বাওয়াল সন্ন্যাসীর গামলা থুড়ি এক যে ছিল রাজা

‘এক যে ছিল রাজা’ ছবিটা পার্থ চ্যাটার্জী বলে একজন ঐতিহাসিকের লেখা ‘আ প্রিন্সলি ইম্পস্টার’ বইটার উপর ভিত্তি করে নাকি বানানো যেটা হচ্ছে মূলত ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা’ কে নিয়ে। এই মামলা নিয়ে আমরা জানি উত্তম কুমারের বিখ্যাত ছবি ‘সন্ন্যাসী রাজা’ হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়েছিলো রাজার পয়সা হাতানোর জন্য তার বউ ডাক্তার কে হাত করে রাজাকে স্লো পয়জনিং করে প্রায় মেরেই ফেলে।

সবাই যখন ভেবে নিয়েছে রাজা মারা গেছে এবং রাজাকে যখন দাহ করা হবে বলে ঠিক হয়, তখনই বৃষ্টি আসে এবং সবাই মৃতদেহ ছেড়ে পালিয়ে যায়। রাজা আসলে মারা যায়না। সে ফিরে আসে বহুদিন পরে। নিজের রাজত্বের অধিকার চাইতে। সেই মামলা ভারতের বিচার ব্যাবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ধরে চলা মামলা (১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ মানে ১৬ বছর) যা কিনা ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা বলেই পরিচিত আমাদের কাছে। মামলার রায় রাজার পক্ষ্যে যায় এবং সে রাজ্যপাঠ ফিরে পায়। এভাবেই গল্পের শেষ হয়।

ভালো কথা। খুবই ভালো কথা। এবার সৃজিত বাবুর বক্তব্য হচ্ছে তিনি সন্ন্যাসী রাজার রিমেক বানাননি। উনি বানিয়েছেন ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা নিয়ে একটা ঐতিহাসিক পটভূমির ছবি যা কিনা ‘সন্ন্যাসী রাজা’ সিনেমাটাও বানাতে পারেনি। আর সৃজিতের এইরকম চিন্তা ভাবনাই হোল এই ছবিটার কাল। কোন ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে সিনেমা বানানো যায়, আর কোনটাকে নিয়ে যায়না, বা গেলেও কতটা জল বা আপন মনের মাধুরী মেশানোর দরকার পরে, তা বোঝার ক্ষমতা হয়তো সৃজিত বাবুর নেই।

পার্থ চ্যাটার্জীর ‘আ প্রিন্সলি ইম্পস্টার’ বইটা একটা রিসার্চ এর ফল। বিশাল তার ব্যাপ্তি। ইয়া মোটা বই। ১৬ বছর ধরে চলা একটা মামলা নিয়ে ওনার নিজের গবেষণার ফল। শয়ে শয়ে উইটনেস, রাজার বাড়ির লোকজন, বাদী, বিবাদী পক্ষয়ের সব্বাই। লোয়ার কোর্ট, হাই কোর্ট, প্রিভি কাউন্সিল সব জায়গার রায়, এই সব নিয়ে একটা দানবিক অবয়ব সামগ্রিক বিষয়টার। সেটাকে নিয়ে ছবি করতে গেলে যদি মুন্সিয়ানা না থাকে, তাহলে যে ছড়িয়ে ছত্রিশ হবেই, তা বোঝার জন্য বিশেষ মাথা লাগেনা।

উত্তম কুমারের ‘সন্যাসী রাজা’ এইজন্যেই অত্যন্ত সযত্নে এই বিশাল ল্যান্ডস্কেপ উপেক্ষা করে গেছে। ঠিকই করেছে। মনে রাখতে হবে ‘সন্নাসী রাজা’ কোথাও কিন্তু সত্যের অপলাপ করেনি। ওই ‘অশ্যত্থামা হত, ইতি গজ’ এর মতো যেটা দরকার সেইটা রেখে বাকি জায়গাটা চেপে দিয়েছে। আর এটাই বোদ্ধা পরিচালকের সাথে বুদ্ধিমান পরিচালকের তফাৎ। সৃজিত বাবুদের বুদ্ধির জন্য ‘এক যে ছিলো রাজা’ পরিনত হলো ‘বাওয়াল সন্নাসীর গামলা’তে যেখানে গামলা ভর্তি বাওয়ালি আছে। সফিস্টিকেটেড বাওয়ালি। কিরকম? তুলোধোনা করা যাক।

