সর্বকালের সেরা ১০ বাংলাদেশি ছবি

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিল্ম আর্কাইভ হল ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানে ৬০,০০০ হাজারের মতো ফিল্ম আর্কাইভ করে রাখা আছে। সারা বিশ্বের যে সব চলচিত্র নিয়ে প্রতিষ্ঠান আছে তার মধ্যে অন্যতম বড় হলো এই প্রতিষ্ঠান। ‘লন্ডন চলচিত্র উৎসব’ এই প্রতিষ্ঠানই আয়োজন করে থাকে। সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচিত্র নিয়ে আজকের আয়োজন।

ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্সটিটিউট মুলত দুটি ক্যাটাগরি সেরা ১০ চলচিত্র বাছাই করেছেন। ক্যাটাগরি দুটি হলো দর্শকের ভোটে নির্বাচিত সেরা ১০ সিনেমা ও চলচিত্রবোদ্ধা ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেরা ১০ চলচিত্র। কোন সেরা ১০টি চলচিত্র চলচিত্রবোদ্ধা ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেরা তা জেনে নেই। ওহ, আরেকটি কথা, যে ১০ টি চলচিত্র বাছাই করা হয়েছে তা ২০০১ সাল পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া সিনেমা গুলোর মধ্যে হয়েছে। সত্যি বলতে এরপর একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে এতো বছরের বলার মতো কিংবা সেরা ১০ এর লিস্টে যাওয়ার মতো সিনেমা সেভাবে আমাদের দেশে আর তৈরি হয়নি বলেই মনে হয়।

  • সাত ভাই চম্পা (১৯৬৮)

আমাদের দেশে লোক-কাহিনীর উপর নির্ভর করে সিনেমা বানানর ইতিহাস সেই শুরু থেকেই। এবং এই লোক-কাহিনীর উপর নির্ভর করে বানানো সিনেমাগুলো আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবসা সফল হয়। সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলেও লোক-কাহিনীর দিকে ঝুকে থাকা স্বাভাবিক। লোক-কাহিনীর উপর নির্ভর করে বানানো সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী বা পথিকৃৎ যে সিনেমা টা তার নাম ‘সাত ভাই চম্পা’। সিনেমায় চম্পার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কবরী সরোয়ার আর সওদাগরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তৎকালীন সুপারস্টার আজিম। সাত ভাই চম্পা সিনেমা পরিচালনা করেছিলেন দীলিপ সোম আর চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন খান আতাউর রহমান (খান আতা)। মুলত দক্ষিনারঞ্জন মিত্রের সংকলিত ঠাকুরমার ঝুলি গল্পগ্রন্থ থেকে নেয়া কাহিনী যা নিয়ে পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ও আমাদের দেশে ১৯৯৪ সালে আবার নির্মাণ করা হয়।

  • শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯)

এই সিনেমার সাথে দুজন মানুষ যুক্ত আছেন যারা আজ আমাদের মাঝে নাই। একজন আমাদের দেশের সাহিত্যের অন্যতম কর্ণধার হুমায়ূন আহমেদ আরেকজন শিল্পী বারী সিদ্দিকী। সোয়াচান পাখি কিংবা আমার গায়ে যত দুঃখ সয় এর মতো কালজয়ী গান গেয়েছিলেন এই সিনেমাতেই। শ্রাবণ মেঘের দিন আমাদের দেশের চলচিত্রের অন্যতম চলচিত্র যা পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ তার নিজেরই লেখা একই নামের উপন্যাস থেকে বানিয়েছিলেন। আমাদের দেশের ভাটি অঞ্চলের গানের মানুষের গল্প বলেছেন এই সিনেমাতে। জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর পরিচালনায় দ্বিতীয় চলচিত্র ছিলো এটি, যা জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কার পায় সাতটি শাখায়।

  • রুপালী সৈকতে (১৯৭৯)

