দেবী দর্শন, জয়া দর্শন

হুমায়ূন আহমেদ আমার প্রিয় লেখকদের মাঝে অন্যতম। তার সৃষ্ট অসংখ্য চরিত্রের মাঝে ‘মিসির আলি’ চরিত্রটি বেশ প্রিয়। শৈশবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মিসির আলি সিরিজের কিছু নাটক দেখেছি। সেখানে মিসির আলি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আবুল হায়াৎ। একসময় আবুল খায়েরও এ চরিত্রে অভিনয় করেন। পরবর্তীতে আরো কয়েকজন অভিনেতা এ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু আমাদের অধিকাংশের কাছে মিসির আলি বলতে আবুল হায়াৎ-এর চেহারা ভেসে ওঠে।

ছোটপর্দায় দেখা মিসির আলিকে কখনো বড়পর্দায় দেখা যায়নি১৯ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত। ১৯ অক্টোবর সারা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মিসির আলিকে দেখা গেল সেলুলয়েডের পর্দায়। কল্পনার সাদা-কালো মিসির আলিকে রঙিন পর্দায় নিয়ে আসার কৃতিত্ব দিতেই হয় জয়া আহসানকে। তাকেও কখনো প্রযোজনায় দেখা যায়নি ১৯ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত। ১৯ অক্টোবর অভিনেত্রীর পাশাপাশি তিনি ধারন করলেন নতুন পরিচয়, প্রযোজক।

আমাদের বর্তমান সময়ে ছোটপর্দার সেরা পাঁচজন অভিনেতার তালিকা করলে তিনি তাতে থাকবেন। সিনেমার নায়ক হিসেবেও তিনি কিন্তু সফল। ‘মনপুরা’, ‘টেলিভিশন’, ‘আয়নাবাজি’ – ছবিগুলোতে তিনি তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি চঞ্চল চৌধুরী। তাকেই বেছে নেয়া হলো মিসির আলি চরিত্রে, বড়পর্দায় মিসির আলি রূপে অভিষেক হলো চঞ্চল চৌধুরীর।

শবনম ফারিয়া ছোটপর্দার প্রিয়মুখ। নাটকে তার অসম্ভব জনপ্রিয়তা। তার প্রথম সিনেমায় অভিষেক হলো ১৯ অক্টোবর। তার আগ পর্যন্ত তাকে সিনেমায় কখনো দেখা যায়নি। তাকেও সিনেমায় পাওয়া গেল এবারই প্রথম।

অনম বিশ্বাস, কখনো সিনেমা পরিচালনা করেননি। এবার তিনি পরিচালকরূপে আত্মপ্রকাশ করলেন, ১৯ অক্টোবর।

এত প্রথমের জন্যই কিনা প্রথম দিনের প্রথম শো’য় দেখে ফেললাম জয়া আহসান প্রযোজিত, অনম বিশ্বাস পরিচালিত, হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘দেবী’। বলাকা সিনেওয়ার্ল্ডের সে শো ছিল ‘হাউজফুল’।

‘দেবী’ উপন্যাসটি আমরা অনেকেই পড়েছি। আমিও পড়েছি একাধিকবার। তাই বলতে গেলে পুরো উপন্যাসের দৃশ্যপট আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে আঁকা। আমি তাই উপন্যাসকে রঙিন পর্দায় খুঁজতে যাইনি, দেখতে গিয়েছি অনম বিশ্বাসের ‘দেবী’-কে।

ছবির প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি দৃশ্য আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে আমার পড়া ‘দেবী’র কথা। মনে হচ্ছিল আমি যা ভাবছিলাম, তাই যেন চিত্রায়িত হচ্ছে, ছবির পর ছবি এসে হাজির হচ্ছে আমার সামনে। এত নিখুঁতভাবে বইয়ের পাতার চরিত্রগুলোকে সিনেমার পর্দায় দেখতে পাব, ভাবিনি। দৃশ্যের পর দৃশ্য যেভাবে সাজানো হয়েছে তাতে মনেই হয়নি আমি অন্য কোন সিনেমা দেখছি। চমৎকারভাবে দৃশ্যগুলোকে সাজিয়ে আমাদের সামনে পরিবেশন করার জন্য সাধুবাদ জানাই পুরো ইউনিটকে।

