অন্যকে ছোট করার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছি আমরা

এক মেয়ে বোধকরি ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। সে মনে হয় বিদেশে পড়াশুনা করেছে। তো, এই উপলক্ষে মেয়েটার বাবা-মা বোধকরি একটা পার্টির আয়োজন করেছে। কেক কেটে উদযাপন করছে, এই ধরনের একটা ভিডিও বোধকরি তারা আপলোড করেছে।

তো এই দৃশ্য আমাদের ভালো লাগবে কেন?

আমরা বাংলাদেশি ফেসবুকাররা ঝাপিয়ে পড়লাম মেয়েটার ফেসবুক পেইজে। শুধু তাই না, এই নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে দেখছি মানুষজন নানান সব বাজে মন্তব্য করে বেড়াচ্ছে ফেসবুকে।

মেয়েটার ফেইসবুকে গিয়ে যা-ইচ্ছে তাই মন্তব্য করছে!

একটা মেয়ে ইউনিভার্সিটি’র পড়াশোনা শেষ করেছে। তাদের সামর্থ্য আছে, তারা পার্টি করছে, কেক কাটছে, আনন্দ করে বেড়াচ্ছে এবং সেটার ভিডিও করে ফেইসবুকে আপলোড দিচ্ছে; এতে আপনার সমস্যাটা কোথায়?

গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার জন্য তাহলে আনন্দ উৎসব করা যাবে না- আপনারা কি এটাই বলতে চাইছেন?

আপনাদের কি জানা আছে, বিদেশে যারা স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে, তারা কি পরিমাণ আনন্দ করে?

এরা রাস্তায় বের হয়ে এসে ব্যান্ড বাজায়, গাড়িতে হর্ন দিয়ে হই-হুল্লোর করে বেড়ায়।

ইউনিভার্সিটিতে গ্র্যাজুয়েশন শেষেও এরা অনেক আনন্দ করে।

এইতো এই জুনে পর্তুগাল থেকে আসা আমার ছাত্র-ছাত্রীরা ওদের ব্যাচেলর থিসিস এখানে ডিফেন্ড করে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। থিসিসে পাশ করেছে জানার পর ওদের আনন্দ আর দেখে কে!

ওরা এরপর সিদ্ধান্ত নিয়েছে – পুরো রাত তারা আনন্দ করবে; এর আগে ওরা কেক কাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আমাকে অনুরোধ করেছে – আমি যেন গিয়ে অন্তত কেকটা কেটে দিয়ে আসি।

আমি ওদের পার্টিতে নিজে গিয়ে কেক কেটে এসছি।

দীর্ঘ দিন কষ্ট করে, সংগ্রাম করে ওরা ইউনিভার্সিটির একটা ডিগ্রী নিয়েছে। আনন্দ তো করতেই পারে।

তাছাড়া নির্মল আনন্দ তো যে কোন একটা ছুতো ধরেই করা যেতে পারে। এতে সমস্যাটা কোথায়?

দেশে তো মুসলমানি দেয়া উপলক্ষে বিশাল আয়োজনের একটা ব্যাপার চালু ছিল। বোধকরি এখনও আছে অনেকের মাঝে।

শরীরের একটা অংশ কেটে ফেলে দিয়ে যদি আমরা আনন্দ করতে পারি, তাহলে মেয়েটা গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে পার্টি করলে আপনাদের বাঁধছে কেন?

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করা আমার বন্ধু তালিকার অনেককে দেখলাম- এই নিয়ে হাসাহাসি করছে।

মানুষকে ছোট করে বোধকরি আমরা এক ধরনের তৃপ্তি পাই।

এইতো সপ্তাহ দুয়েক আগে, আমি এখানকার এক সমুদ্র সৈকতে গেলাম গ্রিল পার্টি করতে। সেখানে আমি হাফ প্যান্ট পরে গিয়েছিলাম। সেই ভিডিও ফেসবুকে দেখে অনেকেই মন্তব্য করেছেন –

– ছি!, আপনি হাফ প্যান্ট পরে বাইরে ঘুরে বেড়ান!

এদের মন্তব্য পড়ে আমার চোখ কপালে উঠার জোগাড়। ভাব খানা এমন, হাফ প্যান্ট মনে হয় পরাই যাবে না। অথচ এই সব দেশে গ্রীষ্মে কিংবা সামারে ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা ক্লাস পর্যন্ত নেয় হাফ প্যান্ট পরে।

এইতো সেদিন আমার এখানকার কিছু ছাত্রের বাসায় গেলাম। ওরা অনেক দিন ধরে যেতে বলছিল। আমারই সময় হচ্ছিলো না, কাল গেলাম। সেখানে বসে আমরা গান-বাজনা করছি; ছাত্র-ছাত্রীরা গাইছে, আমি বাজাচ্ছি। ওই ভিডিও দেখে, এক অতি শিক্ষিত ভদ্রলোক আমাকে মেসেজ করে জানিয়েছেন

– ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে এতো ক্লোজ হবার কোন দরকার নেই। এটা আপনার সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে যায় না!

কি অবাক কাণ্ড! এখানে আমরা আছিই কয়েকজন বাংলাদেশি। এখন এখানেও আমাকে দেখতে হবে- কার সামাজিক অবস্থান কেমন?

আর যেই সামাজিক অবস্থান অন্যদের ছোট করতে শেখায়, সেই সামাজিক অবস্থানের দরকারটা কি?

প্রতিটা মুহূর্তে, আসলে সব সময়ই আমার মনে হয় – আমরা প্রতিটা বাংলাদেশি অন্যকে ছোট করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়েই জন্মেছি।

https://www.mega888cuci.com