বসু পরিবার: যৌথ পরিবারের অন্যরকম গল্প

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

‘বসু পরিবার’কে বাংলায় তারকাখচিত ছবি বলা যায়। কিন্তু মুম্বাইয়ে ‘কাভি খুশি কাভি গাম’-এর মেলোড্রামা নেই। কিংবা যদি ‘বেলা শেষে’র মতো পারিবারিক ছবি দেখবেন ভেবে দেখতে বসেন এ ছবি, তাহলে সেটা খুব ভুল হবে।

উল্লেখিত সব ক’টি ছবি আমার প্রিয় নিজস্ব জায়গায়। কিন্তু এটা বোঝাতে চাইছি ‘বসু পরিবার’ দেখে এটাই মনে হল এ ছবি গতে বাঁধা পারিবারিক ছবির মতো নয়। এ ছবি অনেক বেশী গভীর, অনেক বেশী রেশ রেখে যায় মননশীল দর্শক মহলে। মনকে নাড়িয়ে দেয় এ ছবি।

সুমন ঘোষের ‘বসু পরিবার’ দেখলাম। ‘বসু পরিবার’ হতাশ করেনি, বরং সমৃদ্ধ করল। পারিবারিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সদস্যরা যখন একত্র হয় একটা পিকনিক ম্যুড গড়ে ওঠে ছবিতে। কিন্তু এই ছবি গভীর রহস্যে হেঁটে বেড়ালো যা অনেক পরিবারেই থাকে, কিন্তু সেগুলো বলার সাহস সবার থাকে না।

জেমস জয়েসের ‘দ্য ডেড’ গল্প থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিচালক সুমন ঘোষ ‘বসু পরিবার’-এর গল্পটি তৈরি করেছেন। পরিচালক যে ভাবে জেমস জয়েসের গল্পটিকে আত্তীকরণ করেছেন তা খুবই ভালো কিন্তু ছবির খাতিরে বিদেশি গল্প এখানে ভিষণ বাঙালি।
গল্পটা অসাধারণ রকমের ভালো।

একান্নবর্তীর মাঝেও একক পরিবার প্রতিটি, তাঁদের একক গোপন গল্প দিয়ে অসাধারণ মালা গেঁথেছেন চিত্রনাট্যকার পরিচালক। ঊনিশ বছর পর এ ছবিতে সৌমিত্র-অপর্ণা সঠিক ভাবেই ফিরেছেন। ওঁদের ছবি চয়েজে ভুল নেই, কিন্তু সর্বস্তরের দর্শকের কাছে এ ছবির অর্থ বোঝা কতটা গ্রহণযোগ্যতা হল রিলিজের সময় তা দ্বিধায় রাখলেও ছবিটির গুরুত্ব কমে না। পরিচালক যে সাহস দেখিয়েছেন তা প্রশংসনীয়।

বনেদী ব্লু ব্লাডের প্রদীপের তোলায় যে গল্প থাকে তাই উঠে এসেছে এ ছবিতে। বাঁধা গত বারবার ভেঙেছে এ ছবি।

অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যত সুন্দর আভিজাত্যপূর্ণ বাঙালি তত সুন্দর অপর্ণা সেন যিনি বলেন বউমা-বরণের সময় ‘বউমা কে বধূবরণের সময় যদি জিন্স ছেড়ে শাড়ি পরা বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে ছেলেটিও ধুতি পাঞ্জাবি পরুক’। অপর্ণার চেনা নারীবাদ অনেকে বলবেন কিন্তু এমন বুঝদার শাশুড়ি কি জা কি বউ সব রূপেই যেন অপর্ণা মঞ্জরীর মতো পরিবারটিকে ধরে রেখেছেন। অপর্ণা তো পর্দায় এলেই বাঙালিরা রোমাঞ্চিত হয় আজও, এ ছবিও তাই।

বড় জার ভূমিকায় লিলি চক্রবর্তী অনবদ্য। সরল সহজ স্নেহশীলা অভিনয়ে আরাম দেয় লিলির উপস্থিতি। অপর্ণার পাশেও লিলি নিজের ছন্দে ম্লান হননি এতটুকু।

পরান বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর রসিক ব্যক্তিত্ব, যীশু সেনগুপ্ত, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, শুভাশীষ মুখোপাধ্যায় এবং ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত সবাই এত নিঁখুত। যে ছবিটা যে শুধু মাল্টিস্টারার ছবি তাই নয় ছবিটা ভালো পরিনত অভিনয়ের মেলবন্ধনের ছবি। শ্রীনন্দা শংকর এত তুখোড় অভিনেতা অভিনেত্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যোগ্য সঙ্গত করেছেন। বেশ ভালো। সুদীপ্তা একটু মধ্যবিত্ত স্ত্রীর রোলে পারফেক্ট। অরুণ মুখোপাধ্যায় অতুলনীয়, ছবির সব রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু যিনি।

এই ছবির সবচেয়ে সাহসী চরিত্র কৌশিক সেনের চরিত্রটি। একটা মূলস্ত্রোতের ছবিতে এমন একটি চরিত্র রাখার জন্য পরিচালককে সাধুবাদ। যেন অনেকের নিরুচ্চার কান্না হয়ে উঠে এল কৌশিকের চরিত্রটি। মিথ ভাঙল চরিত্রটা। ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ মনোময় ভট্টাচার্য র গানটি ছবির সম্পদ।

মহিষাদল রাজবাড়িতে ‘দত্তা’র শ্যুটিংয়ে সুচিত্রা সেন ঐ রেফারেন্সটা বেশ লাগল। অপর্ণা সেনের প্রথম যৌবনের চরিত্রে অনিন্দিতা বোস অপূর্ব চয়ন। যৌথ পরিবারের অন্যরকম গল্প বলা ছবি সবাই দেখুন অন্যরকম ভালো লাগা দেবে।

https://www.mega888cuci.com