পঞ্চপাণ্ডব, গালাগাল ও এক টুকরো বাংলাদেশ

দিচ্ছো ভীষণ যন্ত্রণা
বুঝতে কেন পাচ্ছো না ছাঁই?
আমি মানুষ, যন্ত্র না!

অনুকাব্যখানির রচয়িতা রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি আরো লিখেছিলেন-

থাকুক তোমার একটু স্মৃতি থাকুক
একলা থাকার খুব দুপুরে
একটি ঘুঘু ডাকুক

শিরোনামের সঙ্গে আলোচ্য কবিতা জোড়ার কোন মিল নেই। আদতে নেই? রুদ্র তাঁর প্রেমিকাকে বলেছিল, আমিও মানুষ, যন্ত্র নই। চলে যাবার পর সে তার স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর কালে জানিয়েছিল, একলা দুপুরে তোমাকে মনে পড়ে। কিম্বা সারাংশ অন্যরকমও হতে পারে। মিলটা তাহলে কোথায়? ধরতে পেরেছেন নিশ্চয়ই? জ্বি একদম! ‘ক্রিকেট’।

ক্রিকেট আমাদের কাছে প্রেমের আরেক নাম। এমনই যে, বিশ্বকাপ মৌসুমে বহু প্রেম ভাঙে কেবল ফেসবুকে দেওয়া পোস্ট সইতে না পেরে! হয়ত প্রেমিকার প্রিয় তারকাকে নিয়ে প্রেমিক কটুক্তি করে পোস্ট দিল, অথবা প্রেমিকা না বুঝেই ধুয়ে দিল কোন ক্রিকেটারকে। ব্যস! যায় কোথায়? আনফ্রেন্ড, কথার লড়াই, অত:পর ব্লকলিস্টে।

আমাদের কাছে ক্রিকেট সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আবেগের পুরোটাজুড়ে। তাই প্রত্যাশা রাখি আকাশচুম্বী। যাতে হতাশ হই। শুরু হয় সমালোচনা। সাফল্যের শর্তগুলি আমরা জানি। অন্যের চেয়ে বেশি জানুন, বেশি কাজ করুন, কম আশা করুন। ক্রিকেটটা যেহেতু মাঠে ক্রিকেটাররাই খেলবে, সেহেতু জানাজানি আর কাজের ব্যাপারটা তাদের উপর ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। আমাদের হাতে যে জিনিসটি রইল, তা হচ্ছে প্রত্যাশা!

২০১১ সালে ঘরের মাটির বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া মাশরাফির জন্য মন খারাপ করেনি এমন ক্রিকেট ভক্ত একজনও পাওয়া দুষ্কর। তারও আগে ২০০৯ সালে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে প্রথমবার অধিনায়কত্ব পাবার পরপর ইঞ্জুরির দরুণ গোটা টেস্ট ক্যারিয়া শেষ করা মাশরাফির প্রতি সহানুভূতির কমতি কখনোই ছিল না। ১৭ বছর আগে অভিষেকেই নিজেকে চিনিয়েছেন, ইঞ্জুরি না হলে তিনি কোথায় থাকতেন তা নতুন করে বলাটা একেবারে নিষ্প্রয়োজন।

আমরা বরাবরই মাশরাফিকে চেয়েছি। ২০১৪ সালে যখন একের পর এক পরাজয়ে ধ্বজভঙ্গ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন তাকে চেয়েছি। ২০১৫ বিশ্বকাপ বাংলার ক্রিকেটের নতুন রচনার সূচনাসম। মাশরাফি সেই রচনার খাতা। যাতে অনায়াসে নিজের মতোন করে শব্দের খেলা খেলতে পারা যায়। সে বছর একের পর এক জয়ে ক্রিকেট পাড়ায় উৎসব হচ্ছিল মাশরাফিকে মধ্যমণি করে। তখনো আমরা তাকে চেয়েছি।

