। কোমায় চলে যান। ডাক্তাররা বলেছিল কয়েক মিনিটের জন্য তিনি নাকি ‘ক্লিনিকালি ডেড’ ছিলেন। ভারতজুড়ে তখন হাহাকার। দেশের সেরা অভিনেতার শেষযাত্রার প্রস্তুতি হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তার যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করে দেশেই থেকে গেছেন।

কিন্তু কাকতালীয় ভাবে বেঁচে গেলেন অমিতাভ। লম্বা সময় হাসপাতালে থেকে ১৯৮৩ সালে আবারো শ্যুটিংয়ে ফিরলেন। এটা সম্ভব হয়েছিল ডাক্তারদের চিকিৎসা ও জয়ার সেবাযত্নের সুবাদে। দুর্ঘটনার কারণে ছবির ক্লাইমেক্সে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, পরিবর্তন এসেছিল অমিতাভের জীবনেও।

অমিতাভ নিজেকে পাল্টে ফেললেন। রেখা অধ্যায় তাই সেখানেই শেষ। পেশাদার জীবনের মত, তাই সংসার ধর্মেও বিজয়ী জয়া!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।