রমরমা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে পিনপতন নীরবতা!

ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি থমকে আছে প্রায় তিন মাস। কারণ, করোনা ভাইরাসের প্রকোপ। সাধারণত আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় দুই উৎসব মানে দুই ঈদ উপলক্ষে আমাদের দেশের ফ্যাশন হাউজ গুলো নানা রকম ফ্যাশন শো এবং ব্র‍্যান্ডের শ্যুটের মাধ্যমে তাদের পন্য নিয়ে ক্রেতাদের সামনে হাজির হন। তবে, এবার সেসবের কোনো বালাই নেই।

তাই, যাদের প্রচুর ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা, সেখানে এবার করোনার থাবায় সবকিছুই স্তব্ধ। নেই কোন র‍্যাম্প শো, হচ্ছেনা কোনো ব্র‍্যান্ডের ফটোশুট। স্বাভাবিকভাবেই থমকে আছে এই ইন্ডাস্ট্রির সাথে সংশ্লিষ্ট এজেন্সি, মডেল, কোরিওগ্রাফার, ফোটোগ্রাফার, মেক-আপ আর্টিষ্ট সহ সকলেই। লকডাউন শেষ হবার পরেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এই সেক্টরের আবারো অনেকটা সময় লেগে যাবে বলে মনে করছেন অনেকেই।

প্রতিবছর এই সময় ব্যস্ত সময় কাটালে এবার লকডাউন মেনে সবাই বাসায় থাকলেও মডেল-কোরিওগ্রাফার আজরা মাহমুদ নিজের জায়গা থেকে ভিন্নরকম কিছু করার চেষ্টা করছেন। ব্যাপক ক্ষতির মধ্য দিয়ে যাওয়া এই ইন্ডাস্ট্রিতে এই সময়েও বিধিনিষেধ মেনে কিছু কাজ কিভাবে চালু রাখা যায় সেই ভাবনা থেকেই এক নতুন ট্রেন্ডের ভাবনা নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তার আইডিয়াতেই ক্যানভাস ম্যাগাজিন এক ভিন্নধর্মী ভার্চুয়াল ফ্যাশন শ্যুটের আয়োজন করেছে কিছুদিন আগেই। বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি ধারণা।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন অর্গানাইজেশন বা পেইজের তরফ থেকে লাইভ অনুষ্ঠানেও সঞ্চালনের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তাই লকডাউনেও বেশ ব্যস্ততায় সময় কাটছে আজরার। তিনি বলেন, ‘আশা করি সবাই মিলে আবার ঘুরে দাঁড়াবো। ঈদ নিয়ে আলাদা কোনো প্রস্তুতি নেই। এবার সুস্থ থাকাটাই বড় ব্যাপার। বাসায় থেকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে।’

আরেক জনপ্রিয় মডেল জাহেদুর রহমান রিপন বলেন, ‘দেখতে গেলে পুরো ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ভয়াবহ ক্ষতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। মডেল, ফটোগ্রাফার, কোরিওগ্রাফার আমরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি তবে আসল ক্ষতিটা হয়েছে দেশীয় সকল পোষাক ব্র‍্যান্ডের। আমরা অনেকেই মডেলিং করার পাশাপাশি জব, বিজনেস, অভিনয় বা অন্য কোন পেশায় জড়িত আছি। তবে অনেক ফটোগ্রাফার, মেকাআপ আটির্ষ্ট সহ এজেন্সির অনেকেই শুধুমাত্র এই কাজের সাথে জড়িত। তাই প্রত্যক্ষভাবে তারাই আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারন এভাবে বাসায় বসে কতোদিন সারভাইভ করা যাবে সেটা এখন চিন্তার বিষয়। প্রতিবছর এই সময়ে আমাদের কাজের প্রেশারে দম ফেলার সময় থাকেনা আর এবার আমাদের কোন কাজ করা হচ্ছেনা এটা অবশ্যই খারাপ লাগছে। তবে কিছুদিন আগে ক্যানভাস ম্যাগাজিনের উদ্যোগে আজরা আপুর তত্ত্বাবধানে ভার্চুয়াল শ্যুট করা হয়েছে যেটা আসলেই আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে একটি নতুন অধ্যায়। হয়তো এই ভাবে দুরত্ব বজায় রেখে কিছু কাজ করা যাবে ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখার জন্য।’

