ব্যতিক্রমী কণ্ঠের হাসান ও হারিয়ে যাওয়া ‘আর্ক’ ব্যান্ড

সেই ১৯৯৩ সালের কথা। আশিকউজ্জামান টুলু বসে আছেন আর্কের প্র‍্যাকটিস প্যাডে। আগের বছর তাঁদের প্রথম অ্যালবাম ‘মুক্তিযুদ্ধ’ প্রকাশ পেয়েছে। টুলু আগে চাইমে ছিলেন। শুধু ছিলেন বললে ভুল হবে, ‘চাইম’ ব্যান্ডটি প্রতিষ্ঠাও করেছিলেন তিনি। জনপ্রিয়তাও পেয়েছিল ব্যান্ডটি। তবে রক গান তৈরীর মানসে তিনি ১৯৯১ এ চট্টগ্রামে গঠন করেন আর্ক। সুগায়ক মাহমুদুন্নবীর পুত্র রেদওয়ান চৌধুরী পঞ্চম আর্কে লিড গিটারিস্ট ও লিড ভোকাল হিসেবে যোগ দিয়েছেন। প্রথম অ্যালবামের ‘ সেদিনো আকাশে ছিলো চাঁদ’, ‘ হারিকেন-লণ্ঠন’ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। প্রথমটি টুলুরই গাওয়া।

পঞ্চম সেদিন এলেন লম্বা চুলের ফর্সা এক তরুণকে সাথে নিয়ে। বললেন, ‘দ্যাখেন তো, কিছু করা যায় কি না।’ তরুণটি পঞ্চমের বন্ধু। নাম সৈয়দ হাসানুর রহমান। ডাকনাম হাসান। বাড়ি কুষ্টিয়ায়। পল্লীগীতি গায়। কুষ্টিয়ায় শিল্পকলা একাডেমীতে লোকসঙ্গীতে তালিম নিয়েছে। তবে পরিবার খুব ধার্মিক, সঙ্গীতচর্চার সমর্থক নয়।

টুলু হাসানের সাথে পরিচিত হলেন। গাইতে বললেন কোন একটা গান। হাসান একটা পল্লীগীতি গাইলেন। টুলু অবাক হলেন। গাইছে পল্লীগীতি, কিন্তু কণ্ঠে ওয়েস্টার্ন টান। টুলু ভাবছিলেন পাশ্চাত্য কিছু গানের বাংলা রিমেক করবেন। হাসানকে পরখ করে ঠিক করে ফেললেন এই তরুণই হবেন তাঁর অ্যালবামের গায়ক। অ্যালবামের নাম ঠিক হলো ‘কপিয়ার’।

অ্যালবামটি রিলিজ হয় ১৯৯৩ এ-ই। অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা পায় এই অ্যালবাম। বিশেষ করে ‘দস্যি মেয়ে’ গানটি। টুলু ঠিক করেন সিকুয়েল করবেন। পরের বছর হাসান, পঞ্চমকে নিয়ে করেন সিকুয়েল ‘কপিয়ার-২’। এই এলবামটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

এর মাঝেই ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত মিক্সড এলবাম নিয়ে আসেন টুলু। ‘স্টারস’ নামে অ্যালবামটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। তবে হাসান এই অ্যালবামে গান করেননি। আর্কের হয়ে পঞ্চম করেছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালে এই অ্যালবামের সিকুয়েল ‘স্টারস-২’ প্রকাশিত হয়। এখানে টুলুর সঙ্গীতায়োজনে গান করেন হাসান।  ‘ভুলে গেছি কবে এক জোছনা রাতে’ শিরোনামের গানটি হাসান নিজেই লিখেছিলেন। সুর নেয়া হয়েছিল ‘স্টারশিপ’ ব্যান্ডের ‘নাথিঙ গনা স্টপ আস নাও’ থেকে। হাসান গানটি গেয়ে রীতিমত আলোড়ন সৃষ্টি করেন। অ্যালবামে মাকসুদ, আইয়ুব বাচ্চুদের গান থাকলেও হাসানের এই গানটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পায়।

