ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: ভাষা সংগ্রামের আন সাং হিরো

২১ মার্চ, সাল ১৯৪৮। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসমাবেশ। মঞ্চে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তিনি বলেন, ‘এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা, অন্য কিছু নয়। কেউ আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে তারা পাকিস্তানের শত্রু।’

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা জোর প্রতিবাদ করে। পরোয়া না করে বক্তব্য চালিয়ে যেতে থাকেন কায়েদে আজম। দিন তিনেক বাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলেও তিনি একই রকম বক্তব্য দেন।  ছাত্ররা ‘নো… নো’ বলে প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে, ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও।

ভাষা নিয়ে চাপা ক্ষোভটা বাঙালির মধ্যে সেই ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই ছিল। তমদ্দুন মজলিস নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে? বাংলা নাকি উর্দু?’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও সমমর্যাদা দেওয়ার দাবী জানায়।

তবে, বাংলা ভাষার এই প্রাণের দাবীর আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বাঙালি গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তিনিই গণপরিষদে প্রথমবারের মত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য একটি বিল আনেন। তিনি করাচির অধিবেশনে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বলেন, ‘উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার থাকতে হবে।’

পাকিস্তানের পাঁচটি প্রদেশের ছয় কোটি ৯০ লাখ মানুষের মধ্যে চার কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাংলা ভাষাভাষী। সুতরাং বিষয়টিকে প্রাদেশিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে দেখা উচিত। উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি তাই বাংলাকেও সমান মর্যাদায় আসীন করা যায় বলে দাবী করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কাছ থেকে শপথ বাক্য পাঠ করছেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

এই দাবীর পক্ষে ছিলেন মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ছিলেন কিছু বাঙালি সদস্যও। তবে, অধিকাংশ মুসলিম থেকে নির্বাচিত অধিকাংশ প্রতিনিধিই এর বিরোধীতা করেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য ও বাংলার প্রধামন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, মোহাজের ও পুনর্বাসনমন্ত্রী গজনফর আলী খান, গণপরিষদের সহ-সভাপতি তমিজউদ্দিন খান ছিলেন বিরোধীদের মধ্যে শীর্ষে। যথারীতি তাই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দমে যাননি। তিনবার কিছু সংশোধন এনে প্রস্তাবই উত্থাপন করেছিলেন। তবে সেই প্রস্তাব আদৌ পাশ করেনি গণপরিষদ।

তবে, এই বিল উত্থাপনের ‍সুবাদে অফিস-আদালতের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়। যদিও, ১১ মার্চ পাকিস্তান গণপরিষদে রাষ্ট্রভাষা উর্দু বিল পাশ হয়ে যায়।

 

পূর্ব পাকিস্তানে সেদিন ছিল প্রতিরোধ দিবস। দিনভর ধর্মঘট ও বিক্ষোভ করে জনতা। ধর্মঘট ডেকেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটি।

করাচি থেকে ঢাকায় ফিরেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। বিমান বন্দরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাঁকে বিপুল সম্বর্ধনা দিয়ে বরণ করে নেয়। আন্দোলন আরো গতিশীল হয়।  এরপরই তো জিন্নাহকে মুখের ওপর না বলে দেয় সংগ্রামী ছাত্ররা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের অধিবেশনের ঠিক আগের কথা। পুলিশের কাঁদানে গ্যাসে আক্রান্তরা তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের হলের ভেতরে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তসহ কয়েকজন পরিষদ সদস্যকে ছাত্রনেতারা সেখানে নিয়ে যান। বাংলা ভাষার সপক্ষে নিজেদের দাবীর কথা জানান।

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে এ্যারোমা দত্ত ও রাহুল দত্ত

সরকারপন্থী ইংরেজি দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’-এ এই খবরটা বিকৃতরূপে ছাপা হয়। বলা হয়,  পরিষদ অধিবেশনের আগে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের কাছে গিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর ছাত্ররা ১০ জন করে গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে শুরু করে। মিথ্যাচার সম্পর্কে পরিষদের অধিবেশনে ধীরেন দত্ত প্রতিবাদ করে নিজের বক্তব্য দেয়ার অনুমতি চান। কিন্তু স্পিকার সে অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। দাবী করেন যে, পত্রিকার প্রচারণার সঙ্গে পরিষদের কোনো সম্পর্ক নেই।

