প্রতিভাগুলো যেন হারিয়ে না যায়

টাইব্রেকারের শেষ শট। গোল হলেই বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন। কিন্তু এ সমীকরণ পূরণ করতে ব্যর্থ ৪ নাম্বার জার্সিধারী খেলোয়াড়। শট করলেন সরাসরি পাকিস্তানী গোলরক্ষকের শরীর বরাবর। মিস করেই হতাশায় মাথা নিচু করে বসেন পড়লেন আনফা কমপ্লেক্সের টার্ফে।

এগিয়ে এলেন মেহেদী হাসান। সতীর্থের দুই কাঁধে হাত রেখে কিছু একটা বললেন। তারপর বুকে জড়িয়ে নিলেন। হয়ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন, চিন্তা করিস না। ওদেরটা আমি আটকে দিচ্ছি।

মাঠে মেহেদীর শরীরী ভাষায় অন্তত এমন আত্মবিশ্বাসই ফুঁটে উঠেছে । পাকিস্তানের শেষ শটটি জালের ঠিকানা পেলেই ম্যাচটি ‘সাডেন ডেথ’-এ গড়াতো। নিহাত জামান-দুখু মিয়াদের শিরোপা জয়ের উল্লাসের অপেক্ষাটাও বাড়তো। কিন্তু অপেক্ষা করতে কার ভাল লাগে বলেন! মেহেদীরও হয়ত ভাল লাগেনা। তাই তো মুদাসসরের ডান পায়ের জোরালো শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দিয়ে সব হিসাব নিকাশের অবসান ঘটান তিনি।

পরপর দু’ম্যাচে টাইব্রেকার। দু’টোতে মুখোমুখি হতে হয়েছে মোট ৯টি শটের। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ৯টির ৮টিতেই বলের লাইনে ঝাঁপিয়েছেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের গোলরক্ষক মেহেদী হাসান। বাকি একটিতে বলের লাইন প্রেডিক্ট করতে একটু দেরি করে ফেলেন যে কারণে আর ঝাঁপিয়ে পড়ে আটকানোর চেষ্টা করতে পারেননি। ওই ৮টি শটের মধ্যে মেহেদী রুখে দিয়েছেন ৫টি শট। প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে নিখুঁত টাইমিংয়ে বলের লাইনে ঝাঁপিয়ে পড়ে শটগুলো রুখে দেন তিনি।

এদিকে কোন প্রকার ম্যাচ প্র্যাকটিস ছাড়াই কাঠমান্ডুতে পা রাখে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবল দল। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে মেহেদী হাসানের দলের প্রস্তুতি ছিল মাত্র দুই মাসের। সেমিফাইনাল ও ফাইনাল জয়ের নায়ক গোলরক্ষক মেহেদী হাসান ছিলেন দলের বিকল্প গোলরক্ষক। নেপালের বিপক্ষে নিয়মিত গোলরক্ষক মিতুল মারমা লালকার্ড খেলে সেমিফাইনালের মত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রথমবারের মত গোলবারের নিচে সুযোগ পান মেহেদী।

শক্তিশালী ভারতের বিপক্ষে টাইব্রেকারে গড়ায় ম্যাচটি। সেমিফাইনালের মত হাই ভোল্টেজ ম্যাচে প্রথমবারের মত খেলতে নেমে টাইব্রেকারের মত পরিস্থিতিতে স্নায়ুচাপে ভোগা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্নায়ুচাপে মুষড়ে যাননি মেহেদী। বরং নিজের সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রেখেই ম্যাচটি ভারতের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনেন তিনি। সে ম্যাচেও আত্মবিশ্বাসের ঝলক স্পষ্ট ফুটে ওঠে তার চোখে মুখে।

এই মেহেদী হাসানের ভবিষ্যত আছে। নিজের সামর্থ্যের জানান দিতে শুরু করেছেন কেবল। আমি বিশ্বাস করি ওর ভেতর যথেষ্ট সামর্থ্য রয়েছে ভবিষ্যতে আরো এগিয়ে যাওয়ার। দরকার শুধু পরিচর্যার। দায়িত্বটা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে)। আর শঙ্কাটা এখানেই।

তিন বছর আগেরকার কথা। সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে ঘরের মাঠে টাইব্রেকারে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। জয়ের নায়ক ছিলেন মেহেদীর মতই আরেক প্রতিভাবান গোলরক্ষক ফয়সাল আহমেদ। সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে সেদিন ভারতের ৪টি শটের প্রত্যেকটিতে বলের লাইনে ঝাঁপিয়েছিলেন ফয়সায়। অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় আটকে দিয়েছিলেন ২টি শট।

সেসময় ফেডারেশন ফয়সালদের একসঙ্গে রেখে দুই বছরের প্রশিক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সেটি ওই বলা পর্যন্তই। কাজের কাজ কিচ্ছু করেনি। এমনকি ফুটবলারদের কোন খোঁজও রাখা হয়নি ফেডারেশন থেকে। আর তাদের এই উদাসীনতায় হারিয়ে যান ফয়সাল। জীবনের তাগিদে ফুটবল ছেড়ে যোগ দেন পুলিশ কনস্টেবলের চাকরিতে। যদিও তাঁর স্বপ্ন ছিল একদিন জাতীয় দলের হয়ে খেলার। কিন্তু সে স্বপ্ন পাখা মেলতে শুরু করার  কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙ্গে পড়ে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচের আগে মেহেদী হাসান শিরোপা জয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ট্রফি জয় করে দেশে ফেরার সময় এখনই। পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জিতে দেশবাসীকে গর্বিত করার জন্য আমরা জীবন দিয়ে দেব’।

আক্ষরিক অর্থেই জীবন দিয়ে লড়াই করে দেশবাসীকে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন তারা। জানি বাফুফে থেকে কয়েকদিনের মধ্যেই ঘটা করে সংবর্ধনা দেয়া হবে আজকের শিরোপাজয়ী দলকে। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে একেকজনকে ভালো অংকের টাকা দেয়ার পাশাপাশি নানা প্রতিশ্রুতিও দেয়া হবে।

এটাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এই সংবর্ধনা ও পুরস্কারের মাধ্যমেই যেন দায়িত্ব শেষ হয়ে না যায় বাফুফের। মেহেদীদের মত বাফুফেও যেন নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। পাশাপাশি দলের প্রত্যেকটি সদস্যের যথাযথ পরিচর্যার সাথে সাথে কেউ যেন পেটের দায়ে অন্য কোন পেশায় চলে যেতে বাধ্য না হয় সেদিকটাও লক্ষ্য রাখতে হবে।

একজন ফয়সাল হারিয়ে গেছেন। কিন্তু একজন মেহেদী হাসান ও তাঁর সতীর্থরা যেন অবহেলায় হারিয়ে না যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে খোদ ফুটবল ফেডারেশনকেই। নিজেদের উদাসীনতায় এক একটা উঠতি খেলোয়াড় হারানোর সংস্কৃতিটা তবে শেষ হোক এখন থেকেই। জয়তু বাংলাদেশ ফুটবল।

https://www.mega888cuci.com