কালকের রাজা, আজকের ভিখারী

মেক্সিকোর বিপক্ষে জার্মানির ১-০ গোলে পরাজয়টা ছিল ওয়েক আপ কল। জার্মান পত্রিকায় ‘ডাই ওয়েল্ট’ সেদিন লিখেছিল – ‘জেগে ওঠ’। চ্যাম্পিয়ন জার্মানি চেষ্টার কমতি করেনি। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে সেট পিস থেকে টনি ক্রুসের অন্তিম মুহূর্তের গোলে নক আউট পর্বে ওঠার লড়াইয়ে ফিরেছিল তারা।

তবে শেষ রক্ষা হয়নি। জয় যেখানে বাধ্যতামূলক ছিল, সেখানে বুধবার রাতে ডাইম্যানশ্যাফটরা দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরেই গেল। দ্বিতীয় পর্বে ওঠা তো দূরের কথা, ‘এফ’ গ্রুপের চতুর্থ দল হিসেবে চলমান রাশিয়া বিশ্বকাপ শেষ করতে বাধ্য হলো জার্মানি। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, চার বছর আগে তো এই দলটার হাতেই উঠেছিল বিশ্বকাপের শিরোপা।

গেল ৮০ বছরের মধ্যে জার্মান কেবল নিষেধাজ্ঞার কারণে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ খেলতে পারেনি। এর বাদে আর কোনোবারই প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার কোনো নজির নেই। বিশ্বকাপের প্রথম পর্ব থেকেই তাঁরা বাদ পড়েছিল কেবল একবার, সেটা ১৯৩৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপের ঘটনা। ফ্রান্সের স্মৃতি এবার ফিরলো রাশিয়ায়।

তবে, চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে খেলতে এসে প্রথম পর্ব থেকেই ছিটকে  যাওয়ার এটাই প্রথম নজির নয়। বিশ্বকাপের গেল চার আসরেই এই ঘটনা ঘটেছে তিনবার।

  • ফ্রান্স (২০০২)

১৯৯৮ সালে নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ জয়ের পর ভালো একটা অবস্থানে থেকেই জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়েছিল ফ্রান্স। বিশ্বকাপজয়ী মাস্টারমাইন্ড কোচ অ্যাইমি জ্যাকুয়েট অবসর নিয়ে ফেললেও উত্তরসূরী রজার লেমেরেও দারুণ করছিলেন। তার অধীনেই দলটি ২০০০ সালের ইউরো জেতে। শীর্ষ খেলোয়াড়রা তখনও দারুণ ফর্মে। আর্জেন্টিনার সাথে ফ্রান্সও তাই ফেবারিট।

বিশ্বকাপ হবে থিয়োরি হেনরি অঁরি কিংবা ডেভিড ট্রেজেগুয়ের – এমনটাই ছিল অনুমান। তবে, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ার আর্সেনালের হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জেতা রবার্ট পিরেস ছিলেন। সংকট আরো প্রবল হয় যখন বিশ্বকাপের ঠিক আগের মুহূর্তে আগের বিশ্বকাপের নায়ক ও তৎকালীন দলবদলের বাজারে সবচেয়ে দামি তারকা জিনেদিন জিদানের উরুর ইনজুরি হয়।

গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের সঙ্গীরা ছিল সেনেগাল, উরুগুয়ে ও ডেনমার্ক। লস ব্লুজরা এই গ্রুপ দেখে ঘাবড়ায়নি। আর সেটাই তাদের কাল হয়। প্রথম ম্যাচ ছিল  নবাগত সেনেগালের বিপক্ষে। কিন্তু জিদানকে ছাড়া খেলতে নেমে আধঘণ্টার মধ্যেই ফরাসিরা ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে।  আর ম্যাচে ফেরা হয়নি তাদের। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আপসেট হিসেবে পরিচিত এই ম্যাচ।

উরুগুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে গোলশূন্য ড্র করে ফ্রান্স। এবারো ছিলেন না জিদান। ম্যাচের ২৫ মিনিটেই লালকার্ড নিয়ে মাঠের বাইরে জেতে বাধ্য হন অঁরি। শেষ ম্যাচটা ছিল ফ্রান্সের বাঁচা-মরার লড়াই। বাজে ভাবে ম্যাচটা শুরু করে লেমেরের দল। জিদান তখনও ফিট ছিলেন না। মাত্র ২২ মিনিটের মধ্যে ১-০ গোলে পিছিয়ে যায় চ্যাম্পিয়নরা। শেষঅবধি ২-০ গোলে হারে ফ্রান্স।

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ফ্রান্স। আগের আসরেই যারা ১৫টি গোলের বিপরীতে মাত্র দুই গোল হজম করেছিল এবার তারা কোনো গোল করা তো দূরের কথা, হজম করে তিনটি গোল। লেমেরে বরখাস্ত হন। প্রবীণ ফ্র্যাঙ্ক লেবয়েফ ও ইউরি জোরকায়েফ অবসর নিয়ে ফেলেন।

  • ইতালি (২০১০)

ফ্রান্স ২০০২ সালের বিশ্বকাপেও প্রবীণ ও তুলনামূলক ধীরগতির খেলোয়াড় নিয়ে গিয়েছিল। ইতালির ক্ষেত্রে সেটা হয়নি, পরিবর্তন এসেছিল বিস্তর। ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন দলের হিরো আলেসান্দ্রো নেস্তা, ফ্রান্সেসকো টট্টি অবসর নিয়ে ফেলেন আগেই। চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক ফ্যাবিও ক্যানাভারোর বয়স তখন ৩৬। ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন দল থেকে মাত্র সাতজন সদস্য সুযোগ পান ২০১০ সালের দলে।

