পেপ গার্দিওলা কি ওভাররেটেড কোচ?

বার্সালোনাকে নিয়ে পেপ গার্দিওলা যে সফলতা পেয়েছেন সেটা বাকি দুই ক্লাব মানে বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানচেস্টার সিটিকে নিয়ে এখন পর্যন্ত দেখাতে পারেননি। একেবারেই পারেননি বলাটা ভুল হবে, বায়ার্নের তিন মৌসুমে তিনবারই লিগ জিতেছেন, ম্যান সিটিকে নিয়ে আপাতত একবার লিগ জিতেছেন।

সমস্যা হচ্ছে বায়ার্ন মিউনিখকে নিয়ে বুন্দেসলিগা জেতাটা খুব কঠিন কোন কাজ নয়, এমনকি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতলে সেটাকেও একেবারে দূরহ কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। পেপ যাওয়ার আগের মৌসুমেই তো বায়ার্ন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতলো। দুই দলকে নিয়ে পেপ এখন পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিততে পারেননি।

যদি ভুল না হয়ে থাকি তাহলে এই একটি কারণেই পেপকে অনেকে ওভাররেটেড ভাবেন। বিষয়টা হয়তো একেবারে ভুলও নয়। তবে একই সাথে সমালোচকরা গার্দিওলারা আরেকটা বিষয় অনেকে ভুলে যায়। সেগুলোর দিকে একটু নজর দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক যে পেপ কি আসলেই ওভাররেটেড কিনা।

একেকজন মানুষ একেকভাবে ভাবে। এটাই স্বাভাবিক।

আমার কাছে সফলতার মানে শিরোপা জয় না। অনেকের কাছে হয়তো শিরোপাটাই মূখ্য, হয়তো সেটাও ঠিক। শেষ পর্যন্ত তো প্রতিটা দল শিরোপা জয়ের জন্যেই খেলে।

উহু, কথাটা হয়তো ভুল বললাম। প্রতিটা দল শিরোপা জয়ের জন্য খেলে না। কোন কোন দলের লক্ষ্য থাকে লিগে সেরা চারের মাঝে নিজের জায়গা করে নেওয়া যাতে করে পরের সিজনে অন্তত চ্যাম্পিয়ন্স লিগটা খেলতে পারে। প্রতিটি টুর্নামেন্টে খেললেও একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা পাওয়া সম্ভব। একই সাথে টুর্নামেন্টে যত দূর যাওয়া সম্ভব, টাকার পরিমাণটাও সাথে সাথে বাড়বে।

তবে বড় দলগুলো সাধারণত দল গড়ে তুলে শিরোপা জয়ের জন্যেই। প্রতিযোগীতার এই যুগে একজন কোচের পক্ষে তাই নতুন কিছু ভাবাটা কিছুটা কঠিন। আপনার উপর যখন একজন কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে তখন আপনি জানবেন যে সেই মানুষটা খুব দ্রুত সেটার রিটার্নটাও চাইবেন। সেই অবস্থায় বেশির ভাগ মানুষই জুয়া না খেলে সেইফ সাইডে থাকার চেস্টা করে। তবে কিছু কিছু অতি আত্মবিশ্বাসী মানুষ জুয়াটা খেলে ফেলে।

২০১৯ সালে বসে আপনার মনে হতেই পারে যে পেপ গার্দিওলা বার্সালোনায় খুব ভালো একটা স্কোয়াড পেয়েছেন। হ্যা, ভাবনাটা মিথ্যা নয়। তবে খুব ভালো স্কোয়াড পেয়েও কি ইতিহাসের সবাই পেপের মতো রেজাল্ট বের করে আনতে পেরেছেন?

দিনহোকে বাদ দিয়ে মেসিকে কেন্দ্রীয় খেলোয়াড় বানানোর ভাবনাটাও কি জুয়া ছিল না? জুয়াটা কাজে লেগে যাবার কারণে আজ সবাই কাজটা সহজ ভাবছে। এক বছরে সম্ভাব্য ৬ টি শিরোপার প্রতিটি জয়, মাদ্রিদকে তাদের মাঠে যেয়েই ৬-২ গোলে হারানো, এল ক্ল্যাসিকোতে প্রথম এবং একমাত্র কোচ হিসেবে মাদ্রিদকে টানা ৫ ম্যাচে হারানো কিংবা সর্বকনিষ্ঠ কোচ হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় – কেবল মাত্রই কি ভালো স্কোয়াড পাওয়ার কারণে?

২.