নিউটনের বর্ন চাকতির নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? একটা গোল চাকতিকে সমান সাত ভাগে রঙ করা হয়েছে। রামধনুর সাত রঙ। এবার চাকতিটিকে জোরে ঘুড়িয়ে দেওয়া হলো। দেখা যাবে একটা সাদা চাকতি ঘুরছে। অর্থাৎ? সমান অনুপাতে রামধনুর সাত রঙ মেশালে তা সাদা রঙের জন্ম দেয়। এখানে মনে রাখতে হবে সমান অনুপাতটা কিন্তু চরম গুরুত্বপূর্ণ। যদি তা না হয়, তাহলে কিন্তু চাকতি ঘোরালে একটা জগা খিচুরি রঙই দেখাবে। ওই সাত রঙের মিশেল টাইপের কিছু আর কি। মরাল অফ দা স্টোরি কি? আপনি অনেক কিছু দেখান, অসুবিধা নেই। কিন্তু পরিমিতি বোধ থাকা দরকার। তবেই তা নতুন কিছুর জন্ম দেয়। দর্শক কে ভালো লাগায়। মনরঞ্জন করে। হয়তো শিক্ষাও দেয়।

ধরা যাক, ঋত্বিক ঘটকের কথা। মেঘে ঢাকা তারা। কি নেই ছবিতে। একদিকে দেশভাগ এর বেদনা, অন্যদিকে গরীবের নুন আনতে পান্তা ফুরানোর গল্প। একদিকে দাদা ও বোনের অসম্ভব এক ভালবাসার সম্পর্ক (শুধু বাংলা না, ভারতীয় ছবিতে, দাদা বোনের সম্পর্ক নিয়ে এর চেয়ে ভালো আর কিছু বোধ হয় চিত্রায়ন হতে পারেনা, অন্তত আজ অব্দি বোধ হয় হয়নি), অন্য দিকে, বোনের ক্যান্সার নিয়েও বাঁচার আর্তি ‘দাদা, আমি বাঁচতে চাই।’ এতো গুলো ডাইমেন্সান। অথচ কি পরিমিত মিশেল।

টাইটানিক কে কি বলবেন? ডিসাস্টার মুভি? নাকি লাভ স্টোরি? নাকি দুটোই? ভালো ছবির বৈশিষ্ট্যই হলো যে এরা একাধিক আঙ্গিক কে ধরলেও মাপটা বোঝে। রান্না সবাই পারেনা। নুন হলুদ সামান্য ঘাঁটলেই স্বাদ যাবে ঘেঁটে। আর এনারা তো মাল মশলার মাপটাই বদলে দিচ্ছেন।

সৃজিত বাবুর বক্তব্য উনি হিস্টোরিকাল ফ্যাক্টস গুলোর প্রতি যতটা সম্ভব অনেস্ট থাকতে চেয়েছেন। উদাহরণ দেওয়া যাক। গবেষণা করে দেখা গেছিলো রাজার বউ বা শ্যালক বা এমনকি ডাক্তারও হয়তো কালপ্রিট নয়। কালপ্রিট হচ্ছে ব্রিটিশ সরকার যাদের হাত থেকে ঔপনিবেশিক শাসন ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য যখন কোথা থেকে এক নাগা সন্নাসীর আবির্ভাব ঘটল, তখন সেই সরকারই নাকি যৎপরোনাস্তি চেষ্টা করেছিলো যাতে এই লোকটাকে জোচ্চোর বলে প্রমাণ করা যায়। তাহলেই আর রাজ্য পাঠ ফিরিয়ে দিতে হবেনা তার হাতে।

নিজেদের কছেই থেকে যাবে। সেইজন্য তারা নাকি নকল সাক্ষী সাবুদ পর্যন্ত জোগাড় করে ফেলেছিলো। তা সে ভালো কথা। এই দিকটা ধরেই সৃজিত বাবু চলতে পারতেন। কিন্তু তিনি একবার দেখাচ্ছেন শ্যালকের ক্রুরতা, অন্যদিকে ডাক্তারের শঠতা, বউ কে তো বোঝাই গেলোনা ভালো না খারাপ। একটা হিস্টোরিকাল ফ্যাক্ট বেসড সাইকোলজিক্যাল ড্রামা ফিল্ম যেখানে ভালো মন্দের দ্বন্দ আছে, যেখানে নায়ক আছে, তার নায়কোচিত গৌরব আছে, সেখানে এইটাই যদি জানা না যায় যে আসল ভিলেনটা কে, তাহলে সাধারণ দর্শক কি বলবেন?

