গোয়েন্দা গল্প ও টলিউড: বেটার লাভ স্টোরি দ্যান অ্যানিথিং

উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন জুটির হাত ধরে টলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একটা ট্রেন্ড সেট করে গিয়েছিল। আর সেটা হল নিখাঁদ রোম্যান্টিক ছবি। ধুদ্ধুমার একটা প্রেমের গল্প থাকবে, সেখানে ভাল কিছু রোম্যান্টিক গান থাকবে, উত্থান-পতন থাকবে, কখনো ট্র্যাজেডি থাকবে, কখনো ভূবনভোলানো ‍উচ্ছাস থাকবে – ঠিক ফর্মুলা সিনেমা।

না, এর মধ্যেই ৬০-৭০’র দশকে কলকাতায় ভিন্নধর্মী সিনেমা হয়েছে। স্রোতে গা না ভাসিয়ে ভিন্নরকম ছবি করেছেন কুশীলবরা। তবে, সেটা কখনোই মূল স্রোতে গিয়ে মোহনায় মিলতে পারতো না।

আর নব্বই দশক তো ছিল টলিউডের অন্ধকার যুগ। ওই সময় চিরঞ্জিৎ কিংবা প্রসেনজিতের একক দাপট ছিল, তারকাখ্যাতিও নেহায়েৎ কম ছিল না। কিন্তু, একটা গণ্ডীর ভেতরেই বারবার আবদ্ধ হয়ে পড়ছিল টালিগঞ্জ। ফলে, ইন্ডাস্ট্রিটা না হতে পারছিল বিকশিত, না হচ্ছিল বিশাল কোনো লাভ। ওই সময়টাতে টালিউড ও আমাদের ঢাকার সিনেমা মানে ঢলিউড পাশাপাশিই হাঁটছিল।

তবে, এখন যে সিনেমার দিক থেকে ঢাকার চেয়ে কলকাতা অনেক এগিয়ে সেটা বলে না দিলেও চলে। একটা ইন্ডাস্ট্রি বিকশিত হলে অনেক কিছু লাগে। একগাদা হল লাগে, একগাদা মাল্টিপ্লেক্স লাগে। লাগে হলে যেতে ইচ্ছুক এক গাদা দর্শক, দক্ষ মানের অভিনয়শিল্পী আর কিছু সুনিপুন পরিচালক। ফলে, এখনো অজস্র লোকসানের পরও টালিউডের সাথে হরহামেশাই তুলনা হচ্ছে বলিউড কিংবা দক্ষিণী সিনেমাগুলোর।

রহস্য রোমাঞ্চ জনরাটা কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাস্টিতে নতুন মাত্রা পেয়েছে। এর পেছনে বড় একটা অবদান আছে বাংলা সাহিত্যের। সত্যজিৎ রায় নিজেই নিজের সৃষ্টি ফেলুদার ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ উপন্যাস দুটিকে চলচ্চিত্রায়িত করেন। এই দুই ছবিতে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

এরপর আসেন সত্যজিতের ছেলে সন্দ্বীপ রায়। তিনি ফেলুদা সিনেমায় বাড়তি কোনো মাত্রা যোগ করতে না পারলেও তার আমলেই সবচেয়ে মোক্ষম এক ফেলুদাকে পর্দায় পাওয়া যায়। তিনি হলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী।

‘চিড়িয়াখানা’য় উত্তম কুমার

সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ফেলুদার ১০ টি কাহিনী চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। সত্যজিদের পরের আটটি হচ্ছে বাক্স রহস্য (১৯৯৬), বোম্বাইয়ের বোম্বেটে (২০০৩), কৈলাসে কেলেঙ্কারি (২০০৭), টিনটোরেটোর যিশু (২০০৮), গোরস্থানে সাবধান (২০১০), রয়েল বেঙ্গল রহস্য (২০১১)। এর সবগুলোতে ছিলেন সব্যসাচী।

পরে বয়সটা একটু বেশিই হয়ে যাওয়ায় সব্যসাচী আর দর্শক টানতে পারছিলেন না।  তখন, আনা হয় আবীর চট্টোপাধ্যায়কে। তিনি ২০১৪ সালে করে ‘বাদশাহী আংটি’। পরিচালক যথারীতি সন্দীপ রায়। ফেলুদার আরো কিছু সিনেমা তার করার কথা ছিল। কিন্তু, চুক্তি নিয়েই ঝামেলা বাঁধায় সেটা আর হয়নি।

