পুরুষত্ব ও বন্যতার এক জমকালো লড়াই

প্রতিনিয়ত কসাইয়ের জীবনটাই এমন। প্রতিদিন ভোরবেলায় সে প্রস্তুত থাকে মহিষকে মেরে তাঁর গোশত গ্রামে বিক্রি করার জন্য। কিন্তু একদিন ভোরে আকস্মিকভাবে পাগলাটে এক মহিষ কসাই থেকে পালিয়ে গ্রামে ছুটে বেড়াতে থাকে৷ যার দরুণ সমগ্র গ্রামে মহিষকে ঘিরে তান্ডব শুরু হয়ে যায়। ক্ষিপ্র গ্রামবাসী মরিয়া হয়ে উঠে মহিষকে জব্দ করার জন্য।

গল্পটা খুব সাধারণ শোনালেও পরিচালকের পরিবেশনের ভঙ্গিমায় রীতিমতো ভড়কে গিয়েছি সিনেমার প্রতিটি স্তবকে। শুরুর দৃশ্যে শব্দগ্রহণের অপরূপ মেলবন্ধনের সাথে ক্যামেরার ফ্রেমের খেলায় সত্যি দৃষ্টি বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছিলো। আঙ্গামালি ডায়েরিস সিনেমাতে ক্যামেরার সাথে এক ঝাঁক তারকার দৌড়ের মনোরম দৃশ্য সিঙ্গেল শটে ফুটিয়ে তুলেছিলো; তারই ঝলক পেলাম মহিষের পেছনে ছুটতে থাকা ক্ষ্যাপাটে গ্রামবাসীর ছোটাছুটি।

সিনেমার নামকরণটাও হয়েছে মোক্ষম। তামিল নাড়ুতে শতাব্দী প্রাচীন ‘জালিকাট্টু’ খেলা হয়, যেখানে একটা মহিষ বা ষাড়ের সাথে লড়ে এক গাদা মানুষ। ছবিতে রূপকার্থে হলেও নামটা দারুণ মানিয়ে গেছে।

কেরালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য এমনিতেও বাড়তি সৌরভ পুলকতার সঞ্চারণ ঘটায়। সেই সাথে সুদক্ষ পরিদর্শনের জন্য কালার গ্রেডিং আরো মনোরম রূপে ফুটে উঠে। ছোট ছোট দৃশ্যে সিনেমাটোগ্রাফির সৌন্দর্যটা খুব স্পষ্ট বোঝা গেছে। চমৎকার কাজের মোহনীয়তায় দর্শক হারিয়ে গেছেন। সাথে গ্রামের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তো ছিলই।

এই সিনেমার শব্দগ্রহণের অপরূপতা আমার জীবনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সত্যি যেমন কদমে কদমে ভড়কে গিয়েছি। ঠিক তেমনি প্রতিটি সিকোয়েন্সে শব্দগ্রহণের ধারে মুগ্ধতার রেশে শিহরিত হয়েছি। প্রত্যেক কলাকুশলী এখানে নিজেদের কাজটা করেছেন সততার সাথে। তাই, ছবির মূল ভাবটা ধরতে কোনো সমস্যা হয়নি।

খুব সাধারণ একটা গল্পও যে অসাধারণ হয়ে পর্দায় আসতে পারে, সেটা পরিচালক লিজে জোসে পেল্লিসেরির সৌজন্যে দেখা গেছে। মানুষ প্রয়োজনে পশুর চেয়েও বর্বর ও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে – তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই ছবি।

হারিশের ছোটগল্প ‘মাওইস্ট’ অবলম্বনে ছবিটি বানানো হয়েছে। কার্যত, এটা কোনো গল্প নয়। এটা একটা পরিস্থতি। পুরো ছবিতে সংলাপের ব্যবহারও তাই খুবই সামান্য। এমন একটা ব্যাপার নিয়ে ছবি বানানোও সাহসের ব্যাপার।

বড় পর্দায় ছবিটি দেখা নি:সন্দেহে দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হবে। একই সাথে এটা রোমহর্ষক, চিত্তাকর্ষক ও রোমাঞ্চকর। এখানে কোনো গল্প তেমন নেই, শুধু আছে আদি পুরুষত্ব আর বন্যতার লড়াই। আছে মনুষ্যত্বের হিংস্র সক্ষমতার চিত্রায়ন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।