অনুপম রায়: দ্য গ্রেট মিউজিক্যাল মাইন্ড

২০১০ সালে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের অটোগ্রাফ চলচ্চিত্রে ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ এবং ‘বেঁচে থাকার গান’-এর মাধ্যমে কলকাতার গানের জগতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন একটি নতুন ছেলে। সেই সময় পেয়ে যাওয়া সফলতা তাঁকে কলকাতার গানের জগৎ ছাড়িয়ে বাংলাদেশেও তাকে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। বলা যায় এরপরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই সৃজনশীল শিল্পীকে। এতোক্ষণ যার কথা বলা হল তিনি দুই বাংলার জনপ্রিয় শিল্পী অনুপম রায়।

‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ থেকে শুরু করে ‘বেঁচে থাকার গান’ বা ‘তুমি যাকে ভালবাসো’, ‘যে কটা দিন’, ‘এখন অনেক রাত, অথবা ‘বসন্ত এসে গেছে’ বা ‘এ তুমি কেমন তুমি’ সংগীতব্যক্তিত্ব হিসেবে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন অনুপম রায়। বর্তমানে বাংলা সংগীত জগতের সবচেয়ে আলোচিত মানুষগুলির একজন তিনি। তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে তাঁর গান গুলোকে অতিরিক্ত মাত্রায় পাশ্চাত্য প্রভাবিত বলে যাঁরা সমালোচনা করতেন, ‘বসন্ত এসে গেছে’ কিংবা ‘তুমি যাকে ভালবাসো’র মতো ‘খাঁটি বাংলা গান’ তৈরি করে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছেন অনুপম।

অনুপম রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮২ সালের ২৯ মার্চ। তিনি তার প্রাথমিক শিক্ষার ১০ বছর পার করেন কলকাতার সেন্ট পলস ব্রডিং অ্যান্ড ডে স্কুলে। এরপর কলেজ জীবন পার করেন বেহালার এমপি বিরলা ফাউন্ডেশন থেকে। অনুপম রায় কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেক্ট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়াশোনা করেছেন। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন।

তিনি টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস বাঙ্গালুরু, কলকাতাতে ২০০৪ সালের জুলাই থেকে ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত এনালগ সার্কিট ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। তবে যার চিন্তা-চেতনার মাঝে সংগীত নিয়ে একটা বড় ধরনের চিন্তা ছিলো তিনি কি আর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজে মন বসাতে পারতেন! না একদমই পারতেন না। তাই কিছুটা অনিশ্চয়তা নিয়েই গানের জগতে প্রবেশ করেন অনুপম।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন যে, শিল্পী অনুপম রায় কিন্তু তার গানের সবরকম কাজ নিজেই করেন। তাঁর অধিকাংশ গানের ক্ষেত্রেই তিনি নিজেই গান লেখেন, সুর করেন এবং কন্ঠ দেন। অটোগ্রাফ চলচিত্রে তার গান ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ কে বাংলা ভাষার সেরা গানগুলোর একটি হিসেবে গন্য করা হয়। এরপরে ‘চলো পাল্টাই’ সিনেমায় তার ‘বাড়িয়ে দাও’ সহ বেশ কয়েকটি গান বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

তবে তাঁর জনপ্রিয়তার বৃহস্পতি শুরু হয় ‘বাইশে শ্রাবণ’ চলচিত্রের মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রের প্রত্যেকটি গান সুপারহিট হয়। বিশেষ করে রূপঙ্কর বাগচি ও শ্রেয়া ঘোষালের গাওয়া ‘গভীরে যাও’ বছরের সেরা জনপ্রিয় গান হিসেবে ভক্তদের কাছে স্বীকৃতি পায়। তবে জুড়িদের ভোটে সেবছর সেরা গান নির্বাচিত হয় অনুপমের নিজের গাওয়া ‘একবার বল’। তাছাড়া রূপম ইসলামের ‘এই শ্রাবণ’ ও সপ্তর্ষী মুখোপাধ্যায়ের ‘যে কটা দিন’ গানদুটিও দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এছাড়াও অনুপম জানি দেখা হবে, বেডরুম, ল্যাপটপ, চোরাবালি (আমাদের বাংলাদেশের চলচ্চিত্র), শুন্য অঙ্ক, জাতিস্মর, চতুষ্কোণ, প্রাক্তন, বেলাশেষে সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় চলচিত্রে কাজ করেছেন।

