সেই জেদী ছেলেটাই আজ সেরাদের কাতারে

গভীর রাত, ছোট্ট শিশুটি হঠাৎ জেদ ধরে বসলো ব্যাডমিন্টন খেলবে। সেটিও সেই মূহুর্তেই। উপায় না পেয়ে তার জন্য তৈরি করা ব্যাডমিন্টন কোর্ট। এবং সেই রাতে তিনি ব্যাডমিন্টন খেলেই ঘুমালেন। একবার ভেবে দেখেছেন? কতোটা জেদি হলে এমন ইচ্ছা পূরণ করতে পারে!

ছোট বেলায় আজব সব স্বপ্ন যেনো শিশুটিকে ঘিরে রাখতো। বয়সটা যখন একটু বাড়তে থাকে তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ওহে বৎস! বড় হয়ে কি হতে চাও? শিশুটি হেসে উত্তর দিলো ‘আমি কটকটি বিক্রি করবো’। কিন্তু ছোট্ট শিশুটি কি তখন জানতেন, একদিন তিনি দেশের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন হবেন! হয়তো ভাবেনি, হয়তো ভেবেছিলো। কিন্তু ঐসবের গল্পের জন্য না হয় একটু অপেক্ষায় থাকি!

ছেলেটির ছিলো পড়াশোনার প্রতি ব্যাপক আগ্রহ। ছোট বেলা থেকেই বই-খাতাকে ভালোভাবেই আঁকড়ে ধরেছিলেন তিনি। পড়াশোনার বাহিরে বাড়তি নেশা জাগে ক্রিকেটের প্রতি। কিন্তু কিভাবে কি করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না কেউই। হঠাৎ করেই ক্রিকেটের রাস্তা খুলে যায় তার। বাবার হাত ধরে বগুড়ার ‘মাটিডালি ক্রিড়াচক্রের’ মাধ্যমে ক্রিকেটের পথচলা শুরু। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত কোচিং ব্যবস্থা না থাকায় মানিয়ে নিতে পারছিলেন না তিনি।

এভাবে বেশকিছুদিন কেটে গেলো। মাটিডালিতেই নিতে থাকলেন ক্রিকেটের শিক্ষা, আরেকদিকে পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে থাকলেন পুরো দমে। এবার হুট করে বড় মঞ্চে সুযোগ হয়ে গেলো ছেলেটির। বাবা খবর পেলেন বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিড়া প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ভর্তি ফ্রম ছেড়েছে! তাইতো দেরি না করে ছেলেটির জন্য একটা ফর্ম পূরণ করে জমা দিতে দেরি করলেন না। নিজেকে প্রমান করে পরীক্ষায় টিকে গেলো ছেলেটি। এরই সাথে নিদিষ্ট লক্ষ্য পূরণের প্রথম ধাপটা জয় করা শেষ। এখন লক্ষ্য একটাই ভালো কিছু করে দেখাতে হবে তাকে। হোক সেটা ক্রিকেটের ২২ গজে, আর হোক পড়ার টেবিলে!

বাংলাদেশের একমাত্র ক্রিড়া প্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে সুযোগ হবার পর শুরু হয় তার মূল ক্রিকেটীয় অধ্যায়। যেই ছেলে ছোট বেলার স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে ‘কটকটি’ বিক্রেতা হবেন সেই ছেলেটির এখন স্বপ্ন বড় হয়ে দেশসেরা ব্যাটসম্যান হবেন। এবার নিজেকে নিয়ে পরিশ্রম করতে থাকলেন তিনি। স্বপ্ন, অধ্যবসায় আর পরিশ্রম সব মিলিয়ে ছেলেটির এগিয়ে যাওয়া। নিজেকে প্রমান করে জায়গা করে নেন বিসিবির নানান বয়স ভিত্তিক দলে। এভাবেই সময় বেশ ভালোই যাচ্ছিলো ছেলেটির। এরপর হঠাৎ করেই কপাল খুলে যায় তার।

বয়স ভিত্তিক ক্রিকেটের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে রাস্তা খুলে গিয়েছিলো জাতীয় দলে। তবে, সেই সময় তাকে একজন উইকেটরক্ষক হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। যেভাবেই হোক না কেনো ছেলেটির উপর নজর পড়ে যায় বিসিবির। ডাক পেয়ে যান ইংল্যান্ড সফরের স্কোয়াডে। সেটিও ২০০৫ সালের ঘটনা।

