ছবির ফ্রেমে রবীন্দ্রনাথের ‘হৈমন্তী’

‘হৈমন্তী’ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প। কৈশোর বা তারুণ্যে এই অনবদ্য সৃষ্টিটা আমরা সবাই কমবেশি পড়েছি। তবে, এবারের আয়োজনটা ভিন্নধর্মী।

আলোকচিত্রের মধ্য দিয়ে গল্পটাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন আলোকচিত্রী নাজমি খান ও আকিব শাহরিয়ার হিমু। তাঁর আয়োজনে মডেল হয়েছেন প্রত্যাশা ও হিমু।

কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না। তিনি দেখিলেন, মেয়েটির বিবাহের বয়স পার হইয়া গেছে, কিন্তু আর কিছুদিন গেলে সেটাকে ভদ্র বা অভদ্র কোন রকমে চাপা দিবার সময়টাও পার হইয়া যাইবে।

বিবাহের অরুণোদয় হইল একখানি ফটোগ্রাফের আভাসে।

কোনো একজন আনাড়ি কারিগরের তোলা ছবি। মা ছিলো না, সুতরাং কেহ তাহার চুল টানিয়া বাঁধিয়া, খোঁপায় জরি জড়াইয়া, সাহা বা মল্লিক কোম্পানির জবরজং জ্যাকেট পরাইয়া, বরপক্ষের চোখ ভুলাইবার জন্য জালিয়াতির চেষ্টা করে নাই। ভারি একখানি সাদাসিধা মুখ, সাদাসিধা দুটি চোখ এবং সাদাসিধা একটি শাড়ি। কিন্তু সমস্তটি লইয়া কি যে মহিমা সে আমি বলিতে পারি না।

পটের ছবিটির উপর আমার মনের সোনার কাঠি লাগিতেই সে আমার জীবনের মধ্যে জাগিয়া উঠিলো। সেই কালো দুটি চোখ আমার সমস্ত ভাবনার মাঝখানে কেমন করিয়া চাহিয়া রহিলো। আর সেই বাঁকা পাড়ের নীচেকার দুখানি খালি পা আমার হৃদয়কে আপন পদ্মাসন করিয়া লইল।

অকালের ঠিক পূর্বলগ্নটাতে আসিয়া আমার বিবাহের দিন ঠেকিলো। সেদিনকার সানাইয়ের প্রত্যেক তানটি যে আমার মনে পরিতেছে। সেদিনকার প্রত্যেক মুহূর্তটি আমি আমার সমস্ত চৈতন্য দিয়া স্পর্শ করিয়াছি। আমার সেই উনিশ বছরের বয়সটি আমার জীবনে অক্ষয় হইয়া থাক।

বিবাহসভায় চারিদিকে হট্টগোল; তাহারই মাঝখানে কন্যার কোমল হাতখানি আমার হাতের উপর পড়িলো। এমন আশ্চর্য আর কি আছে। আমার মন বার বার করিয়া বলিতে লাগিলো, ‘আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম’

কাহাকে পাইলাম?

এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে… সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ।

দেখিলাম, সতেরো বছরের মেয়েটির উপরে যৌবনের সমস্ত আলো আসিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু এখনো কৈশোরের কোল হইতে সে জাগিয়া উঠে নাই। ঠিক যেন শৈলচূড়ার বরফের উপর সকালের আলো ঠিকরিয়া পড়িয়াছে, কিন্তু বরফ এখনো গলিল না।

আমি জানি, কী অকলঙ্ক শুভ্র সে, কি নিবিড় পবিত্র।

আমার মনে একটা ভাবনা ছিলো, লেখাপড়া জানা বড়ো মেয়ে, কি জানি কেমন করিয়া তাহার মন পাইতে হইবে। কিন্তু, অতি অল্প দিনেই দেখিলাম, মনের রাস্তার সঙ্গে বইয়ের দোকানের রাস্তার কোন জায়গায় কোন কাটাকাটি নাই। কবে যে তাহার সাদা মনটির উপরে একটু রঙ ধরিলো, চোখে একটু ঘোর লাগিলো, কবে যে তাহার সমস্ত শরীর মন যেন উৎসুক হইয়া উঠিলো, তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারিবো না।

