ঢাকার বানিজ্যিক ছবির নির্মাতা কথা

একটি পরিপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন পরিচালক। তাদের ছোঁয়ায় বিকশিত হয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র দর্শকরা উপভোগ করেন। একটা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে বাণিজ্যিক সফল সিনেমার বিকল্প নেই, একের পর এক বাণিজ্যিক সফল সঙ্গে শিল্পমান সমৃদ্ধ সিনেমা উপহার দিয়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলা সিনেমাতেও এর ব্যতিক্রম হয় না। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা বাণিজ্যিক সফল নির্মাতা নিয়ে আজ থাকছে এই বিশেষ আয়োজন।

  • এ জে মিন্টু

তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র উপহার দেয়া চলচ্চিত্র নির্মাতা। পেয়েছেন ‘মাস্টার মেকার’-এর খেতাব। ১৯৭৮ সালে ‘মিন্টু আমার নাম’ ছিল তাঁর নির্মাণে প্রথম চলচ্চিত্র। এরপর একে একে নির্মাণ করেন চ্যালেঞ্জ, মান সম্মান, প্রতিহিংসা, অশান্তি, লালু মাস্তান, সত্য মিথ্যা, পিতা মাতা সন্তান, বাংলার বধূ, প্রথম প্রেম-সহ বেশ সংখ্যক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। তাঁর নির্মিত সর্বশেষ সিনেমা ‘বাপের টাকা’ প্রশংসিত হলেও ব্যবসায়িক ভাবে সফল হয়নি। এরপর থেকেই তিনি অন্তরালে আছেন। শাবানার বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে এই নির্মাতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে বিবেচিত। বরেণ্য এই নির্মাতা সর্বোচ্চ চারবার সেরা পরিচালক বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। সব মিলিয়ে এই পুরস্কার পেয়েছেন মোট ছয়বার। এছাড়া উনার ‘সানফ্লাওয়ার মুভিজ’ নামে প্রযোজনা সংস্থাও ছিল।

  • শহিদুল ইসলাম খোকন

বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রে ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়া মার্শাল আর্ট ভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ করে দর্শকদের মধ্যে আলোড়ন তুলেন প্রতিভাবান এই নির্মাতা। প্রথম সিনেমা ‘রক্তের বন্দী’ ফ্লপ হলেও দ্বিতীয় সিনেমা ‘লড়াকু’ ব্যবসায়িকভাবে দারুণ সফল হয়। এই ছবিতেই নায়ক রুবেলের অভিষেক হয়। এরপর একে একে নির্মাণ করেন বীরপুরুষ, বজ্রমুষ্টি, বিপ্লব, বিশ্বপ্রেমিক, ভণ্ড, কমান্ডার, ম্যাডাম ফুলি, লম্পট-সহ আরো অনেক ছবি। তাঁর আরেক হিট ছবি ‘সন্ত্রাস’ দিয়ে বাণিজ্যিক ছবিতে যাত্রা শুরু করেন কিংবদন্তি হুমায়ূন ফরিদী। এছাড়া পালাবি কোথায়, লাল সবুজ, বাঙলা – তাঁর ক্যারিয়ারে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উনার সাথে রুবেল- হুমায়ূন ফরিদী জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে ব্যাপক জনপ্রিয়। আফসোসের বিষয় বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে প্রয়াত এই নির্মাতা একবারও জাতীয় পুরস্কার পান নি।

  • কাজী হায়াৎ

সামাজিক ও রাজনৈতিক বক্তব্যধর্মী সিনেমা বানিয়ে নিজেকে দর্শকদের মাঝে অনন্য করেছেন এই প্রথিতযশা নির্মাতা। ১৯৭৯ সালে ‘দ্য ফাদার’ সিনেমা দিয়ে নির্মাতা হিসেবে অভিষিক্ত হন। এরপর নির্মাণ করেন দেশের প্রথম ভৌতিক চলচ্চিত্র ‘রাজবাড়ি’। তবে তিনি মূলত বেশি আলোচনায় আসেন নব্বই দশকে এসে। একে একে নির্মাণ করেন দাঙ্গা, ত্রাস, চাঁদাবাজ, দেশপ্রেমিক, সিপাহী, লাভস্টোরি, লুটতরাজ, তেজী, আম্মাজান, ধর, কষ্ট, ইতিহাস-সহ মোট ৪৯টি সিনেমা। নায়ক মান্নার সাথে জুঁটি বেঁধে নির্মাণ করা ছবিগুলো দর্শকরা দারুণ উপভোগ করতেন। বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি সব মিলিয়ে মোট নয়টি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন।

  • দেলোয়ার জাহান ঝন্টু

বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি সর্বোচ্চ সংখ্যক চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা ৭৩টি। তিনি মূলত ছিলেন কাহিনীকার,প্রায় ৩০০টির ও বেশি চলচ্চিত্রের কাহিনী লিখেছেন তিনি। ১৯৮০ সালে তিনি প্রথম সিনেমা বানান। সেটা হল ‘বন্দুক’। এই সিনেমার সাফল্যের পরেই তিনি নিয়মিত ভাবে সিনেমা বানাতে থাকেন। নির্মিত অন্যান্য সিনেমার মধ্যে সেলিম জাভেদ, ভাই আমার ভাই, শিমুল পারুল, জজ ব্যারিস্টার, প্রেম গীত, চাকরানী, হারানো প্রেম, সুপারম্যান, বিষে ভরা নাগিন, বীর সৈনিক অন্যতম।

