লজিক না, ম্যাজিকের মধ্যেই ডুবে থাকতে চাই!

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ও বিশ্বের অন্যমত বড় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বলিউড। শত বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় সব জনরার সিনেমা দিয়ে নিজেদের এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে বলিউড। কোটিকোটি ভক্ত সারা বিশ্বে এখন তাদের।

এই সফলতার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান অবশ্যই তাদের সিনেমার কোয়ালিটি। কোয়ালিটি না থাকলে তো এত সফলতা সম্ভব হতো না এটা সবাই মানবেন। দুনিয়ার সব ইন্ডাস্ট্রির মতই বলিউডেও কন্টেন্ট নির্ভর অফ-বিট আর কমার্শিয়াল অ্যাকশন মাসালা সিনেমা তৈরি হচ্ছে প্রতিবছরই সেই জন্মলগ্ন থেকে।

এই ইন্ডাস্ট্রি যেমন কন্টেন্ট নির্ভর ‘মাদার ইন্ডিয়া’-এর মত কালজয়ী সিনেমা দিয়েছে, তেমনি দিয়ছে সেই সময়ে ইতিহাস সৃস্টি করা অ্যাকশন সিনেমা ‘শোলে’। এভাবেই সুনিয়ার সব সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি চলছে, চলবে।

কিন্তু এখন সময় অনেক বলদে গেছে, দর্শকের সিনেমার রুচি বদলে গেছে। এই ইন্টারনেট আর গ্লোবালাইজেশনের যুগে সবাই সব দেশের সিনেমা দেখছে। বিগত কয়েকবছর ধরে বলিউডেও শুধু কন্টেন্ট নির্ভর সিনেমা হিট হচ্ছে। ব্যাপারটা খুবই ইতিবাচক একটা ইন্ডাস্ট্রির জন্য। কিন্তু এতে করে কিছু সমস্যাও তৈরি হচ্ছে!

কিছু দর্শক আছে যারা কমার্শিয়াল সিনেমা একেবারেই পছন্দ করেনা। এরা সবসময়ই বলিউডের এসব মাসালা সিনেমার ভুল ধরে বেড়ান। তাঁদের মতে এসব সিনেমা বানানোর কোন দরকারই নেই! অফ-বিট সিনেমা হিট হওয়াতে তারা আরো সুযোগ পাচ্ছে এসব বলার। আবার আরেকদল আছে যারা হলিউডের আকাশে গাড়ি উড়া সিনেমার ফ্যান কিন্তু বলিউডের সিনেমা দেখার সময় আইনইস্টাইয়ের ফিজিক্সে সূত্র মেলাতে বসে!

সিনেমার পোস্টার রিলিজ হওয়া থেকে শুরু হয় তাদের এই বিশ্লেষণ।এরপর টিজার, ট্রেলার তো আছেই। অভিনেতা অভিনেত্রী থেকে শুরু করে পরিচালক প্রোযোজক কেউই বাদ যায় না এখনকার স্যোশাল মিডিয়া যোদ্ধাদের ট্রল থেকে! তারপরেও কেন প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা খরচ করে এত এত লজিকলেস অ্যাকশন সিনেমা বানাচ্ছে বলিউড? কেন প্রতি সিনেমায় একটি আইটেম গান জোর করে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে?

কেন এত বিশাল বিশাল সেট তৈরি করে দেশ বিদেশে ঘুরে ঘুরে বানাচ্ছে এসব সিনেমা! একটা আর্ট ফিল্ম বানাতে যেখানে ৩০ দিন লাগে সেখানে ৪-৫ মাস সময় নিয়ে কেন বানাচ্ছে অ্যাকশন সিনেমা!