বয়সটা সবে ১৮ পেরিয়েছে! এই বয়সে ইংল্যান্ডের বাউন্স উইকেটে ছোটখাটো গড়নের মানুষটির জায়গা পাওয়া তো চাট্টিখানি কথা নয়। বয়সে ছোট হলে কি হবে! প্রস্তুতি ম্যাচে খেলতে নেমেই বাউন্স উইকেটে বাজিমাৎ করে বসে ছেলেটি।উইকেটরক্ষক হিসেবে বিবেচনা করায় হয়তো নিজের উপর একটু বেশীই জেদ করে বসেছিলেন তিনি। তা না হলে অচেনা পরিবেশের সাথে অপরিচিত উইকেটে হঠাৎ ব্যাট হাতে তান্ডব দেখানোর তো কথা নয়!

সেবার প্রস্তুতি ম্যাচে সুযোগ পেয়ে সাসেক্সের বিপক্ষে ৬৩ এবং নটিংহ্যাম্পশায়ারের বিপক্ষে অপরাজিত ১১৫* রানের ঝকঝকে ইনিংস উপহার দেন ছোটখাটো গড়নের ছেলেটি। সেই সাথে পথ সুগম হয়ে যায় জাতীয় দলের হয়ে খেলার। সেবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টেই অভিষেক হয় ১৮ বছর বয়সী তরুণ উদীয়মান এই উইকেটরক্ষকের। যদিও শুরুটা রাঙ্গাতে পারেননি। অভিষেক ম্যাচে মাত্র ১৯ রানেই আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরতে হয় তাকে, যদিও সেদিন বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ে মাত্র ৩ জন ব্যাটসম্যান ২ অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পেরেছিলো!

সেই পথচলা শুরু।

__________

সময়ের সাথে সাথে নিজেকে দারুণ ভাবে গুছিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। সুযোগ করে নিয়েছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। শুধু কি সুযোগ? না, পেয়েছিলেন অধিনায়কত্বের দায়িত্ব। ২০০৬ সালে লাল-সবুজের জার্সিতে সেবার বাংলাদেশ দলকে নিয়েছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে! সেই ১৯ বয়সেই সাথে পেয়েছিলেন সাকিব-তামিমকে। শুধু সঙ্গী হিসেবে নয়, ছিলেন তাদের লিডার। সবমিলিয়ে অ-১৯ দলের হয়ে ৩ টেস্ট এবং ১৮ ওয়ানডে ম্যাচে দুর্দান্ত ব্যাটিং করেছিলেন তিনি। প্রমান স্বরূপ, টেস্টে ৩১ এবং ওয়ানডেতে ৩৫ গড়ে করা সেই পারফরম্যান্সগুলো।

এভাবে বেশকিছুদিন কেটে গেলো। বাংলাদেশ দল তখন জিম্বাবুয়ে সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সেবার প্রথমবারের মতো ওয়ানডে স্কোয়াডে জায়গা হয়ে যায় তার। সেটিও ২০০৬ সালের দিকে। সাকিব-রেজার সাথে সেবার ডাক পেয়ে নিজের অভিষেক সিরিজে একমাত্র ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে ১৮ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি।

টেস্ট- ওয়ানডে ক্রিকেটের পর ক্রিকেটের মারমুখী ফরম্যাট টি-টোয়েন্টিতেও সুযোগ পেয়ে যান তিনি। সেটিও ২০০৬ সালেরই ঘটনা। সফরকারী জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে নামের পাশে সুবিচার করতে না পারলেও টি-টোয়েন্টি জার্সিটা গায়ে দেবার সুযোগ হয়েছিলো তার।

সেই থেকে বড় মাঠে পথচলা শুরু। নানান চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ দেশের সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় সবার উপরেই রয়েছে তার নাম। দুর্দান্ত পরিশ্রম আর সাধনা ছেলেটিকে এতোদূর নিয়ে এসেছে। তবে! মুদ্রার উল্টো পিঠটাও দেখতে হয়েছে তাকে। আসুন গল্পে গল্পে তাকে নিয়ে আরো জানার চেষ্টা করি।