সৃজিত বাবু হয়তো স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন, উনি উহ্য রাখতে চেয়েছেন চরিত্রের ধূসর দিক গুলোকে। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চেয়েছেন হলের মধ্যে কে ভালো আর কে খারাপ। কিন্তু আমরা এত ভেবে নেবো কেনো বলতে পারেন সৃজিত বাবু? লোকে ১৫০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে পপকর্নের টাব হাতে নিয়ে প্লেক্সের ঠাণ্ডা ঘরে বিশাল স্টার কাস্ট সম্বলিত একটা পিরিওড ড্রামা দেখতে এসেছে। হিচককের কোনও থ্রিলার নয় বা আগাথা ক্রিস্টির মাউস ট্রাপ নয় যেখানে আগের সিনে কি হলো, দর্শককে মাথায় রেখে দিতে হবে। ক্যামেরার ভাষাটা বুঝুন। এখানে ন্যারেটিভের মধ্য দিয়ে আপনি আসমুদ্র হিমাচল একটা দিগন্ত ধরতে চাইছেন আর উহ্য রেখে দিচ্ছেন চরিত্রের রঙ গুলোকে।

আর একটা বিশেষ রকম খারাপ দিক। কোর্ট সিন। রাজার হয়ে লড়ছেন অঞ্জন দত্ত এবং তার বিপক্ষে লড়ছেন অপর্না সেন। দুই উকিল। হুট করে দেখা গেলো এদের মধ্যে একটা পুর্ব প্রেম টাইপ কিছু একটা ছিলো। হয়তো বিয়ে হয়েছিলো, ডিভোর্স হয়ে গেছে, বা হয়তো প্রেম ছিলো, ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কি যে আসলে হয়েছে সেটা বোঝা গেলনা। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, এই টাইপের একটা প্রসঙ্গের অবতারণাই বা কেন যে করা হোল, সেটাই বোঝা গেলনা। আবার এও দেখানো হলো, অঞ্জন বাবু কেস লড়ছেন একটা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে।

অপর্না সেন লড়ছেন একটা নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে। অঞ্জন বাবুর চিন্তা ভাবনা তবুও কিছুটা হয়তো মানা যায়, কারন রাজা একটা সময় খারাপ ছিলো। বহুগামী ছিলো। এখন ভালো হয়ে গেছে। জাগতিক মোহ, মায়ার উর্ধে চলে গেছে। সুতরাং এরকম একটা লোককে বাঁচানোই দরকার। মেনে নিলাম নাহয়। কিন্তু অপর্না সেনের বক্তব্যটা বাড়াবাড়ি। ওনার কথা হচ্ছে রাজা যেহেতু ব্যাভিচারী ছিলো, বউকে সময়ই দিতনা, সুতরাং এইরকম একটা নোংরা লোককে জেলে ভরতেই হবে।

অথচ সৃজিত বাবু নারীবাদের জয়গান করতে গিয়ে ভুলে গেলেন সেই রাজার বউকেই দেখানো হচ্ছে যে সে নাকি রাজার খুনের চক্রান্তে পরোক্ষ ভাবে যুক্ত। দেশের বিচার ব্যবস্থা যে কতটা ঠুনকো এবং উকিলরা যে কতটা নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করে, আমরাই সবাই কম বেশি জানি। কিন্তু অপর্না সেনের মতো এইরকম একটা অবান্তর চরিত্র চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে সেই বিষয়টাকেই খুঁচিয়ে ঘা করার মতো তুলে ধরার কি বিশেষ কোনও দরকার ছিল?

আরও একটা বাজে দিক বলি, এডিট। একবার দেখানো হচ্ছে ১৯০০ সালের কাছাকাছি সময়। আবার একবার ১৯৩০ সাল নাগাদ সময়। আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। আবার এগিয়ে আসছে। মুশকিল হচ্ছে, গল্পের চরিত্র গুলো ভালো ভাবে আঁকার আগেই এই আগুপিছু ব্যাপারটা বড়ই বিরক্তিকর। বরং এতো গুলো ডাইমেনশান নিয়ে যখন একটা ছবি, সেখানে যদি ন্যারেটিভ সিম্পল হতো, সাইড বাই সাইড দুটো সময় দেখানো হত, তাহলে হয়তো তুলনা মূলক ভাবে দর্শক কম বিরক্ত হতেন। যাই হোক, এটা সম্পুর্নই আমার ব্যাক্তিগত মত। অনেকেই আপত্তি জানাতে পারেন।