তাই, ২০১৬ সালে এসে সন্দীপ আবার ফেরেন সব্যসাচীর কাছে। ডবল ফেলুদায় তাই আবার তাই ফেলু মিত্তিরের চরিত্রে দেখা যায় সব্যসাচীকে। সব্যসাচী এর আগেই অবশ্য বাংলা সাহিত্যের আরেক অনবদ্য রহস্য চরিত্র সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সৃষ্টি কাকাবাবু করে ফেলেছেন। এখন অবশ্য কাকাবাবুটা করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তিনি ‘মিশর রহস্য’ ও ‘ইয়েতি অভিযান’ নামে কাকাবাবুর দু’টি কিস্তি করেছেন। বুম্বাদার এককালের প্রতিদ্বন্দী চিরঞ্জিতও অবশ্য গোয়েন্দা গল্পে ‘ষড়রিপু’ সিনেমাটি করেন। এর পরের বছরই তিনি নীহাররঞ্জন গুপ্ত সৃষ্ট একটি বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ‘কিরীটি রায়’ করেন।

কিরীটি রায় নিয়ে সিনেমা অবশ্য আগে এবং পরেও হয়েছে। ‘কিরীটী ও কালোভ্রমর’ নামের ছবিটিতে ২০১৭ সালে কিরীটির চরিত্রে ছিলেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। ‘এবং কিরীটি’ নামের আরেকটি সিনেমায় কাজ করেছেন প্রিয়াঙশু চট্টোপাধ্যায়। তবে কিরীটি রায়ের চরিত্রটিতে মোটামুটি থিতু হয়ে গেছেন ইন্দ্রনীল। ২০১৮ সালে মুক্তি পেয়েছে তাঁর ‘নীলাচলে কিরীটি’।

কিরীটি রায় রূপে ইন্দ্রনীল

ইন্দ্রনীল গোয়েন্দাধর্মী আরেকটি সিরিজেরও নিয়মিত মুখ।সমরেশ বসুর গল্প অবলম্বনে তিনি অশোক ঠাকুর নামের এক গোয়েন্দা চরিত্র করেন। শিশুতোষধর্মী সিনেমা দু’টি হল ‘গোয়েন্দা গোগোল’ ও ‘গোগোলের কীর্তি’।

আর আবীর ফেলুদা থেকে বাদ পড়লেও দিব্যি করে যাচ্ছেন ব্যোমকেশ বক্সী সিরিজ। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে এরই মধ্যে ব্যোমকেশের ছয়টা সিনেমা করে ফেলেছেন তিনি। করেছেন ভিন্নধর্মী ‘বিদায় ব্যোমকেশ’ও। ব্যোমকেশের এই ছবিগুলো তিনি করেছেন তিনজন ভিন্ন ভিন্ন পরিচালকর নির্মানে। অঞ্জন দত্ত দিয়ে শুরু করে তিনি এখন থিতু হয়েছেন অরিন্দম শীলে।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যোমকেশ বক্সী হয়েছেন টলিউডের আরো দুই অভিনেতা। প্রথমজন হলেন যীশু সেনগুপ্ত। তিনি অঞ্জন দত্তর পরিচালনায় ব্যোমকেশের তিনটি সিনেমা করেছেন।  আর দ্বিতীয়জন হলেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। তিনি শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের ব্যানারে হৈচৈ অরিজিনাল সিরিজ ‘ব্যোমকেশ’-এ ব্যোমকেশ বক্সীর চরিত্র করেছেন।

বাংলা সিনেমায় ব্যোমকেশের শুরুটা অবশ্য করে দিয়ে যান স্বয়ং উত্তম কুমার। ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায় ‘চিড়িয়াখানা’। পরিচালনায় আবার ছিলেন সত্যজিৎ রায়। উত্তম কুমার নিজের ক্যারিয়ারে আরেকটি গোয়েন্দা চরিত্র করেছিলেন। সেটা হল নারায়ণ সান্যালের পি কে বসু। সিনেমাটি হল ১৯৭৪ সালের ‘আমি জানতেম’।

চিরঞ্জিৎ, কিরীটি রায়ের চরিত্রে

আরেকটা গোয়েন্দা গল্প ইদানিং বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে টলিউডে। সেটা হল গোয়েন্দা শবর। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টি করা এই চরিত্রটিতে তিনটি সিনেমা করে ফেলেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। পরিচালনায় আছেন অরিন্দম শীল।

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।