আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আক্ষেপ, ঘরোয়া ক্রিকেটের সম্পদ

জহুরুল ইসলাম অমিকে নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে গেলে, সবকিছুর আগে অবধারিতভাবে যেটা বলতে হয়, ‘খুব ভালো ছেলে!’

কোনো ক্রিকেটারকে নিয়ে আলোচনায় তিনি মানুষ হিসেবে কেমন, এটা অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বটে। তবে সবকিছুর আগে সেটা আসার কথা নয়। কিন্তু এই ছেলেটি এত ভালো, এত বিনয়ী, এত মৃদুভাষী, এত ভদ্র – এসবই আগে চলে আসে!

দেখা হলে স্মিত হেসে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। হাসিটা দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। এত আস্তে কথা বলেন, অনেক সময় কান খাড়া করেও শোনা কঠিন। এই যুগে এসব বিরল।

মানুষ তিনি যতটা ভালো, তার ক্রিকেটও কম ভালো নয়। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে আবাহনীর হয়ে আজকে ওপেন করতে নেমে আউট হয়েছেন ৫০তম ওভারে। ১৩৮ বলে করেছেন ১৩০।

আজকে যেটি অল্পের জন্য পারেননি, এবারে আসরের প্রথম ম্যাচে সেটিও পেরেছিলেন। পুরো ৫০ ওভার খেলেছিলেন। আবাহনীর রান ছিল ২১৬, অমি একাই অপরাজিত ১২১!

আবাহনী সেদিন ৯ উইকেট হারিয়েছিল, অলআউট হলেই ‘ক্যারিং দ্য ব্যাট থ্রু আ কমপ্লিটেড ইনিংস’ কীর্তি গড়া হতো। সেই ম্যাচটি খেলেছিলেন হাতের ইনজুরি নিয়ে। ইনিংসের সময় পায়ে ক্র্যাম্প করায় খেলতেই পারছিলেন না ঠিক মতো। তার পরও হাল না ছেড়ে লড়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত।

ইনজুরি সারতে সময় লেগেছে। পরে নতুন করে আবার চোট লেগেছে। আঙুলে ব্যান্ডেজ পেঁচিয়ে ব্যাটিং ও কিপিং করে গেছেন। একাডেমি মাঠে একদিন হাতে ব্যান্ডেজ দেখে বললাম, ‘ঘটনা কি?’ তিনি হাসি মুখে বলেন, ‘এমন কিছু না ভাই। খেলে ফেলব…।’ এখন অবশ্য ঠিক হয়ে গেছে।

এই দুই সেঞ্চুরির মাঝে মোহামেডানের বিপক্ষে আছে ৯৬ রানের ইনিংস। সব মিলিয়ে ৬ ইনিংসে করে ফেলেছেন ৪০৬ রান। আবাহনীর ব্যাটিংকে ধরে রাখার দায়িত্ব তার। সেটি পালন করছেন দারুণভাবে।

অমির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এখনও আমার কাছে বড় আক্ষেপ। অনেক সম্ভাবনাময় ব্যাটসম্যান ছিলেন। আমার বেশ প্রিয় ব্যাটসম্যানও ছিলেন, অনেক আশা ছিল। সম্ভাবনার ঝলক দেখিয়েছিলেনও কিছু।

ঘরোয়া থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়ে আমাদের অনেকে অথৈ সাগরে পড়ে যায়। অমির সেরকম হয়নি। প্রথম টেস্ট ইনিংসে যদিও শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন। পরের ইনিংসেই চমকে দিয়েছিলেন। টেস্টে তার প্রথম চারটি স্কোরিং শট ছিল ৬, ৬, ৪, ৪!

ওই ইনিংসে করেছিলেন ৪৩ রান। পরে সেটিই হয়ে যায় তার পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গল্প। ৭ টেস্টে ১৪ ইনিংস খেলেছেন। তার ১০ ইনিংসেই ২০ রান ছুঁয়েছেন, অবিশ্বাস্যভাবে সর্বোচ্চ কেবল ৪৭! ৫ বার ৪০ রান পেরিয়েও ফিফটি করতে পারেননি।

ওয়ানডেতেও একই চিত্র। ১৩ ইনিংস খেলেছেন, ৯ টিতে দুই অঙ্ক ছুঁয়েছেন। কিন্তু ফিফটি কেবল একটি, ২০১২ এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে ৫৩। কত যে সম্ভাবনাময় ইনিংস, ৪০, ২৭, ৩৪, ৪১ … বড় করতে পারেননি। তাই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও বড় হয়নি।

ঘরোয়া ক্রিকেটে রান করে গেছেন। মাঝে বছর দুয়েক অবশ্য ক্রিকেট থেকে অনেকটাই দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কিছু ব্যক্তিগত ঝামেলা ছিল। একের পর এক ইনজুরিও হানা দিয়েছে। ক্যারিয়ারঘাতী হতে পারত, এমন ইনজুরিও ছিল। মনে হচ্ছিল, আর হয়তো ফিরতে পারবেন না। ঠিকই ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়টি পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। আবার নিয়মিত খেলছেন, পারফর্ম করছেন।

অনেকেরই অনেক কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্লিক করা হয়ে ওঠে না। সেটিই শেষ কথা নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে যে নিবেদন, যে ভালোবাসা ও প্যাশন দিয়ে খেলে যাচ্ছেন, দেশের ক্রিকেটের জন্য সেসব কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অমির জন্য শুভ কামনা।

– ফেসবুক পেজ থেকে

https://www.mega888cuci.com