বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ একাদশ

ব্রিটিশ মুল্লুকে বসতে যাওয়া ক্রিকেটের এবারের বিশ্ব আসরটি টুর্নামেন্টের দ্বাদশ সংস্করণ। এর আগে ১১ বার ক্রিকেটের মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশ অংশ নিয়েছে মাত্র পাঁচ বার। ওই পাঁচ আসরে লাল সবুজের জার্সি গায়ে খেলেছেন বহু ক্রিকেটার। ব্যাট ও বল হাতে দ্যুতিও ছড়িয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্য থেকে সেরা ১১ জনকে বাছাই করে গঠন করছি বিশ্বকাপের ইতিহাসে বাংলাদেশের সেরা একাদশ।

  • তামিম ইকবাল

তামিম ইকবালের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে। মাত্র দুটি ওডিয়াই খেলে বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পাওয়া এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান প্রথম ম্যাচেই সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেই ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে ব্যাট হাতে বোলারদের রীতিমত শাসন করেন তিনি।

সাত চার ও দুই ছক্কায় তার ৫১ রানের ইনিংসটি সেদিন বাংলাদেশকে জয়ের পথে এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছিল। তারপর ২০১৫ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দলের জয়ে আবারো অবদান রাখেন তিনি। ৩১৯ রান তাড়া করার সে ম্যাচে ৯৫ রান করে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন তামিম। এখন পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপ খেলা তামিম ইকবালের সংগ্রহ ২৩ গড়ে ৪৮৩ রান। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি যেমন সেরা ওপেনার, বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের সবচেয়ে সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন তিনি।

  • ইমরুল কায়েস

২০১১ সালে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে খেলতে নেমে টুর্নামেন্টে বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক বনে যান তিনি। ৬ ম্যাচ খেলে ৩৭.৬০ গড়ে তার সংগ্রহ ছিল ১৮৮ রান। আসরে ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি বাঁচা মরার লড়াইয়ে ৬০ ও অপরাজিত ৭৩ রান করে দলের জয়ে বড় অবদান রাখেন তিনি। উভয় ম্যাচের ম্যাচসেরার পুরষ্কারও তাই চলে যায় তার দখলে।

  • মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ

বিশ্বকাপের ইতিহাসে শতক হাকানো প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান তিনি। ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৩৮ বলে ১০৩ রানের ইনিংস খেলে তিনি এ কীর্তি গড়েন। ঠিক এর পরের ম্যাচেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আবারো শতক হাকান রিয়াদ। খেলেন ১২৮ রানের হার না মানা ইনিংস।

শুধু কী তাই! ওই আসরে ৬ ম্যাচে ৭৩ গড়ে ৩৬৫ রান করে বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক বনে যান তিনি। ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের সেরা দশ জনের তালিকায়ও। সেইসাথে বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ রান তোলা বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের তালিকায় তার নামটি চলে যায় সবার উপরে।

  • মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক)

অদ্যাবধি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনটি। ৩১.৮৭ গড়ে তুলেছেন ৫১০ রান। ২০০৭ সালে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে প্রথম ম্যাচেই ভারতের বিপক্ষে ৫৬ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। পরের বিশ্বকাপে বলার মত কিছু না করলেও ২০১৫ বিশ্বকাপে বেশ ধারাবাহিক ছিলেন মুশফিক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের দিনে ৭৭ বলে ৮৯ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি।

এর আগে আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি অর্ধশতক তুলে নেন মুশফিক। শুধু ব্যাট হাতে নয়, গ্লাভস হাতেও দলে বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ২১ ম্যাচে তার ডিসমিসাল সংখ্যা ১৮ যা যেকোন বাংলাদেশির মধ্যে সর্বোচ্চ।

  • মিনহাজুল আবেদীন নান্নু

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম কোন ম্যাচ জয়ের নায়ক এই মিনহাজুল আবেদীন নান্নু। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সে ম্যাচে মাত্র ২৬ রানে প্রথম সারির ৫ ব্যাটসম্যান আউট হয়ে গেলে তিনি দলের হাল ধরেন। অপরাজিত ৬৮ রান করে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলে একটা লড়াই করার মত পুঁজি পাইয়ে দেন তিনি।

 

ওই ম্যাচে বল হাতে একটি উইকেটও পান নান্নু। ম্যাচ সেরাও নির্বাচিত হন। ঠিক এর পর ম্যাচেই ম্যাকগ্রা, ফ্লেমিং, মুডি ও ওয়ার্নদের মত শক্তিশালী বোলিং লাইন আপের বিপক্ষে তিনি খেলেন অপরাজিত ৫৩ রানের ইনিংস। তবে সে ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ।

  • সাকিব আল হাসান

ক্রিকেটের বিশ্ব আসরে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ও সর্বোচ্চ উইকেটশিকারির নাম সাকিব আল হাসান। বিশ্বকাপে সাকিবের প্রথম অংশগ্রহণ ২০০৭ সালে। প্রথম ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে খেলেন ৫৩ রানের একটি ইনিংস। আসরে দ্বিতীয় অর্ধশতক তোলার দিনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিব অপরাজিত থাকেন ৫৭ রানে।

তারপরের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি। ওই আসরে ১টি ও ২০১৫ বিশ্বকাপে দু’টি হাফ সেঞ্চুরি সাকিব। বিশ্বকাপে তার সেরা বোলিং ৫৫ রানে ৪ উইকেট নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ২১ ম্যাচে ৩০ গড়ে সাকিবের সংগ্রহ ৫৪০ রান ও ২৩ উইকেট।

