ক্রিকেট ফিরেছে বিমানে, বিমান ফিরবে কি?

‘শিরোপা জিতলো বিমান’, ‘মাঠে নামবে বিমান’ কিংবা ‘জয়ের ধারায় বিমান’ – ছোটবেলায় যখন পত্রিকায় এমন শিরোনাম দেখতাম তখন রাজ্যের বিস্ময় ভর করতো মাথায়, বিমান সেতো আকাশে উড়ে বেড়ায়, ক্রিকেট কিভাবে খেলে?

আমার তখন জানা ছিলনা অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও তখন রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো ক্রিকেটে অংশ নিতো দল গঠন করে।

বিমানের সাথে শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেটের সম্পর্ক ছিন্ন হয় ২০০৮ সালে। সরাসরি বাংলাদেশের ক্রিকেটে না ফিরলেও ক্রিকেটে আবার ফিরেছে বিমান। দেহরাদুনে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান তিন ম্যাচ টি-টুয়েন্টি সিরিজের টাইটেল স্পন্সর হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স!

কিছুটা অবাক হচ্ছেন? বছরের পর বছর যারা লসের উপর আছে তারা কিভাবে আন্তর্জাতিক একটা সিরিজের স্পন্সর হয়ে গেলো! হতে পারে খুব স্বস্তায় পেয়েছে, হতে পারে দুই দেশেরই বড় কোন প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি তাই বিমান ফাঁকা মাঠেই পেয়েছে অনেকটা।

কারণ যেটাই হোক এই যে বিমান আবার ক্রিকেটের মাঠে ‘ল্যান্ড’ করছে সেটা অনেক কিছু মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ দল যখন এমসিসির সাথে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছিলো সেই ম্যাচে বাংলাদেশ দলের স্পন্সর ছিলো বিমান।

১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ী দলের অফিশিয়াল স্পন্সর ছিলো বিমান। আর ঘরোয়া প্রথম বিভাগ ক্রিকেটে বড় দল হিসেবে সবসময় সুনাম ছিলো বিমানের।

২০০০-২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট চালু হলে প্রথম আসরেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। পরে ওই বছরের একদিনের টুর্নামেন্টেও জয়ী হয় বিমান।

বিমানের চমক ছিলো ১৮ বছর বয়সী পাকিস্তানি অলরাউন্ডার ইমরান ফরহাত। অনেকেই জানেন না, বাংলাদেশের প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন ইমরান ফরহাত (২১৬), এবং সেটা বাংলাদেশের ঘরোয়া প্রথম শ্রেনীর ইতিহাসের ওপেনিং ম্যাচেই।

বিমানের অধিনায়ক ছিলেন জাভেদ ওমর বেলিম। শিরোপা জিতলেও প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে আর কখনো অংশ নেয়নি বিমান।

একমাত্র আসরে বিমানের পক্ষে সেঞ্চুরি করেছিলেন ছয়জন ব্যাটসম্যান, সর্বোচ্চ তিনটি সেঞ্চুরি করেন ব্যাটসম্যান হাসানুজ্জামান, পাকিস্তানের ইমরান ফরহাত এবং বাংলাদেশের জাভেদ ওমর বেলিম, হাবিবুল বাশার করেন দুটি করে সেঞ্চুরি। দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস হাবিবুল বাশারের (২২৪)। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল খেলেছিলেন ১৫৩ রানের একটি ইনিংস।

ওই আসরে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রান করেন ইমরান ফরহাত, ৬ ম্যাচে ৭৫৩ রান, গড় ৯১.৮৭! দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন বিমানের আরেক ব্যাটসম্যান হাবিবুল বাশার। ১০ ম্যাচে ৪২.৪২ গড়ে ৫৯৪ রান।