বইয়ের গল্পকে এ সময়ের ছাঁচে ফেলে সাজিয়েছেন নির্মাতা। তাতে মূলগল্পের আবেদন কমেনি এতটুকু। বরং এ পরিবর্তন না হলে সিনেমাটি তার সৌন্দর্য হারাতো।পরিচিত কিছু জায়গায় পরিচিত গল্পের চিত্রায়ন অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। ছবিটির সিনেমাটোগ্রাফি চমৎকার ছিল, এডিটিং এ সময় দেয়া হয়েছে বোঝা গেছে। একটি তথ্য জানিয়ে রাখি, ছবিটি কিন্তু দুইবার এডিট করা হয়েছে।

ছবিতে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার ছিল রানু’র। সে একবার স্বাভাবিক থাকে তো পরক্ষণেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। এই যে রূপান্তর, এটা চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারন না করতে পারলে অভিনয় করা অসম্ভব। এই জায়গায় নিজের অন্যতম সেরা কাজটা করে দেখালেন ছবির প্রাণ, জয়া আহসান। তার চোখের ভাষা, সংলাপ প্রক্ষেপণ, শারীরিক অভিব্যক্তি, সবকিছুই যেন ছিল সেরার চেয়েও সেরা। তিনি যেন জয়া নন, তিনি রানু। হুমায়ূন আহমেদের রানু, অনম বিশ্বাসের রানু। ‘দেবী’র রানু, আমাদের জয়া আহসান।

কেন জয়া বর্তমান সময়ে দেশের সেরা অভিনেত্রী তা যদি জানতে চান তাহলে আপনাকে ‘দেবী’ দেখতে হবে। রানু চরিত্রে আর কারো পক্ষে এত নিখুঁত অভিনয় করা সম্ভবত সম্ভব নয়। একজন অভিনয় শিল্পীর বড়গুণ চরিত্রের বয়সের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া। জয়া সে কাজটি সুনিপুণভাবে করেছেন। ‘দেবী’ মুক্তির আগে বইয়ের রানুর বয়স ও জয়ার বয়স নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছিল। ছবি দেখলে বোঝা যায়, সে আলোচনা ছিল নিতান্তই অবিবেচকের কাজ। জয়া অভিনয়ে দিয়েই সে সমালোচনার দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন।

মিসির আলি চরিত্রে চঞ্চল কেমন করেন তা নিয়ে অনেকের মনে দ্বিধা কাজ করেছিল নিশ্চিত। তবে ছবিটি দেখার পর সে দ্বিধা আর থাকবেনা। চঞ্চল চৌধুরী মিসির আলি চরিত্রটিকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেললেন, তাকে এ চরিত্রে দেখতে কোন অস্বস্তিবোধই হয়নি। চুলকে সাদা করে নিয়েছিলেন, সংলাপ প্রক্ষেপণে গাম্ভীর্য এনেছিলেন। এ ছবি দেখার পর এ প্রজন্মের কাছে মিসির আলি বললেই চোখে চঞ্চলের ছবি ভেসে উঠবে নিশ্চিত।

শবনম ফারিয়া ‘নীলু’ চরিত্রে ভালো করেছেন। তার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল, সিনেমায় প্রথম অভিনয়, কেমন করেন তা নিয়ে একটা কৌতূহল কাজ করেছে সকলের মনে। তিনি সে চ্যালেঞ্জ জয় করেছেন। কিছু কিছু দৃশ্যে তার অভিনয় দেখে খুব তৃপ্ত হয়েছি। শবনম ফারিয়াকে বলবো, আপনি প্রথম পরীক্ষায় পাশ করেছেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবেন কিনা ভেবে দেখবেন, আপনাকে নায়িকা হিসেবে পেলে মন্দ হবেনা।

‘আনিস’ চরিত্রে অনিমেষ আইচ ঠিকঠাক ছিলেন। চরিত্রানুযায়ী তার বেশি কিছু করার সুযোগও ছিল না, যা করেছেন তাতে তিনি পাশ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর জয়ার সাথে তার জুটি দেখে পুরনো দিনের স্মৃতি মনে পড়েছিল।

