মেটাফোরিক শেডে আবদ্ধ ‘ড্রাকুলা স্যার’

‘আমি তো ডুবে যেতেই চেয়েছিলাম মঞ্জুরী। আমাকে আটকালে কেন?”

হারিয়ে যেতে চাওয়া কোন সত্তাকে আটকে তার অতীত ও বর্তমানের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে অতীতকে জাগ্রত রাখাই মঞ্জুরীদের কাজ। তাই মঞ্জুরীরা বারবার ফিরে আসে, নিভে যাওয়া ছাইকে জ্বালিয়ে রাখে। মনে করে দিতে চায়, সব শেষ হয় নি, এখনো বাকী। ড্রাকুলা স্যার মুভির মঞ্জুরী চরিত্রটিকে সেই দায়িত্বই অপর্ণ করেছে পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্য।

‘ড্রাকুলা স্যার’ নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে রুক্তপিপাসু এক চরিত্রের। কিন্তু দেবালয় ভট্টাচার্যের ড্রাকুলা এখানে পুরোপুরি মেটাফোরিক চরিত্র। নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে সংগ্রাম, পরাজয়, নির্যাতন ও স্তিতিমভাবে জ্বলতে থাকা লক্ষ্যের বার্তা। বিদেশি ছবি ও সাহিত্যের প্রভাবমুক্ত হয়ে বাঙালির আবেগ জারিত করে ড্রাকুলা চরিত্রে নতুন পরত যোগ করতে চেয়েছেন দেবালয় ভট্টাচার্য। ‘ড্রাকুলা স্যার’ নিঃসন্দেহে এক্সপেরিমেন্টাল কাজ তার।

২০২০ সালের এক চরিত্রের মাঝে, সত্তরের এক বিপ্লবীর সত্তা প্রবেশ করিয়ে তাকে ড্রাকুলার মত মৃত্যুহীন করে তোলার প্রয়াস সত্যি দুর্দান্ত। পুরো মুভিটি মূলত মেটাফোরিক শেডে আবদ্ধ। শেডের মূল চরিত্র রক্তিম। যার মধ্যেই রয়েছে আরো দুটি চরিত্র – বিপ্লবী অমল সোম ও ড্রাকুলার সত্তা। যে সত্তার কাজ ছিল এক অর্থে আধুনিকতার বিরুদ্ধে প্রাচীনতার যুদ্ধ, পুঁজিবাদ শোষনের বিরুদ্ধ্বে সাম্যবাদের এগিয়ে যাওয়া।

ছবিতে উঠে আসবে সত্তরের শহর কলকাতা, নকশাল পিরিয়ড। সেই সময়কার রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট। ৭০ এর সেই অমল বোসের কথা, যে নকশাল আন্দোলনের সময় পালিয়ে আশ্রয় নেয় প্রাক্তন প্রেমিকা মঞ্জুরীর কাছে। ভালোবাসা ও বিপ্লবের মধ্যে যে বেছে নিয়েছিল বিপ্লবকে। মূলত অমল চরিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে নকশালবাদী নেতা চারু মজুমদারকে। যিনি ছিলেন প্রথমদিকের নকশাল নেতাদের অন্যতম অনুপ্রেরণা। স্বভাবতই প্রশ্নই আসবে নকশালবাদ কি? কিভাবে এর জন্ম?

১৯৬৭ সালের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের কাছে নকশালবাড়ির একটি গ্রামে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিলেন দুটি শিশু-সহ মোট এগারোজন লোক। সেই ঘটনা থেকে যে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলনের সূচনা, তাতে অচিরেই যোগ দেন হাজার হাজার তরুণ – নকশালবাড়ির গণ্ডী ছাড়িয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে ভারতের নানা প্রান্তে।

শীঘ্রই উগ্রবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে নকশালবাড়ি নামটি মিশে যায়। সৃষ্টি হয় নকশালবাদ। ষাটের দশকের শেষের দিকে এবং সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে নকশালবাড়ি বিদ্রোহ শহুরে তরুণ এবং গ্রামীণ জনগণের হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছিল। পরের কয়েক মাসে, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র পর্যন্ত পুরো ওড়িশার কিছু অংশে বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে একই রকম বিদ্রোহ সাধারণ ঘটনা হয়ে উঠল। সেসব ঘটনার কিছুটা ঝলক দেখা যায় এ মুভিতে।