স্বপ্ন ছিলো একদিন লাল-সবুজের জার্সিতে মাঠ মাতানোর, সেটা পূরণ করতে পেরেছেন তিনি, পেরেছেন বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে। পেরেছেন কোটি ভক্তের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে। কখনোবা নিজেকে চিনিয়েছেন অন্যরূপে আবার কখনোবা চেনা রূপে! কখনো হয়েছেন নায়ক, আবার কখনো খলনায়ক। সবটা মিলিয়ে আজ তিনি দেশের সবচেয়ে পরিশ্রমী ক্রিকেটার হয়েছেন, পেয়েছেন মিস্টার ডিপেন্ডেবল তকমা।

এতোক্ষণে বুঝে গেছেন আমি কাকে নিয়ে কথা বলছি! হ্যাঁ আমি দেশসেরা ব্যাটসম্যান মিস্টার ডিপেন্ডেবল খ্যাত মোহাম্মদ মুশফিকুর রহিমের কথায় বলছি। এই মুশফিককে বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তরা চিনবে না তা কি হয়? এই মুশফিকে রচিত হয়েছে অনেক ইতিহাস। তৈরি হয়েছে অনেক নতুন অধ্যায়। একনজরে দেখে নেওয়া যাক মুশফিকের কিছু দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্সগুলো।

  • এক চার, নতুন ইতিহাস

সময়টা ১৭ মার্চ ২০০৭ সাল। বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের স্বরণীয় একটা দিন। সেদিন বিশ্বকাপ মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত। মাশরাফির চার উইকেটে ম্যাচের লাগামটা তখন লাল-সবুজের দিকেই। শুরুতে তামিমের ফিফটি, মাঝখনে ফিফটির পর সাকিবের বিদায়! ক্রিজে তখন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন ছোটখাটো গড়নের মুশি। শুধু এগিয়ে নয়, দুর্দান্ত এক বাউন্ডারিতে সেদিন বাংলাদেশকে ম্যাচটি জিতিয়েই মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি। খেলেছিলেন ৫৬ রানের অসাধারণ একটা ইনিংস। যেটাই তৈরি হয়েছিলো নতুন ইতিহাস।

  • টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরি

সময়টা যাচ্ছিলো নিজস্ব গতিতে। পেছনে ফিরে তাকানোর সময় নেই, যেতে হবে সামনে, প্রমাণ করতে হবে ব্যাট হাতে, জয় করতে হবে কোটি ভক্তের মন। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে কোথায়? ১৬ টেস্ট খেলা শেষ, নামের পাশে সেঞ্চুরির সংখ্যা ০! পরিসংখ্যান কিছুটা অবাক হলাম! তবে সেই অবাক হবার পরের ম্যাচটিতেই বাজিমাৎ করে বসলো ছেলেটি। নিজের ১৭ তম ম্যাচেই সেই কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে যান তিনি। সেদিন ভারতের বিপক্ষে দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ১০১ রানের অসাধারণ বীরত্ব গাঁথা একটা ইনিংস উপহার দিয়েছেন এই ডিপেন্ডেবল!

  • প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি

২০১১ সাল! মাঠে নামার আগে ৯৫ ম্যাচ খেলা শেষ! কিন্তু নামের পাশে তখনো যুক্ত হয়নি তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার! একটু অবাক করার মতো ঘটনা। কিন্তু এমনটাই হয়েছিলো মুশির ক্ষেত্রে। যদিও একবার খুব কাছে গিয়ে সেঞ্চুরি মিসের আক্ষেপে পুড়তে হয়েছিলো তাকে। কিন্তু ১৬ আগষ্ট নতুন করে আফসোসে পড়তে হয়নি তাকে, সেদিন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তুলে নিয়েছিলো ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি! খেলেছিলেন ১০১ রানের ঝকঝকে ইনিংস। সেটিও অবাক করার মতো, কেনোনা নিজের টেস্ট সেঞ্চুরির ম্যাচেও ১০১ রানের ইনিংস উপহার দিয়েছিলেন তিনি!

