কফি হাউজ ও ইতিহাসের আকর্ষণে

আচ্ছা কফি হাউজের যে খ্যাতি, যে নাম ডাক, যে জনপ্রিয়তা আর যে সরগরম অবস্থা, চারদিকের মুখরতা কফি হাউজ কি আজ থেকে বহু বছর আগে, ঠিক করে বলতে গেলে মান্নাদের তুমুল জনপ্রিয় ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানের আগে থেকেই এমন ছিল নাকি তার গানই কফি হাউজকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে?

ভীষণ ব্যস্ততা আর কোলাহল মুখরতায় যায়গা না পেয়ে আর এক দম্পতির পাশে দাড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাদের সাথে পরিচিত হয়ে তাদের প্রতি আমার জিজ্ঞাসা ছিল এটাই।

কিন্তু তারা আমার এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারেন নি। আমাকে বোঝাতে চেয়েছেন যে আগে থেকেই কফি হাউজের ব্যাস্ততা ছিল আর আজও তেমনই ব্যাস্ততম রয়ে গেছে কফি হাউজ।

কিন্তু আমার প্রশ্ন ছিল কফি হাউজের জনপ্রিয়তা, খ্যাতি, দুই বাংলার আপামর জনসাধারণের কাছে, বিশেষ করে যারা একটু পড়াশুনা করেছে, দুই চারটি গান শুনেছে, ভালো লাগার গানে নিজের ঠোঁট মিলিয়েছে। তাদের কাছে কফি হাউজ কি আসলেই মান্নাদের গানই জনপ্রিয় আর এতটা আলোচিত করে তুলেছে? নাকি আগে থেকেই কফি হাউজের এই খ্যাতি বিদ্যামান ছিল?

কিন্তু আমার মনপুত উত্তর যে তাদের কাছেও নেই সে বেশ বুঝতে পারলাম। তারপর ঝটপট একটা টেবিল খালি হতেই সেই অপরিচিত দম্পতি আর আমি তিনজন মিলে তিনটি চেয়ারের একটি টেবিলে বসে পড়লাম কফি হাউজের তৃতীয় তলার বেলকোনিতে।

তখন সন্ধ্যা ঠিক সাতটা। এর আগে কতবার যে কোলকাতায় এসেছি তার সঠিক হিসেব আমার কাছে নেই! কিন্তু কেন যেন, আর কিভাবে যেন কফি কখনো কফি হাউজে আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিছুতেই কেন যেন সময় বের করতে পারিনি কোনদিনই। কিন্তু এবার হুট করে আসা কোলকাতায় একটা অন্যতম আকর্ষণ আর আগ্রহ ছিল কফি হাউজে যাবো একটু সময় পেলেই। অন্তত একবার ঢুঁ মেরে আসতেই হবে আমাকে।

দ্বিতীয় দিন সকাল থেকে আকাশ ভালো থাকলেও। দুপুরের আগে থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি আর দুপুর নাগাদ তুমুল বৃষ্টিতে কোলকাতা শহর যেন ভেসে যায় পারলে। মন খারাপই হল বৃষ্টির অঝোর ধারায় ঝরে পরা দেখে। কিন্তু সময় যখন হাতের মুঠোয়, তুমুল বৃষ্টি একটু ধরে এসে গুড়িগুড়িতে রূপ নেয়ার পরেই শেষ চেষ্টা করে দেখবো বলে বেরিয়ে পরলাম রুম থেকে। হাতের ব্যাগপত্র যা ছিল সারাদিনের কেনাকাটা রেখে।