আমাদের দেশের চলচিত্রের ক্লাসিক নির্মাতার লিস্ট যদি বানানো হয় তাহলে একটা নাম ছাড়া সে লিস্ট কখনই পূরণ হবে না। যাকে আমাদের দেশের চলচিত্র আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যাক্তিত্ব মানা হয়। তিনি হলেন খ্যাতিমান চলচিত্রকার আলমগীর কবির। স্বাধীনতা পূর্ব সময়টা তে এই দেশে যে অসহনীয় অবস্থা ছিলো তারই রুপদান করেছিলেন তার এই ‘রুপালী সৈকতে’ নামের চলচিত্রে। ষাটের দশকে আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনামলে অনেক কারাবরণ করেন। সেইসব দেশ প্রেমিকদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতেই পরিচালক আলমগীর কবির সিনেমাটি উৎসর্গ করেছিলেন। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কবির, শর্মিলী আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, অঞ্জনা রহমান, রোজী সামাদের মতো তারকারা।

  • ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩)

স্বাধীনতা যুদ্ধের ঠিক পরপরই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি করা সিনেমা ‘ধীরে বহে মেঘনা’। যদিও প্রাথমিক ভাবে এই সিনেমার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন বাংলা চলচিত্রের আরেক দিকপাল জহির রায়হান কিন্তু ধীরে বহে মেঘনা চলচিত্রটিই আলমগীর কবিরের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচিত্র। সত্য সাহার সঙ্গীতে এই সিনেমায় গান গেয়েছিলেন উপমহাদেশের দুই প্রখ্যাত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন বুলবুল আহমেদ, ববিতা, গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, খলিল উল্লাহ খান সহ আরো অনেকে।

  • সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯)

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এবং ১৯৪৭ এর দেশভাগ পরবর্তী সময়কালে বাংলার গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতন্ত্রের নির্যাতন ও ধনীদের শোষণ সব মিলিয়ে তখনকার পরিবেশ ছিলো দুর্বিষহ। সেই দুর্বিষহ সময় কে চলচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের। সমাজের কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি কিংবা পুরুষদের নির্যাতনে নারী কতটা অসহায় ছিলো তারই রুপদান হয়েছিলো এই চলচিত্রে। সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, এটিএম শামসুজ্জামান। কথা সাহিত্যিক আবু ইসহাক এর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমা বাংলাদেশের প্রথম সরকারী অনুদান প্রাপ্ত চলচিত্রও।

  • বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না ( ১৯৮৯)

বাংলা সিনেমার লিস্ট আপনি যেভাবেই করবেন না কেন, আপনাকে ঐ লিস্টে বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না সিনেমাটা রাখতেই হবে। কিছু কারণ বলি, শোনা যায় এই সিনেমার টিকেট না পেয়ে নাকি একজন আত্মহত্যাও নাকি করেছিলেন। ২০ লাখ টাকা দিয়ে নির্মিত সিনেমা ২০ কোটি টাকায় আয় করেছিলো যার জন্য এই সিনেমা বাংলা চলচিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসা সফল চলচিত্র। এই সিনেমা প্রায় ১২০০ সিনেমা হলে মুক্তি দেয়া হয়েছিলো এবং কিছু কিছু সিনেমা হলে টানা ১২০ দিন চলেছিলো এই সিনেমা। এই সিনেমা করার আগে ইলিয়াস কাঞ্চন কিংবা অঞ্জু ঘোষ কে চলচিত্র জগতে জায়গা খুঁজে বেড়াতে হতো, অথচ এই সিনেমা করার পর দুই জনেই রাতারাতি তারকা বনে যান। এতো কিছু ঘটে যাওয়া সিনেমার কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছিলেন তোজাম্মেল হক বকুল যা পরবর্তীতে ওপার বাংলায় রিমেক করা হয়েছিলো। সেখানেও অঞ্জু ঘোষ অভিনয় করেছিলেন। এই সিনেমার গান ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না আমায় কথা দিয়েছে’ যা কালজয়ী হয়ে আছে সঙ্গীতাঙ্গনে।

  • সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭)

