সামান্য এক নৈশপ্রহরীর অসামান্য যুদ্ধ

জাদুর কুপি থাকলে কি কি করা যায়, সেটা মিনা কার্টুন দেখিয়ে গেছে। মিথলজিতে আমরা দেখেছি জাদুর প্রদীপের দৈত্য কি করে সব অসম্ভব স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। নৈশপ্রহরী সুরুজ মিয়ার কোনো জাদুকরী ক্ষমতা নেই। তবুও নিজের অদম্য মানসিকতায় তিনি হয়ে উঠেছেন এক অসামান্য দৃষ্ঠান্ত।

গাইবান্ধার দুর্গম চরাঞ্চল থেকে শিক্ষিত হয়ে ওঠাটা খুব সহজ কাজ নয়। সেখানেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করেন নিজে কখনো মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরোতে না পারা সুরুজ মিয়া। পুরো নাম শাহ আলম সুরুজ। পেশায় তিনি ফুলছড়ি ডিগ্রী কলেজের নৈশপ্রহরী। প্রায় ১০ বছর ধরে রাতের বেলা তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিতরণ করেন শিক্ষার আলো।

সুরুজ মিয়া ও আরো কয়েকজন উদ্যমী তরুণের এই উদ্যোগের নাম হল – সেবা শিক্ষালয়। বাউশি গ্রামের ২৫০ থেকে ৩০০ জন শিশু এখানে শিক্ষা গ্রহণ করে। ফুলছড়ি ডিগ্রী কলেজের বারান্দায় প্রতিদিন বিকাল পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলে এই পাঠদান।

আর এর পুরোটাই হয় বিনা বেতনে। স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছে ১৫ জন শিক্ষক। এদের কেউ কেউ ডিগ্রী কলেজের ছাত্র। কেউ আবার কলেজের শিক্ষক। প্রত্যেকেই নিজের কাজটা করছেন হাসিমুখে।

সকালে স্কুলে যা পড়ানো হয়, সন্ধ্যার পর ঠিক একই পড়াটাই পড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে, অভিভাবকদের বাড়িতে গিয়ে আর না পড়ালেও চলে। শুধু তাই নয়, স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায়ই কলম, খাতা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ করা হয়। ফলে, অভিভাবকরাও ছেলে-মেয়েদের পাঠাতে আপত্তি করেন না।

শুধু পড়াশোনাই নয়, সপ্তাহে একদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। মাদক, যৌতুক ও নারী নির্যাতনের মত সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধেও নিয়মিত প্রচারণায় অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা।

সমাজ বদলাতে হবে, বদলাতে হবে নিজেদেরও। এই অঙ্গীকারে দৃঢ় প্রত্যয়ী সুরুজ মিয়ার স্কুল গড়েছে নতুন এক দৃষ্ঠান্ত। নিজে খুব বেশি শিক্ষার আলো পাননি বলেই হয়তো শিক্ষার গুরুত্বটা বোঝেন এই নৈশপ্রহরী। এই উদ্যোগ থেকে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থীও যদি দেশের কাজে আসেন, সেটাকেই নিজের প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন তিনি।

বললেন, ‘অভাব অনটনের কারণে আমি শিক্ষা পাই নাই। আমার বাবা-মা শিক্ষিত ছিলেন না। তারাও গুরুত্বটা বোঝেন নাই। আমি চাই এই বাচ্চাগুলোর সাথে যেন সেটা না হয়। আমি চাই ওরা শিক্ষিত হয়ে দেশের উপকারে আসুক।’

স্কুলের শুধু একটাই নিয়ম। পড়তে আসলে সাথে নিয়ে আসতে হবে একটা ল্যাম্প বা কুপির বাতি। সন্ধ্যা গড়ালে শিশুরা পড়তে বসে। কলেজের অন্ধকার বারান্দায় কুপির আলোর সাথে তাদের পড়ার শব্দ একরকম মায়াবী বিভ্রম সৃষ্টি করে। সেই বিভ্রমে খালি চোখে সুরুজ মিয়াকে দেখা যায় না, কিন্তু তাঁর অবদানটুকু বোঝা যায়।

বাংলাদেশের জাদুর কুপির স্কুলে সবাইকে স্বাগতম!

https://www.mega888cuci.com