ইরেশ যাকেরের অভিনয় তারমতোই ভাল ছিল, দর্শক তাকে দেখে মজা পেয়েছে। তাকে আরো বেশি সময় দেখার ইচ্ছেটা কিন্তু হয়েছে।

ছবির অন্যান্য চরিত্রগুলোর অভিনয় খারাপ ছিল না। পরিচালক অনম বিশ্বাস নিজস্ব মুন্সিয়ানায় অভিনয় আদায় করে নিয়েছেন সকলের।

‘দেবী’ চলচ্চিত্রের গল্প বলার ধরনটি দারুণ ছিল। একটি দৃশ্যের সাথে আরেকটি দৃশ্যের সংযোগ ছিল। কিছুই বাহুল্য মনে হয়নি। ছবিটিতে কিছু হাস্যরসাত্মক দৃশ্য দেয়া হয়েছে, যা দেখে দর্শক মজা পেয়েছে প্রচুর। আমি নিজেও হেসেছি। সংলাপ দিয়েই মানুষকে হাসানো যায়, ভাঁড়ামো করতে হয় না। অনম বিশ্বাস এ কাজটিতে সফল। এ ছবিটিতে কিছু কিছু ইলামেন্ট যুক্ত করা হয়েছে সাধারন দর্শকের কথা বিবেচনা করে, এমনটিই মনে হলো। তবে যা যুক্ত করা হয়েছে তা ছিল একদম খাপে খাপে মিলে যাওয়ার মতো। ছবিতে গান ছিল, তবে সেগুলো মোটেও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়নি। ভৌতিক দৃশ্যের চিত্রায়নে গা ছমছম করতে পারে দর্শকের, একথা বলাই যায়। ছবিটি দেখে আরো কিছু দেখার আগ্রহ তৈরী হয়েছে। অর্থাৎ, ছবিটি যেন হইয়াও হইলো না শেষ। এই বোধটুকু সাধারনত হলিউডের সিরিজ ছবিগুলো দেখে হয়।

আমি ‘দেবী’ দেখে তৃপ্ত। একটা দাবী কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, অন্তত যারা দেবী দেখবে তারা বলবে। ‘দেবী’র পর এর দ্বিতীয় কিস্তি ‘নিশীথিনী’ নিয়ে আসা জয়া আহসানের দায়িত্ব। সবচেয়ে তৃপ্তির জায়গা হলো জয়া আহসান বাংলাদেশে বেশ আলোড়ন তুলে নতুন ধারার ছবি নিয়ে এলেন। এমন ছবি আমরা বাংলাদেশে দেখে অভ্যস্থ নই। অনভ্যস্থ বাঙালিকে অভ্যস্থ করে তোলার এ চ্যালেঞ্জে জয়ার জয় হয়েছে, আমার কাছে তো বটেই। আপনার কাছেও হবে, ‘দেবী’ দেখে আসুন।

শেষ করার আগে, আরো একবার প্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসানকে ধন্যবাদ, এমন অস্থির সময়ে অসাধারন একটি চলচ্চিত্র উপহার দেয়ার জন্য। আপনি ভালোবাসা যা দেবেন আমরা তার দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেব। এভাবেই অভিনয় করে যান, ভালোবাসা পাওয়া কেউ আটকাতে পারবেনা।

প্রিয় জয়া, আপনি কিন্তু ভুলবেন না – ‘নিশীথিনী’ আপনাকেই করতে হবে।

ছবি রিভিউ: দেবী

পরিচালনা: অনম বিশ্বাস

কাহিনী: হুমায়ূন আহমেদ

সংলাপ ও চিত্রনাট্য: অনম বিশ্বাস

অভিনয়: জয়া আহসান, অনিমেষ আইচ, চঞ্চল চৌধুরী, শবনম ফারিয়া, ইরেশ যাকের প্রমুখ।

প্রযোজনা: জয়া আহসান

পরিবেশনা: জাজ মাল্টিমিডিয়া

https://www.mega888cuci.com