একটাই কারণ – দর্শক চাহিদা পূরণ করে ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখা। হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন এই লজিকলেস, অ্যাকশন সিনেমাগুলোই ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রেখেছে।

আপনি যদি বলিউডের বক্স অফিস রেকর্ড দেখেন তাহলে দেখবেন পুরা ইন্ডাস্ট্রির প্রায় ৮০ শতাংশ আয়ই আসে এসব বিজ্ঞাপন সিনেমা থেকে। বছরের ফেস্টিভালগুলাতে সুপারস্টারদের এসব সিনেমার জন্যে হল মালিকরা সারাবছর অপেক্ষা করে থাকে তাদের পুরো বছরের আয় পুষিয়ে নেয়ার জন্য।

২০০৮ থেকে ২০১৯ সাল – এই এক দশকে শুধুমাত্র সালমান খানের সিনেমাই বক্স অফিসে ২৭২৭ কোটি ব্যবসা করেছে। আপনি হিসাব করে দেখেন তো এই সময়ে অফ-বিট সিনেমাগুলো কত আয় করছে!

ভারতের সিনেমার দর্শকদের বড় অংশ এখনো মাস অডিয়েন্স আর সিঙ্গেল স্ক্রিনের দখলে। এরা ফেস্টিভালে এসব সিনেমা দেখে উৎসব করতে যায়। গানের সময় এরা সিনেমাহলে নাচানাচি করে, পটকা ফাটায়। এসব কারণেই আইটেম গান রাখা হয়। এমনকি সিনেমার ওপেনিং কালেকশনে বড় ভুমিকা রাখে হিন্দি সিনেমার গান।

মাস অডিয়েন্স এর সাপোর্ট ছাড়া কোন সিনেমা বড় হিট হতে পারেনা। এর একদম গরম গরম উদাহরণ হলো সালমান খানের ‘ভারত’ আর শহীদ কাপুরের ‘কবির সিং’। ভারত ক্রিটিকদের কাছ থেকে পজিটিভ রিভিউ পেলেও মাস অডিয়েন্স তেমন পছন্দ করেনি। অন্যদিকে কবির সিং এর বিরুদ্ধে নারীবাদী থেকে অনেক ক্রিটিকই নেগেটিভ রিভিউ দিয়েছে প্রচুর। কিন্তু মাস অডিয়েন্স ভালবেসেছে বলেই অলরেডি বছরের হাইয়েস্ট গ্রোসার সিনেমা হয়ে গেছে কবির সিং। আর হ্যাঁ ‘কবির সিং’ অ্যাকশন সিনেমা না হলেও এটা একটা কমার্শিয়াল সিনেমা।

এখন বলিউডের এই বিশাল দর্শক শ্রেণী উপেক্ষা করে সিনেমা বানানো বাদ দিলে কি বলিউড ইন্ডাস্ট্রি টিকবে? প্রোডাকশন হাউজগুলো শুধু অফ-বিট সিনেমা বানিয়ে কয়দিন চলবে? হল মালিকরা পারবে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে? পারবে না!

এটা শুধু বলিউড না, সারা বিশ্বের সব ইন্ডাস্ট্রির চিত্র। সম্প্রতি মুক্তি পাওা অ্যাভেঞ্জারস: এন্ড গেম এর আয় নিয়ে মাতামাতি করেন নাই এমন কোন সিনেমাপ্রেমী নাই। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমার সবগুলোই এই লজিকলেস সাইন্স ফিকশন অ্যাকশন সিনেমা। বলিউডে তো তাও এই লিস্টে মুঘল-ই-আজম, মাদার ইন্ডিয়া, ম্যায়নে পেয়ার কিয়া, হাম আপকে হে কওন, দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে, থ্রি ইডিয়টস, পিকে, দাঙ্গাল-সহ অনেক কন্টেন্ট নির্ভর সিনেমা আছে। হলিউডে একটাও পাবেন না। তারপরেও সব দোষ বলিউডের সিনেমার।

পৃথিবীর একটা অ্যাকশন সিনেমা দেখাতে পারবেন যেখানে ফিজিক্স মেনে চলা হয়? আর নামা হবেই বা কেন? এটা কি আপনার ভার্সিটির সাইন্স কম্পিটিশনের প্রেজেন্টেশন নাকি ভাই?

