ঈদের সেরা ‘ইতি, মা..’

আমি আসলে রিভিউ লিখি না বা সরাসরি বলতে পারি যে, লিখতে পারিনা। কারন যারা রিভিউ লিখেন তাদের একটি নাটক, সিনেমা যেটাই দেখুক সেটার প্রতিটা সেক্টর যেমন গল্প, পরিচালনা, শিল্পীদের অভিনয়, মিউজিক, সংলাপ, ডায়লগ ডেলিভারি, সিনেমাটোগ্রাফি, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সবকিছুতেই মনোযোগ রাখতে হয়।

আমার কাছে এটা খুবই কষ্টসাধ্য বলে মনে হয়। এজন্য যারা রিভিউ দেন তাদের প্রতি আমার আলাদা একটা শ্রদ্ধাবোধ হয়। তবে আজ একটু লিখতে চেষ্টা করার সাহস করছি। আজ একটা টেলিফিল্ম দেখে একান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতি সবার সাথে শেয়ার করার ইচ্ছা জাগলো।

এই সময়ের প্রিয় নির্মাতা আশফাক নিপুণের পরিচালনায় ‘ইতি, মা..’ দেখলাম। আব্বু, আম্মু, ছোট বোন আর বোনেই জামাইকে নিয়েই দেখলাম। ইদানীং আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প মানেই চাকরি না পাওয়া ছেলে যে কিনা প্রেম করে উচ্চবিত্ত ঘরের সুন্দরী মেয়ের। এই ধারনা থেকে বের হয়ে অবশেষে একটা ফ্যামিলি ড্রামার দেখা পেলাম ‘ইতি, মা..’ এর মাধ্যমে। এজন্য আগেই ধন্যবাদ নির্মাতাকে। গৎবাধা প্রেমকাহিনী আর অহেতুক কমেডি নামের ভাড়ামো থেকে বের হয়ে ভিন্ন কিছু দেখার সৌভাগ্য হলো।

একটি পরিবারে বাবা মানেই বটবৃক্ষ। এই বটবৃক্ষের ছায়া মানে মাথার উপর থেকে সরে গেলে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের কি কি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় বা হতে পারে সেটি আশফাক নিপুণ সুনিপুণ ভাবে তুলে ধরেছেন। অনেক অপ্রাপ্তি আর না পাওয়ার মধ্য দিয়ে জীবন কাটানো মধ্যবিত্ত সেই পরিবারের ছেলে-মেয়ে তাদের মায়ের একটি ইচ্ছা পূরণ করার জন্য নিজেদের জায়গা থেকে যতটুকু কন্ট্রিবিউট করা যায় সেই গল্পটাই দেখলাম আমরা। গল্পটি যেমন করে ধরে রেখেছে আমাদের তেমনি অসাধারন ছিল দক্ষ শিল্পীদের অভিনয়।

আফরান নিশোকে পরিপূর্ণ ভাবে কাজে লাগালে তিনি যে নিজেকে ছাড়িয়ে যাবেন সেটা তো মানতেই হবে সাথে আমাদের দেশের আরো অনেককেই ছাড়িয়ে যাবেন একথার দলিল ‘ইতি, মা..’ তে বড়ছেলের ভূমিকায় তার অসাধারন অভিনয়। শিল্পী সরকার অপু’র অভিনয় দক্ষতা বা চরিত্রের সাথে মিশে যাবার ক্ষমতা নিয়ে আসলে কিছু লেখার যোগ্যতা আমার নাই। তবে এরকম নানা ভিন্নধর্মী শক্তিশালী চরিত্রে তাকে এবং তার মতো অভিনেত্রীদের আরো বেশি করে কাজে লাগানো হবে সেটাই কামনা।