রাস উপলক্ষে দেশের কুটুম্বরা আমাদের কলিকাতার বাড়িতে আসিয়া জমা হইলেন। কন্যাকে দেখিয়া তাঁহাদের মধ্যে একটা কানাকানি পড়িয়া গেল। কানাকানি ক্রমে অস্ফুট হইতে স্ফুট হইয়া উঠিলো।

দূর সম্পর্কের কোনো-এক দিদিমা বলিয়া উঠিলেন, ‘পোড়া কপাল আমার! নাতবউ যে বয়সে আমাকেও হার মানাইলো’

আর এক দিদিমাশ্রেণীয়া বলিলেন, ‘আমাদেরই যদি হার না মানাইবে তবে অপু বাহির হইতে বউ আনিতে যাইবে কেন।’

আমার মা খুব জোরের সহিত বলিয়া উঠিলেন, ‘ওমা, সে কি কথা। বউমার বয়স সবে এগারো, আসছে ফাল্গুনে বারোয় পা দিবে’

এই লইয়া ঘোর তর্ক, এমন-কি বিবাদ হইয়া গেল। এমন সময় সেখানে হৈম আসিয়া উপস্থিত।

কোনো-এক দিদিমা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘নাতবউ তোমার বয়স কত বলো তো’

মা তাহাকে চোখ টিপিয়া ইশারা করিলেন। হৈম তাহার অর্থ বুঝিলো না;

বলিল, ‘সতেরো’

মা রাগ করিয়া বাবার কাছে তাঁহার বধূর মূঢ়তা এবং ততোধিক একগুঁয়েমির কথা বলিয়া দিলেন। বাবা হৈমকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘আইবড় মেয়ের বয়স সতেরো, এটা কি খুব একটা গৌরবের কথা, তাই ঢাক পিটিয়া বেড়াইতে হইবে? আমাদের এখানে এ-সব চলিবে না, বলিয়া রাখিতেছি।’

হৈম ব্যথিত হইয়া প্রশ্ন করিল, ‘কেহ যদি বয়স জিজ্ঞাসা করে কী বলিব’

বাবা বলিলেন, ‘মিথ্যা বলিবার দরকার নাই, তুমি বলিয়ো, আমি জানি না- আমার শ্বাশুড়ি মা জানেন।’

কেমন করিয়া মিথ্যা বলিতে না হয় সেই উপদেশ শুনিয়া হৈম এমনভাবে চুপ করিয়া রহিলো যে বাবা বুঝিলেন, তাঁহার সদুপদেশটা একেবারে বাজে খরচ হইল।

অন্তঃপুরে হৈমর একটি প্রকৃত ভক্ত ছিল, সে আমার ছোট বোন নারানী। বউদিদিকে ভালোবাসে বলিয়া তাহাকে অনেক গঞ্জনা সহিতে হইয়াছিলো। সংসার যাত্রায় হৈমর সমস্ত অপমানের পালা আমি তাহার কাছেই শুনিতে পাইতাম। এক দিনের জন্যও আমি হৈমর কাছে শুনি না…

নতুন বধূর প্রতি একদিন পূজা সাজাইবার আদেশ হইলো; সে বলিলো, ‘মা, বলিয়া দাও কী করিতে হইবে?’

ইহাতে কাহারও মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িবার কথা নয়। কিন্তু, কেবলমাত্র হৈমকে লজ্জিত করাই এই আদেশের হেতু। সকলেই গালে হাত দিয়া বলিল, ‘ওমা, এ কী কাণ্ড! এ কোন নাস্তিকের ঘরের মেয়ে। এবার এ সংসার হইতে লক্ষী ছাড়িল, আর দেরী নাই!’

এই উপলক্ষে হৈমর বাপের উদ্দেশে যাহ-না-বলিবার তাহা বলা হইল। এই মেয়েটির সকলের চেয়ে দরদের জায়গাটি যে কোথায় তাহা আমাদের সংসার বুঝিয়া লইয়াছিলো।

আমি তাহার হাতখানি ধরিয়া কেবল বলিলাম, ‘হৈম, আমার উপর রাগ করিয়ো না। আমি তোমার সত্যে কখনো আঘাত করিবো না। আমি যে তোমার সত্যের বাঁধনে বাঁধা।’

হৈম কিছু না বলিয়া একটুখানি হাসিল। সে হাসি বিধাতা যাহাকে দিয়াছেন তাহার কোনো কথা বলিবার দরকার নাই।