সেদিনের বক্তৃতায় শুধু ২১ ফেব্রুয়ারি নয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পুরো সংগ্রামের কথা সেদিন বলেছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলা ভাষার সপক্ষে এবং ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ওপর সরকারি নির্যাতনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়ে ঝাঁঝালো বক্তৃতা রেখেছিলেন তিনি।

এর হাত ধরেই আসে চূড়ান্ত বিজয়। ১৯৫৪ সালে আসে যুক্তফ্রন্ট সরকার। সেবার সাত মে যুক্তফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি। ১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জাতীয় সংসদে বাংলা এবং উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধান পাশ হয়। তিন মার্চ কার্যকর হয় সংবিধান।

ধীরেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৮৬ সালের দুই নভেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তরে রামরাইল গ্রামে। শিশুবেলা থেকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রীয় ধীরেন্দ্রনাথের রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয় ১৯০৫ সালে, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলেনর মধ্য দিয়ে। বেশ কয়েকবার কারাবাসও বরণ করতে হয়েছে তাঁকে।  ১৯৩৫ সালের নতুন ভারত শাসন আইনে ১৯৩৭ সালে যে সাধারণ নির্বাচন হয়, তাতে জয়ী হয়ে তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য হন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনেও তিনি আবারো নির্বাচিত হন। ভূমিকা রাখেন ভাষা আন্দোলনে। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন আইনজীবী।

যদিও, দেশকে স্বাধীন হতে দেখতে পারেননি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। উত্তাল ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ তাঁকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আসা হয়। গণহত্যার সেই মাসে তার ওপর পাকিস্তানি আর্মি চালায় নির্মম নির্যাতন। ধীরেন্দ্রনাথের বয়স তখন ৮৫ বছর। তবুও, অত্যাচারের অমানবিকতা কমেনি।কতটা বিভৎস ছিল সেই অত্যাচার তাঁর কথা এক সাক্ষাৎকারে দিয়েছিলেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ক্ষৌরকার রমনীমোহন শীল।

ধীরেন বাবু সম্পর্কে বলতে গিয়ে রমণী শীলের চোখের জল বাঁধন মানেনি। মাফলারে চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘আমার সে পাপের ক্ষমা নেই। বাবু স্কুলঘরের বারান্দায় অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় প্রস্রাব করবেন। আমি আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় তাকে প্রস্রাবের জায়গা দেখিয়ে দিই। তখন তিনি অতি কষ্টে আস্তে আস্তে হাতে একটি পা ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠানে নামেন। তখন বারান্দায় বসে আমি এক জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। আমি বার বার বাবুর দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলাম বলে জল্লাদ উর্দুতে বলে, ‘এটা একটা দেখার জিনিস নয়, নিজের কাজ কর।’

এরপর বাবুর দিকে আর তাকাবার সাহস পাইনি। মনে মনে শুধু ভেবেছি বাবু জনগণের নেতা ছিলেন, আর আজ তার কপালে এই দুর্ভোগ। তার ক্ষতবিক্ষত সমস্ত দেহে তুলা লাগান, মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ হাত বাঁধা অবস্থায় উপর্যুপরি কয়েকদিনই ব্রিগেড অফিসে আনতে নিতে দেখি।’

রমণীমোহন শীল হিন্দু হলেও তাকে পাকিস্তানি আর্মি বাঁচিয়ে রেখেছিল নিজেদের প্রয়োজনেই। কারণ তাঁর মৃত্যু হলে পাকিস্তানী সৈন্যদের চুল দাড়ি কাটার মতো কোন লোক থাকবে না। ওই কুমিল্লা ক্যান্টমেন্টেই শহীদ হন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ছোট ছেলে দিলীপকুমার দত্তও ছিলেন আর্মিদের জিম্মায়। তিনিও মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাননি।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আরেক ছেলে  প্রখ্যাত সাংবাদিক সঞ্জীব দত্ত। তিনি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ অবজারভারের শীর্ষ স্থানীয় পদে ছিলেন। নাতনি অ্যারোমা দত্ত বেগম রোকেয়া পদক পাওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৯৭ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সড়ক নামে কুমিল্লার একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে তাঁর নামে একটি ই-লাইব্রেরী স্থাপিত হয়েছে। তিনি না থাকলেও তাঁর নাম, তাঁর আদর্শ ও তাঁর স্মৃতি – সবই আদৌ টিকে আছে।

তথ্যসূত্র:

বাংলাপিডিয়া

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

https://www.mega888cuci.com