উদাসিনী বেশে বিদেশিনী: পামেলা অ্যান্ডারসন

পামেলা অ্যান্ডারসন বিয়ে করেছেন। বরমশাই পামেলার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী। আমরা যাঁরা আশির দশকের সন্তান এবং নব্বইয়ে টিন এজ যাপন করেছি, তাঁরা একটু নস্টালজিক হবেন আজ। অবশ্য মন থাকতে হবে।

নস্টালজিক হবার কারণ বলার আগে একটু সময়টা বলে নিই।

আগে জয়েন্ট ফ্যামিলিতে একটা মাত্র টিভি। তাও আবার যৌথ পরিবারের অরণ্যদেব দাদু, দিদা দেখবেন। তাঁদের ইচ্ছার বাইরে সংসারে কিছুই হবার নয়। প্রত্যেকের বাতকর্মের গন্ধও তাঁদের মুখস্ত হওয়া চাই। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী নাতনী বা বাড়ির বৌদের পিরিয়ড হবে এই ছিল পারিবারিক দাবী। পরিবারগুলি টিন এজার ছেলেমেয়েদের জন্য ছিল প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর ভাষায়, ‘হাড় হিম করা সন্ত্রাস’।

বাংলা সিরিয়ালে জননী-জন্মভূমি-কনকাঞ্জলী দেখে বাঙালীর কামবোধ বিলুপ্ত হয়েছিল। পিটুইটারি গ্রন্থির অবস্থা হয়েছিল অ্যাপেনডিস্কের মতো নিষ্ক্রিয়। সবাই ঘুমোলে নবপরিণীতরা হয়ত টুকুস করে একটু খেলে নিতেন কিন্তু ডায়াবিটিক ঠাকুর্দা রাতে বাথরুমে যাবার সময় ‘খুউহু’ করে একটু কাশলেই শীঘ্রপতন হয়ে যেত আদরের নাতি পুপাইয়ের। নাতবৌয়েরও আবার ভোরে ওঠা ছিল। তিনি বিস্কুট না দিলে জেঠশ্বশুরের  আবার পিত্তি পড়বে।

টিভি বলতেও তখন ঐ পল্লীকথা, চিত্রহার, বা সিবাকা গীতমালা। সুপারহিট মুকাবলা আসায় তাও কাজলের ‘ধ্যাড়কে জিয়া/উও কিঁয়ো ভালা’ বা করিশমা কাপুরের বিখ্যাত ‘সেক্সি মুঝে লোগ বোলে’ শোনা গেছিল, বা বড়জোর লিরিল বিজ্ঞাপনে প্রীতি জিন্টা। কিন্তু তাও দাদু-দিদা, বাবা,মা, জেঠু-জেঠিমার সামনে দেখতে হবে।

এবং নব্বইয়ে সুপারহিট ‘মুকাবলা’ দেখা ছিল সত্তরের দশকে রেড বুক পড়ার মতোই নিষিদ্ধ। লিরিলের বিজ্ঞাপণের সময় আবার দাদু তাঁর নাতিকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘অঙ্কে কত পেয়েছ?’ সালমান খানের জামা খোলা নাচ দেখার সময় দিদা তাঁর নাতনীকে, ‘এই মেয়ে, যা তো জল নিয়ে আয়।’

মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে কেবল টিভি এলো। চ্যানেল বেশী, চাহিদাও বেশী। যৌথ পরিবার নিপাত গেলো, বা হাঁড়ি এক থাকলেও টিভি আলাদা হল (মনমোহন সিং কে নোবেল দেওয়া উচিত)। বাঙালির যৌনতা বাঁচল। বোকাবাক্স হয়ে উঠল দক্ষিণমুখী জানালা। ব্রিগেড-বিধুশ্রীর চেনা ছকের মধ্যে বাঙালীর ঘরের ভিতর হঠাৎ চরম সুখ।

ম্যাডোনা, পামেলা অ্যান্ডারসন নামগুলির আগমন ঘটল বাংলায়। সাথে প্রতি মঙ্গলবার টিবি ৬ এবং কেবল অপারেটারের চ্যানেলে শনিবার রাতে পানু (এ’দুটি নিয়ে পরে একদিন লিখব), এফটিভি। ব্যাস, মধ্যবিত্ত বাঙালীকে আর পায় কে!

