বাংলার চার্লি জহর রায় ও তাঁর লাইব্রেরি

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

তাঁর অভিনয় আসার গুরু বলা যায় চার্লি চ্যাপলিনের ছবি দেখে। কিন্তু বহু পেশা ঘুরে সে দর্জির পেশা অবধি করে বহু দেশ ঘুরে তারপর চার্লির দেখানো পথেই নোঙর দিলেন জহর রায়।

জহরকে চার্লি বলেই ডাকতেন স্বয়ং সুচিত্রা সেন। বলা হয়, সেই থেকে জহর রায় বাংলার চার্লি চ্যাপলিন নামে পরিচিত।

সুচিত্রা সেন ও অন্যান্যদের সাথে বাংলার চার্লি (বাঁ-এ)।

পেরিয়ে এলাম গত বছর জহর রায়ের শতবর্ষ। হাসির ফোয়ারা জহর রায়কে আমরা চিনি। কমেডিয়ান জহর রায়কে আমরা জানি। কিন্তু মানুষ জহর রায়?

তাঁর বড় শখ ছিল বই পড়া। জহর রায়ের প্রথম ভালোবাসা ছিল বই। নিজের লাইব্রেরি ঘরটা তিনি নিজে হাতে বানান সেটি কিন্তু বাড়িতে বানাননি। ওনার লাইব্রেরি ছিল একটা মেসের ঘরে।

নিজের লাইব্রেরিতে জহর রায়।

বাড়িতে রাখতেন বউ আর মেসের ঘরে বই। লাইব্রেরির মেঝেতে আধশোয়া অবস্থায় বই পড়তেন মাদুর কি শতরঞ্জি পেতে এবং সঙ্গে সুরাপান করতেন। তাঁর কাছে পড়াশোনা ছিল মদ্যপানের অনিবার্য অনুষঙ্গ। আর মদ্যপানে বেশীরভাগ সময়ই মাত্রাজ্ঞানের ধার ধারতেন না। শেষে শরীরটাও ভেঙে গেছিল।

আমি শিল্পী দের ঐরকম উইকি লিখিনা একটু অন্য ভাবে লিখি সেটা শ্রদ্ধা রেখেই। তাই কেউ খারাপ ভেবে নেবেননা।

ছেলে মেয়েদের সাথে জহর।

কিন্তু জহরের পান্ডিত্য ছিল অসাধারণ। সব অভিনেতা অভিনেত্রীদের নিজের বইয়ের সংগ্রহ ডেকে নিয়ে দেখাতেন। কোন বই নতুন আনালেন ইত্যাদি।

সত্যজিৎ রায় কোন বই না পেলে জহর রায়কে বলতেন। ভেবে দেখুন তাহলে কতটা পান্ডিত্য জহর রায়ের। কোনো ডিগ্রী নেই কিন্তু পন্ডিত মানুষ ছিলেন। সেসব বই শুধু সিনেমার নয় সব বিষয়ে জানার তাঁর শিশুর মতো কৌতুহল ছিল।

কমেডির আরেক দিকপাল ভানু বন্দোপাধ্যায়ের সাথে একাধিকবার স্ক্রিন শেয়ার করেন।

পরিবারে তাঁর বইয়ের দাম হয়তো অতটা ছিলনা। অত বই কি সংরক্ষণ হল? কিন্তু এই মেসের ঘরটি পটুয়াটোলায় আজও আছে বন্ধ অবস্থায়।

নিজের সম্বন্ধে বলতেন, ‘অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করেন – কী করে এত হাসান বলুন তো?  এর কোনো উত্তর আমার জানা নেই। আমি জানি মানুষকে হাসাতে আমাকে হবেই। নিজের সব কিছু গোপন করে সকলের সামনে এসে সঙ সেজে দাঁড়াই। সবাই আমাকে দেখে হাসেন। আমি হাসির ট্রেডমার্ক। আমার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এইখানেই। আমার আসল গুলোকে মানুষরা নকল বলে ভুল করে। আমার দুঃখতেও ওঁরা হাসেন। ওরা ভুলে যান শ্লেট কালো, শ্লেট-পেন্সিলও কালো, কিন্তু লেখা হয় সাদা। কিন্তু ওঁদের হাসাতে যে আমাকে হবেই। আমি যে জহর রায়।’

স্ত্রী কমলার সাথে।

জহর রায়ের শেষযাত্রায় টালিগঞ্জ পাড়ার খুব একটা কেউ ভিড় করেনি এতো শিল্পীদের প্রাপ্তি শেষের পথের। কিন্তু তাঁর শেষ যাত্রা থেমে গেছিল পথ মধ্যে। কারণ, সুচিত্রা সেনের গাড়ি এসে থেমেছিল। গাড়ি থেকে নেমে সুচিত্রা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উঠে গেছিলেন জহর রায়ের লরিতে। জহর রায়ের কপালে একটা চুম্বন দিয়ে সুচিত্রা বলেছিলেন, ‘তুমি চলে গেলে চার্লি।’

https://www.mega888cuci.com