ফারুক আহমেদ আদৌ কতটুকু মূল্যায়ন পাচ্ছেন?

প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের খুব পছন্দের অভিনেতা ছিলেন তিনি। সেটা এতটাই যে নিজের উপন্যাস ‘লিলুয়া বাতাস’ এই ফারুক আহমেদকে উৎসর্গ করেছিলেন নন্দিত এই কথাসাহিত্যিক। নি:সন্দেহে হুমায়ূন আহমেদের প্রতিও কৃতজ্ঞই থাকবেন ফারুক। কারণ, ফারুকের আজকের অবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদানটাই হুমায়ুন আহমেদের।

তাকে দিয়ে কি না করিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘মতি মিয়া নিজের ইচ্ছায় চলে, অন্যের ইচ্ছার ধার ধারে না’ কিংবা ‘গাঞ্জা খাইয়াই কূল পাই না, পড়ালেখা করমু কখন’ – এমন আইকনিক ডায়লোগগুলো হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত নাটকেই বলেছিলেন তিন।

এখানেই শেষ নয়, আরো আছে। ফারুক আহমেদের কমিক সেন্স বরাবরই হুমায়ূনের নাটকে বাড়তি একটা মাত্রা যোগ করতো। ‘বলবো আল্লাহর কসম আমি ভাঙ্গি নাই, পশ্চিম দিক ফিরা কইতাছি, যদি মিছা কথা কই তাইলে আমার উপর ঠাডা পরবো’, কিংবা ‘ধুর ছাতা দলই করমু না, আমি বিখ্যাত ঢোল বাদক তৈয়ব আলী, অতি উচ্চবংশ’ –  এই সংলাপগুলো তাঁর কণ্ঠে যতটা মানিয়ে গেছে, অন্য কেউ করলে মানাতো কি না সন্দেহ!

‘আজ রবিবার’, ‘বৃক্ষমানব’, ‘গৃহসুখ প্রাইভেট লিমিটেড’ ও ‘উড়ে যায় বক্ষপক্ষী’ – হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় এই নাটকগুলোর সংলাপে দর্শকদের বিনোদিত করেছিলেন তিনি। শুধু এই চারটি নাটকই নয় হুমায়ূন আহমেদের অসংখ্য নাটকে মজার মজার সংলাপ বলে দর্শকদের বিনোদিত করতেন। এই নাটকগুলির মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন কৌতুক অভিনেতা।

ফারুক মানিকগঞ্জের ছেলে। বাংলা নাট্যঙ্গনের অন্যতম স্বনামধন্য এই অভিনেতা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকাকালীন সময়েই যুক্ত হন থিয়েটারে। ১৯৮৩ সালে যোগ দেন ঢাকা থিয়েটারে। টিভি নাটকে প্রথম খ্যাতি পান জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘আজ রবিবার’ দিয়ে। হুমায়ূন আহমেদের নাটকগুলিতে বাড়িতে কাজের লোকগুলো একটু বিশেষ হয়ে থাকতো। তেমনি এই নাটকে একটি উচ্চবিত্ত একান্নবর্তী পরিবারের কেয়ারটেকার ‘মতি মিয়া’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছিলেন। তাঁকে হুমায়ূন আহমেদের আবিস্কার বললেও তাই বাড়িয়ে বলা হবে না।

বিটিভির ‘গ্রন্থিকগন কহে’ নাটক দিয়ে শুরু তাঁর। এরপর ‘বারো রকমের মানুষ’ নামের আরেকটি নাটকে তিনি সবার নজরে আসেন। মজার ব্যাপার হল, এত দুর্দান্ত যার কমিক টাইমিং বাংলা নাটকে তাকে এখানে দেখা গিয়েছিল নেতিবাচক চরিত্রে। নাম ছিল ‘রসিকলাল’। যদিও, পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে তাঁর ক্যারিয়ারে পরিবর্তন ও বিকাশ হয়। হুমায়ূনের সাথে তাঁর প্রথম কাজ ছিল ‘অচিন বৃক্ষ’।

‘আজ রবিবার’-এর পরই একে একে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে একজন নিয়মিত অভিনেতা হয়ে উঠেন। অভিনয় করেন ‘যমুনার জল দেখতে কালো’, ‘চোর’, ‘গৃহসুখ প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘বৃক্ষমানব’, ‘জইতরী’, ‘বনুর গল্প’, ‘একি কাণ্ড’, ‘ভূত বিলাস’, ‘হাবলঙ্গের বাজারে’, ‘রুপালী রাত্রি’, ‘এনায়েত আলীর ছাগ’-সহ অনেক নাটকে। এর মাঝে বিশেষ করে বলতে হয় ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’র কথা। তৈয়ব আলী চরিত্রে তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন। পুরো ধারাবাহিক নাটকে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন প্রধান আকর্ষণ। এটিই এখন পর্যন্ত সেরা অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

হুমায়ূন আহমেদ তাঁর তিন প্রিয় অভিনেতাকে নিয়ে বানিয়েছিলেন ‘আমরা তিনজন’ সিরিজ। এই সিরিজের এজাজুল ইসলাম, স্বাধীন খসরুর সঙ্গে তিন জনের একজন ছিলেন তিনি। বোকা কিন্তু হিউমারাস চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের সিনেমা ‘শ্যামল ছায়া’, ‘নয় নম্বর মহা বিপদ সংকেত’-এ অভিনয় করেছিলেন। মুস্তফা কামাল রাজের ‘তাঁরকাটা’ সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সম্প্রতি তৌকির আহমেদের ‘ফাগুণ হাওয়ায়’ সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন।

রেদোয়ান রনির পরিচালনায় মোশাররফ করিমের সঙ্গেও গড়ে উঠেছিল দারুণ জুটি। এই ত্রয়ীর ‘জিম্মি’, ‘বিহাইন্ড দ্য সিন’, ‘বিহাইন্ড দ্য ট্র‍্যাপ’, ‘ফাঁদ ও বগার গল্প’ দর্শকমহলে বেশ সমাদৃত নাটক। সিকান্দার বক্স সিরিজে ‘মামা’ চরিত্রে অভিনয় করেও বেশ আলোচনায় এসেছিলেন। সাম্প্রতিক সময়েও টেলিভিশনে ভীষণ ব্যস্ত তিনি। কাজ করেছেন ‘প্যারা’, ‘হিটলারের মৃত্যু চাই’ সহ অনেক জনপ্রিয় নাটকে। অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক রচনা ও নির্দেশনাও দিয়েছেন।

ফারুকের ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু আক্ষেপও আছে। পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে তাঁর জুড়ি বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। অথচ তিনি বরাবরই অবমূল্যায়িত থেকে যান। হুমায়ূন আহমেদ তাঁকে যেভাবে নাটক-চলচ্চিত্রে কাজে লাগাতে জানতেন, এই সময়ের নির্মাতারা সেটা পারছেন না। ফলশ্রুতিতে আক্ষেপটা ক্রমেই আরো দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

https://www.mega888cuci.com