ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেট, বাংলাদেশ এবং বাস্তবতা

স্যার জ্যাক হবস প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১৯৯ টি সেঞ্চুরি করেছেন। ব্র্যাডম্যানের ৯৯.৯৪ গড়ের মত আরেকটা মাইলফলক হতে গিয়েও হয়নি। হবস অবশ্য এই রেকর্ডের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। ৫১ বছর বয়সে যখন অবসর নিলেন ততদিনে সামর্থের শেষবিন্দুটুকু দিয়ে ফেলেছেন, জানলেও হয়তো রেকর্ডের পিছনে ছুটতে পারতেন না। হবস ছাড়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি আছে আরো ২২ জন ব্যাটসম্যানের। এর মধ্যে তিনজন এই শতাব্দীতে খেলেছেন। গ্রাহাম গুচ অবসর নেন ২০০০ সালে; বাকি দুজন হচ্ছেন গ্রায়েম হিক আর মার্ক রামপ্রকাশ।

২০০৮ এ অবসর নেয়ার আগে গ্রায়েম হিক প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৫২ গড়ে ১৩৬ টি সেঞ্চুরি করেন। ৬৫ টেস্টে সেই হিকের গড় ৩১। রামপ্রকাশ এই অভিজাত লিস্টে সর্বশেষ সংযোজন, ২০১২ সালে যখন অবসর নেন তার ৫৩ গড়ে ১১৪টি সেঞ্চুরি প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে। ৫২ টেস্টে এই ভদ্রলোকের গড় ২৭। নব্বইয়ের দশকজুড়ে নড়বড়ে ইংলিশ ব্যাটিং লাইনাপের পেছনে বড় কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এদের ব্যর্থতা। এ নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ হয়েছে, এই বেলা যদি বলি এটা কাউন্টি ক্রিকেটেরও ব্যর্থতা, তাহলে কি খুব ভুল হবে?

কাউন্টি ক্রিকেট নিয়ে এদেশি ফ্যানদের অনেকে চিন্তাভাবনা দেখলে কুয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘কিল বিল’ সিনেমার মাস্টারের কথা মনে পড়ে যায়। যেন পাহাড়ের চুড়ায় শ্মশ্রুমন্ডিত সহস্রবর্ষী মাস্টার বসে আছেন, পাহাড় বেয়ে উঠে তার কাছে ট্রেনিং নিলেই জীবন বদলে যাবে। বাস্তবতা কি তাই? আসুন দেখি।

আপনি যদি ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিবাসী না হন, বা কলপাক চুক্তি না করেন তবে ইংলিশ কাউন্টির রেগুলেশনের ভাষায় আপনি হচ্ছেন ‘আনকোয়ালিফাইড ক্রিকেটার’। একজন ‘কোয়ালিফাইড’ ক্রিকেটার অতীতে অন্য কোন আইসিসি মেম্বার দেশের প্রতিনিধিত্ব করেনি (দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য খানিকটা ছাড় আছে), আর কলপ্যাক চুক্তি করলে অন্তত চুক্তি চলাকালীন সময়ে নিজ দেশের হয়ে খেলতে পারবে না (এই চুক্তি সাধারণত লম্বা সময়ের জন্য হয়, কাজেই এটাও সমাধান নয়)।

কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ (প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট) আর ওয়ানডে কাপে একসাথে সর্বোচ্চ দু’জনকে একজন আনকোয়ালিফাইড ক্রিকেটারকে খেলানো যায়, টি-টোয়েন্টিতে টূর্নামেন্টে দুজন। দলে রেজিস্টার করাতে পারবে দুজনকে, অর্থাৎ প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের জন্য একজন রেগুলার আর একজনকে ব্যাক-আপ হিসেবে দলে নেয়া যায়। টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডে চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল ম্যাচের জন্য বাড়তি আরেকজন আনকোয়ালিফাইড ক্রিকেটারকে রেজিস্টার করা যায়, কিন্তু সেক্ষেত্রেও ম্যাচ প্রতি কোটা বলবৎ থাকবে।

স্যার জ্যাক হবস

প্রতিটি কাউন্টি দলের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্যালারির মাত্রা বেঁধে দেয়া আছে।

কাউন্টি দলগুলো প্রত্যেক ক্রিকেটারের বেতন-ভাতার একটা অংশ ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডকে (ইসিবি) দিতে বাধ্য থাকে। কিন্তু উল্লিখিত ক্রিকেটার যদি কাউন্টির নিজস্ব যুব স্কোয়াডের মাধ্যমে ডেভেলপ করা হয় তবে ওই ক্রিকেটারের জন্য প্রদেয় ভাতার বেলায় ছাড় দেবে ইসিবি। অর্থাৎ সে যদি ব্রিটিশ হয় এবং আগে অন্য কোন কাউন্টি দলের হয়ে খেলে না থাকে তাকে খেলানো ক্লাবগুলোর জন্য লাভজনক।

এছাড়া ২২ বছরের কম দুজন বা ২৬ বছরের কম ৩ জন ব্রিটিশ ক্রিকেটার খেলালে সেজন্যও ইনসেন্টিভ পাচ্ছে ক্লাবগুলো। অন্যদিকে আনকোয়ালিফাইড খেলোয়াড়দের পিছনে যাবতীয় বাড়তি খরচ তাদের বেতন-ভাতার অংশ হিসেবে গণ্য হয়, ফলে সেই অনুপাতে ইসিবির প্রতি দেনাও বেড়ে যায়।