আবিদা সুলতানার ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ কিংবা ভুপেন হাজারিকার ‘মেঘ থম থম করে’ গানের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? হুম, এই দুই বিখ্যাত গান যে সিনেমায় রয়েছে তার নাম ‘সীমানা পেরিয়ে’। সিনেমাতে দেখা যায় একজন গ্রাম্য তরুণ আর এক শহুরে তরুণী ভাসতে ভাসতে এক অজানা দ্বীপে এসে পড়েছে যেখানে কোনো মানুষ বাস করে না। তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়েই সীমানা পেরিয়ে সিনেমার কাহিনী এগিয়ে গেছে। বেঁচে থাকার তাড়নায় একেবারে বিপরীতমনা মানুষের মধ্যেও যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে- সেটাই এই সিনেমার বিষয়বস্তু। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেন ও পরিচালনা করেন আলমগীর কবির। সিনেমা তে অভিনয় করেছিলেন বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কর ও তানুজা।

  • নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৪)

সিনেমার বিষয়বস্তু ছিলো আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধ। মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত এক দূরবর্তী গ্রামের মাতব্বর মোতালেব মোল্লা ও তার দ্বিতীয় বৌ এর ছেলে বাচ্চুর মধ্যে দেশের স্বাধীনতা নিয়ে বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেয়ার গল্প তুলে ধরেছেন সিনেমার পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল। ১৯৯৪ সালে মুক্তি প্রাপ্ত এই সিনেমার কাহিনী ও সংলাপ লিখেছেন পরিচালক নিজেই। সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন তৌকীর আহমেদ, আলী যাকের, রাইসুল ইসলাম আসাদ, সারা জাকের, আফসানা মিমি সহ আরও অনেকে।

  • চিত্রা নদীর পাড়ে (১৯৯৯)

আবারো তানভীর মোকাম্মেল এর কাহিনী, সংলাপ ও পরিচালনায় সিনেমা। এবারো সিনেমার গল্পের অন্যতম প্রধান উপাদান নদী তবে এবারের সিনেমার প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধের না, আরেকটু আগের। ১৯৪৭ সালে যখন দেশভাগের আন্দোলনে এই দেশের অধিকাংশ হিন্দুরা পাশের দেশে চলে গিয়েছিলো নানা কারণে তখনকার চিত্র ফুটে উঠেছিলো এই সিনেমায়। ঐ সময় হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা কেমন ছিলো তার রুপদান করেছিলেন পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল। সিনেমার অভিনয় করেছিলেন মমতাজউদ্দীন আহমেদ, তৌকির আহমেদ, আফসানা মিমি ও রওশন জামিল।

  • তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩)

বাংলাদেশের অন্যতম চলচিত্র প্রযোজনা ব্যাবসার পথিকৃৎ মুক্তিযদ্ধা হাবিবুর রহমান খান তখন সবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছেন। কি করবেন ভেবে ঠিক করতে পারতেছিলেন না। এমন সময় হটাৎ তিনি ঠিক করলেন চলচিত্র প্রযোজনায় নামবেন। মাত্র স্বাধীন হওয়া দেশের চলচিত্র কে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে তিনি ঠিক করেছিলেন সত্যজিৎ রায় কিংবা ঋত্বিক ঘটক কে দিয়ে সিনেমা বানাবেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে তিনি চলচিত্র বানানোর কথা চিন্তা করে গেলেন সত্যজিৎ রায়ের কাছে। সব দেখে শোনে সত্যজিৎ রায় বললেন ‘এই ছবিটি নির্মাণ করার ক্ষমতা আমি রাখি না। একমাত্র ঋত্বিক ঘটকই এটি সম্ভব করতে পারেন।’ আর ঋত্বিক এই সিনেমা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমার ছবিতে গ্রাম নায়ক, তিতাস নায়িকা’। সিনেমাটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন কবরী, প্রবীর মিত্র, রোজী আফসারী, গোলাম মোস্তফা ও রওশন জামিল।

https://www.mega888cuci.com