  • খালেদ মাহমুদ সুজন

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম কোন পরাশক্তিকে বধ করার কারিগর তিনি। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে হারানোর সেই ম্যাচে ব্যাটিং, বোলিং উভয় বিভাগেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন খালেদ মাহমুদ সুজন।

ব্যাট হাতে প্রথমে ২৭ রান করার পর বল হাতে ৩১ রানের বিনিময়ে তিনি তুলে নেন আফ্রিদি, ইনজামাম ও সেলিম মালিকের উইকেট। ফলশ্রুতিতে ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।

  • মাশরাফি বিন মুর্তজা (অধিনায়ক)

বিশ্বকাপের কোন আসরে বাংলাদেশের সেরা সাফল্যটি আসে মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে। ২০১৫ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বেই প্রথমবারের মত কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ।

এর আগে ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ জয়ের ভীতটা গড়া হয়েছিল মূলত তার হাতেই। পোর্ট অব স্পেইনের বাইশ গজে সেদিন নতুন বলে  ঝড় তুলেন মাশরাফি। প্রথম স্পেলেই বীরেন্দ্র শেবাগ ও রবিন উথাপ্পাকে আউট  করে ভারতকে ব্যাকফুটে ফেলে দেন তিনি। ম্যাচে ৩৮ রানের বিনিময়ে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরাও নির্বাচিত হন মাশরাফি।

২০০৩ সালে প্রথম বিশ্বকাপ খেলা মাশরাফি এখন পর্যন্ত তিনটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে ১৬ ম্যাচে ১৮টি উইকেট নিয়ে আছেন বিশ্বকাপে বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকের তালিকার তৃতীয় অবস্থানে।

  • মোহাম্মদ রফিক

২০০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বাঁ-হাতি স্পিনারদের ত্রয়ী বেশ আলোচিত হয়েছিল। সেবার সাকিব ও রাজ্জাকের সাথে এই আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোহাম্মদ রফিক। নি:সন্দেহে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা বাঁ-হাতি স্পিনার। তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। এর মধ্যে পেয়েছেন ১২ টি উইকেট। রান করেছেন ১১৩।

  • আব্দুর রাজ্জাক

আব্দুর রাজ্জাক বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক। ১৫ ম্যাচ খেলে তার সংগ্রহ ২০ উইকেট। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কয়েকটি জয়ে বল হাতে তিনি অবদান রাখলেও সেগুলো অনেকটা আড়ালে ঢাকা পড়ে অন্যদের পারফরম্যান্সে।

যেমন, ২০০৭ বিশ্বকাপে শুরুতেই ২ উইকেট হারিয়ে ধুকতে থাকা ভারতের বিপক্ষে তিনি তুলে নেন তিনটি উইকেট। এর মধ্যে ছিল শচীন টেন্ডুলকার ও থিতু হওয়া যুবরাজ সিংয়ের উইকেট।

যদিও সে পারফরম্যান্স ঢাকা পড়ে যায় মাশরাফির ৪ উইকেট, তামিম, সাকিব ও মুশফিকের হাফ সেঞ্চুরির আড়ালে। একই আসরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাত্র ২৫ রানের বিনিময়ে তিন উইকেট তুলে নিলেও সেটি পড়ে যায় আশরাফুলের বিরোচিত ৮৭ রানের ইনিংসের আড়ালে।

তাছাড়া ২০১১ বিশ্বকাপে টিকে থাকার লড়াইয়ে ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও বল হাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ৩২ রানে দু’টি ও নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯ রানে তিনটি উইকেট তুলে নেন এই বাঁ-হাতি অফ-স্পিনার।

  • রুবেল হোসেন

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য । ২০১৫ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে প্রথমবারের মত টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার ম্যাচে বল হাতে চার উইকেট তুলে নেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে ৬৩ রান করা ইয়ান বেল ও অধিনায়ক ইয়ন মরগানের উইকেট। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দুটি উইকেট তিনি তুলে নেন সেটি একেবারে ম্যাচের অন্তিম সময়।

ম্যাচ তখন পেণ্ডুলামের মত দোদুল্যমান। শেষ ১২ বলে ইংল্যান্ডের দরকার ছিল ১৫ রান। ঠিক তখন বল করতে এসে প্রথম তিন বলের মধ্যেই ব্রড ও অ্যান্ডারসনকে ক্লিন বোল্ড করে বাংলাদেশকে জয়ের বন্দরে ভেড়ান এই পেসার। একইসাথে নিশ্চিত করেন প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের খেলার টিকেট।

  • মোহাম্মদ আশরাফুল (দ্বাদশ ব্যক্তি)

২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। ৯ ম্যাচে ৩৬ গড়ে করেন ২১৬ রান। এর মধ্যে সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে খেলেন ৮৩ বলে ৮৭ রানের ম্যাচ জেতানো এক ইনিংস। হয়েছিলেন ম্যাচসেরাও। এর আগের আসরে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ খেলতে নামা আশরাফুল এখন পর্যন্ত তিনটি আসরে অংশ নিয়ে ২৪.৯১ গড়ে করেছেন ২৯৯ রান।

  • বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ একাদশ

তামিম ইকবাল, ইমরুল কায়েস, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিম (উইকেটরক্ষক), মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, সাকিব আল হাসান, খালেদ মাহমুদ সুজন, মাশরাফি বিন মুর্তজা (অধিনায়ক), মোহাম্মদ রফিক, আব্দুর রাজ্জাক ও রুবেল হোসেন। দ্বাদশ ব্যক্তি: মোহাম্মদ আশরাফুল।

https://www.mega888cuci.com