ইসিবির চেষ্টায় কলপ্যাক আর ওভারসিজ ক্রিকেটার, দুই ধরনের বিদেশিদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট পাওয়াও আগের চেয়ে কঠিন করেছে ব্রিটিশ সরকার। সোজা বাংলায় ইসিবি গত দুই দশক ধরেই বিদেশি ক্রিকেটার খেলানোর চেয়ে নিজস্ব প্লেয়ার ডেভেলপ করতে উৎসাহ দিয়ে আসছে।

টি-টোয়েন্টি লিগগুলোর তুলনায় কাউন্টি ক্রিকেটে আয়ে আকাশ-পাতাল তফাৎ। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) এক বিরাট কোহলির আয় কাউন্টি দলগুলোর পুরো স্কোয়াডের স্যালারির চেয়ে বেশি।

ক্লাবগুলো কাকে সাইন করাবে সেটা সম্পূর্ণই ক্লাবের ইচ্ছাধীন, তবে ইসিবি তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত না দিলেও বাঁধা দেয়ার ক্ষমতা রাখে।

বাস্তবতা হচ্ছে সেই রাম নেই, সেই অযোধ্যাও নেই। কাউন্টি ক্রিকেটের রোমাঞ্চ হারিয়ে গিয়েছে। ইংলিশ কাউন্টির মানও আগের জায়গায় নেই; বেশিরভাগ বোলার-ব্যাটসম্যান একই ধাঁচের, প্রকৃত ফাস্ট বোলারের অভাব এই ধরনের অভিযোগ বেশ কিছুদিন ধরেই।

তারওপর সারা বছর এতো বেশি ক্রিকেট খেলা হয় যে জাতীয় দলে নিয়মিত ক্রিকেটাররা যেমন কাউন্টিতে খেলার সময় পান না, তেমনি কাউন্টি দলগুলোও জানে আন্তর্জাতিক সূচীর জন্য তাদের সবেধন নীলমণি ওভারসিজ প্লেয়ারটিকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ছেড়ে দিতে হবে। ফলে খেলোয়াড় সাইন করানোর আগে ফিক্সচার নিয়ে জটিল অংক কষতে হচ্ছে তাদের। ক্রিকেটারদের কাছে কাউন্টি ক্রিকেট আর্থিকভাবেও লাভজনক নয়।

উস্টারশায়ারের হয়ে কিছুদিন খেলেছিলেন সাকিব আল হাসান

বর্তমানে কাউন্টিতে ওভারসিজ ক্রিকেটার যারা আছেন তাদের একটা বড় অংশ নিজ নিজ দেশে টেস্ট স্পেশালিস্ট। পিটার সিডল, চেতেশ্বর পূজারা, ইশান্ত শর্মা এই ক্যাটাগরির। বেশ কয়েকজন নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটার আছেন, তার কারণ কোন এক অদ্ভুত কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর প্রায় ছয় মাস নিউজিল্যান্ড জাতীয় দলের কোন খেলা ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার শিডিউলেও গ্যাপ ছিল, আমলা-স্টেইনরা বয়সের কারনে বেছে বেছে খেলবেন এটাই স্বাভাবিক; সেই কারণে আছেন তারাও। আগের সিজনে কুমার সাঙ্গাকারার মত এবার আছেন মরনে মরকেল, যারা জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে পাট চুকিয়ে কাউন্টিতে থিতু হয়েছেন এনারা।

এবার একজন কাউন্টি দলের ম্যানেজার হিসেবে নিজেকে কল্পনা করুন। ভেবে দেখুন, এতো হিসেব নিকেশ মিলিয়ে একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে দলে করানোর সম্ভাবনা কতটুকু, বিশেষ করে যাদের ইংলিশ কন্ডিশনে অভিজ্ঞতা তেমন নেই। দ্বিতীয়ত, জাতীয় দলে যারা খেলছে বা স্কোয়াডে থাকছে তাদের বাইরে যারা আছে তাদের কজনের মান বা প্রতিভা নিয়ে বাংলাদেশি ফ্যানরা আশাবাদী?

উসমান খাজা আর অ্যারন ফিঞ্চের পিছনে ক’জন জো বার্নস বসে আছে? ক’জন বেন হিলফেনহস, জ্যাকসন বার্ড, কাইল অ্যাবোট আছে জাতীয় দলের বাইরে? সতের কোটি মানুষের দেশে জাতীয় দলের জন্য প্লেয়ার পুল অস্বাভাবিক রকম ছোট বোধ হয়, প্রসেস অফ এলিমিনেশনের মাধ্যমে বার বার ইমরুল কায়েসেই ফিরে যেতে হয়। শাহরিয়ার নাফিস, তুষার ইমরানদের ঘরোয়া ক্রিকেটে গড়ই ৪৫ পেরোয় না, বাইরের নজর কাড়বে কি করে?

এরপরেও যে সাকিব-মুস্তাফিজরা সুযোগ পেয়েছিলেন সেটা নিসন্দেহে তাদের সাফল্য, কিন্তু তারা আগে সফল হয়েছেন, তারপর ডাক পেয়েছেন; উল্টোটা নয়। নিজেদের ভালো মানের ঘরোয়া ক্রিকেট থাকলে কাউন্টির মুখাপেক্ষী হবার প্রয়োজন পড়ে না। অস্ট্রেলিয়ায় কিছুদিন আগেও কাউন্টিকে শেফিল্ডের চেয়ে নিম্নমানের ধরা হত, বলা হয় কাউন্টিতে দীর্ঘদিন খেলতেন বলেই ড্যারেন লেহম্যানকে অস্ট্রেলিয়ান নির্বাচকরা বার বার উপেক্ষা করতেন। আমাদেরও লক্ষ্য সেদিকেই হওয়া উচিত।

https://www.mega888cuci.com