লকডাউন মেনে পরিবারে সাথে বাসায় আছেন তিনি বলে জানিয়েছেন। সুস্থ থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর এই যুদ্ধে সবাইকে জেতার জন্য সুস্থ থাকতে হবে এবং নিজের আশেপাশের সবাইকে সুস্থ রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন এই জনপ্রিয় মডেল৷ সাথে সাথে তিনি আরো বলেন, ‘আশা রাখি খুব শ্রীঘই আল্লাহ তায়ালা এই বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করবেন সবকিছু দ্রুত স্বাভাবিক হোক এটাই প্রত্যাশা।’

বাংলাদেশের মডেলিং জগতে আলোচিত এবং জনপ্রিয় এক নাম শাবনাজ সাদিয়া ইমি। র‍্যাম্পের মঞ্চ থেকে শুরু করে ব্র‍্যান্ডের শ্যুট বা ম্যাগাজিনের পাতায় ফ্যাশন পেইজ প্রায় এক দশক ধরেই ইমি রাজত্ব করছেন মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে।

তিনি বলেন, ‘শুধু ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য না এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কিন্তু পুরো পৃথিবীর জন্য। অবশ্যই এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য নতুন এবং আতংকের তবে আমাদেরকে এটার সাথে ডিল করতেই হবে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি যে, কোভিড১৯ আমাদের জন্য একটা রিয়েলাইজেশন ফ্যাক্ট হিসেবে সামনে আসছে। এতোদিন ধরে মানবজাতি পৃথিবীতে নানা ভাবে প্রকৃতির উপর অত্যাচার চালিয়ে আসছে, বায়ুদূষণ, নদীভরাট, বন কেটে উজাড় করা, যত্রতত্র কলকারখানা স্থাপন সহ নানাভাবে প্রতিনিয়ত এমন কাজ করে আসছে যে রির্টান হিসেবে হয়তো আজ ন্যাচার এই প্রতিশোধটা নিচ্ছে। করোনায় আমরা যে বিষয়টা বুঝতে পেরেছি যে, আমাদের ভুল,অন্যায় আমাদের বুঝতে হবে, সেসব নিয়ে অনুতপ্ত হতে হবে। আমাদের কাছের মানুষের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। ঠিক বা ভুল বিবেচনা করার সময় এটা। এবছর ঈদ উপলক্ষে কোন কাজ করা হয়নি এটা অবশ্যই কষ্টের এবং আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য খারাপ একটা সময় তবে আমরায়া সকলে মিলেই এই সময়টা কাটিয়ে উঠবো বলে আশা করি।’

ঈদের প্রস্তুতি জানতে চাইলে ইমি বলেন, ‘ঈদ মানে আনন্দ আর খুশি, একভাবে বলতে গেলে আল্লাহর রহমতে আমি আমার পরিবারের সবাইকে সাথে নিয়ে সুস্থ আছি, ভালো আছি এটাই তো অনেক আনন্দের বিষয়। আমার কাছে এই সময়ে দাড়িয়ে এটাই ঈদ। আল্লাহ তায়ালা এখনো আমাদেরকে বিপদে পড়তে দেননি এটাই কি ঈদের আনন্দ হিসেবে যথেষ্ট নয়!’

এই সময়ে আমাদের দেশের আরেকজন আলোচিত এবং জনপ্রিয় মডেল ইমরান খান। র‍্যাম্প, ম্যাগাজিন, ব্র‍্যান্ড শ্যূট, টিভিসি থেকে মিউজিক ভিডিও মিডিয়ার অনেকগুলো সেক্টরে নিয়মিত কাজ করছেন তিনি। নিজের পরিশ্রম এবং কাজের প্রতি ডেডিকেশন তাকে দেশের অন্যতম আলোচিত এবং জনপ্রিয় মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে বৈশাখ এবং ঈদ এই দুই উৎসব উপলক্ষে সবচেয়ে বেশি কাজ করা হয়। এবার এই দুই উৎসবেই আমরা ঘরে বসে ছিলাম, কারণ করোনার ভয়াবহতায় হঠাৎ করেই সব বন্ধ করে দিতে হয়েছে। একটু গুছিয়ে নিয়ে কিছু কাজ করে রাখার সময়টাও আমরা পাইনাই। আমাদের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য সবচেয়ে খারাপ সময় পার করলাম আমরা এবার। দুটো সিজন যেখানে প্রচুর কাজ করা হয় সেখানে আমাদের বসে থাকতে হলো।’

