অথচ প্রথম ইনিংসে ‘ওরা ১১ জন’ করেছিল মোটে ৬৭ রান!

আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর আগে আপনার মাথায় শুধু একটা জিনিসই ঘুরছিলো, ইংল্যান্ড কত দ্রুত আউট হবে আর অস্ট্রেলিয়া কত রানে জিতবে, উইকেটের পেছনে প্যান প্যান করা পেইনও তাই ভাবার কথা। দোষ আপনারও না, পেইনকে দিলেও লাভ নেই। ইনিংসটা যখন চার নাম্বার, তখন ৩৫৯ রান আসলেই অসম্ভব একটা টার্গেট। টেস্টের এখনো দুটো দিন বাকি, এই ব্যাপারটা ছাড়া ইংলিশদের ভেসে উঠার খড়কুটো আর কিছু ছিলোনা।

সাঝসকালে আগের দিনের সাথে স্কোরবোর্ডে মাত্র ১৮ রান যোগ করে রুট-স্টোকস জুটি। অতি আত্মবিশ্বাসী জো রুট ক্রিজের গভীরে গিয়ে লায়নকে মাঠের বাইরে উড়িয়ে মারতে গিয়ে পেইনের পেছনে ওয়ার্নারের হাতে তালুবন্দী হলেন। অজিদের সেলিব্রেশনই বলে দিচ্ছিলো তাদের গতরাতের সিলেবাসে শুধু রুটই ছিলো, স্টোকস সেখানে পেছনের পাতায়। মিরাকল থেকে তখনো ইংরেজরা বরাবর ২০০ রান দূরে। আমি, আপনি কিংবা পেইন – অজিদের জয়ের সুবাতাস পাচ্ছি ; আর বদলে গিয়েছে বাজিকররাও, পালটে দিয়েছে বাজির দান!

আগের দিন ৫০ বলে ২ রান করা বেন তখন ভাবছিলেন অন্য কিছু, সাথে পেলেন বদলে যাওয়া বেয়ারস্টোকে। কিন্তু সেট হয়েও ৩৬ রান করে আউট হওয়ায় জনি সেটাকে প্রায় অপরাধ বানিয়ে ফেলছিলো পরের ১৬ রানের মাঝে আরো ২ উইকেট চলে যাওয়াতে।

২৬১-৭ ; স্টোকস আছেন, ফিরে গেলেন ওকস আর আসলো আর্চার, এবার ব্যাট হাতে। ইংলিশদের জন্য মাত্র ৯৮ রানের দুরত্ব অমরত্বের, আর ক্যাংগারুরা তখন এশেজ কনফার্ম করার আনন্দে ভরপুর। এদিকে কামিন্স আর প্যাটিনসন ইচ্ছেমত বাউন্সারের গোলা মারছেন স্টোকসের শরীরে, স্টোকসের ভ্রুক্ষেপ নেই। মাথায় একটাই চিন্তা, হারা যাবেনা।

আমি, আপনি আর পেইন – অপেক্ষায় বাকি দুই উইকেটের৷

১৪ই জুলাই, ২০১৯ – বিশ্বকাপ ফাইনাল, সুপার ওভারের খেলায় যখন তিন বলে ইংলিশদের ৯ রান দরকার, স্ট্রাইকে ছিলো স্টোকস। ওভারের চতুর্থ বলে দ্বিতীয় রানটি নেয়ার সময় ফিল্ডিং এর সুপারম্যান মার্টিন গাপটিলের থ্রো স্টোকসের ব্যাটে লেগে যখন চার হলো, সেদিনই বোঝা গিয়েছিলো, ভাগ্য কি চাচ্ছে। ‘ফরচুন ফেভারস দ্য ব্রেভ’ – ইংলিশরা অসম্ভবকেও সম্ভব করায় বিশ্বাসী, হাল ছাড়েনা তারা, স্পেশালি ওই ‘ব্লাড অফ কিউই’ বেন স্টোকস। হারার আগে হেরে যাওয়ার মানসিকতা না থাকাটাই কিনা তাকে সেই ফাইনাল জিতিয়ে দিয়েছিলো, দিয়েছিলো অমরত্ব!