২০১৫ সালে সুজিত সরকার পরিচালিত ‘পিকু’ চলচিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে বলিউডে পদার্পণ করেন অনুপম। সিনেমাটির আবহ সংগীতের জন্য ফিল্ম ফেয়ার পান অনুপম। এটা তার কাছে অনেক বড় একটি প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করে অনুপম বলেন, ‘প্রথম সিনেমাতেই কলকাতার একজন শিল্পীকে বলিউডের গ্রহন করে নেয়া এবং কাজের স্বীকৃতি প্রদান এটা অনেক বড় একটি ঘটনা আমার জীবনে।’

এরপর একে একে পিঙ্ক, রানিং শাদি ডট কম, ডিয়ার মায়া, পরি, অক্টোবরসহ বেশ কয়েকটি বলিউড চলচিত্রে কাজ করেছেন তিনি। প্রতিটা সিনেমায় আলাদা একটি স্বতন্ত্র ছাপ ছেড়েছেন অনুপম।এছাড়া ‘প্রাক্তন’ সিনেমার ‘তুমি যাকে ভালোবাসো’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে ২০১৬ সালে ভারতের ৬৪ তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন অনুপম।

চলচ্চিত্র বাদে ‘দূরবীনে চোখ রাখবো না’, ‘দ্বিতীয় পুরুষ’, ‘বাক্যবাগীশ’ এবং ‘এবার মরলে গাছ হবো’ নামে চারটি অ্যালবাম বেরিয়েছে অনুপমের। ভিন্নধর্মী কথা, ব্যতিক্রমী সুর এবং অসাধারন গায়কীর জন্য তার প্রতিটি অ্যালবামই দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে অনেকের মতে চলচ্চিত্র বা অ্যালবামকে ছাপিয়ে যায় দ্য অনুপম রায় ব্যান্ড-এর স্টেজ পারফরমেন্স।

আনন্দলোক ম্যাগাজিনে এক সাক্ষাৎকারে অনুপমকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে, জনপ্রিয়তা কি আপনার শিল্পী স্বত্তাকে প্রভাবিত করে? অনুপম বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় চাই আমার থেকে বেশি জনপ্রিয় হোক আমার গান।’

গান লেখার পেছনে থাকে নানা ঘটনা। তা হয়তো ব্যক্তিজীবনেও ঘটে থাকে। শিল্পী অনুপমও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘প্রত্যেকটা গান লেখার পেছনেই বাস্তবে নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতার গল্প থাকে। সেটা হয়তো ছোট। কিন্তু তাকে আমরা বিভিন্ন রং দিয়ে আরও বড় করে ফেলি। যার সাথে আবার সাহিত্যের মিশ্রন থাকাতে তার রূপ আরও পাল্টে যায়। যা শ্রোতাদের কাছে ভিন্নরূপে ধরা দেয়। একেকজন একেকভাবে বিশ্লেষণ করেন। এ ধরনের বিষয় শুনলে নিজের মধ্যেও এক ধরনের ভাল লাগা কাজ করে। গানের জন্যই আপনারা আমাকে ভালোবাসেন। তাই গান শিল্পী সত্ত্বাকে প্রভাবিত অবশ্যই করে তবে জনপ্রিয়তা সেই প্রভাবটা ধরে রাখার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।’