টুলু সিদ্ধান্ত নেন হাসানকে আর্কে লিড ভোকালিস্ট হিসেবে নেবেন। পঞ্চমও সম্মতি দেন। ১৯৯৬ সালে শুরু হয় আর্কের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘তাজমহল’ এর কাজ। অ্যালবামের ‘সুইটি’ গানটি ছিল টুলু-পঞ্চমের দুই বছরকালীন সাধনার ফসল। ১৯৯৬ এর ঈদ উল ফিতরে অ্যালবামটি রিলিজ হয়। অন্যরকম জনপ্রিয়তা পায় অ্যালবামটি। বিশেষ করে ‘সুইটি’, ‘একাকী’, ‘পাগল মন’, ‘গুরু’, ‘তাজমহল’ গানগুলো। বিটিভির আনন্দমেলায় সাদী মোহম্মদ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও পাপিয়া সারোয়ার ‘পাগল মন’ গানটি কভার করেন।

 

১৯৯৮ সালে আসে আর্কের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘জন্মভূমি’। এই এলবামটিও প্রচণ্ড সাফল্য পায়। ‘যারে যা উড়ে যা’, ‘আকাশের নীলে’, ‘বাংলাদেশ’, ‘এত চাই তবুও’ গানগুলো তরুণদের মুখে মুখে ফেরে। সেবছর ফিতরের ঈদে প্রকাশিত মিক্সড অ্যালবাম ‘আনন্দধারা’-য় হাসানের ‘বালুকা বেলায়’ গানটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এ সময়ই মিক্সড অ্যালবাম ‘ধুন’ এ আসে হাসানের বিখ্যাত গান ‘গাঙচিল’।

সোহেল আরমানের কথায়, আর্কের সঙ্গীতে (পঞ্চম) গানটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এই বছর আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে হাসানের সঙ্গীতজীবনে। লাকী আখন্দ ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ অ্যালবাম দিয়ে বছর দশেক পর কামব্যাক করেন। এই অ্যালবামে তাঁর সুর-সঙ্গীতে হাসান দুটি গান করেন। এর মধ্যে ‘এত দূরে যে চলে গেছ’ গানটি খুব জনপ্রিয় হয়। বেশ কঠিন সুরের এই গানটি তিনি অবলীলায় গেয়ে ফেলেছিলেন। এই বছরই আর্কের প্রধান টুলু প্রবাসী হয়ে যান।

২০০০ সালে ‘স্বাধীনতা’ নামে তৃতীয় অ্যালবাম আসে আর্কের। এই অ্যালবামটিও জনপ্রিয়তা পায়। তবে টুলুর প্রবাসজীবনের কারণে আর্কে অতিরিক্ত সদস্য নিতে হতো। তাছাড়া হাসান নিজেও একক ক্যারিয়ারে মনোযোগী হচ্ছিলেন। ফলে আর্ক ব্যাণ্ড হিসেবে সমন্বয় হারাচ্ছিল। এই বছর জুয়েল-বাবু-র ‘মেয়ে’ অ্যালবামে হাসানের ‘একাকী প্রহর’ ( সঙ্গীতে পঞ্চম) গানটি জনপ্রিয়তা পায়। এছাড়া প্রায় সব মিক্সড অ্যালবামেই থাকতে শুরু করে হাসানের গান।

এই ২০০০ সালেই হাসানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁকটি আসে। প্রিন্স মাহমুদ তখন মিক্সড অ্যালবামের মহারাজ। তাঁর সুরে হাসান আগে ‘স্রোত’ অ্যালবামে দুটি গান করেছিলেন। দুটিই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ( যে যায় ফিরে আসেনা ও সে যেন ফেরারি)। তবে এ বছর এলো আরো বড় ধামাকা। প্রকাশ পেলো ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়। ‘ এই একটি গান যে কী পরিমাণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তা বলে বোঝানোর নয়। হাসান পরিণত হলেন সর্বাধিক পারিশ্রমিক প্রাপ্ত গায়কে।

তবে এদিকে আর্কে ব্যান্ডে বেজে উঠেছে ভাঙনের সুর।

চতুর্থ এলবামের কাজ অসমাপ্ত থাকতেই ভেঙে যায় আর্ক। ছয়টি গান নিয়ে জেমসের সাথে যৌথভাবে আর্কের চতুর্থ ও সর্বশেষ অ্যালবাম আসে ‘বৃহস্পতি’ নামে। সেটা ২০০২ সালের কথা। এই অ্যালবামের ‘তোমাকে আজ বারে বারে’, ‘এখনি নামলে আঁধার’ গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়।

