অব্যর্থ নিশানায় ঘুচবে অপ্রাপ্তির অন্ধকার?

আর্জেন্টিনা! ছোট ছোট পাস, বল স্কিল আর ট্যাঙ্গোর তীর্থভূমি হচ্ছে এই ল্যাটিন আমেরিকান দেশটি। এখানকার প্রতিটি শিশুর শৈশব কাটে ফুটবল দিয়ে কারিকুরি করে আর স্বপ্ন থাকে একের পর এক ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে বল জালে পাঠানোর এবং পুরো মাঠ দাপড়িয়ে বেড়ানোর। যে স্বপ্ন তাঁদের দেখতে শিখিয়েছে ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনা। এই ভূমিকাটির আর্জেন্টাইন নাম হচ্ছে ‘এনগাঞ্চো’। ইতালিয়ানরা বলে ‘ট্রেকোয়াটিস্তা’। আর সহজ ফুটবলীয় পরিভাষায় একে ‘ক্লাসিক নাম্বার টেন’ বলা যায়।

প্রথম বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা রানার্সআপ হয়। এরপর দীর্ঘদিন আর বড় কোনো সাফল্য আসেনি। মাঝখান দিয়ে বয়কট করে কয়েকটি বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ না খেললেও তারা ধারাবাহিক সাফল্য রেখে যায় কোপা আমেরিকায়। ব্রাজিলের ৫৮ বিশ্বকাপজয়ী দলকে কোপাতে ৩-০ গোলে হারাতে সমর্থ হয় আর্জেন্টিনা। এরপর বিশ্বকাপে ফিরেই ১২ বছরের ব্যবধানে ৭৮ আর ৮৬ তে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। ৯০ সালে হয় রানার্সআপ। ৮৬-এর চ্যাম্পিয়ন হওয়া তো ম্যারাডোনাময় মহাকাব্যিক এক অধ্যায়। এরপর শুরু ৩২ বছরের আক্ষেপ!

ম্যারাডোনা একা নন আর্জেন্টিনা ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছে গিলের্মো স্ট্যাবিল, আলফ্রেড ডি স্টেফানো, মারিও কেম্পেস, জানেত্তি, রিকুয়লেমে, বাতিস্তুতা, লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তি।

ট্যাঙ্গো ফুটবল স্টাইল দিয়ে আর্জেন্টিনা জয় করেছে হাজারো ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়। ট্যাঙ্গোকে সংক্ষেপে বুঝালে সারাংশটা অনেকটা এমন দাঁড়ায় যে – মাঠজুড়ে অসংখ্য ছোট খাটো পাস দেয়া হয়। আসলে এগুলা দেখলে রাগ হয় এবং বিরক্তি চলে আসে। এই পাসিং এর মিটিং পয়েন্ট থাকে একটা নাম্বার টেন পজিশন এ। যে পজিশন এ ১৯৮৬-তে ম্যারাডোনা ও ২০১০ বিশ্বকাপে মেসি খেলেছেন।

৮৬’র বিশ্বকাপ জয়

এই ১০ পজিশন এ বল যাওয়ার পর বোঝা যায় এত পাসিং এর কারণ। মুলত পাসিং গুলা করা হয় একটা ব্যাসিক ক্রাইটেরিয়া মেন্টেইন এর জন্য। সেটা হল নাম্বার টেন পজিশন থেকে মার্কার সরিয়ে তাকে স্পেস দেয়া। আর নাম্বার টেন যে দিক দিয়ে বল বক্সে দিবে অর্থাৎ নাম্বার ৯ থেকে ডিফেন্সিভ মিডের দৃষ্টি সরানো।

পুরো মাঠ জুড়ে ছোট পাস দিলে স্বাভাবিক ভাবেই ডিফেন্সিভ লাইন এগিয়ে এনে ‘পিভট মুভ’ করে শর্ট পাসিং বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। দ্যাটস দা মোমেন্ট। পিভট মুভেবল হয়ে যাওয়া মানে স্পেস ফর টেন, আর স্পেস ফর টেনকে প্রেস করতে আসা ডিফেন্স লাইন ব্রেকিং পাস কে নাম্বার নাইনের গোলে কনভার্ট করার ভাল সুযোগ থাকে। এটাই ট্যাঙ্গোর বেসিক মুভ। পুরোপুরি সেই ট্যাঙ্গো বর্তমানে ফলো না করলেও এখনো আর্জেন্টিনার খেলায় এর একটা ছাপ থেকে যায়।

রাশিয়ায় বসতে যাচ্ছে ২০১৮ বিশ্বকাপ। বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসতে আর্জেন্টিনাকে বেশ কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। শেষ দিকে ছোট জাদুকর লিওনেল মেসিতেই রক্ষা। মেসির হ্যাটট্রিকে রাশিয়াগামী প্লেনের টিকেট নিশ্চিত করেছে সাম্পাওলির শিষ্যরা। ২৩ সদস্য বিশিষ্ট স্কোয়াড ঘোষণা করেছে সাম্পাওলি। বাদ পড়েছে ইকার্দি, প্যারাদেস, ফুনেস মাউরির মত বড় নাম। হাঁটুর ইনজুরির কারণে স্কোয়াডে থেকেও জায়গা হারিয়েছেন গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো।