অনুপম তার গান লেখার বিষয়টা নিয়ে সরাসরিই অনেকবার বলেছেন যে, ‘আমি বেশিরভাগ সময় গান লিখি মানুষের নানা রকম সম্পর্ক নিয়ে। আর সম্পর্কের গান তো সব সিনেমাতেই কাজে লাগে। গান লিখি নিজের কথা ভেবেই, তবে সিনেমাতে ব্যবহার করার পর সে গান সিনেমার অংশ হয়ে ওঠে। এটাই হয়তো গীতিকার বা সুরকার হিসেবে আমার স্বার্থকতা। আবার এমন অনেক গান আছে যেগুলো কোন সিনেমায় কাজে লাগানো যায় সেটা ভাবছি। একটু হেসে অনুপম বলেছিলেন যে, আমার তো ইউএফও নিয়েও গান আছে। কিন্তু স্পেস নিয়ে কেউ আর সিনেমা বানাচ্ছে কই? বিজ্ঞান নিয়েও গান আছে, কিন্তু সে বিষয় নিয়েও কোনও সিনেমাতো আমি অন্তত দেখতে পাচ্ছি না।তাই সেসব বন্দি হয়ে আছে আমার ডায়েরিতে। যদি কখনো সুযোগ আসে তবে অবশ্যই সেগুলোও কাজে লাগাবো।’

কিছুদিন আগেই একই সময়ে দৃষ্টিকোণ, কণ্ঠ, উমা এই তিনটি সিনেমার জন্য আলাদা আলাদা গান একসঙ্গে তৈরি করেন তিনি। কোন সিনেমার গল্পের প্লট এক না, সিকোয়েন্সের আবহ এক না তবুও তিনি তিনিট সিনেমার জন্য একই সময়ে ভিন্নধর্মী গান বানিয়েছেন। এই বিষয়ে অনুপম বলেছিপেন- আসলে আমার মধ্যে সুইচ আছে। আমি সময়মতো সেগুলো অন-অফ করতে পারি। কখনও শিবু মুড বা কখনও সৃজিত মুড। আবার প্রয়োজনমতো কৌশিক মুডেও ফিরে আসতে পারি। এগুলো সব আমার এই ইন্টারন্যাল সুইচ দিয়েই সামলাই। তাই কাজ করতে অসুবিধা হয়না।

রেদোয়ান রনি’র ‘চোরাবালি’ সিনেমায় সুরকার হিসেবে কাজ করেছিলেন অনুপম। তার সুরের জাদুতে সেবার মজেছিলেন বাংলাদেশের দর্শক এবং শ্রোতা। কিছুদিন আগে জয়া আহসানের প্রযোজনায় প্রথম সিনেমা ‘দেবী’ সিনেমায় তার কন্ঠ এবং সুরের জাদুতে আরেকবার মাতোয়ারা বাংলাদেশ। অনুপমের নিজের লেখা ও সংগীত পরিচালনায় ‘দু মুঠো বিকেল’ শিরোনামের গানটি জনপ্রিয়তা এবং প্রশংসা কুড়িয়েছে সকলের কাছেই।

গানের মতোই অনুপম কিন্তু ভালো সিনেমার প্রতিও আসক্ত। অনেকেই জানেন না যে, তিনি একবার ‘ট্রাইবেকার’ নামে একটা শর্টফিল্ম বানিয়েছিলেন, অনুপমের মতে, ‘সেটা মোটেও উৎকৃষ্ট মানের কিছু হয়নি। তবে ভবিষ্যতে খুব সাধারণ গল্প নিয়ে ভিন্নধর্মী একটি ভালো মানের ফুললেংন্থ ফিল্ম বানাতে চাই আমি। অনুপম আরো জানান ইচ্ছে পুরোপুরিই আছে, তবে ঠিক কী বলতে চাই বুঝে উঠতে পারিনি এখনো। যেদিন মনে হবে আমার বক্তব্যটা যথেষ্ট জোরালো, সেদিন নিশ্চয়ই বানাবো। আপাতত হাতে সময় একদমই নেই।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এই জনপ্রিয় এবং দক্ষ শিল্পী বলেন, ‘আমি তো বেঁচে থাকার গান গাই। আগামী দিনেও বেঁচে থাকার গান গেয়ে যেতে চাই।’ সৃষ্টির নেশা সবসময় তাড়া করে বেড়ায় শিল্পী অনুপমকে। আর এই নেশাই তাকে একদিন আরো অনেকটা এগিয়ে দিবে সাফল্যর পথে এই কামনা রইলো।

https://www.mega888cuci.com