__________

সেঞ্চুরি বলেন আর ফিফটি বলেন, এইসব কিছু দিয়ে সবসময় একটা ব্যাটসম্যানকে বিচার করা যায়না। দেখতে হয় ক্লাসটা! তবে এই ক্লাসের টপার মুশফিক। যদিও এই মুশফিকের একটা সময় জাতীয় দলেই খেলা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিলো। সময়টা ২০০৭ বিশ্বকাপের পর! টানা ৫ ওয়ানডে ম্যাচে নামের পাশে যুক্ত করেছিলেন মাত্র ৪ রান। ফলাফল স্বরূপ দল থেকে বাদ।

কিন্তু মুশফিক তো ঘাবড়ে যাবার পাত্র নয়। যেই ছেলে দিনরাত পরিশ্রম করে নিজেকে সেরা প্রমানের সে তো এই অল্প ঝড়ে ঘাবড়ে যাবার নয়। তাইতো ঘাবড়ে না গিয়ে কাজ করেছেন নিজেকে নিয়ে, ফিরেছেন ক্রিকেটে, নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ দলকে! নামের পাশে যুক্ত করেছেন অসংখ্য রেকর্ড, জায়গা করে নিয়েছেন সেরা উইকেটরক্ষকদের কাতারে। কতোটা আত্মবিশ্বাস আর মনোবল থাকলে এমন ভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ধরেই নেওয়া যায় মিস্টার ডিপেন্ডেবলকে।

__________

মুশফিক! একজন পরিশ্রমী ক্রিকেটারের নাম। যিনি ছুটির বেশীরভাগ সময় কাটিয়ে দেন অনুশীলন করে। হয়তো এটাই তার এগিয়ে যাবার কারণ। মুশফিক তার ক্যারিয়ারে অনেক রেকর্ডের সাক্ষী হয়ে আছেন। অনেক ইতিহাস রচিত হয়েছে তার ব্যাটে। আজ সেই ইতিহাসের দুয়েকটা তুলে ধরার চেষ্টা করা যাক!

লিখতে গিলে অনেক কিছুই মনে পড়ে, মনে পড়ে ক্রিকেটের ২২ গজের অসংখ্য স্মৃতি, মনে পড়ে নায়ক বনে যাবার সেই মজার মূহুর্তগুলো। কিন্তু সবটা তো লিখে প্রকাশ করা যায়না, তবে চেষ্টাতো করতেই পারি।

  • ৩২১ বলের ইতিহাস

বাংলাদেশ তখন শ্রীলঙ্কা সফরে। শক্তিশালী শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের সামনে ৫৭০ রানের বিশাল রানের পাহাড় দাঁড় করিয়ে ইনিংস ঘোষণা করলো লঙ্কানরা। বিশাল লক্ষ্যে খেলতে নেমে ১৭৭ রানে ৪ ব্যাটসম্যান সাজঘরে। ইনিংস হারের সম্ভাবনা জেগে উঠলো। কিন্তু তখনি ব্যাট হাতে রূঢ়মূর্তি ধারণ করলেন বদলে যাওয়া মুশফিক। সেদিন দুর্দান্ত ব্যাটিং করে ২০০ রানের ইনিংস উপহার দেন তিনি। যেটি ছিলো বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম কোনো ব্যাটসম্যানের টেস্ট ডাবল সেঞ্চুরি। সেদিন ৩২১ বলের মোকাবিলা করেছিলো মিস্টার ডিপেন্ডেবল।

  • ৫৮৯ মিনিটের গল্প

৫৮৯ মিনিট! সেটিও আবার ক্রিজে কাটিয়ে দেওয়া; এতো চাট্টিখানি কথা নয়। কিন্তু নামটা যেখানে মুশফিকুর রহিম, সেখানে অবাক হবারও কিছু নেই। কেননা, যেই ব্যক্তি নিজের ছুটিতেও অনুশীলনে মনোযোগী হয়ে থাকেন সেই মানুষের ৫৮৯ মিমিট ক্রিজে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কঠিন কিছু নয়! কিন্তু এটিই যে একটা ইতিহাস।

আর সেই ইতিহাসের জন্মটা মুশফিকের মাধ্যমেই। এইতো কদিন আগের ঘটনা। সফরকারী জিম্বাবুয়ে বিপক্ষে ৫৮৯ মিমিট ক্রিজে থেকে সাদা পোশাকে দেশের পক্ষে সর্ব্বোচ (২১৯*) রান করার রেকর্ড গড়েন। শুধু তাই নয়, বিশ্বের প্রথম উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় বারের মতো ডাবল সেঞ্চুরি করার রেকর্ডও গড়েন তিনি।