যখন শেষ ব্যাটসম্যান জ্যাক লিচ নামলেন, সবাই খোঁজ নিলেন তার ফার্স্ট ক্লাস রানের খবর, জানা গেলো মিয়াভাই ব্যাটিং এ একেবারে শিক্ষানবিশ না, ৯২ রানের একটা ইনিংস আছে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেই! কিন্তু দূরত্ব তো তখনো ৭৩ রানের, গত কিছুক্ষণের, কিংবা গত ২/৩ দিনের টেস্ট ক্রিকেটের উত্তেজনা শেষ হলো মনে হচ্ছে আমার আপনার কাছে। একটা উইকেটেরই তো ব্যাপার, এ আর এমন কি! স্টোকস এক জীবনে দু’বার এরকম চাপের মুখে এমন ইনিংস খেলবে আপনি কি বিশ্বাস করতেন? আমি করিনি, কিন্ত স্টোকস এই সময়টাকেই বেছে নিলো, অমরত্বের আরেকটা সিড়ি পেরোবার জন্য!

শুরু হলো পালটা আক্রমণ, পাগলামী, অস্থিরতা আর ক্লাইম্যাক্স!

ইনিংসের ১১৭ নাম্বার ওভার, লায়নকে উড়িয়ে বাউন্ডারি পার করলেন বেন, অমরত্বের পাগলামীর শুরু। এরপর আবারো ১১৯ নাম্বার ওভারে লায়নকে মারলেন দুটো ছয়, আপনি চিন্তা করুন একবার, শেষ উইকেট জুটি, রান দরকার ৬০ এর উপর, ওই জায়গায় এভাবে পালটা আক্রমণ করার সাহস কিংবা সামর্থ্য আর ক’জন ইংলিশ ক্রিকেটারের আছে, বিশ্ব ক্রিকেটেই এমন প্লেয়ার কজনই বা আছে, একজনও না হয়তো, থাকলেও অল্প কজন।

১২০ নাম্বার ওভার, প্যাটিনসন বোলিংয়ে। দ্বিতীয় বলে স্টোকস নিয়ে বসলেন একটা সিঙ্গেল, লিচ স্ট্রাইকে। নড়েচড়ে বসলাম সবাই, এই-ই মনে হয় শেষ ওভার, লিচ শেষ এখানেই। নাহ, লিচ মাটি কামড়ে চারটা বল পার করে দিলো

লায়নের উপর ঝড় যাবে ভেবে পেইন আনলেন টেস্টের এক নাম্বার বোলার, কামিন্স ‘দ্য পোস্টম্যান’ কে। রান দরকার ৪৮, তৃতীয় বলে সেই কামিন্সকেও ফাইন লেগের উপর দিয়ে ছয়, হোয়াট দ্যা হেল ইউ আর ডুইং স্টোকসি! ততক্ষণে টার্গেট চল্লিশের নিচে – গ্যালারির দর্শকরা কেউই বসে নেই। পেইনের মুখে টেপ, হি ক্যান নট বিলিভ ইট!

কিন্তু এর পরের ওভারে যা হলো এর জন্য স্টোকস ছাড়া প্রস্তুত ছিলোনা কেউ, আপনিও না, আমিওনা, পাঁড় ইংলিশ কোনো ভক্তও না।

আসলেন সুইং মাস্টার হ্যাজলউড, অলরেডি ইনিংসের চারটা উইকেট তার পকেটে। আরেবাবা একে তো মারতে গেলে বল আকাশে উঠবে, নাহ এই ওভারেই শেষ! ৪,৬,৬,২,১ – ইতিহাস কিংবা ভবিষ্যৎ দুটোকেই স্তব্ধ করে দিয়ে ওই ওভারে নিলেন ১৯ রান – তাই বলে হ্যাজলউডকেই? ইউ আর ম্যাড, স্টোকসি!

এখন মাত্র ১৮ রানের, ইশশ আরেকটা উইকেট যদি থাকতো, ইংল্যান্ড জিতেই যাচ্ছিলো প্রায় – আমরা এভাবেই ভাবছিলাম। ঠিক তখনই চিত্রনাট্যটা অন্যভাবে লেখার ছক কষছিলেন স্টোকস।

আবার লায়নকে আনলেন, আপিল হলো একটা, লাভ হলোনা, রানও হলো ওই একটাই। দরকার ১৭ টা রান, মাইটি এশেজটা না হারানোর জন্য।

প্রান্ত বদল করে আসলেন কামিন্স – প্রথম বলেই থার্ডম্যানে ক্যাচ, দুধভাত মার্কাস হ্যারিস করলেন ড্রপ, ঠিক সেই বিখ্যাত ২০০৫ এশেজের সাইমন জোনসের মত, ঠিক সেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপের হার্শেল গিবসের মত। ম্যাচটাই কি ফেলে দিলেন হ্যারিস?