হৈম তাহার বাপের কাছ হইতে যত চিঠি পাইত সমস্ত আমাকে পড়িতে দিত। চিঠিগুলো ছোট কিন্তু রসে ভরা। সে-ও বাপকে যত চিঠি লিখিত সমস্ত আমাকে দেখাইত। বাপের সঙ্গে তাহার সম্বন্ধটি আমার সঙ্গে ভাগ করিয়া না লইলে তাহার দাম্পত্য যে পূর্ন হইতে পারিত না।

বাড়িতে এখন সকলে বলিতে আরম্ভ করিল, ‘এইবার অপুর মাথা খাওয়া হইল। বি.এ ডিগ্রি শিকায় তোলা রহিলো। ছেলেরই বা দোষ কি।’

সে তো বটেই। দোষ সমস্ত হৈমর। তাহার দোষ যে আমি তাহাকে ভালোবাসি; তাহার দোষ যে বিধাতার এই বিধি, তাই আমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্ত আকাশ আজ বাঁশি বাজাইতেছে।

বিএ ডিগ্রি অকাতরচিত্তে আমি চুলায় দিতে পারিতাম। কিন্তু হৈমর কল্যানে পণ করিলাম, পাস করিবই এবং ভালো করিয়াই পাস করিবো। এ পণ রক্ষা করা আমার সে অবস্থায় যে সম্ভবপর বোধ হইয়াছিল তাহার দুইটা কারন ছিল- এক তো হৈমর ভালোবাসার মধ্যে এমন একটি আকাশের বিস্তার ছিল যে, সংকীর্ণ আসক্তির মধ্যে সে মনকে জড়াইয়া রাখিত না। দ্বিতীয়, পরীক্ষার জন্য যে বইগুলি পড়ার প্রয়োজন তাহা হৈমর সঙ্গে একত্রে মিলিয়া পড়া অসম্ভব ছিলো না।

হৈম যে অন্তরে অন্তরে মুহূর্ত মুহূর্তে মরিতেছিল। তাহাকে আমি সব দিতে পারি কিন্তু মুক্তি দিতে পারি না- তাহা আমার নিজের মধ্যে কোথায়? সেইজন্যই কলিকাতার গলিতে ঐ গরাদের ফাঁক দিয়া নির্বাক আকাশের সঙ্গে তাহার নির্বাক মনের কথা হয়; এবং এক একদিন রাত্রে হঠাৎ জাগিয়া উঠিয়া দেখি সে বিছানায় নাই, হাতের উপর মাথা রাখিয়া আকাশ ভরা তারার দিকে মুখ তুলিয়া ছাতে শুইয়া আছে।

পিতায় কন্যায় আর একবার বিদায়ের ক্ষণ উপস্থিত হইল। এইবারেও দুইজনেরই মুখে হাসি। কন্যা হাসিতে হাসিতেই ভর্তসনা করিয়া বলিল, ‘বাবা, আর যদি কখনো তুমি আমাকে দেখিবার জন্য এমন ছুটাছুটি করিয়া এ বাড়িতে আস তবে আমি ঘরে কপাট দিব।’

বাপ হাসিতে হাসিতেই বলিলেন, ‘ফের যদি আসি তবে সিঁধকাঠি সঙ্গে করিয়াই আসিবো’

ইহার পরে হৈমর মুখে তাহার চিরদিনের সেই স্নিগ্ধ হাসিটুকু আর একদিনের জন্যও দেখি নাই।

তাহারও পরে কী হইল সে কথা আর বলিতে পারিব না।

যেদিন অযোধ্যার লোকেরা সীতাকে বিসর্জন দিবার দাবী করিয়াছিল তাহার মধ্যে আমিও যে ছিলাম।

আর সেই বিসর্জনের গৌরবের কথা যুগে যুগে যাহারা গান করিয়া আসিয়াছে আমিও তাহাদের মধ্যে একজন। আর আমি-ই তো সেদিন লোকরঞ্জনের জন্য স্ত্রীপরিত্যাগের গুণবর্ণনা করিয়া মাসিকপত্রে প্রবন্ধ লিখিয়াছি।

বুকের রক্ত দিয়া আমাকে যে একদিন দ্বিতীয় সীতা বিসর্জনের কাহিনী লিখিতে হইবে, সে কথা কে জানিত?

https://www.mega888cuci.com