অমলের উপর যেভাবে অমানুসিক অত্যাচার করা হয় ঠিক একইভাবে মূল চরিত্র চারু মজুমদারের উপর করা হয়েছিল অমানুষিক অত্যাচার। ৬ জুলাই ১৯৭২ জীবনে শেষবারের মতো গ্রেপ্তার হওয়ার আগে পর্যন্ত আত্মগোপন অবস্থায় বিপ্লবী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কলকাতার কুখ্যাত লালবাজার লক-আপে ‘জিজ্ঞাসাবাদের’ সময় তাঁকে অমানুষিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু কোনো স্বীকারোক্তি অথবা বিন্দুমাত্র গোপন তথ্য তাঁর কাছ থেকে আদায় করা যায়নি। বিপ্লবের চূড়ান্ত জয় সম্পর্কে প্রগাঢ় প্রত্যয় নিয়ে এই মহান বিপ্লবী ২৮ জুলাই ১৯৭২ ভোর প্রায় ৪টের সময় মাথা উঁচু করে শহীদের মৃত্যুবরণ করেন। এজন্য অমল সোমের বেদিতে দেখা যায় মৃত্যুর সময় ১৯৭২।

ছবি জুড়ে যে ‘সত্যি-মিথ্যে’র খেলা চলে, শেষ দৃশ্যেও তা বহাল ছিল। তাহলে রক্তিম যা কল্পনা করেছিল তা কি মিথ্যা ছিল? নাকি সব সত্য? অমল সোমেরা পালিয়ে যায় না, পালিয়ে যায় কিছু সুবিধাভোগীরা, পালিয়ে যায় অমল সোমের নাম নিয়ে। যার কৃতিত্ব নিয়ে বহাল তবিয়াতে থাকতে চায় তারা। তাদেরকে শাস্তি দিতেই কি মঞ্জুরীদের ফিরে আসা। যে দিনের আলোতে ঘুমিয়ে থাকা রক্তিমকে রাতের আঁধারে ড্রাকুলাতে পরিণত করে বারবার জানিয়ে দিয়ে চায় বিপ্লবের বিনাশ নেই। ঠিক যেমন ছিল কাউন্ট ড্রাকুলা; জীবিত নয়, কিন্তু মৃতও নয়, সে মৃত্যুহীন, না-মৃত ‘আনডেড’।

অমল সোম ও রক্তিমের ভূমিকায় রয়েছেন অনির্বান ভট্টাচার্য। অনির্বাণ বলা যায় বর্তমান সময়ে কলকাতার সব থেকে দক্ষ অভিনেতা। । রক্তিম, অমল ও ড্রাকুলার লুকে তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছে। মিমি মঞ্জুরী চরিত্রে চেষ্টা করেছে। তবে অমল – মঞ্জুরীর রসায়ন দেখানোর জন্য কিছু দৃশ্যের প্রয়োজন অনুভব করেছি। অন্যান্য চরিত্রে বিদীপ্তা চক্রবর্তী, সুপ্রিয় দত্ত, কাঞ্চন মল্লিক, রুদ্রনীল ঘোষও ভাল।

সব মিলিয়ে দারুণ এক মেটাফোরের চিত্র এঁকেছেন দেবালয় এবং কল্লোল লাহিড়ি। এ ধরনের নিরীক্ষাধর্মী কাজ কলকাতার চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। সাথে সাথে জানান দিচ্ছে কতটা গভীরভাবে তারা তাদের ইতিহাস নিয়ে ভাবাছেন। নতুন প্রজন্মকে অর্থবহ বার্তা দিচ্ছেন। মুভির নাম ড্রাকুলা স্যার রাখা এখানেই মনে হয় পুরোপুরি স্বার্থক।

https://www.mega888cuci.com