আঞ্চলিক ভাষা কি হারিয়েই যাবে?

১.

একুশ আসলেই ভাষা নিয়ে কথা হয়, বাংলা ভাষা নিয়ে কথা হয়। ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য অনেক ধরণের আয়োজনও হয়। একই সাথে বাংলা ভাষার ব্যাবহারের ব্যাপারটি নিয়েও কথা উঠে। আমরা কি সত্যি বাংলাকে সঠিকভাবে ব্যাবহার করছি? কিংবা বাংলা বলতে গিয়ে বিকৃত করছি কিনা? বা হিন্দি ইংরেজির সাথে মিলিয়ে ফেলছি কিনা – এসব নিয়ে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতেই কথা হয়।

আমার মনে হয়, বর্তমান সামাজিক এবং শিক্ষাব্যাবস্থার প্রভাবে আমাদের প্রতিনিয়ত ইংরেজি ভাষার সাথে বাংলা মিশিয়ে বলতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি অনেক আগে থেকেই। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও যেমন এ ব্যাপারটাকে এড়াতে পারেননা তেমনি একজন সাধারণ মানুষও তাই। একটা সময় ইংরেজিতে কথা বলতে পারাটাই একজন শিক্ষিত ব্যাক্তির পরিচায়ক হিসেবে গণ্য হতো বা এখনো হয়।

তাই আমাদের ভাষাতে ইংরেজির প্রভাব আছে এবং থাকবে। তবে অবশ্যই এটা বলার সুযোগ নেই যে ইংরেজি শব্দ ছাড়া একেবারে কথা বলাই যাবেনা। ব্যাতিক্রম অবশ্যই আছে – তবে আপনাকে বড় অংশ কোনটাতে অভ্যস্ত সেদিকে তাকাতে হবে।

এটা গেল বাংলা এবং ইংরেজি মিশ্রিত বাংলার কথা। আমাদের ভাষার উপর হিন্দি ভাষার যথেষ্ট প্রভাবও লক্ষণীয়। ভারতীয় চলচ্চিত্র এবং ধারাবাহিক নাটক (সহজ ভাষায় ‘সিরিয়াল’ বলে মানুষ) আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তার পিছনে বিভিন্ন কারণ আছে তবে এর ফলে আমাদের মধ্যে কথাচ্ছলে একটা দুইটা হিন্দি শব্দ ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি হয়েছে অনেক আগে থেকেই। এটাকে আমরা অপছন্দ করতে পারি, বাংলা ভাষা ধ্বংস হয়ে যাবার আশংকায় আর্তনাদ করতে পারি, কিন্তু বিশ্বায়ন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাজের মানের কাছে আমরা এখানে হার মেনে নিচ্ছি মনের অজান্তে।

আমি সমাজ বিজ্ঞানী না, কিন্তু আমার সাধারণ ধারণা বলে যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজির প্রভাব, আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের উপর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব এবং বিশ্বায়নের ফলে আমরা বাংলার সাথে প্রায় সময়ই ইংরেজি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে হিন্দি ভাষা প্রয়োগকে এড়াতে পারছিনা। এটা হয়ত যেকোন ভাষাভাষী মানুষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, যদিও সেটা গবেষণা লব্ধ ব্যাপার।

২.

এবার একটু ভিন্ন আলোচনায় আসি, এটাই মূল আলোচনা ছিল যদিও।

আমার বাড়ি চট্টগ্রাম এবং ছোটবেলা থেকে আমি আমার মায়ের ভাষাতেই কথা বলে বড় হয়েছি। স্কুলের বন্ধু তৈরি করেছি। আমার মায়ের ভাষা আমার আঞ্চলিক ভাষা। চট্টগ্রামের মতো প্রতিটা অঞ্চলেই যার যার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা আছে। আমি প্রথম যখন ‘অ’ লিখেছি তখন আমি আমার আঞ্চলিক ভাষায় আমার মনের ভাব প্রকাশ করা শিখে গিয়েছিলাম।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সবাই একই এলাকার থাকায় বন্ধুদের সাথেও কখনো “শুদ্ধ বাংলা” ভাষায় কথা বলার প্রয়োজন হয়নাই। উচ্চ বিদ্যালয়ে উঠার পরই মূলত অন্য অঞ্চলের বন্ধু বান্ধবের সাথে পরিচয় হতে থাকে এবং সেই সাথে শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলার প্রয়োজন অনুভব হয় এবং ধীরে ধীরে সেটার প্রয়োগ বাড়তে থাকে। কিন্তু এরপর এত বছর কথা বলার পরও আমার ভাষায় আমার সেই আঞ্চলিক ভাষার টানটা রয়ে গেছে। আমার কথা বলার সুর বা ধরণ দেখে পাশের লোক বলে দিতে পারে আমার বাড়ি বোধয় চট্টগ্রাম।

