চেনা ঢাকা গেটের অচেনা অধ্যায়

বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস পরখ করলে দেখা যাবে এই বাংলার মাটি সমৃদ্ধ হয়েছে যুগে যুগে বিভিন্ন জাতি প্রজাতির মিলনে। বছরের পর বছর বাংলার মাটিতে শাসন করে যাওয়া বিদেশি শাসকদের এই বাংলা উদার মনে কাছে টেনে নিয়েছে। বিদেশি শাসন ব্যবস্থা একদিকে বাংলাকে করেছে রক্তাক্ত অপরদিকে এই বিদেশি শাসকদের কল্যাণে বাংলা হয়েছে সমৃদ্ধ।

সেই আর্যজাতি থেকে শুরু করে ব্রিটিশদের কোম্পানি শাসন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলা নিজেকে করেছে উন্নত। শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি, স্থাপত্য, জীবনযাত্রা সবকিছুতেই দিনে দিনে এসেছে পরিবর্তন। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা তার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলীততে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। স্থানীয় স্থাপত্যকর্ম আরো উন্নত হয়েছে বাংলায় আগত বিভিন্ন জাতির সংস্পর্শে।

মূলত, মোঘল এবং ব্রিটিশ স্থাপত্যকলার অজস্র নিদর্শন আমাদের এই ধারনাকে আরো শক্ত ভিত প্রদান করে। মোঘল এবং ব্রিটিশ আমলের এমন অনেক অসাধারণ সুন্দর কিছু স্থাপনা আমাদের ঢাকা শহরকে আজও আলঙ্কারিক মাধুর্য্যে আঁকড়ে রেখেছে। তেমনি এক অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপনা সাজিয়ে তোলা হয়েছে আমাদের আজকের আয়োজন

ঢাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দোয়েল চত্বরের দিকে হাটা শুরু করলে হঠাৎ চোখ আটকে যাবে হলুদাভ একটি স্থাপনা দেখে। অজত্নে, অবহেলায় স্থাপনার উজ্জ্বলতা এখন অনেকটাই ফিকে। একসময়ের মোঘল স্থাপত্যের অসাধারণ সৌন্দর্য এখন বিজ্ঞাপনী পোস্টারের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে।

বলছি, ঢাকা গেটের কথা।

মোঘল আমলের তখন আওরঙ্গজেবের শাসন। আওরঙ্গজেব বাংলার সুবেদার করে পাঠান মীর জুমলাকে, যিনি ছিলেন একজন ইরানি তৈল ব্যবসায়ীর ছেলে। বাংলার সুবেদার হওয়ার পরে তিনি এই গেইট নির্মাণ করেন।তৎকালীন বাংলার রাজধানী ঢাকা প্রায়ই বহিরাগত দস্যু দ্বারা আক্রান্ত হত বলে ১৬৬৩সালে বাংলার তৎকালীন সুবেদার মীর জুমলা,মূলত মগ দস্যুদের থেকে ঢাকাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ঢাকার উত্তরদিকে এই গেইট নির্মাণ করেন।এই গেইট লোকমুখে মীর জুমলা গেইট, ময়মনসিংহ গেইট,রমনা গেইট প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিলো।

গেটটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত। দু’টি দেয়াল এবং একটি স্তম্ভ নিয়ে গঠিত এই গেইট আজও ঢাকার ৪০০ বছরের পুরোনো ইতিহাসকে প্রতিনিধিত্ব করে। কেন্দ্রীয় স্তম্ভটি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ইঞ্চি ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট। যার ওপরে রয়েছে কারুকাজ করা চারকোনা বিশিষ্ট একটি কার্নিশ বা শেড। পশ্চিম পাশের বড় স্তম্ভের পাশেই রয়েছে অপেক্ষাকৃত ছোট আরেকটি স্তম্ভ। যার মাঝে টানা অবস্থায় রয়েছে একটি দেওয়াল।