এসপ্ল্যানেড থেকে লোকাল বাসে চেপে বসলাম। গন্ত্যব্য কলেজ স্ট্রিট। কারন কফি হাউজটা সেখানেই অবস্থিত। কতশত আন্দোলন, কতশত স্বাধীনতার ডাক, পরাধীনতা থেকে বাঁচার প্রয়াস, নিজেকে মুক্ত করার কতশত প্রচেষ্টা, কত প্রেম-ভালোবাসা, হাসি-ঠাট্টা, সফলতা-ব্যারথতা, ব্যাথা-বেদনা-হাহাকার, জয়োল্লাস, উৎসাহ, উদ্দীপনা, অনুপ্রেরণার সূতিকাগার এই কফি হাউজ সে শুধুমাত্র কফি হাউজ আর এর ইট, কাঠ, পাথর, লোহার বেড়া, শত বছরের পুরনো, জীর্ণ মিটার জানে আর জানে এই কফি হাউজের কালের সাক্ষী চেয়ার-টেবিল।

সেই কফি হাউজের দিকে যাচ্ছি ভাবতেই একটা আনন্দ, একটা অস্থিরতা, একটা টানটান উত্তেজনা অনুভূত হচ্ছিল ভিতরে ভিতরে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল আমি যেন কফি হাউজ দেখতে যাচ্ছিনা, যাচ্ছি কফি হাউজে কোন গণআন্দোলনের মিটিং বা আলোচনার সাক্ষী হতে। আমি যেন কারো আহ্বানে ছুটে চলেছি কফি হাউজের পানে নতুন কোন গোপন মিশনের আয়োজনে।

কোলকাতার জ্যাম, গরম আর সিগনালের বাঁধা পেরিয়ে। পথের এই সব নানা রকম বাঁধা পেরিয়ে ৭ রুপীর টিকেট কেটে ৩০ মিনিটের মধ্যেই কলেজ স্ট্রিটে পৌঁছে গেলাম। এ যেন এক বইয়ের রাজ্য! থাক, কলেজ স্ট্রিটের এই বইয়ের রাজ্যের কথা পরে অন্য গল্পে বলবো।

একজনকে কফি হাউজের কথা জিজ্ঞাসা করতেই রাস্তার অদূরে একটি মোড় দেখিয়ে বললেন, ওই মোড়ের বামে ঢুকলেই হাতের বামে কফি হাউজ। শুনেই একটা টগবগে অনুভূতি টের পেলাম নিজের ভেতরে। বইয়ের রাজ্যের ফুটপাথ ধরে কিছুটা এগোতেই পেয়ে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই মোড়ের দেখা। যে পথে বামে মোড় নিলেই হাতের বামে বিখ্যাত সেই কফি হাউজ।

শত বছরের পুরনো, কতশত কালের সাক্ষী, নিজ নামে খ্যাতি অর্জন করে আজও তার আভিজাত্য জানান দিয়ে যাচ্ছে প্রতি বিকেলে, সন্ধ্যায় আর রাতের আঁধারে। হ্যাঁ ঠিক তাই। বামে মোড় নিয়ে হাতের বামে তাকাতেই চোখে পড়লো কাঙ্ক্ষিত কফি হাউজের উঁচু পুরনো দালানের নিয়ন আলো।

জরাজীর্ণ সিঁড়ি, বইয়ের দোকান, শত বছরের পুরনো লেটার বক্স, জং ধরা, ঘুণে ধরা প্রাচীন আমলের বৈদ্যুতিক মিটারের অবাক ঝুলে থাকা দেখতে দেখতে দোতালায় উঠে গেলাম, কফি হাউজের গেটে। শরীর মনে তখন একটা টগবগে উত্তেজনা।

গেটের কাছে গিয়ে দাড়াতেই যেন মনে হল মান্নাদের গানের চরিত্ররা সবাই দাড়িয়ে আছে কফি হাউজের সামনে। ঠিক সাতজন যেন দাড়িয়ে আছে একালের এক অনাগতকে দেখতে। চুপ করে সিঁড়িতে দাড়িয়েই যেন কিছুক্ষণ তাদের দেখলাম। তারপর তাদের অগোচরে ভিতরে ঢুঁকে বিস্মিত হয়ে গেলাম!