__________

এছাড়াও টেস্ট ক্রিকেটে অনেক সাফল্য গাঁথা ইনিংস খেলার রেকর্ড রয়েছে তার, ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের মাঠে দুর্দান্ত ব্যাটিং, ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরি সহ টেস্ট ক্রিকেটে মোট ৭ বার ছুঁয়েছেন ৩ অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার, মজার বিষয় হলো এই সাতবারের মাঝে ৩ বার করেছেন ডাবল সেঞ্চুরি, রয়েছে ১৫৯ রানেরও একটি ইনিংস। সাক্ষী হয়ে আছে কিছু জয়ী ম্যাচের।

__________

টেস্ট ক্রিকেটের পারফর্ম বাদ দিলে আসবে ওয়ানডের কিছু সাফল্য। ওয়ানডে ক্রিকেটে মুশি নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত, দলের প্রয়োজনে কখনো ঠান্ডা মাথায় এগিয়ে নেওয়া, আবার কখনো মারমুখী ব্যাটিং করে দ্রুত রান তুলে দলকে নিয়ে যাওয়া সম্মানজনক পজিশনে, সবটাই দায়িত্বের সাথে করে যাচ্ছেন তিনি। রয়েছে অনেক সাফল্যগাঁথা স্কোর, কখনো দলকে জেতাতে পেরেছেন আবার কখনো পারেননি। আসুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্কোর জানার চেষ্টা করি।

  • ৫৫.১৭% রান

প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা, দল তখন দারুণ ব্যাটিং বিপর্যয়ে, মাত্র ১ রানে ২ উইকেটের পর ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে হলো তামিম ইকবালকে। এমন পরিস্থিতিতে দলকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব পড়লো অভিজ্ঞ মুশফিকের উপর। অবশ্য সেদিন সেই দায়িত্ব ভালোভাবেই পালন করেছিলেন মুশফিক, খেলেছিলেন ১৪৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ এক ইনিংস, সেদিন তামিমের ত্যাগে শেষ দুই ওভারে চার-ছক্কায় গ্যালিরি মাতিয়ে তুলেছিলেন মুশি। সেদিন দলের মোট রানের ৫৫.১৭% রানই এসেছিলো মিস্টার ডিপেন্ডেবলের ব্যাটে।

__________

দলের প্রয়োজনে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ন ইনিংস খেলেছেন তিনি। কখনো সেই ইনিংস গুলো দলকে জিতিয়ে দিয়েছে আবার কখনো ভালো খেলেও শেষ হাসিটা হাসা হয়নি তার। মুশি বিগত কয়েকবছরে কতোটা এগিয়েছে তা তার ব্যাটিং দেখলেই চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়। এই কয়েকবছরে নামের পাশে যুক্ত করেছেন ৭ টি সেঞ্চুরি।

শুধু তাই নয়, সেঞ্চুরি রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বড় বড় দলের বিপক্ষে। রয়েছে ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ উইনিং ইনিংস। এছাড়াও ছোট-বড় অনেক ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছেড়েছেন তিনি, নামের পাশে যুক্ত করেছেন মিস্টার রানমেশিন তকমা। যদিও সেঞ্চুরির সংখ্যাটা আরেকটু বেশী হতে পারতো, কিন্তু নিজের খামখেয়ালিতে সেটা আর হয়ে ওঠেনি।

__________

ওয়ানডে ক্রিকেটে এমন অনেক সাফল্যময় ইনিংস খেলেছেন, দলকে জিতিয়েছেন বিশ্বকাপ মঞ্চের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে। কখনোবা ধারণ করেছেন রূঢ়মূর্তি, আবার কখনোবা হয়েছেন সমালোচিত। তবে কখনো দমে যাননি, লড়াই করেছেন এবং ফিরেছেন পূর্বের থেকেও শক্তিশালী হয়ে।

__________

ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ দুই ফরম্যাট বাদ দিলে সামনে আসবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের স্মৃতি। অবশ্য এই ফরম্যাটটা মুশির জন্য বাজে বলায় যায়, যদিও বর্তমান সময়ে মানিয়ে নিয়ে খেলার বেশকিছু নজির রয়েছে তার। বেশকিছু ম্যাচ উইনিং ইনিংসগুলো যেনো একেকটি ইতিহাস! আসুন দুয়েকটা ইনিংস দেখে নেওয়া যাক।