এবার একটু স্ক্রিপ্টে আসি। এতক্ষণে যা বোঝা গেলো, এই সিনেমাতে অনেক কিছু দেখানো হয়েছে, যেটা আমার পছন্দ হয়নি। আর এই বিষয়টার সাথেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে স্ক্রিপ্ট। দেখানো হচ্ছে, রাজা একাধারে প্রজাবৎসল, ভালো ব্যাপার। অন্যদিকে নারীবৎসল, খারাপ ব্যাপার। অথচ একটা সিন ছাড়া কোথাও প্রজা বাৎসল্য চোখে পড়েনি। নারী বাৎসল্য এদিকে পর পর পর পর এসেই চলেছে। রাজা বাইজির সাথে দাবা খেলছে।

একটা করে বাইজির ঘুঁটি রাজা খেয়ে নিচ্ছে, একটা করে অলঙ্কার বাইজি খুলে ফেলছে। প্রায় বোধ হয় ৫ মিনিট ধরে চলল সিনটা, শেষ হল গিয়ে বিছানাতে। এই যে বৈসম্য ট্রিটমেন্টের, এইটাই হচ্ছে চিত্রনাট্যের ফাঁক। যেখানে দেখানো হচ্ছে রাজাকে প্রজারা সব্বাই সাপোর্ট করছে, সেখানে রাজার প্রজা বাৎসল্য আর একটু ভালো ভাবে দেখানো দরকার ছিল। কিন্তু সৃজিত বাবু সেপথে না হেটে বাজার ধরতে চেয়েছেন যেখানে হয়তো শ্রীনন্দা শঙ্করের বাইজি নাচ এবং ব্যাক গ্রাউন্ডে এক গুচ্ছ প্রয়োজনের অতিরিক্ত গান দিয়ে একই সাথে একটা ‘সো কল্ড আরটিস্টিক’ ব্যাপার পর্দায় চিত্রায়িত করতে চেয়েছেন, এবং সং রাইটের জায়গাটাও নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। কিন্তু মোদ্দা তাতে কি দাঁড়ালো? আমরা দর্শকরা হাতে পেলাম শুধু পেন্সিল। মাথা চুলকাবো বলে।

ছবিতে এক গুচ্ছ ভুল ভাল সিন আছে যার আদৌ প্রয়োজন ছিলোনা। আর থাকলেও যেভাবে দরকার সেভাবে দেখানো হয়নি। হঠাত একজন মারা গেলো। কে যে মারা গেলো, সেটাই বোঝা গেলো না! শুধু আমরা দেখলাম কিছু কাঠ পুড়ছে। রাজার ছোট ছেলেকে দেখানই হলনা অথচ তার উল্লেখ গোটা ছবিতে অন্তত বার তিনেক অত্যন্ত গুরুত্তপূর্ন জায়গাতে এসেছিলো। রাজা নিরুদ্দেশে গিয়ে হিন্দিভাসী হয়ে গেছিলো নাকি। অথচ রাজার হিন্দি শুনলে মনে হবে কোনও বাঙালি হিন্দি বলছে। এগুলো তো ক্ষমার অযোগ্য। বেসিক ভুল। হুট করে একটা সিনে দেখানো হলো রাজার পিঠে একটা উল্কি টাইপ কি একটা লেখা।

দর্শককে পড়তেই দেওয়া হলোনা কি লেখা। তাহলে বাপু দেখানোর কি দরকার ছিলো। মানে এগুলো কি ছেলেখেলা হচ্ছে আমাদের পয়সা নিয়ে? গোটা ছবিতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট ইংরাজিতে ডায়লগ আছে। ইংরেজদের নিজেদের মধ্যে। মজার বিষয় হলো সেখানে কোনও সাব টাইটেল নেই। হ্যাঁ, সৃজিত বাবু বলতেই পারেন যারা ইংরাজি বোঝেনা, আমি তাদের জন্য এই ছবি বানাইনি। হতেই পারে। কোনও ভুল নেই তাতে। কিন্তু বলেছেন কি সেটা? নিজের অবস্থানটাকে তো স্পষ্ট করতে হবে। সত্যজিত রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’।

বেশির ভাগ ডায়ালগ বাংলা আর ইংরাজির মিশেল। কেন? কারণ, গল্পটাই একটা আপার ক্লাস বাঙালি পরিবারের। যেখানে ছবি বিশ্বাসের হাতে স্বচ্ছন্দে চুরুট মানিয়ে যায়। কিন্তু এখানে আপনি কি দেখাচ্ছেন? বাঙাল ভাষায় কথা বলা বাংলার একটা গ্রামের ছবি যার পটভূমি দেশভাগেরও আগে। দর্শকের তো মাথা গরম হবেই দাদা!