তাকে মাঠে একটু ক্লান্ত দেখা গেলে প্রার্থনা করেছি যেন ’০৯ বা ’১১ ফিরে না আসে। ’১৭-তে কলকাতায় সেরা বাঙালির সংবর্ধনা পাওয়া ম্যাশ ওইবছর অভিমানে অবসর নেন কুঁড়িবিশ ফরম্যাট থেকে। আমরা তখন তার পক্ষ নিয়ে বিসিবিকে ধুয়েছি। মোদ্দাকথা, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ এর প্রথমাংশ পর্যন্ত আমরা তাকে চেয়ে এসেছি। তার প্রতিভা, বিচক্ষণতা, ক্রিকেটের প্রতি ভালবাসার ফলে সবার হৃদয়ে তিনি পোক্ত আসন গেঁড়েছেন।

তারপর ২০১৮ আসে। জাতীয় নির্বাচনের বছর, নো হেটার তকমা থেকে ম্যাশের নির্বাসনের বছর! দেড় দশকের ক্রিকেট, সাত অস্ত্রোপচার নিমিষেই আড়াল হয় ভিন্ন এক সত্ত্বার মাঝে! মাশরাফি, মেম্বার অব পার্লামেন্ট। এমপি মাশরাফির আড়ালে একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে থাকে ধ্রুব কয়েকটি সত্য! যার প্রধান দুই হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বসেরা অধিনায়ক!
তিনি বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বসেরা পেসার!

মাশরাফি তাও প্রতিভার পূর্ণ বিচ্ছুরণ ঘটাতে পারেননি। সাকিবের দোষটা কোথায়? সামর্থ্যের একশো দশ শতাংশ দিয়েও সমালোচিত। না! এবারের বিশ্বআসরে সাকিবকে নিয়ে কেউ কিচ্ছুটি বলেনি। বলেছিল শুরুর আগে। জাতীয় দলের জার্সি উন্মোচনী ফটোসেশনে তার না থাকা নিয়ে। আমরা সাকিবকে ধুই। সাকিবের বউ পর্দা করে না তা নিয়েও কপচাই। আচ্ছা ফয়সাল যেভাবে খেলছে, শিশির পর্দা করলে কি তার চেয়ে ভাল খেলত? কতটা ভাল খেলতে হবে তাকে আর? কতটা খেললে আমরা তাকে গালাগাল দেব না? তামিমের স্ত্রী যথেষ্ট পর্দানশীল, তাহলে জীবনের সবচাইতে বাজে খেলাটা কেন তামিম খেলছে এবারই? উত্তর আমাদের কাছে নেই।

আমরা অন্ধ। আমরা স্রেফ গালি দিয়ে সো কল্ড আধুনিক হতে শিখেছি, একরত্তিও প্রশংসা করতে শিখিনি। নইলে অজি ম্যাচে মুশফিকের সেঞ্চুরি নিয়ে সমালোচনা হতো না। মুশফিক চাইলেই ট্রাই করতে পারত তা সত্যি, তবুও চেষ্টা একেবারে করেনি তা কিন্তু নয়! পঞ্চপাণ্ডবের বাকীজন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। একমাত্র এই লোকটাই নিন্দা, সমালোচনা, গালাগালের ঊর্ধ্বে। তিনিও ছিলেন এসবের মাঝে।

২০১৪’র ভূতুড়ে সময়টাতে তিনি ছিলেন বলির পাঠা। তাকে বাদ দিলেই জিতে যাব এমন হাস্যকর ফিলোসোফি ঝেড়েছিলাম আমরা। দর্শন কেবল মুখে এবং বইয়ের পাতায় সুন্দর, বাস্তব এর বিপরীতমুখী। তাই তাকে বাদ দিয়েও লাভ হয়নি। বরঞ্চ মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ নামটা ক্রিকেট বাংলাদেশে আজীবন ইতিহাস গড়ে বসে আছে! বিশ্বকাপে আমাদের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান তিনি, প্রথম টানা দুই সেঞ্চুরিও অভিন্ন ব্যক্তিটির।

