আগুন পথে হাঁটা এক শক্ত মন

২১ মে, ১৯৯৪। দিনটা নিশ্চয়ই ভারতের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে। সেদিন মিস ইউনিভার্সের শিরোপা জয় করেন সুস্মিতা সেন। সেবারই প্রথমবারের মত কোনো ভারতীয় নারীর মাথায় ওঠে বিশ্বসুন্দরীর মুকুট।

না, শুধু চেহারা আর শারীরিক আকর্ষণীয়তাই সেদিন সুস্মিতার জয়ের একমাত্র কারণ ছিল না। তিনি ছিলেন পুরো একটা প্যাকেজ। তিনি ছিলেন ‘বিউটি ওই ব্রেইনস’-এর অনন্য এক নজীর। সেই বছরই নভেম্বরে মিস ওয়ার্ল্ড হয়েছিলেন ঐশ্বরিয়া রায়। তবে, তিনি মিস ইন্ডিয়াতে হেরেছিলেন এই সুস্মিতা সেনের কাছে।

মিস ইউনিভার্সের ফাইনালের দিন তিনি যে পোশাকটা পরেছিলেন সেটাও কোনো ডিজাইনারের বানানো নয়। তখনকার সময়ে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতায় এখনকার মত স্পন্সরদের ছড়াছড়িও ছিল না। সুস্মিতাকে অনুষ্ঠানে নিজের পোশাকের খরচটা নিজেকেই যোগাতে হয়েছিল।

 

 

ফাইনালের গাউনটা তাঁর মা নিজের হাতে সেলাই করে দিয়েছিলেন। হাতের জন্য যে মোজাটা বানানো হয় সেটা এক জোড়া পায়ের মোজা কেটে বানানো হয়। মধ্য বিত্ত পরিবারটির সাধ্য কম ছিল, কিন্তু স্বপ্ন দেখেছিল আকাশসমান।

যদিও, বুদ্ধিমতি এই সুস্মিতার অবশ্য বলিউডে শুরুটা বুদ্ধিদীপ্ত ছিল না। ১৯৯৬ সালে তাঁর প্রথম সিনেমা ছিল মহেশ ভাটের ‘দস্তক’। সিনেমাটি বক্স অফিসে একদমই সারা ফেলতে পারেনি। মজার ব্যাপারে হল, সিনেমায় তিনি মিস ইউনিভার্সজয়ী সুস্মিতা সেনের ভূমিকাতেই ‘অভিনয়’ করেন!

বলিউডে তিনি প্রথম পুরস্কার জেতেন ২০০০ সালে এসে। ডেভিড ধাওয়ানের সিনেমা ‘বিবি নম্বর ওয়ান’-এ তিনি সহ-অভিনেত্রী হিসেবে ফিল্মফেয়ার ও আইফা জিতেন।  সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারে ‍দু’টি ফিল্মফেয়ার, তিনটি জি সিনে ও তিনটি স্টার স্ক্রিন পুরস্কার।

সুস্মিতা ২০১০ সাল অবধি নিয়মিত কাজ করে গেছেন। এরপর একদমই আড়ালে চলে যান। ২০১৫ সালে ‘নির্বাক’ নামের একটা সিনেমা করেছিলেন। এরপর আর তাকে পর্দায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। ‍সুস্মিতা বিয়েতে বিশ্বাসী নন। অনেক ‘তথাকথিত’ প্রেমিক থাকলেও কখনো বিয়ের খবর শোনা যায়নি।

তবে, সুস্মিতা’র দুই মেয়ে – রিনি ও আলিশাহ। সুস্মিতা তাঁদের দত্তক মা। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি প্রথম শিশু দত্তক নেন। সুস্মিতা বলেন, ‘সিঙ্গেল মাদার হওয়ার চ্যালেঞ্জটা খুব একটা সহজ নয়। তবে, এর মধ্য দিয়ে অনেক কিছু শেখা যায়। এটা সত্যি নিজের বাবা-মার প্রতি সম্মানটা বাড়িয়ে দেয়।’

সুস্মিতার ‘আই অ্যাম’ নামের একটি দাতব্য সংস্থান আছে। সুস্মিতার আরেকটি পরিচয় হল তিনি একজন কবিও বটে। নিজে যেমন কবিতা পড়েন, তেমনি অবসরে টুকটাক লেখেনও।

সুস্মিতার দু’টি পোশা কুকুর আছে। এটা বড় কোনো ব্যাপার নয়, থাকতেই পারে। তবে, বড় ব্যাপার হল একটা সময় তাঁর একটা পোষা পাইথন সাপ ছিল।

সুস্মিতা বরাবরই খুব মেধাবী। পড়াশোনা করেছিলেন হিন্দি মাধ্যমে। কিন্তু, ১৬ বছর বয়সে জেদ চেপে গেল, যে করেই হোক শিখতে হবে ইংরেজি ভাষা। ব্যস, ১৮ বছর বয়সে তিনি যখন বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগীতায় গেলেন তখন তিনি অনর্গল ইংরেজি বলতে পারেন। মিস ইউনিভার্স থেকে ফিরেও তিনি পড়াশোনাটা চালিয়ে গেছেন। সাংবাদিকতায় তাঁর উচ্চতর ডিগ্রিও আছে।

সুস্মিতা ভিন্নধারার এক মানুষ। এই কথাটা যেদিন তিনি বিশ্বসুন্দরীর খেতাব পেলেন সেদিন যেমন সত্যি ছিল, তেমনি যখন বলিউডে নিয়মিত কাজ করতেন তখনও সত্যি ছিল। তিনি নিজের জীবনটাকে নিজস্ব একটা নিয়মের বেড়াজালে আটকে রেখেছেন। এই জীবনটাকে আসলে উপমহাদেশীয় সমাজের সাথে মেলানোই যাবে না।

মজার ব্যাপার হল, আজকের দিনে যাকে নারীদের আদর্শ হিসেবে দেখা হচ্ছে সেই সুস্মিতা কোনো আমলেই ঠিক প্রচলিত মেয়েদের মত ছিলেন না। তিনি ছিলেন ‘টমবয়’ – বান্ধবীর থেকে বন্ধুই ছিল বেশি। সেই টম বয় ইমেজ ভেঙে মডেলিংয়ের দুনিয়াতে তোলপাড় সৃষ্টি করা সহজ ব্যাপার নয়।

তবে, এটা করতে গিয়ে সুশ নিজেকে করে তুলেছেন অনন্য। তাই তো আজো যেকোনো উঠতি মডেলের অনুপ্রেরণা হলেন সুস্মিতা!

https://www.mega888cuci.com