ওয়েল, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম যে পেপ বার্সালোনাকে কোচিং করাননি। কেবল মাত্র বায়ার্ন আর সিটির কোচ ছিলেন।

আগেই বলা হয়েছে যে বায়ার্নের হয়ে তিন মৌসুমে তিনবারই লিগ জিতেছেন পেপ। তা জার্মান লিগে বায়ার্নকে নিয়ে জেতাটা অতটা কঠিন কাজ নয়। নিন্দুকেরা বলে কোচ না থাকলেও বায়ার্ন চ্যাম্পিয়ন হবে। তাই চ্যাম্পিয়ন হলেও স্পেশাল কিছু না করলে পুরোপুরি মন ভরবে না। সেই স্পেশাল কাজটাই করলেন গার্দিওলা। লিগ জেতেন ৭ ম্যাচ হাতে রেখে যা কিনা বুন্দেসলিগার রেকর্ড।

খেলোয়াড়ি জীবনের পেপ গার্দিওলা

বুন্দেসলিগায় দায়িত্ব নিয়ে টানা ১৪ ম্যাচ জয়ের রেকর্ড করেছিলেন কার্ল হেইঞ্জ ফেল্ডক্যাম্পস। গার্দিওলা সেই রেকর্ড ভেঙ্গে নিয়ে গেলেন ২৮ ম্যাচের রেকর্ডে । হ্যা, বায়ার্নকে নিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ পেপ জিততে পারেনি। তিনবারই সেমি খেলেছে; একবার হার মানে বার্সার কাছে, একবার রিয়ালের কাছে আরেকবার অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে।

বিষয়টা অজুহাত মনে হতে পারে তবে পেপ কখনোই তার পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াডটা পাননি। ২০১৪-১৫ সেমিতে বার্সার বিপক্ষে রিবেরি আর রোবেন এর মতো খেলোয়াড় খেলেনি। ২০১৫-১৬ তেও এটিএম এর বিপক্ষে প্রথম লেগে রিবেরি আর রোবেনকে পাননি, দ্বিতীয় লেগে রিবেরি আসলেও রোবেন মিস ছিলেন। রিবেরী আর রোবেন বায়ার্নে থাকলেও বায়ার্ন হারতে পারতো তবে জাভি-মেসি-ইনিয়েস্তাসহ বার্সা আর এদের বাদে বার্সার শক্তির পার্থক্যটা আশা করি সবাই বুঝবেন।

সিটিতে গিয়েও কিন্তু গার্দিওলা চমক দেখিয়েছেন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে প্রথম বারের মতো ১০০ পয়েন্ট অর্জন করে তার দল ম্যানচেস্টার সিটি যা কিনা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চেয়ে ১৯ পয়েন্ট বেশি। হ্যা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ক্লপের কাছে হেরে যাওয়াটা কিছুটা ব্যর্থতা তবে কখনোই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল না খেলা সিটিকে নিয়ে আরো কিছুদিন সময় পাচ্ছেন পেপ।

পেপ যদি বার্সালোনাকে কোচিং না করাতেন তাহলেও কি কেবল মাত্র তার খেলোয়াড়ি দর্শনের কারণে ইতিহাসে একটা আলাদা জায়গা পেতেন না?

৩.

সাচ্চির কথা মনে আছে? মিলানের আরিগো সাচ্চি। মিলানকে নিয়ে দু’বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। তিনি কিন্তু কেবল জয়ের জন্যে স্মরণীয় হয়ে থাকেন নি। ১৯৮৯ সালে মাদ্রিদকে সেমিতে হারিয়েছিলেন ৫-০ গোলে যে মাদ্রিদ কিনা সেই সময়ের লা লিগা চ্যাম্পিয়ন ছিল। নতুন নতুন কিছু ভাবনার কারণেই তিনি স্মরণীয়। সাচ্চিরও কিন্তু মিলান বাদে তেমন কোন সফলতা নেই, মিলানের সমতূল্য সফলতা তো বাদই দিলাম।

সাচ্চি যদি ওভাররেটেড না হন তাহলে পেপ কেন হবেন?

৪.

বার্সালোনার সফলতা অবশ্যই পেপকে একটা আলাদা স্বীকৃতি দিয়েছে সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। সেই সফলতা না থাকলে হয়তো সেরার তালিকায় পেপ আরেকটু নীচের দিকে থাকতেন। কিন্তু বায়ার্ন আর সিটিকে নিয়েও পেপ যা করেছেন সেটার জন্যেও ইতিহাসে তিনি আলাদা একটা জায়গা পাবার যোগ্যতা রাখেন।

হ্যাঁ, ক্যারিয়ারে কিছুটা ব্যর্থতাও আছে তার। তবে, বরাবরই তিনি নিজেকে ভাঙতে চেয়েছেন। বার্সার পরিচিত এবং নিজের হাতে গড়া সাম্রাজ্য ছেড়ে ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে যাচাই করার চ্যালেঞ্জটা নিয়েছেন তিনি।  ইতিহাস তাকে কেবল শিরোপা জয়ী হিসেবেই স্মরণ করবে না, টিকিটাকার যথাযথ প্রয়োগকারী হিসেবেও মনে রাখবে আশা করি।

https://www.mega888cuci.com