কেবলায়িত ঝড়ে এলো ‘বেওয়াচ’ – আমেরিকান টিভি সিরিজ। আর বেওয়াচের ‘ফরবিডেন প্যারাডাইস’ সিরিজে সিজে পার্কারের চরিত্রে এলেন পামেলা অ্যান্ডারসন। কেঁপে উঠল বাঙালি। এর আগে ম্যাগাজিনের দোকান থেকে কেনা (দোকানদার ইঞ্জিন গরম হওয়া পুরোনো ম্যাগাজিন দ্বিগুণ দামে দিত) ম্যাগাজিনের কভার ফটোয় বাঙালি দেখেছিল ম্যাডোনাকে। এবং ক্রাশ বা হিট যাই হোক খেয়েছিল। অরুনাভ নামে আমাদের এক ক্লাসমেট তো ঐ ম্যাগাজিন নিয়ে দৌঁড়ে স্কুলের বাথরুমেও চলে যায়। তারপর আর কেউ অবশ্য বইটা হাতে নেয়নি। তবু সে ছিল ছবি – ‘শুধু পটে আঁকা’ না হলেও স্থির।  কিন্তু স্বপ্নসুন্দরীকে জীবন্ত চাই। ফলত বেওয়াচ তাই বাঙালির ‘পরম পাওয়া’।

এক্জ্যাক্টলি পামেলা অ্যান্ডারসনের মধ্যে কি খুঁজে পেয়েছিল বাঙালি? শহরতলির ছোট্ট স্টেশান কেনই বা এত আলোচনা? ব্লন্ড চুল, কটা চোখ, জীবনরসে ভরপুর খোলা হাসির মাদকতা, সপ্রতিভ চাহনি এবং স্বপ্নের ৩৬-২৪-৩৬ ফিগার – বাঙালি শুনেছিল শুধু স্বপ্নেই হয়। সুচিত্রা সেন স্বপ্নসুন্দরী হলেও পৃথুলা। একই কথা খাটে তৎকালীন ভারতের প্রায় সব অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে। আর সোনালী চুলে সূর্য্যের আলো তো ভারতীয়দের মধ্যে কারও নেই। মনে পড়ছে, ‘ব্লন্ড অ্যান্ড ব্লন্ডার’-এ বিকিনি পড়ে ছুটে আসছেন পামেলা, ব্যাকলিটে সোনালী চুলের উপর পড়ছে সূর্য্যের আলো। যেন পুরো টিভি স্ক্রিন ঝলসাচ্ছে।

আর এই মাদকতার জন্যই যখন এইচবিও, স্টার মুভিজ বা লোকাল কেবল চ্যানেলে ‘দ্য টকিং অফ বেভারলি হিলস’, ‘স্ন্যাপ ড্র্যাগন’, ‘ডেজ অফ আওয়ার লাইভস’ দেখানো হয়েছে, চড়চড় করে বেড়েছে চ্যানেলের টি আর পি।

পুঁজিবাদকে চালনা করে বাজার। আর বাজারের ড্রাইভার চাহিদা। তাই চাহিদা বুঝে ধীরে ধীরে পামেলা অ্যান্ডারসনের ছবি/ সিরিজগুলির সাথে হিন্দি-বাংলার ডাবিং শুরু হল। ‘প্লেবয়: সেক্সি লঁজারিস’, ‘নেকেড সোলস’ তো প্রায় সব চ্যানেলেই নিকৃষ্ট মানের ডাবিংয়ের সাথে দেখানো হয়েছে।

১৯৯৫ সালে পামেলা প্রথম বার বিয়ে করেন। পাত্রের নাম মনে নেই – রকস্টারও হতে পারে আবার নাড়ুগোপালও। কিন্তু বিবিসি তে সেই খবর দেখানোর পর বাসে, ট্রামে, চায়ের ঠেকে, ইউরিনালে তাঁকে বাঙালি ডেকেছে ‘সাআলা’ সম্বোধনে। সাদা ওয়েডিং গাউনে ২৭ বছরের পামেলাকে মনে হচ্ছিল অপ্সরী। এখন তিনি ৫৩। এটি তাঁর পঞ্চম বিবাহ। পামেলার পরবর্তী জীবন সুখের হোক।

____________________

নেম শেমিং, বডি শেমিং আশা করি হয়নি। হয়ে থাকলে তা অনিচ্ছাকৃত। এই সিরিজের সব লেখাই আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশক নিয়ে। সেই সময় ও সময়ের স্বপ্নসুন্দরীকে নিয়ে লেখাটাই উদ্দেশ্য।

https://www.mega888cuci.com