পঞ্চপাণ্ডব গেল। সমালোচনার তান্ডব থেকে রক্ষা পায়নি বাকীরাও। মুস্তাফিজ গেল গেল, সৌম্য লিটন যাচ্ছেতাই, সাব্বিররেও দরকার নাই, এরে চাই ওরে চাই, পারলে নিজেই মাঠে নেমে যাই! তাদের খেলাটা তাদের খেলতে দিন। মাশরাফি তামিম বলেছিল সোশ্যাল মিডিয়া তাদের উপর প্রভাব ফেলে না। ডাহা মিথ্যে কথা। তাদের লিস্টে সত্যিকারের বহু বিশেষজ্ঞ আছে, তারা তাদের ফলো করেন। সেসব গঠনমূলক সমালোচনা গায়ে মাখেন। আমরাও সমালোচনা করতে পারি, সেসব তারা হয়ত দেখলেও দেখতে পারেন। সমালোচকই সবচেয়ে বড় আলোচক। কিন্তু গালাগাল নয়। ওসব দেখে দেখে ক্লান্ত হয়েই তারা বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়া ফলো করেন না।

‘চাঁদের যা কলঙ্ক সেটি কেবল মুখের উপর, তার
জ্যোৎস্নায় কোন দাগ পড়ে না…’

কথাটি রবি ঠাকুরের বলা। বাংলাদেশ দলকে যদি চাঁদ ধরি তবে ক্রিকেটাররা হচ্ছেন কলঙ্ক। কিন্তু এই কলঙ্কদের সম্মিলিত আয়োজনে যে জ্যোৎস্নার প্রতিফলন, তার সবটাজুড়ে সৌন্দর্য বিদ্যমান। চলুন জ্যোৎস্নাবিলাসে মাতি। নয়ত একদিন ওরা অমাবশ্যায় ঢেকে যাবে। কিম্বা পূর্ণিমা রাতে মেঘের আড়াল হবে। ওরা কেবল ওদের জন্যই খেলতে শুরু করলে আমি আপনিই কষ্টে মরে যাব। গত ম্যাচের মুশফিক যার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়ার একসাথে একটা প্রজন্ম থেমে গেছিল। আমাদের ক্রিকেটেও সেই সময়টা আসবে।

শচীনকে সকলেই ভালবাসি। শচীনের বিদায়ে কতটা ভারাক্রান্ত হয়েছিলেন মনে করে দেখুন তো। অথচ তিনি ভিনদেশী প্লেয়ার! লারা অবসরের সময় জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনাদের বিনোদন দিতে পেরেছি কি? আমরা যেভাবে গালাগাল দিয়ে ধুয়ে দিচ্ছি ক্রিকেটারদের হয়ত ওরা আমাদের এসব বলতেও ভয় পাবে! কখন জানি মুখ ফসকে গালি দিয়ে ফেলি। পঞ্চপাণ্ডবের এসব তাও গা সওয়া হয়ে গেছে, উঠতি যারা আছে তারা কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর রাখেন। আমরা তাদের মনেও ভয় ধরিয়ে দিচ্ছি না তো?

শেষ করব মাশরাফির কথা দিয়ে, ‘মুক্তিযোদ্ধারা পায়ে গুলি নিয়েও যুদ্ধ করে গেছেন। আমরা তেমন কিছুই করছি না। ক্রিকেট আমার কাছে বিনোদনই। প্রকৃত যোদ্ধা, দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা।’

আমরাও বিনোদন হিসেবেই নিই না হয়। তারা যেমন যোদ্ধা নন, আমরাও বোদ্ধা না হই। আমরা শুধু ফ্যান হয়ে থাকি। মাথার উপরের ফ্যান যেমন শীতল হাওয়া দিয়ে নির্ভার রাখে, আমরাও তেমনি তাদের নির্ভার রাখি চলেন। দেখবেন, তারা নিজে থেকে সবটা উজাড় করে দিবে। বিশ্বের দরবারে হয়ে উঠবে আক্ষরিক অর্থেই একটুকরো বাংলাদেশ।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।