ইকার্দির বাদ পড়াটা অনুমিতই ছিল। কারণ সে সাম্পার সিস্টেমের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি। তবে তাঁর ক্রস থেকে হেডে গোল করার যে যোগ্যতা সেটা সত্যিই খুব মিস করবে আর্জেন্টিনা। একটি কথাই বলবো যে ২৩ জনকে নিতে হলে কাউকে না কাউকে বাদ পড়তেই হবে! বরং যারা নির্বাচিত হয়েছে তাদের জন্য শুভকামনা জানানোটাই জরুরী।

এবার আসি মূল স্কোয়াযডে। রোমেরোর জায়গায় সম্ভবত কাবায়েরো খেলবেন। আর ডিফেন্সে মার্কাদো, আনসালদি, ওতামেন্দ্বী, ফ্যাজিও, রোহো, ট্যাগ্লিয়াফিকো, আকুনাতেই ভরসা রাখতে হবে।

এবার আর্জেন্টিনা মিস করবে খুব করে ২০১৪ সালের মাশ্চেরানোর পারফেক্ট স্পিডি ডেস্ট্রয়ার ভূমিকাকে। ২০১৪ সালে নেদারল্যান্ডসকে ১২০ মিনিট ও জার্মানিকে ১১৩ মিনিট গোলবঞ্চিত রাখার নায়ক তিনিই। গত বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি পাস ও ট্যাকল করা খেলোয়াড়টি এখন বয়সের কারণে অনেকটা স্লো। ডেস্ট্রয়ার হিসেবে বিগলিয়াও অনেকটা স্লো টাইপেরই। আর্জেন্টিনা যদি এবার স্ট্রাগল করে তবে এ জায়গাটিতেই করবে। আশা করি মিডে সেলসো, মেজা, লাঞ্জিনি, ডি মারিয়া, স্যালভিও, প্যাভনরা নিজেদের সেরাটাই দিবে। আর প্লেমেকার রোলে থাকবে ব্যানেগা।

আর ফরোয়ার্ড হিসেবে মেসি, দিবালা, আগুয়েরো, হিগুয়েনরা যার যার ক্লাবে অদ্বিতীয়। সমস্যাটা হচ্ছে মেসি ব্যতিত সকলেই ক্লাবের ফর্মটা জাতীয় দলে ক্যারি করতে পারেনা যা আসলেই দুশ্চিন্তার বিষয়। তবে আমি আশাবাদী এবার বেশ ভালো কিছুই হবে।

এই স্কোয়াডটার সবচেয়ে পজিটিভ দিক হচ্ছে এদের ভার্সেটাইলিটি (কয়েক পজিশন এ খেলতে পারা)। আরিগো সাক্কি একবার বলেছিল ভবিষ্যৎ ফুটবলে রাজত্ব করবেন ভার্সেটাইল ফুটবলাররা। আশা করি সাক্কির বাণীই সত্য হবে। এই ভার্সেটাইলিটিটাই সাম্পার হাতে বেশ কয়েকটি ফরমেশনের অপশন দিবে। ৪-৩-৩, ৪-২-৩-১, ৪-৪-২, ৩-৪-৩, ৩-৫-২ এগুলোকেই ধরা হচ্ছে সম্ভাব্য ফরমেশন। সাম্পা ২-৩-৩-২ ফর্মেশনেও টিমকে ট্রেনিং করিয়েছেন।

বোঝাই যাচ্ছে তিনি সহজেই হাল ছেড়ে দেয়ার পাত্র নন। সকল টোটকাই তিনি কাজে লাগাচ্ছেন। এই মাস্টার ট্যাকটিশিয়ানের সামর্থ্য সকলেরই জানা। এই দলের আরেকটি বড় অ্যাডভান্টেজ হচ্ছে এদের উপর প্রত্যাশার চাপ কম। বাস্তবতা বলছে এই টিমের দৌড় কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত কিন্তু ইতিহাস ও আবেগ বলে যে দল নিয়ে প্রত্যাশা কম সেটিই সাফল্যের চূড়ায় পৌছে।

গ্রপ ‘ডি’ আক্ষরিক অর্থেই গ্রুপ অফ ডেথ। আছে ইউরোপিয়ান পাওয়ার হাউস লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া, ‘আফ্রিকান ইগলস’ খ্যাত নাইজেরিয়া আর ২০১৬ ইউরোর চমক আইসল্যান্ড। আপনি চোখ বন্ধ করে নিশ্চিতরূপে কারো পক্ষেই বাজি ধরতে পারেন না। আর ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা আর নাইজেরিয়ার লাভ স্টোরি হচ্ছে ‘বেটার দ্যান টোয়ালাইট’।

এবারের দলটা সাদামাটা খেলোয়াড় এ পরিপূর্ণ হলেও একজন ব্যক্তিই মুল পার্থক্যটা তৈরি করে দিতে জানেন। তিনি হচ্ছেন লিওনেল মেসি। ‘ইফ দেয়ার ইজ লাইফ, দেয়ার ইজ হোপ’ – প্রবাদটির মতই যতক্ষণ মেসি আছেন ততক্ষণ আর্জেন্টিনার আশা টিকে আছে। অপেক্ষা কেবল একটি অব্যর্থ নিশানার!

https://www.mega888cuci.com