কিছু ভালো কথা বলি ছবিটা নিয়ে। প্রথম হচ্ছে অভিনয়। যীশু রাজার চরিত্রে বেশ ভালো। তবে আমি বেশি নম্বর দেবো অনির্বাণ কে। রাজার শ্যালক। দুরন্ত করেছেন অনির্বাণ। চোখের চাহনি থেকে মুখের এক্সপ্রেশান, যখনি পর্দায় এসেছেন, ভালো লেগেছে শুধু ওকেই। দ্বিতীয় বলবো জয়া আহসান। প্রথম দিকের দু তিনটে সিন ছাড়া জয়াও নজর কাড়েন। শুধু প্রথম দিকে উনি যে রাজার মানে যীশুর প্রেমিকা নন, বোন, সেটা বোঝাই যায়নি।

ওরকম আদর মাখা চোখের চাহনি বোনের হয় কিনা জানা নেই। বাকি ছবি জুড়ে অবশ্য জয়া তুখোড়। আর একজনও ভালো। রুদ্রনীল। ডাক্তারের চরিত্রে বেশ ঠিকঠাক। বাকিরা মোটামুটি। যা স্ক্রিপ্ট ছিলো, উতরে দিয়েছেন। সৃজিত নিঃসন্দেহে বড় ‘টাস্ক মাস্টার’। জানেন কাজ করিয়ে নিতে। নিয়েওছেন।

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও খারাপ নয়। বিশাল কিছু আহামরি লাগেনি। মাঝে মাঝেই মাত্রাতিরিক্ত লেগেছে। ভারতীয় ক্লাসিকাল বাজলেই যে সবসময়ে দারুন একটা ব্যাপার হবে, আর আইটেম সং মার্কা লারেলাপ্পা চললেই যে ক্লাস নেমে যাবে, এরকম ভাবার বিশেষ কারণ আছে বলে তো মনে হয়না। যেখানে দরকার সেখানে সুরকার ব্যাকগ্রাউন্ডে সেতার বা তানপুরাতে হয়তো ঝঙ্কার তুলিয়েছে, যেখানে দরকার নেই, সেখানেও তুলিয়েছে। ফলে বিষয়টা আদতে, দর্শকদের হাই তুলিয়েছে। তবুও মোটের উপর মন্দ লাগেনি। সাহানার গলায় ‘মহারাজো, এ কি সাজে’ বেশ ভালই লেগেছে শুনতে যদিও চিত্রায়নটা গানের সাথে যায়নি বলেই মনে হয়েছে।

মোটের উপর যা দাঁড়ালো, যারা দেখেন নি, তাঁদের জন্য আমার দুটো সাজেশান। যারা যীশু বা অনির্বাণ বা জয়ার ভক্ত, তারা দেখতে পারেন। চোখের, মনের, দুয়েরই পুষ্টি হবে। আর যারা ভালো ছবির ভক্ত, তারা দেখুন একটা অত্যন্ত ঘটনাবহুল এবং বিরাট ল্যান্ডস্কেপের একটা বিষয়কে নিয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টার ছবি বানানোর একটা প্রয়াসকে অন্তত একটা সম্মান দিতে। ছবিটা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাবেন। অনেকেই বলবে ভালো লাগলো। অনেকেই বলবে অতি জঘন্য। আমি বলবো খারাপ। ভালো যতটুকু আছে, খারাপে তা চাপা পরে গেছে বলেই মনে হয়েছে আমার।

শেষে একটা বিধিবদ্ধ সতর্কিকরণ দিয়ে দেই। আমি একটা মুরগির মতো ডিম পাড়তে পারিনা। কিন্তু একটা অমলেটের বিষয়ে, একটা মুরগির থেকে ভালো বুঝি!

বাওয়াল সন্ন্যাসীর গামলা থুড়ি এক যে ছিল রাজা: দশে সাড়ে চার।

https://www.mega888cuci.com