কিংবদন্তি মার্সেলো লিপ্পির মত কোচ ছিলেন দলের দায়িত্বে। জিয়ানলুইজি বুফন, আন্দ্রে পিরলোর মত ভুবনজয়ী খেলোয়াড়রা আছেন। গ্রুপে ছিল নিউজিল্যান্ড, প্যারাগুয়ে ও স্লোভাকিয়া – বিশ্বকাপ ফুটবলে এর চেয়ে সহজ গ্রুপ আগে কেউ কখনো পেয়েছে কি না সে নিয়ে তর্ক পর্যন্ত চলতে পারে।

গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে প্রথমার্ধে ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল ইতালি। শেষ অবধি দ্বিতীয়ার্ধে একটা গোল পরিশোধ করে ১-১ গোলে ড্র করে আজ্জুরিরা। দ্বিতীয় ম্যাচেও একই দশা। মাত্র সাত মিনিটে নিউজিল্যান্ডে লিড পায়। ইতালি সমতা ফেরালেও আর জয়সূচক গোলটা পাওয়া হয়নি। স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচের আগে হিসাবটা ছিল পরিষ্কার – জিততেই হবে ইতালিকে।

কিন্তু লিপ্পির দল আবারো ঝিমিয়ে ঝিমিয়েই শুরু করে। পিছিয়ে যায় প্রথমার্ধেই। ৭৩ মিনিটে তারা ব্যবধান দ্বিগুণ করে। এরপর জমে ওঠে ম্যাচ। ৮১ মিনিটে গোল পরিশোধ করে ফেরার আভাস দেয় ইতালি। কিন্তু, ৮৯ মিনিটে আরেকটা গোল দিয়ে ফেলে স্লোভাকিয়া। ৯০ মিনিটে ইতালির শেষ গোলটি তাই ব্যবধান কমানো ছাড়া আর কোনো উপকারেই আসেনি। ৩-২ গোলে হারে চ্যাম্পিয়নরা।

বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় ইতালি। মার্সেলো লিপ্পি ব্যর্থতার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘একটা দল যদি তাদের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পায়ে আর মগজে ভীতি নিয়ে খেলতে নামে, তাহলে বুঝতে হবে কোচ দলটিকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে পারেননি। আমি ভেবেছিলাম যাদের আমি বেছে নিয়েছি, তারা ভিন্ন কিছু উপহার দিতে পারবে, অবশ্যই আমি ভুল ছিলাম।’

  • স্পেন (২০১৪)

স্পেন যখন ব্রাজিলের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপকে সামনে রেখে প্রস্তুত হচ্ছিল, তখন তাদের আশাবাদী হওয়ার অনেক কারণ ছিল। কারণ এই দলটাই তো ২০০৮ ও ২০১২ সালের ইউরো আর চার বছর আগের বিশ্বকাপ জিতেছে। টানা তিনটি বড় শিরোপা জয় তো মুখের কথা নয়, দেল বস্কের অধীনে দলটা ছিল সর্বজয়ী।

টিকিটাকাকে তখন ফুটবল খেলার অনন্য এক ধরন নয়, একমাত্র ধরন হিসেবেও ভাবতে শুরু করেছিলেন ফুটবল ভক্তরা। কিংবদন্তিতুল্য ডিফেন্ডার ও নেতা কার্লোস পুয়োল অবসর নিয়ে ফেলেন। ফরোয়ার্ড ফার্নান্দো তোরেসের পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তোষ ছিল। তারপরও দলটা অনেকটা ২০১০ সালের মতই ছিল। গ্রুপটা তুলনামূলক শক্ত ছিল। তবে নেদারল্যান্ডস, চিলি ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে থাকা স্পেন প্রথম পর্বের বাধা পেরোতে পারবে না, এমনটা কেউ স্বপ্নেও ভাবেননি।

বিশ্বকাপের শুরুটা স্পেনের মন মতই হয়। ১-০ গোলে এগিয়েছিল স্পেন। পেনাল্টি থেকে গোল করেন জাবি আলোনসো। প্রথমার্ধেই দলকে সমতায় ফেরান নেদারল্যান্ডসের রবিন ভ্যান পার্সি। দ্বিতীয়ার্ধটা স্রেফ ইতিহাস। মিনিট সাতেকের মধ্যে দলকে লিড এনে দেন আরিয়েন রোবেন। এরপরের ২৫ মিনিটে একের পর এক গোল হজম করে ৫-১ গোলে হারে স্পেন। লা রোজাদের সামনে এরপর আসে চিলি।

তবে দক্ষিণ আমেরিকান দলটি ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই চেমে ধরে স্পেনকে। প্রথমার্ধেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায় চিলি। দ্বিতীয়ার্ধে আর গোল হজম না করলেও গোল আর দিতে পারেনি স্পেন। দুই ম্যাচে স্পেন সাত গোল হজম করে, দেয় মোটে এক গোল, আসে না একটাও পয়েন্ট। ছয় বছরের অজেয় দলটি তখন মুদ্রার অন্য পাশটা দেখে ফেলে। প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়াও নিশ্চিত হয়ে যায়। শেষ ম্যাচে দলের চেহারাটা পাল্টে যায়। ৩-০ গোলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জিতে যায় স্প্যানিশরা। যদিও তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিন পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে থেকেই তাদের সন্তুষ্ট হতে হয়।

বিশ্বকাপের পর কিংবদন্তিতুল্য মিডফিল্ডার জাভি অবসর নেন। দেল বস্ক আরো দু’বছর দলের সাথে ছিলেন। ২০১৬ সালে বাজে একটা ইউরো কাটানোর পর তিনি পদত্যাগ করেন। সেই দলের হয়ে খেলা সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকে, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তারা এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপেও আছেন।

https://www.mega888cuci.com