কারণ আমি ভেবে ছিলাম কফি হাউজ হবে বেশ শান্ত, ধিরস্থির, গুরু গম্ভীর আর বনেদী কোন পরিবেশ হবে বোধয়। মনে মনে আমার তেমনই কল্পনা ছিল।

কিন্তু একই দেখছি? চারদিকে তিল ধারনের ঠাই নেই বলতে গেলে। শতেক টেবিলের একটা চেয়ারও ফাঁকা নেই যে! কত মানুষ যে দাড়িয়ে আছে টেবিলের চারধারে একটি চেয়ার পেতে গুনে শেষ করা যাবেনা নিশ্চিত। দ্বিতীয় তলায় কোনভাবেই বসা তো দূরের কথা একটু দাঁড়াবার যায়গা না পেয়ে শেষে তৃতীয় তলার বেলকোনিতে উঠে পরলাম। কিন্তু সেখানেও যায়গা নেই এতটুকু।

যেহেতু যায়গা নেই তাই সময় নষ্ট না করে পুরো কফি হাউজের যতটা সম্ভব ঘুরে দেখতে লাগলাম ধীরে পায়ে হেটে হেটেই। বেশ ভালোই হল যায়গা না পেয়ে। কত যে দেয়ালচিত্র দেখতে পেলাম। কত রকম তৈলচিত্র, কত রকম অর্থের ছবি। কোথাও প্রেম, কোথাও ব্যাথা, কোথাও ভালোবাসা, কফির সাথে নারীর সম্পর্ক, হাসি, আনন্দ আর নানা রকম যন্ত্রণার চিত্র।

একটা একটা দেয়াল আর তৈলচিত্র যেন এক একটা সময়ের কথা বলছে। যেন আলাদা আলাদা কালের সাক্ষী হয়ে দেয়ালে ঝুলে আছে। দারুণ সব ছবি আর দারুণ একটা যায়গায়, কফু হাউজের দেয়ালে দেয়ালে।

অগণিত মানুষে মুখরিত কফি হাউজের সকল যায়গার ছবি তুলে নিজের মোবাইলে ধরে রাখলাম ইচ্ছামত। এক জনকে অনুরোধ করে নিজেরও একটি দুটি ছবি তুলে রাখলাম সৃতিময় আর খ্যাতিময় কফি হাউজের সাথে। এইসব ছবি তোলার মাঝেই কতশত একালের প্রেম, ভালোবাসা, আশা-আকাঙ্ক্ষার ছবি যে দেখতে পেলাম সেই গল্প অন্যদিনে।

এরই মাঝে দাড়িয়ে থাকা সেই দম্পতির সাথে দেখা, একটু পরিচিত হওয়া, যায়গা পেয়ে ভাগ করে বসে পরে কফি হাউজ নিয়ে আমার জিজ্ঞাসা আর আমার প্রত্যাশার সাথে কফি হাউজের কি মিল অমিল পেলাম সেই আলোচনা।

টেবিলে বসেই আমরা যার যার অর্ডার দিয়েছিলাম বেয়ারাকে। আমার জন্য কফি আর ওরা ওদের জন্য ফিস কাটলেট। প্রায় ২০ মিনিট নানা রকম গল্প করার পরে আমাদের যার যার খাবার এসে গেলো। ধোঁয়া ওঠা গরম কফি আর প্রখ্যাত কফি হাউজ। বাহ দারুণ কম্বিনেশন।

কফি হাউজে এসে এক কাপ কফি না খেলে যে কফি হাউজের অমর্যাদা করা হয়। তাই ২৫ রুপীর বিলাসবহুল দামেই গরম কফির মগে চুমুক দিতে দিতেই চোখ রাখছিলাম কফি হাউজের উপরে, নিচে, আনাচে-কানাচে, দেয়ালে দেয়ালে আর আশেপাশের টেবিলে টেবিলে।

দারুণ কেটেছিল সেই সন্ধ্যা, টেবিলে টেবিলে কপোত কপোতি দেখে, জনারণ্যে, দেয়ালে চিত্রে চোখ বুলিয়ে, কফি হাউজের ইতিহাস আর আকর্ষণে নিজেকে হারিয়ে।

https://www.mega888cuci.com