  • আজিজুর রহমান

বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রথিতযশা নির্মাতা তিনি। প্রথম সিনেমা সাইফুল মুলুক বদিউজ্জামান। ষাটের দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত তিনি নিয়মিত সিনেমা বানিয়েছেন। তিনি বিশেষ করে অশিক্ষিত ও ছুটির ঘন্টার মত কালজয়ী সিনেমা নির্মাণ করে চিরঞ্জীবী হয়ে থাকবেন। তাঁর নির্মিত অন্যান্য সিনেমার মধ্যে মধুমালা, স্বীকৃতি, অতিথি, অমর প্রেম, মাটির ঘর, জনতা এক্সপ্রেস, যন্তর মন্তর, রঙিন রুপবান, দিল, জিদ, লজ্জা, ডাক্তার বাড়ী অন্যতম। কিংবদন্তি এই নির্মাতার সফলতার পালকে জাতীয় পুরস্কার যোগ না হওয়াটা অত্যন্ত হতাশাজনক ব্যাপার।

  • এহতেশাম

বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে বিখ্যাত হয়ে আছেন। উনি নবাগত নায়ক-নায়িকাদের অভিষিক্ত করানোর জন্য ‘শিল্পী গড়ার কারিগর’ হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। উনার হাত ধরেই অভিষেক ঘটেছে শবনম, শাবানা, শাবনাজ ও শাবনূরের। ১৯৬১ সালে তিনি প্রথম নির্মাণ করেন ‘এই দেশ তোমার আমার’, রাজধানীর বুকে উনার নির্মিত সেরা সিনেমা হিসেবে বিবেচিত। নব্বই দশকের শুরুতে ‘চাঁদনী’ নির্মাণ করে বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দেন। এছাড়া বাংলা ও উর্দু মিলিয়ে নির্মাণ করেন পিচ ঢালা পথ, চান্দা, চকোরী, দূরদেশ, শক্তি, চোখে চোখে, চাঁদনী রাতে-সহ বেশ সংখ্যক সিনেমা। একজন সফল পরিচালকের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সফল প্রযোজক।

  • দেওয়ান নজরুল

বাংলাদেশে ওয়েস্টার্ন ধাঁচের সিনেমা বানানোর জন্য তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। ১৯৭৭ সালে বলিউডের ‘শোলে’ অনুকরণে নির্মিত ‘দোস্ত দুশমন’ ছিল তাঁর পরিচালিত প্রথম সিনেমা। প্রথম ছবিতেই তিনি দারুন সাফল্য পান। একে একে নিজের ক্যারিয়ারে যুক্ত করেন বারুদ, আসামী হাজির, ওস্তাদ সাগরেদ, ধর্ম আমার মা, কালিয়া, মাস্তান রাজা, বাংলার নায়ক-সহ বহু ব্যবসাসফল সিনেমা। চিত্রনায়ক জসিমের সাথে তাঁর জুটি বাংলা চলচ্চিত্রে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হিসেবে বিবেচিত।

  • শিবলী সাদিক

বাংলা চলচ্চিত্রে দারুণ সব বাণিজ্যিক সফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি। ভিন্ন ভিন্ন গল্পে দর্শকদের আকৃষ্ট করেছেন তিনি। প্রথমে তিনি যৌথভাবে নির্মাণ করেন ‘বালা’ ছবিটি, একক ভাবে নির্মিত প্রথম ছবি ‘শীত বসন্ত’। ‘ভেজা চোখ’ এর মত মর্মস্পর্শী সিনেমা, ‘আনন্দ অশ্রু’ সিনেমাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ক্যারিয়ারে নির্মান করেছেন নোলক, তিন কন্যা, ত্যাগ, দূর্ণাম, দোলনা, অচেনা, সম্মান, মা মাটি দেশ, অন্তরে অন্তরে, মায়ের অধিকারের মত সিনেমা। তিনি বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে চিত্রনাট্যকার হিসেবে দু’বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।

  • ইবনে মিজান

সাড়া জাগানো রুপবান সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত ‘আবার বনবাসে রুপবান’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালনায় আসেন। ‘রাখাল বন্ধু’ নির্মাণ করে তিনি দারুণ জনপ্রিয় হন। ফোক-ফ্যান্টাসি নির্ভর ছবিতে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক – এই ধারার সিনেমাই তিনি বেশি বানিয়েছেন। তাঁর নির্মিত সিনেমার মধ্যে নিশান, বাহাদুর, এক মুঠো ভাত, লাইলী মজনু, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, রাজবধূ অন্যতম।

  • দিলীপ বিশ্বাস

তারকাবহুল সিনেমা বানানোর জন্য সুপরিচিত ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে অভিনেতা হিসেবে যাত্রা করলেও পরবর্তীতে পরিচালক হিসেবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠা পান। প্রথম সিনেমা ‘সমাধি’ দারুণ সফল হয়। ‘জিঞ্জির’ ছবিটি আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে উল্লেখযোগ্য সংযোজন।তাঁর নির্মিত প্রতিটি ছবিই বাণিজ্যিক সফল। ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে বন্ধু, অংশীদার, অনুরোধ, আনারকলি, অপেক্ষা, অস্বীকার, অজান্তে, মায়ের মর্যাদা অন্যতম। বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি দু’বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন।

এছাড়া বাংলা চলচ্চিত্রে বাণিজ্যিক সফলতা পাওয়া নির্মাতাদের মধ্যে খান আতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন, মুস্তাফিজ, কাজী জহির, নারায়ণ ঘোষ মিতা, মতিন রহমান, কামাল আহমেদ, তোজাম্মেল হক বকুল, মালেক আফসারী, এফ কবির চৌধুরী, সোহানুর রহমান সোহান, জাকির হোসেন রাজু, মনতাজুর রহমান আকবর, এফ আই মানিক, মমতাজ আলী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

https://www.mega888cuci.com