রাজনীতির সাথে জড়িয়ে যাওয়া ছোট ভাইয়ের চরিত্রে আবির স্বল্পসময় স্ক্রিনে ছিলেন। তবে তিনি পুরোপুরি নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি বলে আমার মনে হয়েছে। বিশেষ করে অন্য তিনটি চরিত্রে যারা ছিলেন তারা একে অন্যর সাথে পাল্লা দিয়েছেন পুরো সময়। সামনে নিজেকে শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রমান করবেন এই তরুণ অভিনেতা সেই কামনা রইলো।

তবে নিঃসন্দেহে এই টেলিফিল্মে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন ঈশিতা তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তার অভিনয় দক্ষতা নিয়ে তো নতুন করে বলার কিছু নাই তবে ‘ইতি, মা..’ এর মতো টেলিফিল্মে এমন চমকে দেয়া অভিনয় উপহার দেবার পরে আমার মতো অনেক ভক্তদের আক্ষেপ যে, যদি একেবারে নিয়মিত না হলেও অন্তত দুই/তিনমাসে একটা কাজ নিয়ে হাজির হবেন এই গুনী অভিনেত্রী।

তাঁকে নিয়ে আমাদের চাহিদা বা আশার পারদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন ঈশিতা। ‘ইতি, মা..’ টেলিফিল্মে বাড়ির বড় মেয়ে যে কিনা বাবা মারা যাবার পর মায়ের ইচ্ছা পূরণ করার যে দায়িত্ব কাধে নিয়ে ভাইদের সাথে মিলে সেটি পূরন করার যুদ্ধটা করেছেন তা দেখে যেকোনো দর্শকের চোখে পানি নিয়ে আসবে৷ কি সুন্দর অসাধারণ আর সহজাত অভিনয় করলেন ঈশিতা। তার অভিনয় জীবনের অন্যতম সেরা একটি কাজ হিসেবে ‘ইতি, মা..’ জায়গা করে নিবে এটি নিশ্চিত। সামনে তাঁকে নিয়ে এরকম ভিন্নধর্মী গল্প আর চরিত্র নিয়ে ভাববেন গল্পকার আর নির্মাতারা এটাই চাওয়া।

সবশেষে বলতেই হয় নির্মাতা আশফাক নিপুণের কথা। দিন দিন নিজেকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছেন এই তরুন এবং দক্ষ পরিচালক। সমসাময়িক নানা বিষয় দারুণ ভাবে তুলে ধরছেন তিনি কয়েক বছর ধরেই। গৎবাধা গল্প বা ভিউয়ার সংস্কৃতির বাইরে থেকেই একের পর এক অসাধারণ কাজ উপহার দিচ্ছেন তিনি।

এই ঈদে শর্টফিল্ম ‘অযান্ত্রিক’ এবং আরেকটি টেলিফিল্ম ‘ভিক্টিম’ দিয়ে ইতোমধ্যে ঈদ আয়োজনের সেরা পরিচালক হিসেবে এগিয়ে আছেন তিনি। ‘ইতি, মা..’ নিঃসন্দেহে শুধু এই ঈদ বা শুধু এই বছরের না এটি জায়গা করে দিবে তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজের লিষ্টে। আফরান নিশো বা ঈশিতার ক্যারিয়ারের মুকুটে ‘ইতি, মা..’ যদি আরেকটি সোনালী পালক হয়, তবে আশফাক নিপুনের ক্ষেত্রেও তাই।

সহজ, সাধারণ আর বাস্তবতার অসাধারণ মিশেল নাটকে এই সময়ে যারা উপহার দেন তাদের মধ্য স্বতন্ত্র একটি নাম তার। সব মিলিয়ে স্রোতের বাইরে যেয়ে এই রকম কন্টেন্ট নিয়ে নির্মিত ‘ইতি, মা..’ ঈদ বিনোদনের এখন পর্যন্ত আমার দেখা সেরা কাজ। সময় থাকলে দেখে নিতে পারেন পরিবারের সবাইকে নিয়ে আপনি বা আপনারাও।

https://www.mega888cuci.com