সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ: কেমন হল পরমব্রত’র ব্যোমকেশ!

‘সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ’ ছবির পোস্টার মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে অনেককেই ক্রমাগত মন্তব্য করতে দেখেছি, ‘আবার ব্যোমকেশ। আরেকজন ব্যোমকেশ! কেন করছে রে বাবা? অনেক তো দেখলাম!’

ট্রেলার মুক্তি পাওয়ার পর থেকে আবার অনেকে বলে চলেছিলেন, ‘আরে এই ছবি তো সুপার ফ্লপ।’ ট্রেলার দেখে কিছু মানুষ কীভাবে যে ছবির ভবিষ্যৎ নির্ণয় করে দিতে পারেন তা দেখে আমি সত্যি আশ্চর্য হই। যাই হোক আমি কিন্তু শ্রদ্ধেয় পরিচালক সায়ন্তন ঘোষালের আগের থ্রিলার ছায়াছবি ও ওয়েবসিরিজের কাজগুলো দেখেছি। তাই ওনার উপর পূর্ণ আস্থা রেখেই আমি আমার সিনেমা পরিক্রমা এই ছবি দিয়েই শুরু করি।

ছোটবেলায় প্রথম যে উপন্যাসগুলো আমি পড়ে থাকি। না একটু ভুল বললাম, মানে চোখ দিয়ে আনন্দের সাথে যেগুলো ‘গিলে’ থাকি তা হল স্বর্গীয় শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ। তাঁর জন্যই তো ছোটবেলা থেকে থ্রিলারের প্রতি আমার এক অদ্ভূত ভালোবাসা জন্মায়। এই ছবির গল্প ‘মগ্নমৈনাক’ উপন্যাস অবলম্বনে বানানো। তাই ছবির শুরু থেকেই ‘কি’, ‘কেন’ ও ‘কে’ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমার জানা ছিল। এবার এটাই দেখার ছিল যে উপস্থাপনা কেমন হয়!

ব্যোমকেশের চরিত্রে অভিনেতা শ্রী পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় একদম নিজেস্ব স্টাইলে অভিনয় করেছেন। ঠিক যেমন বইতে পড়েছি সেইরকম অভিব্যক্তি। এর আগে যাঁরা ব্যোমকেশের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তাঁদের সাথে কোথাও মিল পেলাম না। তাই ট্রেলার দেখা মানুষদের থেকে নেগেটিভ ফিডব্যাক পাওয়া সত্ত্বেও আমার কিন্তু ভালো লাগতে শুরু করে। ব্যোমকেশের ধূর্ত মিচকে হাসি, চোখের চাউনি মুগ্ধ করে আমায়।

ব্যোমকেশের প্রসঙ্গে কথা বললেই অজিতের প্রসঙ্গে তো কথা বলতেই হয়। অজিতের ভূমিকায় রুদ্রনীল ঘোষ খুব ভালো অভিনয় করেছেন। ‘তিন ইয়ারির কথা’, ‘হাওয়া বদল’, ‘চলো লেটস গো’, ‘কালবেলা’, ‘থানা থেকে আসছি’ এমনকি ‘প্রলয়’ তেও এই জুটির অন স্ক্রিন কেমিস্ট্রি দেখবার মতোই ছিল। ব্যতিক্রম ঘটেনি এই ছবিতেও। অজিত ও ব্যোমকেশের মধ্যে খুনসুটি দর্শক হিসেবে খুব আনন্দ পেয়েছি।

প্রত্যেকের অভিনয় ভালো তবে উদয়ের চরিত্রে শ্রী সুপ্রভাত আলাদা নজর কেড়েছেন। যতবার এই ছবিতে উপস্থিত হয়েছেন বেশ মন জয় করেন। তবে নেংটির চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন তিনি ‘গোত্র’ ছবিতে মনে দাগ কাটলেও এই ছবিতে তেমন পারেননি।

আর হেনা’র চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন তিনি ভবিষ্যতেও আরো সুযোগ পাবেন কারণ এই ছবিতে সত্যি ভালো কাজ করেছেন। অঞ্জন দত্ত রবির ভূমিকায় কখনো গোবেচারা হয়ে টাকার লোভ সামলাতে পারছেন না আবার কখনো শাসাচ্ছেন দুটো আলাদা রকমের অভিব্যক্তি একই দৃশ্যে সত্যি বড় লক্ষনীয়, এক কথায় দারুণ।

ছবির কালারিং বেশ ভালো ১৯৭১-এর প্রেক্ষাপট অনুভব করায় তবে ছবির একদম শেষে ব্যোমকেশের হটেল রুমে ঢোকার দৃশ্যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটি খুব কানে লাগে। মনে হচ্ছিল কোন মর্ডার্ণ মিউজিকের আওয়াজ। অবশ্য ওভারঅল পুরো ছবিতেই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তেমন দাগ কাটে না।

এই ছবিতে কিছু দৃশ্য মনে রাখার মত। প্রথমার্ধে ব্যোমকেশ ও অজিতের কথোপকথনে কে খুন করতে পারে সেই দৃশ্যটা বারবার ভারী চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এমনকি শেষ দিকে হাত থেকে পিস্তল পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটাও ভালো। এমনকি ৭১ সালের প্রপ্সগুলো সঠিক নির্ণয় করেন । ব্যোমকেশ যে বারবার ছদ্মবেশ ধারণ করেন তার মেক-আপ ও বেশ ভালো।

মূল গল্পের বেশ কিছু জায়গায় পরিবর্তন করা হয়। কোথাও তেমন খারাপ লাগে না অবশ্য। শুধু দুটো জায়গায় একটু দৃষ্টিকটু লাগে। এক হল হোটেল রুমে কাঁচের জানলার বাইরে খড়খড়ি দেওয়া জানলা থাকা সত্ত্বেও উদয়ের লুকিয়ে দেখার মতোই ব্যোমকেশের লুকিয়ে দেখানোটা দেখালে ভালো হত।

ওইরকম কাঁচের জানালা থেকে কিন্তু পরিষ্কার রুমের ভেতর থেকেই ব্যোমকেশকে দেখা যাচ্ছিল যদিও উনি ছদ্মবেশে ছিলেন ও দ্বিতীয় হল মাউথওর্গ্যান বাজানো অচেনা অজানা কালো গাড়িটি মন্ত্রীর বাড়ীর একেবারে দরজার সামনে কি করে দাঁড়ায় ? সেক্ষেত্রে কি সিকিউরিটি মন্ত্রীর বাড়ীতে একেবারেই ছিল না ? ওটা বাড়ীর অনেকটা বাইরে রাস্তায় দেখালে আরো ভালো লাগত।

ছবির শেষে ইঙ্গিত পাই যে এই সিরিজের পরবর্তী ছবি আমার অন্যতম প্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে হবে আর এই ‘সত্যান্বেষী-অজিত’ জুটিকে ভালো লেগেছে তাই পরের ব্যোমকেশ সিরিজের ছবি আমি অবশ্যই দেখব আর অন্যদের উদ্দেশ্যে এটুকুই বলব যে যদি ‘ব্যোমকেশ’কে ভালোবেসে এই ছবি দেখতে যান, ঠকবেন না। আমি কথাটা ছবি দেখে বলছি শুধুমাত্র ট্রেলারের ভিত্তিতে নয়।

https://www.mega888cuci.com