  • নাগিন ড্যান্সের স্মৃতি

এইতো সেদিন, প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। বিশাল লক্ষ্যমাত্রা সামনে দেখে বলদে গেলো মুশির ব্যাটিং স্টাইল। যদি বলি, হাথুরুর বিপক্ষে সেটি ছিলো মুশির প্রতিবাদী ইনিংস! তাহলেও হয়তো ভুল হবেনা। সেদিন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মাত্র ৩৫ বলে ৭৫ রানের ম্যাচ উইনিং ইনিংস উপহার দিয়েছিলেন তিনি। সেদিন রচিত হয়েছিলো ইতিহাস। বাংলাদেশ পেয়েছিলো রেকর্ড রান তাড়া করে জয়ের দেখা। আর সেই জয়ের নায়ক মিস্টার রানমেশিন। সেদিন মুশির সাথে দলের সবাই মেতে উঠেছিলো নাগিন ড্যান্সে!

  • ভারত বধের গল্প

৩ নভেম্বর ২০১৯ সাল! বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ভারত। জয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৪৯ রান। জয়ের সুবাতাস পাচ্ছিলো বাংলাদেশ। আর সেই জয়ের মূল কারিগর মুশফিকুর রহিম। সেদিন ৮ চারের সাথে ১ ছক্কায় অপরাজিত ৬০ রানের ম্যাচ উইনিং ইনিংস খেলেছিলেন মুশি, দল জিতেছলো ৭ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে।

__________

এছাড়াও ক্রিকেটের এই ফরম্যাটে কিছু ম্যাচ উইনিং ইনিংস ছাড়াও সাক্ষী হয়ে আছেন অনেক ম্যাচ জয়ের। আবার কখনো দুর্দান্ত খেলেও দলকে না জেতানোর আক্ষেপটাও কম নেই। তবে, অন্য ২ ফরম্যাটের থেকে এই ফরম্যাটে অনেকটা পিছিয়ে ছিলো মুশি, যদিও গত ২/৩ বছরের রেকর্ড পরিবর্তন এসেছে মুশির ব্যাটে।

__________

এতোক্ষণ তো মুশফিকের বিপক্ষে অনেক কিছুই জানলাম। তবে জানার বাহিরে অনেক কিছুই রয়েছে। মুশফিককে যেমন দেশসেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে সবাই জানে, তেমনি তিনি আবেগী এটাও সবাই জানে। ব্যাট হাতে যেমন হয়েছেন অনেক ম্যাচ জয়ের নায়ক, তেমনি বহুবার হয়েছেন খলনায়ক! ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্তে গিয়ে নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে যেমন নিজে আফসোসে পুঁড়েছেন তেমনি নিরবে কেঁদেছেন বহুবার।

মুশফিকের কথা মনে করতেই ভেসে উঠে এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২ রানে হারার পর সাকিবের বুকে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য, ভেসে উঠে ২০১৯ বিশ্বকাপে খলনায়কে পরিণত হবার পর আবেগী সেই স্মৃতি!

__________

জয়ের পর নাগিন ড্যান্স করে যেমন এসেছেন আলোচনায়, তেমনি জয়ের আগে সেলিব্রেশন করে ম্যাচ হারের পর হয়েছেন সমালোচিত। কখনো নিজের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে জ্বলে উঠেছেন আগুনে রূপে! বাজে অধিনায়কত্বের কারণে সমালোচনায় এসেছেন অনেকবার। কিন্তু তাতে কি? তার অধিনায়কত্বে টাইগার ভক্তরা হেসেছে অনেকবার। ব্যাটিংয়ে নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে যেমন নিরবে কেঁদেছেন তেমনি সমালোচনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে রাজ করেছেন ক্রিকেটের ২২ গজ।

শুধু রানের দিক দিয়ে নয়, ক্লাসিকাল ব্যাটিং, আর নিখুঁত টাইমিংয়ের কারণে তাকে দেশসেরা ব্যাটসম্যান তকমা দিয়েছে ক্রিকেটবোদ্ধারা। দিনশেষে তাকে নিয়ে যতোই সমালোচনা হোক না কেনো একজন মুশফিকের অবদান সবাই বোঝে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।