মিডিয়াতে ফ্যাশন ফটোগ্রাফার হিসেবে ইতিমধ্যেই নিজের মেধা, দক্ষতা এবং ভিন্নধর্মী কাজ দিয়ে আলাদা একটা স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছেন আকিব রায়হান। লকডাউন বিধিনিষেধ মেনে বিগত দুই মাস ধরেই বাসায় আছেন তিনি। তার মতে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি খারাপ একটি সময় পার করছে, ‘সারাবছর ধরেই আমরা প্ল্যান করি যে কিভাবে ঈদের সময়কার শ্যুট গুলো ব্যতিক্রমী ভাবে উপস্থাপন করা যায়। ব্র‍্যান্ড শপ, কোরিওগ্রাফার, মডেল এবং আমরা ফটোগ্রাফাররা এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করি, ব্যস্ততায় কারনে দেখা যায় রোজার একমাস আগে থেকেই কাজ শুরু হয়ে যায়। প্রতিটা দিন কাজের মধ্যে দিয়ে ব্যস্ত সময় কাটে। তবে এবার এসব কিছুই হচ্ছেনা। দেশীয় পোষাক শিল্প ক্ষতির সম্মুখীন সাথে সেখানে কাজ করা শ্রমিক এবং পোষাক শিল্পের সাথে কাজ করা আমরা সবাই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তবে আশাকরি করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে সব বিধিনিষেধ মেনে আমরা অল্প পরিসরে কাজ শুরু করতে পারবো। এখন নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং দেশের জন্য সবাইকে সাবধানে থাকা, সচেতন থাকার প্রতি মনোযোগী হতেই হবে।’

গতবছর মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করেন শিরীন আক্তার শিলা। এই একবছরেই নিজের কাজ এবং দক্ষতা দিয়ে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এই সময়ের সম্ভাবনাময় এই মডেল করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বেশ সচেতন। লকডাউন মেনে বাসায় সময় কাটাচ্ছেন তিনি। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বাজে অবস্থার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে তাই স্বাভাবিকভাবেই এটা নিয়ে কিছুটা খারাপ লাগা তো আছেই।

তবে শিলা ভাবছেন অন্যভাবে। বললেন, ‘এখন মানুষের সবচেয়ে বড় চাহিদা হচ্ছে খাদ্য নিশ্চয়তা। সেই বেসিক চাহিদা পূরন হবার পরেই না মানুষ কাপড়চোপড় কিনতে আগ্রহী হবে। তবে এই সময়ে এসে পোষাকশিল্প খারাপ সময় পার করছে এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তবে একটা সময়ে যেয়ে আবারো ঘুরে দাড়াবে।’

আমাদের মিডিয়ার আরেক আলোচিত মডেল রিয়াশাদ শুভ জোর দিলেন সচেতনতা বাড়ানোর দিকে। তিনি বলেন, ‘আসলে সচেতন হওয়া আর বিধিনিষেধ মেনে চলার প্রতি গুরুত্ব দেয়া ছাড়া উপায় নাই। এই যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য বাসায় থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গত তিনমাস ধরেই বাসায় আছেন তিনি, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হচ্ছেন না। তবে প্রতিবছর এই সময়ে বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের শ্যুট নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত সময় কাটালেও এবার কোন কাজই করা হয়নি। এটা নিয়ে কিছুটা হতাশা এবং খারাপ লাগা তো আছেই। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা প্রতিটি মানুষের জন্যই সময়টা কঠিন তবে ধৈর্য্য ধরে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। শুভ জানালেন তিনি আরেকটি বিষয় নিয়েও চিন্তিত এই মূহুর্তে সেটি হচ্ছে, উন্নয়নশীল একটা দেশে এভাবে দীর্ঘদিন লকডাউন দিয়ে চালানো যাবেনা। কারন যারা দিন আনে দিন খায় তাদের জন্য ব্যাপারটা একদমই নিয়ন্ত্রণের বাইরে তাই এদিকটায় নজর দিতে হবে সবাইকেই।’

 

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।