হাসান নতুন ব্যান্ড করেন ‘স্বাধীনতা’ নামে। সেখান থেকে সে বছরই আসে এলবাম ‘কারবালা’। পেপসি অ্যালবামটি স্পন্সর করে। অ্যালবামের ‘কারবালা’, ‘সূর্য ছুঁয়ে’ গানগুলো জনপ্রিয়তা পায়। তবে ব্যান্ডটি দ্রুতই ভেঙে যায়। হাসান পরবর্তীতে ‘জন্মভূমি’ নামে একটি আরেকটি ব্যান্ড করেন। সেটিও ভেঙে যায়।

হাসান তখন একক ক্যারিয়ারের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। ২০০০ সালের দিকে প্রিন্স মাহমুদের সঙ্গীতে প্রথম একক অ্যালবাম ‘তাল’ প্রকাশ করেন। ২০০২ এ আইয়ুব বাচ্চু ও জেমসের সাথে প্রিন্স মাহমুদের মিক্সড অ্যালবাম ‘নীরবতা’য় গান করেন। হাসান তখন পরিণত হয়েছেন ব্র‍্যান্ডে। তিনি যা-ই গান না কেন, তা হিট হবেই হবে।

ফলে নতুন আগত বিভিন্ন সঙ্গীত পরিচালকেরা তাঁকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। ফলে জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে পেলেও তাঁর গানের লিরিক্যাল ভ্যালু কমতে থাকে। যেমন- অযুত লক্ষ নিযুত কোটি বা লাল বন্ধু নীল বন্ধুর মত গানগুলো।

২০০৪ সালে হাসানের একক অ্যালবাম ‘তিন সত্য’ প্রকাশ পায়। এই অ্যালবামের ‘অযুত লক্ষ নিযুত কোটি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। অ্যালবামটির কথায় ও সুরে ছিলেন আরমান খান।

হাসান এভাবে বিভিন্ন ব্যান্ড মিক্সডে গেয়ে চলছিলেন। তবে আর্কের ভক্তরা মিস করছিল টুলু-পঞ্চম-হাসানের জুটি। পাশাপাশি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় হাসানকে নিয়ে নানারকম গুজব রটনা হতে থাকে। হাসান নাকি মাদকাসক্ত, উনি নেশা করেন- এমন অনেক কথা। আবার আর্ক ভেঙে যাবার পেছনে কেউ কেউ দায়ী করেন শীর্ষ এক ব্যান্ড তারকার চক্রান্তকে!

তবে এসব গুজবের কোন প্রমাণ মেলেনি। টুলু নিজেও এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা উড়িয়ে দেন। উনি বলেছিলেন, ‘হাসান আমার কাছে সন্তানের মত। ও অত্যন্ত সহজ-সরল ছেলে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত, কোন নেশা বা এসব কিছুই করতো না। ও আসলে মিডিয়ায় পলিটিক্সের স্বীকার।’

২০০৭ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে ধস নামে। হাসানও চলে যান অন্তরালে। শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে আবার আর্কে ফেরার ঘোষণা দেন তিনি। সে সময় বাংলাভিশনে ‘আমার আমি’ অনুষ্ঠানে টুলুসহ উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন, ‘টুলু ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। তবে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, দলকেন্দ্রিক।’ হাসান ২০০২ সালে বিয়ে করেন। ব্যক্তিজীবনে এক কন্যার পিতা তিনি।

হাসান বর্তমানে আবার কাজ করছেন আর্কের সাথে। টুলু বা পঞ্চম আর্কে নেই, তবে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাঁকে। বর্তমানে আর্ক সম্পূর্ণ নতুন লাইন-আপ নিয়ে এসেছে। গত কয়েক বছর ধরেই তাঁরা নতুন অ্যালবাম প্রকাশের কথা বলছেন। তবে অডিও বাজারের মন্দার কারণে তা হয়ে ওঠেনি।

তবে ভক্তদের প্রত্যাশা, আবারো ফিরবেন হাসান তাঁর ব্যতিক্রমী অনবদ্য কণ্ঠ নিয়ে। আবারো সুইটি, গাঙচিল, একাকী, পাহাড়ের চূড়ায়, প্রশ্ন, অভিমানে নয়, ভুলে গেছি কবে, এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়- এর মত কালজয়ী সব গান পাবো আমরা। হয়তো হারিয়ে যাওয়া হাসানের ডানায় ভর করে হারিয়ে যাওয়া আর্কও ফরে আসবে!

https://www.mega888cuci.com