ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেননি, দেশের জন্য শহীদ হয়েছিলেন

‘আমাদের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশাররফ কী বলেন, জান?’ শফি ইমাম রুমী বলেন, “কোনো স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না; চায় রক্তাক্ত শহীদ।” অতএব মামনি, আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাব, এই কথা ভেবে মনকে তৈরি করেই এসেছি।’

প্রিয় সন্তানকে যেতে দিতে মন চাইছিল না মা জাহানারা ইমামের। কিন্তু সন্তানের প্রবল দেশপ্রেমের কাছে নতি স্বীকার করতে হলো তাঁকে। জননী জাহানারা ইমাম বাধ্য হয়ে সন্তানকে বললেন, ‘যাহ, তোকে দেশের জন্য কুরবানি করে দিলাম।’

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম তাঁর একাত্তরের দিনগুলি গ্রন্থের এক জায়গায় বলেন – ‘স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান বিতার্কিক রুমীর সাথে তর্কে পারবো, সে শক্তি কী আমার আছে?’

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ের সন্ধিক্ষণে যাঁর জন্ম, একাত্তরের নিবিড় প্রশান্তিতে তাঁর চলে যাওয়া। মাঝখানে দৃপ্ত জীবনের এক অনিমেষ অধ্যায়। আদমজী স্কুল এন্ড কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন তিনি। তারপর ভর্তি হন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (বর্তমান বুয়েট)। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থাতেও তিনি বিশেষ অনুমতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ক্লাশ করেন। ফলে সে-ই সময়ের উত্তাল পরিস্থিতি তাঁকেও স্পর্শ করে এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের জন্য তিনিও তৈরি করতে থাকেন নিজেকে। আর সে কারণেই ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পড়ার সুযোগ পেয়েও যুদ্ধ শুরু হবার দরুণ সে সুযোগটি তিনি গ্রহণ করেননি।

একাত্তরের জন্য রুমীর প্রথম প্রয়াস ছিলো ২ মে সীমান্ত অতিক্রম। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাঁকে ফেরত আসতে হয় তবে দ্বিতীয় প্রচেষ্টাটি ছিলো একেবারে সফল। তিনি সেক্টর-২ এর অধীনে মেলাঘরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সেক্টরটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন খালেদ মোশাররফ ও রশিদ হায়দার। প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি ঢাকায় ফেরত আসেন এবং ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দেন।

ক্র্যাক প্লাটুন হলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ পরিচালনাকারী একটি সংগঠন। রুমী ও তার দলের ঢাকায় আসার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন হামলা করা। এ সময় তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয় যার মধ্যে ধানমণ্ডি রোডের একটি আক্রমণ ছিলো উল্লেখযোগ্য।

১৯৭১ সালের ২৫ আগস্ট, যেদিন রুমীসহ আরও পাঁচজন গেরিলা সদস্যের একটি গ্রুপ ধানমন্ডির ১৮ ও ৫ নম্বর রোডে দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশন চালান। গ্রুপের সদস্যরা ছিলেন হাবিবুল আলম বীর প্রতীক, বদিউল আলম (শহীদ) বীর বিক্রম, মরহুম কাজী কামালউদ্দিন বীর বিক্রম, কামরুল হক স্বপন বীর বিক্রম, রুমী (শহীদ) বীর বিক্রম, সেলিম আকবর বীর প্রতীক। এ অপারেশনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।

অপারেশনের একপর্যায়ে পলায়নকালে পাকিস্তানি আর্মিদের একটি জিপ তাদের গাড়ি অনুসরণ করলে রুমী তার স্টেনগানের বাঁট দিয়ে পেছনের কাচ ভেঙে প্রথমে এবং তার দুই পাশ থেকে বদি ও স্বপন ফায়ার করা শুরু করলে চালক গুলিবিদ্ধ হয়। ফলে জিপটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। রুমীর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কারণে সেদিন সব গেরিলা যোদ্ধার জীবন রক্ষা পায়।

