তোমার কিসের এত তাড়া!

ক্রিকেটার হতে হতে বেঁচে থাকার তাগিদে অভিনেতায় বদলে যাওয়া এনএসডির স্কলারশিপধারী এক রাজস্থানী যুবক তিনি। আত্মনিবেদিত অভিনয়ের ঊজ্জ্বল নিদর্শন দেওয়া সেই অভিনেতা ইরফান খানকে কোনদিন ভুলতে পারবেনা ভারতীয় সিনেমা। অভিনয় করতেন, মনেই হতনা। এতটাই সাবলীল ছিলেন তিনি তার অভিনয়ে।

ভোডাফোনের সেই ‘ছোটা রিচার্জের’ ছোট্ট ছোট্ট বিজ্ঞাপনগুলি বা সিয়েট টায়ার্সের বিজ্ঞাপন, অথবা মাস্টারকার্ডের মনছোঁয়া সেই বিজ্ঞাপন, তাকে মনে পড়িয়ে দেবে সবসময়। বিজ্ঞাপন তো না, যেন আমার আর আমাদের কথাই বলে দিতেন ইরফান খান, তার গলায়। অভিনয় দিয়ে দর্শককে আপন করে নেবার ক্ষমতা ছিল তার মজ্জাগত।

মঞ্চ, টিভি, বলিউড হয়ে হলিউড, যেখানেই পড়েছে তার অভিনয়ের আলো, সব জায়গাতেই তিনি ছড়িয়ে রেখে গেছেন এক আশ্চর্য ভোরের আগমনী।এক অনাবিল ভালোলাগার উত্তরাধিকার রেখে গেছেন তিনি তার প্রিয় সৃষ্টিগুলির মাধ্যমে।ইউটিউবে ধরে রাখা তার সাক্ষাৎকারগুলি এখন দেখা মানে এক একটা উজ্জ্বল উদ্ধার, এক একটা মনখারাপের নিশ্ছিদ্র ও নিশ্চিত গ্যারান্টি।

এছাড়া তার দৃশ্যমাধ্যমের লঞ্চপ্যাড দূরদর্শনে তার অমর কিছু কাজ ধরা আছে শ্রীকান্ত (১৯৮৭), ভারত এক খোঁজ (১৯৮৮), চাণক্য (১৯৯২), চন্দ্রকান্ত (১৯৯৪), জাস্ট মোহব্বত (১৯৯৬), স্পর্শ (১৯৯৮), ডর (২০০০), ডন (২০০৭) আর টোকিও ট্রায়াল-এ (২০১৬)।

তাঁর অভিনয় ক্ষমতায় ঊজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থেকে গেল অনেক ছায়াছবি।যেমন, ‘সালাম বম্বে’ (মীরা নায়ার), ‘এক ডক্টর কি মউত’ (তপন সিংহ), ‘বাড়াদিন’ (অঞ্জন দত্ত), ‘ধুন্দ’, ‘দি গোল’, ‘ফুটপাথ’, ‘মকবুল’ (বিশাল ভরদ্বাজ), ‘দ্য নেমসেক”, ‘মাদারি’, ‘ডি-ডে’, ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’, ‘কসুর’, ‘আজা নাচলে’, ‘নিউইয়র্ক’, ‘স্লামডগ মিলিওনার’, ‘লাইফ অফ পাই’, ‘পান সিং তোমার’, ‘লাঞ্চবক্স’, ‘হায়দার’, ‘পিকু’ (সুজিত সরকার), ‘কারওয়ান’, ‘কারিব কারিব সিঙ্গেল’ এবং ‘আংরেজি মিডিয়াম’। ‘পান সিং তোমার’ তাঁকে এনে দিয়েছিল ২০১২ সালের জাতীয় পুরস্কার।

২০১১ সালে পেয়েছিলেন পদ্মশ্রী পুরস্কার। আন্তর্জাতিক মানের অভিনয় তাঁকে অনেক আন্তর্জাতিক ছবিতেও সুযোগ করে দিয়েছিল। ‘বাজিরাও মস্তানি’ আর ‘দ্য জাঙ্গাল বুক’-এ তাঁর কণ্ঠদান আজ ইতিহাস।