আমি ঢাকায় থাকা শুরু করেছি ২০১৬ এর জুন মাস থেকে। জীবনের প্রায় সাতাশ বছরই থেকেছি চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের মানুষ শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বললেও সেখানে উচ্চারণ এবং টান গত কিছু ভঙ্গি থাকে এবং আমরা সেটাতেই অভ্যস্ত। ঢাকায় কোন ভীড়ের মাঝে হাটতেও বুঝে ফেলি আমার পাশে একজন চট্টগ্রামের মানুষ কথা বলছে। এইতো সেদিন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় “লুচি চাপ” দোকানের একজনের কথার টান শুনেই ধরে ফেলি ওর বাড়ি নিশ্চয় মীরসরাই (চট্টগ্রামের একটি উপজেলা)। পরে যখন নিশ্চিত হলাম তখন উপলব্ধি করলাম, আমার আঞ্চলিক ভাষা আমার পরিচয় বহন করে।

আমার মনে হয় নিজের এলাকার মাবুষের সাথে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত এমন সব মানুষেরই এধরণের অভিজ্ঞতা হয়েছে। দিনশেষে আমাদের সবারই একটা শিকড় আছে।

সেদিন একজন ঢাকা নিবাসী বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল। ওর গ্রামের বাড়ি রাজশাহী, কিন্তু জন্ম ঢাকাতেই। আমি বললাম তাঁকে রাজশাহীর ভাষায় কিছু বলতে, কিন্তু তার সহজ উত্তর – ‘পারিনা’। কারণ কি? কারণ ছোটবেলায় তাকে তার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে হয়নি। তার বাবা মা ও তাকে সে ভাষা শেখানোর প্রয়োজন অনুভব করেনি। বাস্তবতা হচ্ছে তাদের তিন ভাই বোনের কেউই রাজশাহীর যে অঞ্চলে তাদের বাড়ি সে অঞ্চলের ভাষা তারা জানেনা।

তাহলে কি দাড়ালো?

তাদের মাধ্যমে একটা ভাষার পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া থেমে গেল। অর্থাৎ তাঁদের পরের প্রজন্ম কখনোই তাঁদের আঞ্চলিক ভাষা সম্পর্কে জানবেনা। এটা শুধু ঢাকাতে না, আমাদের দেশের যেকোন শিক্ষিত পরিবারেই বাবা মা রা তাদের সন্তানকে আঞ্চলিক ভাষা ব্যাবহারে খুব একটা আগ্রহ দেখান না। শুধুমাত্র যারা এখনো গ্রামে বড় হচ্ছে তারাই শিখছে তাদের মায়ের ভাষা।

একটি প্রজন্ম শিক্ষিত হয়ে তার পরের প্রজন্মকে আঞ্চলিক ভাষা শিখানোর বিষয়টি এড়িয়ে চলার প্রথাটা যদি চলতে থাকে তখন একসময় দেখা যাবে আমাদের দেশের বিশাল একটা অংশ তাদের নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষায় কথা বলতে পারছেনা। আঞ্চলিকতাকে গুরুত্ব দেয়ার ব্যাপারে অনেকে আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা শুদ্ধভাবে জানা এবং বলা যেমন জরুরি তেমনি আমাদের আঞ্চলিক ভাষাগুলোকেও আগামী প্রজন্মে প্রবাহিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবেই কেবল মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধার ব্যাপারটা আরো বেশি উপলব্ধি করা যাবে। একই সাথে বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা আঞ্চলিক ভাষার শব্দগুলোও বেচে থাকবে অনেকদিন।

https://www.mega888cuci.com