ধানমণ্ডি রোডের অপারেশনের পর রুমী তার সহকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তাঁর নিজের বাড়িতে কাটান, এবং এই রাতেই বেশকিছু গেরিলা যোদ্ধার সাথে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে বেশ কিছু সংখ্যক যোদ্ধাকে গ্রেফতার করে যার মধ্যে ছিলেন বদি, চুন্নু, আজাদ ও জুয়েল (ক্রিকেটার শহীদ জুয়েল, যার নামে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে আছে শহীদ জুয়েল স্ট্যান্ড)।

রুমীর সাথে তাঁর বাবা শরীফ ও ভাই জামীকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সুরকার আলতাফ মাহমুদও গ্রেফতার হন। জিজ্ঞাসাবাদের স্থানে রুমীকে ভাই ও বাবাসহ একঘরে আনলে রুমী সবাইকে তাঁদেরকে তাঁর সাথে যুদ্ধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করতে বলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, পাক বাহিনী তাঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন এবং এর সব দায়দায়িত্ব তিনি নিজেই নিতে চান।

অনিবার্য পরিণতি অনুধাবন করে ধরা না পড়া অন্য সহযোদ্ধাদের জীবন রক্ষার জন্য সহ্য করে যায় অমানুষিক নির্যাতন। একই সময়ে ধরা পড়া রুমীর সহযোদ্ধা মাসুদ সাদেক জানান, চরম অত্যাচার সহ্য করেও রুমী কারও নাম প্রকাশ করেনি। দুই দিন ধরে অমানুষিক নির্যাতন চালানোর পর পরিবারের অন্য সদস্যদের ছেড়ে দেওয়া হলেও রুমীকে ছাড়া হয়নি। ফিরে আসার সময় বাবা শরীফ ইমাম রুমীর কথা জিজ্ঞেস করলে পাকিস্তানি একজন কর্নেল জানায়, রুমী যাবে এক দিন পরে, ওর জবানবন্দি নেওয়া শেষ হয়নি। পরের সেই দিনটি আর আসেনি।

১৯৭১ সালের সালের ৩০ আগস্টের পর সহযোদ্ধাদের সাথে রুমীর সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয় যায়। তাঁর সহযোদ্ধাদের বিভিন্ন লেখায় জানা যায়- ত্রিশ আগস্টের পর আর তাঁরা রুমীর দেখা পাননি।

বাবা শরীফুল আলম ইমামের সাথে

রুমী শৈশব থেকেই ছিলেন ভীষণ মেধাবী। বয়সের তুলনায় তাঁর মানসিক বিকাশ ছিল একটু বেশি। এই ধরনের মানসিক অবস্থাকে বলা হয় ‘মেন্টালি অ্যাডভান্সড চাইল্ড’। তিনি বেড়ে ওঠেন সেই সময়ের স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত একটি পরিবেশে। উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর মা ছিলেন তখনকার একজন খ্যাতিমান স্কুলশিক্ষিকা, পরবর্তীতে একাত্তরের দিনগুলি বইয়ের লেখিকা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।

আজিমপুরের কিন্ডারগার্টেন স্কুল দিয়ে শুরু হয় রুমীর লেখাপড়া। ১৯৬৮ সালে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসির পাঠ শেষ করেন। লেখাপড়ায় ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ভীষণ মেধাবী। পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ড থেকে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন।

গান, কবিতা আবৃত্তি, বই পড়া ছিল তাঁর পছন্দের কাজ। শিশু থেকে কিশোর বয়সেই তিনি পড়ে ফেলেন চে গুয়েভারা, নেলসন ম্যান্ডেলা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিভিন্ন বিখ্যাত বই। মা জাহানারা ইমাম তাঁকে একটি বুকসেলফ কিনে দিয়েছিলেন, বই জমানোর জন্য। রুমী ছিলেন বইয়ের পোকা। পুরো বুকসেলফকে তাঁর লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলেন। নামীদামি বইয়ের স্পর্শে তাঁর মেধা হয়ে ওঠে আগুনের পরশমনি। তিনি জুডো-কারাত খেলাতেও ছিলেন ভীষণ পারদর্শী। ‘ব্রাউন বেল্ট’ হোল্ডার ছিলেন।