বোলারদের ভেতর শীর্ষ অবস্থানে ছিলেন বিমানের তরুণ পেসার মোহাম্মদ শরীফ। ১০ ম্যাচে নিয়েছিলেন ৪৯ উইকেট। পেস আর সুইং দিয়ে সাড়া জাগিয়ে ওই বছরেই টেস্ট অভিষেক হয় শরীফের, যার বাংলাদেশের জার্সিতে ক্যারিয়ার শেষ হয় বিদ্রোহী লিগ আইসিএল দিয়ে।

লেগ স্পিনের ঘুর্নিতে ইমরান ফরহাত নিয়েছিলেন ২৩ উইকেট, ৬ ম্যাচে। ইমরান সেই বছরই পাকিস্তান জাতীয় দলে সুযোগ পান। ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৪০ টেস্ট, ৫৮ ওয়ানডে এবং ৭ টি-টুয়েন্টি খেলেন এই বাহাতি ওপেনার।

বিমান আর কখোনই প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে অংশ নেয়নি কারন প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট পরের আসর থেকেই বিভাগীয় দলের ভিত্তিতে খেলার প্রচলন শুরু হয়। কোন সংস্থার আর অংশ নেয়ার সুযোগ ছিলোনা।

ক্রিকেটের আকাশে দল হিসেবে বিমানের প্রথম ‘টেক-ওফ’ সেই ১৯৭৮ সালে। ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিমান নিয়মিত প্রথম বিভাগ আর প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লীগে অংশ নিয়েছিলো।

খেলার পাশাপাশি ক্রিকেটারদের চাকরির ব্যবস্থাও করে দিতো বিমান। সানোয়ার হোসেন, জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার, ২০০৪ সালে বিমান তাকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয় চাকরিতে। তবে বিমানের চাকরিকেই প্রাধান্য দিয়ে ২০০৫ সালে ক্রিকেট থেকে অবসর নেন সানোয়ার, বিষয়টা তখন বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।

২০০৮ সাল থেকেই বিমানের অবস্থা খারাপ হতে থাকে, ক্রমাগত লসের ধাক্কা সামলাতে না পেরে ক্রিকেটে বিনোয়গ প্রায় বন্ধ করে দেয়। ভালো কোন দল গঠন না করায় ক্রমাগত অবনমন হতে থাকে।

বিমানের দেয়া তথ্যে সর্বশেষ ২০১৬-১৭ মৌসুমে তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে খেলেছিলো বিমান। ৯ ম্যাচের ভেতর হেরেছিলো ৬ ম্যাচেই, ২ ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়, জয় মাত্র ১ ম্যাচে।

২০১৭-১৮ মৌসুমের কোন তথ্য পাইনি, অংশ নিয়েছিলো কিনা সেটাও জানতে পারিনি। এভাবে চললে হয়তো বিমান নামের দলটাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দেশের প্রথম ‘ফার্স্ট ক্লাস টাইটেল’ জয়ী দল তখন শুধু রেকর্ড বুকেই পাওয়া যাবে, বাস্তবে নয়।

তবে দল হিসেবে না হলেও স্পন্সর হিসেবে বিমানের এই ফিরে আসা ইতিবাচক। মনে আশার সঞ্চয় হয় হয়তো ক্রিকেট দলটার দিকেও এবার তারা নজর দিবে।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এই সংস্থার অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে পত্রিকায় অসংখ্য রিপোর্ট পড়ি আমরা, হাজার কোটি টাকার হদিস পাওয়া যায়না হিসাবে। বর্তমানে একটু একটু করে উন্নতি হচ্ছে, নতুন নতুন এয়ারবাস ক্রয় করেছে, যাত্রীসেবার মান আগের চেয়ে সামান্য ভালো হয়েছে। ফ্লাইট শিডিউল বিপর্যয় কমেছে।

এইবার ক্রিকেটে কি একটু নজর দিবে? যাত্রী হিসেবে ক্রিকেট আবার কি বিমানে চড়বে?

https://www.mega888cuci.com