উঁচু থেকে নিচুতে নামা এ দেয়ালটি প্রায় ২০ ইঞ্চি চওড়া। এ গেটের তিনটি অংশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণা কেন্দ্রের দিকে, মাঝখানের অংশ পড়েছে সড়ক বিভাজকের দিকে এবং অপর অংশটি রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তিন নেতার মাজারের পাশে। ধারণা করা হয়, তৎকালীন সময়ে বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে ঢাকায় প্রবেশের জন্য এই গেইট ব্যবহার করা হত।

সেই সময় মীর জুমলা গেইট-সংলগ্ন এলাকায় একটি অনিন্দ্য সুন্দর বাগান গড়ে তোলেন, যার নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহী বা সম্রাটের বাগান। ব্রিটিশ আমলে এই বাগানটিকে ঘোড়দৌড় জন্য ব্যবহার করা হত।যেখান থেকে এই বাগানের নাম হয় রেসকোর্স ময়দান। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেই বাগানের নাম আরো একদফা পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যেন নাম দেওয়া হয়। যা বর্তমানে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অন্যতম জনপ্রিয় পার্ক।

মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ঢাকা এর আগের জৌলুশ হারাতে থাকে। কলকাতা কেন্দ্রিক ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থা উজ্জ্বল ঢাকার আলোকে অনেকাংশেই ফিঁকে করে দেয়। অন্যান্য অনেক মোঘল স্থাপনার ন্যায় ঢাকা গেইটও হয়ে উঠে জৌলুশবিহিন। সংস্কারের অভাব, অবহেলা, অযত্নে স্থাপনাটি হয়ে পরে জীর্ণ।

ব্রিটিশ শাসনামলে, তৎকালীন বাংলার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস স্থাপনাটিকে ব্রিটিশ স্থাপত্যকলা অনুসারে পুনরায় নির্মিত করেন। যার ফলে স্থাপনাটি মোঘল শাসনামলের হলেও এর স্থাপত্যধারা ইউরোপীয় স্থাপত্যধারাকে প্রতিনিধিত্ব করে। স্থাপনার দেওয়ালে কার্নিস আকৃতির ডিজাইন এবং কেন্দ্রীয় স্তম্ভের গোলকার আলংকারিক কাঠামো ইউরোপীয় স্থাপত্যধারার এক অনবদ্য উদাহারণ।

পার্টিশন তথা দেশ ভাগের পরে পাকিস্তান সরকার এই স্থাপনার আরো সংস্কার করে। ১৯৫০ সাল নাগাদ এই স্থাপনা সংলগ্ন এলাকাতে রাস্তাঘাট এবং বসতবাড়ি গড়ে উঠে যার ফলে সেই সময় স্থাপনাটি আরেক দফা সংস্কার করা হয়।

শিল্পীর তুলিতে আঁকা

ঢাকার যে কয়টি নিদর্শন ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস তার মধ্যে মোগল আমলের ঢাকা গেট অন্যতম। ঢাকা গেইট তৎকালীন ঢাকার অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক, সামাজিকসহ অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এবং গুরুত্ববহ এই স্থাপনার সংরক্ষনে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

ইতোমধ্যে অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনাটির চুন সুরকির আস্তরন ঝরে গিয়ে এর কংকালসার রুপ বেড়িয়ে এসেছে অনেক জায়গায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত হলেও স্থাপনাটি সংরক্ষনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তেমন কোন সচেতন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থাপনাটিকে ‘হেরিটেজ সাইট’ ঘোষনা করেই তাদের দায় সেরেছে।

এমনকি স্থাপনাটির উপর দিয়ে মেট্রোরেলের প্রকল্প চলমান থাকলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন করেনি।অযত্নে, অবহেলায় ঐতিহ্যবাহী এবং গুরুত্ববহ এই স্থাপনাটি যাতে হারিয়ে না যায় সেই ব্যপারে সরকারের সজাগ দৃষ্টি দেয়া উচিত। সেই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় সাধন এবংজনগনের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই জাতীয় স্থাপনা রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত।

https://www.mega888cuci.com