পরিবারের সাথে রুমী (সর্বডানে)

রুমী ‘ইউনিভার্সিটি অফিসার্স ট্রেনিং কোর’-এ তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে যোগ দেন। এবং মেধার সঙ্গে সার্জেন্ট পদে পদোন্নতি পান। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের এক বিরল প্রতিভা। ব্যবহার আর মনমানসিকতায় তিনি জয় করে ফেলেছিলেন সবার মন।

প্রকৌশলী বাবার মতো তিনিও চাইতেন বিখ্যাত প্রকৌশলী হতে। আমেরিকার বিখ্যাত ইলিনয়স ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে চান্স পান। কিন্তু সেখানে আর পড়তে যাওয়া হয়নি। নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। আমেরিকার শিকাগোতে পড়তে যাওয়ার পরিবর্তে রুমী তাই চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধে। ভীষণ আদর-যত্নে বড় হওয়া রুমী অর্ধাহারে-অনাহারে, বনেজঙ্গলে, ধুলাবালি কাদামাটি মেখে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিলেন। প্রযুক্তিবিদ্যাকে গ্রহণের পরির্বতে আলিঙ্গন করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্রকে।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ দেখে যাবার সৌভাগ্য রুমীর হয়নি।

১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ এক চিকিৎসক তাঁর তত্ত্বাবধানে সদ্য ভূমিষ্ঠ এক শিশু সম্পর্কে তার মাকে বলেছিলেন, ‘এটা ১৯৫১ সাল। ২০ বছর পরে ১৯৭১ সালে এই ছেলে ইঞ্জিনিয়ার হবে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জাহানারা ইমাম রুমীর জীবনীগ্রন্থ লেখার কাজ শুরু করেন। শুরুতেই ১৯৫১ সালে সদ্য ভূমিষ্ঠ রুমীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ডাক্তারের মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে লেখেন—রুমী ১৯৭১ সালে ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেনি, তবে কিছু একটা হয়েছিল। তিনি দেশের জন্য শহীদ হয়েছিলেন।

আজ ২৯ মার্চ, শহীদ শাফী ইমাম রুমী (বীর বীক্রম)-এর ৬৭ তম জন্মদিন। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই এই অকুতভয় তরুণকে, মাত্র ২০ বছরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারে প্রাণ হারিয়েছিলেন যিনি।

রণাঙ্গন থেকে শহীদ রুমীর লেখা একটি চিঠি নীচে দিলাম (এটি ‘একাত্তরের চিঠি’ বইয়ে পাওয়া যাবে)। চিঠিটি লিখেছিলেন তার মামা সৈয়দ মোস্তফা কামাল পাশাকে।

Agartala, June 16, ‘71

Dearest Pasha Mama,

Don’t be surprised! It was written and has come to pass. And after you read this letter, destroy it. Don’t try to write to Amma about this letter. It will put them in danger.

This is a hurried letter. I don’t have much time. I have to leave tomorrow for my base camp.

We are fighting a just war. We shall win. Pray for us all. I don’t know what to write.. ..there is so much to write about. But every tale of atrocity you hear, every picture of terrible destruction that you see is true. They have torn into us with a savagery unparalleled in human history. And sure as Newton was right, so shall we too tear into them with like ferocity. Already our war is far advanced. When the monsoons come we shall intensify our operation.

I don’t know when I shall write again. Please don’t write to me.

And do your best for SHONAR BANGLA.

Bye for now.

With love and regards.

Rumi.

ছবি সৌজন্যে: সাইফ ইমাম জামী (শহীদ রুমী ভাইয়ের ছোটভাই)

https://www.mega888cuci.com