হলিউডের সিনেমার অ্যাকশন দেখে মুগ্ধ হওয়া মানুষই আবার হিন্দি সিনেমার অ্যাকশন সিনে যুক্তি খুঁজে। ব্যাপারটা হিপোক্রেসি ছাড়া আর কিচ্ছু না। এসব সিনেমায় যদি আপনি লজিক খুঁজেন তাহলে আপনার সমস্যা আছে। সিনেমা দেখা বাদ দিয়ে ডকুমেন্টারি দেখতে পারেন।

আসলে হলিউডের সিনেমার প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ বাজেটের সিনেমায় যে এত সুন্দর অ্যাকশন সিনেমা ইদানীং বলিউড বানাচ্ছে তার জন্য তারা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।

আরো একটা ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি সমালোচনা হয় তা হলো এসব সিনেমার কাস্টিং নিয়ে। সালমান খানকে কেন এই সিনেমায় নিলো? সে তো অভিনয় পারেনা। টাইগার শ্রফকে কেন হৃত্বিক এর সাথে কাস্ট করা হলো? জন আব্রাহাম তো এক্সপ্রেশন দিতে পারেনা তাকে কেন নেয়া হলো? ক্যাটরিনা, দিশা পাটানি, বাণি কাপুর, শ্রদ্ধা কাপুর এরা তো অভিনয় জানেনা এদের কেন এত বিগ বাজেটের সিনেমায় কাস্ট করা হলো?

এসব প্রশ্ন যারা করে তারা আসলে সিনেমার কিছুই বুঝেনা। আপনি কি চান রাজকুমার রাও, আয়ুস্মান খুড়ানা বা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী টাইগার জিন্দা হ্যায়, বাঘি, বাঘি ২, ফোর্স, রকি হ্যান্ডসাম – এসব সিনেমা করুক? দিপীকা, আলিয়া, তাপসি পান্নুর মত মেথড অ্যাক্টররাই সব সিনেমা করবে?

কমার্শিয়াল সিনেমায় আসলে অভিনয়ের খুব বেশি দরকার হয় না। তবে যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো পর্দায় অবশ্যই হিরোকে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ চরিত্রে ভাল লাগতে হবে। সালমান খানের টাইগার সিনেমার এন্ট্রি সিনে রাজকুমার রাওকে চিন্তা করে দেখেন। সেই হিরোইজম খুঁজে পাবেন না আপনি। জয়া ক্যারেক্টারে আলিয়াকে চিন্তা করেন। বেমানান লাগবে। এভাবেই কাস্টিং করা হয়, হবে।

হেটারদের এত সমস্যার কারণ আসলে একটাই কারণ হতে পারে ব্যক্তিগতভাবে এসব সিনেমা অপছন্দ করা। ‘যাকে ভাল লাগেনা তাঁর চলনও ভাল লাগেনা’-এই কথাটার সাথে সবাই পরিচিত আমার মনে হয়।

কিন্তু তাদের হতাশ করে দিনদিন বলিউডে বড় বাজেটের ধুম, এক থা টাইগার, টাইগার জিন্দা হ্যায়, ঠাগস অফ হিন্দুস্তান, ওয়ার বানাচ্ছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মান আরো উন্নত হবে এসব সিনেমার, বাজেট বাড়বে, নাচ গান বাদ দিয়ে হলিউডের মত সিনেমা বানাবে। কিন্তু সেটা করতেও সময় লাগবে। এই বিশাল ফ্যানবেজের চাহিদা তাদের পুরণ করেই যেতে হবে।

বলিউডের এই লজিকলেস সিনেমা আরো বেশি বেশি আসুক। শুধু মানটা বাড়তে থাকলেই হবে।

লজিক না, ম্যাজিকের মধ্যেই ডুবে থাকতে চাই!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।