তখন ইউপিতে পোস্টিং ছিল, আমার ব্যাংকের বেনারস অডিট অফিসের আন্ডারে। মনে পড়ছে ২০০৪ সালের একটা রবিবারের দুপুরে আজমগড়ের ‘গরুণ হোটেল’-এ বসে টিভিতে দেখেছিলাম ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া বিশাল ভরদ্বাজের পরিচালনায় ‘মকবুল’। সেদিন স্তম্ভিত হয়ে দেখেছিলাম পঙ্কজ কাপুর আর টাবুর অভিনয়ের সঙ্গে ইরফান খানের অভিনয়ের টক্কর। সেদিন বুঝেছিলাম, ইরফান খানের মাপের অভিনেতা খুব সহজে পাওয়া যায় না। ভারতীয় সিনেমাজগত এখন এটা উপলব্ধি করছে ভালভাবেই।

২৯ এপ্রিল ২০২০ তারিখে বলিউড হারিয়েছিলো অসাধারণ অভিনেতা ইরফান খানকে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছরের একটু বেশি। তার আগের দিন কোলনে ইনফেকশন নিয়ে কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হন অভিনেতা ইরফান খান।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরফান খানের নিউরো এন্ডোক্রিন টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে।এরপর দীর্ঘ সময় লন্ডনে চিকিৎসা চলেছিল ইরফান খানের। ২০১৯-এর এপ্রিলে ভারতে ফিরেছিলেন ইরফান খান। ক্যানসার যুদ্ধে জয়ী হলেও তারপর থেকেই ইরফান খান নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যেই ছিলেন, কিন্তু আচমকাই পরিস্থিতি খারাপ হয় মৃত্যুর দু’তিনদিন আগে থেকে।

মৃত্যুর চারদিন আগে গত ২৫শে এপ্রিল ২০২০ তারিখে তার মা-কে হারান ইরফান খান। ভিডিয়ো কলের মাধ্যমে শেষবারের মতো মৃত মায়ের দর্শন সেরেছিলেন অভিনেতা। মায়ের মৃত্যুর চারদিনের মাথাতেই না ফেরার দেশে  চলে যান এই অভিনেতা।

শারীরিক অসুস্থতার জন্যই দীর্ঘ সময় ধরে রূপালি পর্দা থেকেও দূরে ছিলেন ইরফান। ক্যানসার জয় করে বক্স অফিসে ইরফানের কামব্যাক হয়েছিল তার শেষ ছবি ‘আংরেজি মিডিয়াম’ দিয়ে। ২০২০ সালের ১৩ মার্চ মুক্তি পেয়েছিল এই ছবি।

২৮ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেছিলেন এনএসডি গ্র্যাজুয়েট সুতপা সিকদারকে। তাঁদের দুটি পুত্রসন্তান আছেন – বাবিল আর আয়ান। ‘রিসার্জেন্ট রাজস্থান’-এর ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়েছিলেন ইরফান খান ২০১৫ সালে। নামের বানানে একটি অতিরিক্ত ‘R’ বসাতেন ২০১২ থেকে। এতটা খারাপ লাগিয়ে, এতটা শূন্যতা আনিয়ে, ইদানীংকালে আর কোন অভিনেতা চলে যাননি।

আর ক’টা দিন থেকে গেলে খুব ক্ষতি হত কি ইরফান খান সাব? কিসের এত তাড়া ছিল আপনার? ‘হামারা তো গালি মে ভি তালি মিলতে হ্যায়।’ এই ‘গালি আর তালির একাকার’ সময়কে আপনার মত আর কে এভাবে বোঝাবে? অভিনয়ে যে তাড়াহুড়োটা কোনদিন ছিল না, সেটা কি যাবার সময়ের জন্য তুলে রেখেছিলেন আপনি?

https://www.mega888cuci.com