ক্লাস অব ‘৮৩: শক্ত চোয়ালের ববি ও আন্ডারওয়ার্ল্ড-এনকাউন্টারের রসায়ন

গুরুর ব্যর্থতার দুঃখ শিষ্য ঘোচাবে। এই লক্ষ্যেই নাসিকের পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার ছেড়ে মুম্বাইর ময়দানে নামে ৫ বন্ধু। একাডেমিতে ব্যাকবেঞ্চার, বাউন্ডুলে বলে পরিচিত ওদের শাস্তি হিসেবে বিতাড়িত করা যায়নি। একাডেমির ডীন সিং তাদের নিয়ে এক নিরীক্ষা চালাবে। দুই বছর আগে যেই গুন্ডাকে ধরতে গিয়ে দুর্নীতির যাতাকলে পড়ে তার পানিশমেন্ট পোস্টিং হয়েছিলো, সেই গুন্ডাকে খতম করবে এই পাঁচজন।

কাহিনীটা একটু শোনা শোনা লাগে? ৭০ এর দশকের বিখ্যাত শোলে ছবিতে ঠাকুর গাব্বারকে পাকড়াও করতে জয় আর ভীরুকে নিয়োগ দিয়েছিলো, ‘ক্লাস অব ‘৮৩’-তেও খানিকটা তেমনই।

ঠাকুরের জনপ্রিয়, ‘ও বদমাশ হ্যাঁয়, লেকিন বাহাদুর হ্যাঁয়; খাতারনাক হ্যাঁয় ইস লিয়ে কিউকে লাড়না জানতে হ্যাঁয়…’ এর মতো ডিনরূপী ববি দেওলও একটা ডায়লগ দেয়। পার্থক্য শুধু শোলের মতো ঝাঁজ পাওয়া যায় না। যাবেই বা কেন? ডায়লগবাজির দিন তো আর নেই। কিন্তু গল্প সেই পুরোনো। সেখানে তো নতুন কিছু ঢালতে হবে।

এখন, লেখক হোসেন জায়িদী নিজে ক্রাইম রিপোর্টার ছিলেন, আগেও তার বই থেকে শুটআউট অ্যাট ওয়াডাওয়ালা, ব্ল্যাক ফ্রাইডে হয়েছিলো। এনকাউন্টার, পুলিশি অপারেশানের ঘটনাগুলো তাই যথেষ্ট সত্যতা পায়। কিন্তু এখন ওসব গল্পও শোনা, দেখা।

তাই এই ছবিতে কোন টুইস্ট নেই, থ্রিল আছে, নতুনত্ব নেই। তবু ভালো লেগেছে। জানিনা, কেন সবাই এতো নেতিবাচক এটা নিয়ে।মেকিং খুবই অথেনটিক। কোনোকিছুই খেত অপ্রয়োজনীয় লাগেনি। হ্যাঁ, অ্যাকশন গুলো জমেনি। সবাই মনে হয় সেখানেই বিরক্ত। কিন্তু পাঁ পুলিশের অন্তর্দন্দ্ব, ববির রিভেঞ্জ – সব জমেছে।

ভালো লাগার অন্যতম কারণ এর কাস্টিং, অভিনয়শৈলী ও নির্মাণ। নির্মানের মধ্যে প্রোডাকশান ডিজাইন সবচেয়ে নজরকাড়া, তামাটে আর নির্জীব সবুজ মিশ্রিত কালারগ্রেডিংয়ে ৮০’র দশকের মুম্বাই দারুণ। সাথে ৯০’এর জনপ্রিয় সব অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমা ( গুপ্ত, মোহরা, ত্রিদেব…) এর সঙ্গীত পরিচালক ভিজু শাহর আবহ সঙ্গীত।

মানাস মিত্তালের সতেজ সম্পাদনায় পুরাতন চলচ্চিত্র বিভাগের তথ্যচিত্রকে চটপট ন্যারেটিভে বসানোটাও জমেছে। শেষবার অর্জুন রামপালের ড্যাডি ফিল্মে মুম্বাইর এতো অথেনটিক উপস্থাপনের প্রয়াস দেখেছিলাম।পরিচালক অতুল সাভারওয়াল আওরঙ্গজেবের পর পরিচালনায় ফিরে প্রমাণ করলেন, তিনি ক্রাইম জনরার মুভি খারাপ বানান না। আওরঙ্গজেবও আমার ভালো লেগেছিলো, এখন পর্যন্ত অর্জুন কাপুরের সবচেয়ে আন্ডাররেটেড অভিনয়।

অতুল নতুনদের অভিনয়টাও ভালোই করান। পাঁচ নতুন মুখকে পুলিশ অফিসারের চরিত্রে সাবলীল লেগেছে। বিশেষ করে শুকলা আর ভার্দে চরিত্রের দুজনের অভিনয় দেখে তো মনেই হয়নি এটা ওদের প্রথম কাজ।

নেপোটিজমে জর্জরিত বলিউডে রেড চিলি ও শাহ্রুখ খান এমন ভালো ভালো নতুনদের সুযোগ দিচ্ছেন। ভালো খবর। কিন্তু শাহ্রুখ নিজের জন্য কবে ভালো একটা পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাবেন? থাক, সে কথা!

‘ক্লাস অব ’৮৩’ দেখার মূল কারণ অবশ্যই ববি দেওল, তার গম্ভীর ও কঠোর চেহারা ডিন চরিত্রে মানিয়েছে। কিছু জায়গায় রক্তসুত্রে পাওয়া ডায়লগবাজি চলে আসলেও জায়গামত নিখুঁত ছিল তাঁর কাজ। কিন্তু এই সিনেমাটায় চরিত্রায়ন আরও দরকার ছিলো। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ‘রাত আকেলি হ্যাঁয়’ ছাড়া সব সিনেমাই দেড় থেকে দুই ঘন্টার মধ্যে গুটিয়ে ফেলা হয়।

সেখানে অভিযোগ নেই, কিন্তু এই মুভিটা আরও লম্বা হলে চরিত্রের বিস্তার বেশি হতো। কেননা, পাঁচ বন্ধুর দুই-এক জন ছাড়া কাউকেই ঠিকমতো চেনা হলো না। তাছাড়া, চমৎকার প্রোডাকশানের বদৌলতে জগৎটায় থাকতে ভালো লাগছিলো। গ্যাংস্টার কপ থ্রিলারগুলো দুই-আড়াই ঘন্টা হলেই বেশি জমে। এখানে থ্রিলগুলো জমছিলো, কিন্তু তাড়াহুড়া। পে অফের জন্য যথেষ্ট বিল্ড আপ নেই। হুট করে শেষ। হয়তো এই প্ল্যাটফর্মে এতোটুকুই মিলবে। না হলে, ‘ব্রিদ’, ‘পাতাল লোক’-এর মতো ওয়েব সিরিজ বানাতে হবে।

সব মিলিয়ে, আন্ডারওয়ার্ল্ডকে খতম করতে যে কখনো কখনো আইনের কঠিন বিধিনিষেধ অমান্য করাই যায়, সেই পুরান বার্তাই বহন করছে মুভিটা। এনকাউন্টারের সুযোগ নিয়ে আজকাল যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাতে বিষয়টা সময়োপযোগীও হলো না।

https://www.mega888cuci.com