পরের দুইবলে দুটো চার, তাও কামিন্সকে। স্টোকসের কি নার্ভ টার্ভ কিচ্ছু নাই? এই অবস্থায় অন্য কোনো প্লেয়ার হলে এতক্ষণে কি কি ভিজাই ফেলতো ঠিক নাই, আর সে টেস্টের এক নাম্বার বোলারকে পেটাচ্ছে, হায় স্টোকস!

ওই বেদম মারের প্রেশারেই কিনা শেষ বলে পেইন নিলো রিভিউ, এবার ডেসপারেট অস্ট্রেলিয়া। লেগ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরে পিচ করলো বল, রিভিউ লস্ট – আক্ষেপের শুরু। একেই বলে ফরচুন ফেভারস দ্যা ব্রেভ, ওই হিটিং না শুরু করলে অজিরা এই রিভিউটা হয়তো নিতোনা, এটা শাপেবর হয়ে আসলো পরের ওভারেই।

লায়ন আসলেন, প্রজন্মের সবচেয়ে সেরা অফ স্পিনার। অস্ট্রেলিয়ানরা আদর করে ডাকেন, গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম। স্ট্যাটসও সেই কথাই বলে। কিন্তু আজতো স্টোকসের ইম্মরট্যালিটি ডে – কারও ভাত নেই, হোক সেখানে লায়ন কিংবা কোনো টাইগার! তিন নাম্বার বলে ছয়, রান লাগে আর দুই।

পাচ নম্বর ডেলিভারি – এ কি করলেন লায়ন! বল টা স্ট্যাম্পে লাগাতে পারলেন না, ওহ মাই গড! নিশ্চিত রান আউট মিস! শেষ বল, স্টোকস স্লগ সুইপ খেলতে লেগেন, বল সোজাসুজি প্যাডে, সোজা চোখেও আউটই মনে হচ্ছিলো সবার কাছে, কিন্তু ডিসিশন তো আমরা দেবোনা, দেবেন ওই রিভিউ কিং জোয়েল উইলসন। তিনি ধারা বজায় রেখেই মাথা নাড়লেন, নট আউট। আফসোস, পেইন, আফসোস তোমার জন্য – আগের ওভারেই ব্লাডি রিভিউগুলো শেষ করে দিয়েছিলে – ফরচুন নেভার ফেভারস দ্যা উইক এন্ড স্কেয়ারস!

আর কি, সব তো শেষই – কামিন্সকে পরের ওভারে চার মেরে সব শেষ! ব্লাডি কিউই ‘বেন স্টোকস’ ডিড ইট এগেইন। ছাইদানির আগুনটা এখনো টিকে থাকলো!

আপনি স্টোকসের আক্রমণাত্মক মানসিকতাকে যতই অপছন্দ করুন, স্টোকসের তাতে কিছু যায় আসেনা, আপনার কীবোর্ড আপনিই তার পেছনে খরচ করতে বাধ্য হবেন, দ্যাটস বেন স্টোকস ফর ইউ। অথচ, এই ইংল্যান্ডই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে করেছিলো মাত্র ৬৭, ভাবা যায়। একবার ভাবুন ঠিক কতটা মানসিক দৃঢ়তা থাকলে এই ম্যাচ জিতে আসা যায়!

আপনি কাল অজিদেরকে সাপোর্ট করুন কিংবা ইংলিশদেরকে – আপনি কোনোভাবেই পরাজিত ছিলেন না। নিপাট ক্রিকেট সমর্থক হিসেবে ক্রিকেটেরই জয় এটা, আমরা যারা টেস্ট ক্রিকেটের পাঁড় ভক্ত, টি-টোয়েন্টির ঝলসানো, তান্দুরী চিকেন টাইপের ক্রিকেটের সাথে পেরে উঠছিলাম না। এই ম্যাচটা সবাইকে চোখ খুলে দেখিয়ে দিলো, টেস্ট ইজ স্টিল দ্যা বেস্ট!

ধন্যবাদ, বেঞ্জামিন স্টোকস। ক্রিকেট আপনার কাছে ঋণী থাকবে, আজীবন!

মাহবুব এলাহী

ভালবাসি ক্রিকেট। ভালবাসি বাংলাদেশ।

https://www.mega888cuci.com